প্রকাশ : 2020-04-13

মানুষের ঐক্যই পারে শ্রেণী-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে

১৩এপ্রিল,সোমবার,আহাম্মদ হোসেন ভুইয়া,নিউজ একাত্তর ডট কম:১৭০৩ সালে জন্ম নেন একজন ভারতীয় চিন্তাবিদ, দার্শনিক, সুফী সাধক যিনি তৎকালীন সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভীত নতুন করে গেড়েছিলেন। ধনী-গরীব বৈষম্য ঘুচাতে, ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে মজলুম মানুষকে মুক্তি দিতে শুধু দান-খয়রাত যথেষ্ট নয়, নেতৃত্ব বদল করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। সকল কালে, যে কোন জাতিকে সার্বিকভাবে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে যে সমাজব্যবস্থা তার বর্ণনা তিনি রেখেছেন তাঁর অমর গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা-তে। সেই সাথে তিনি রেখে গেছেন একটি মতবাদ যা বিভিন্ন সময়ে দেশে দেশে উচ্চারিত হয়েছে, আরবি উচ্চারণে বলা হয়- ফুক্কা কুল্লে নেজামিন। বাংলা করলে যার মানে দাঁড়ায়, বিদ্যমান সকল ব্যবস্থা (যা জুলুম ও শোষণের সহায়ক) নির্মূল করে দাও। ১৭৪৮ সালে দেয়া এই মতবাদের প্রবক্তা হলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রঃ)। ১৭৬২ সালে তাঁর ইন্তেকালে এ মতবাদ কিন্তু ঘুচে যায়নি। তাঁর যোগ্য তিন ছেলে পিতার ঝান্ডা উঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন শাহ ওয়ালিউল্লাহর (রঃ) বড় ছেলে মহাজ্ঞানী শাহ আবদুল আজিজ (রঃ)। তৎকালীন সময়ে মূলত তাঁরা যুদ্ধ চালিয়ে যান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। একে একে নেতৃত্বে আসেন সৈয়দ আহমদ বেরলভি (রঃ), সৈয়দ নিসার আলি তিতুমির (রঃ), শায়খুল মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (রঃ) প্রমুখ। ঠিক ১০০ বছর পর ১৮৪৮ সালে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন আঙ্গিকে একটি স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে। এক্ষেত্রে বইয়ের নাম দ্য ক্যাপিটাল, লেখক জার্মান কার্ল মার্ক্স আর স্লোগানটি হল- দুনিয়ার মজদুর/ এক হও, এক হও। এই আন্দোলনের ঝান্ডার বাহক হলেন ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্টালিন, মাও-সে-তুং, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা গ্রন্থে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রঃ) লিখেছেন, যদি কোন মানব গোষ্ঠীর মধ্যে সভ্যতার বিকাশ ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে তাদের শিল্পকলা পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে। তারপরে শাসকগোষ্ঠী যদি ভোগ বিলাস, আরাম-আয়েসে ঐশ্বর্যের মোহে আচ্ছন্ন জীবনকেই বেছে নেয়, তাহলে সেই আয়েসী জীবনের বোঝা মজদুর শ্রেণির উপরই চাপে; ফলে সমাজে অধিকাংশ লোক মানবতা শূণ্য পশুর জীবন যাপনে বাধ্য হয়। গোটা সমাজ-জীবনের নৈতিক কাঠামো তখনই বিপর্যস্ত হয় যখন তাকে বাধ্য বাধকতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। তখন সাধারণ মানুষকে রুটি রুজির জন্য ঠিক পশুর মতোই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। মানবতার এবং অর্থনৈতিক দুর্যোগের চরম মুহূর্তের এ অভিশাপ থেকে মুক্তি দিবার জন্য স্রষ্টা নিজেই বিপ্লবের আয়োজন করেন। রোমান এবং পারসিক শাসকগোষ্ঠীও যে জুলুমবাজির পথে এগিয়ে গিয়েছিল, তাদের ঐশ্বর্য এবং বিলাসের যোগান দিতে জনসাধারণকে পশুরস্তরে নেমে আসতে হয়েছিল। এ জুলুমশাহির প্রতিকারের জন্যই আরবের জনগণের মধ্যে হজরত রসুলে করিম (সাঃ) কে অবতীর্ণ করা হয়েছিল।অর্থাৎ এক শ্রেণির বিলাসী জীবনের ভার যদি মজদুর শ্রেণির কাঁধে নেমে আসে তবে সে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া রাসুলের (সাঃ) সুন্নত। কমিউনিজমের প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উক্তি হল-এতোদিন দার্শনিকেরা কেবল বিশ্বকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাই করে গেছেন, কিন্তু আসল কাজ হল তা পরিবর্তন করা। তাঁর বই, যা এখন বিশ্বের অর্থনীতির ও সমাজবিজ্ঞানের প্রতিটি ছাত্রের জন্য অবশ্য পাঠ্য, সেখানে তিনি শাণিত যুক্তিতে, বাস্তবতার নিরিখে, অতীত-বর্তমানের ইতিহাস-পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রমাণ করেছেন যে মানব সমাজের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস, অর্থ হলো পুঁজিপতিদের হাতে শ্রমিক শোষণের হাতিয়ার। সকল পেশার শ্রমজীবী মানুষ একাট্টা হয়েই শুধু পারে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যেখানে শ্রেণীবিভেদ থাকবে না, অসাম্য থাকবে না, এককথায়-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। তবে তার আগে করণীয় হল, বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ১০০ বছরের ব্যবধানে দুটি মহান মতবাদ প্রচারিত হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায়, সম্পূর্ণ আলাদা প্রেক্ষাপটে। তবে, উভয়ের সারাংশ একটি লাইনে আনলে মর্মার্থ দাঁড়ায়-যে সকল ব্যবস্থা শোষণ ও জুলুমের সহায়ক, দুনিয়ার মজদুর মানুষের ঐক্যই পারে তা নির্মূল করে শ্রেণী-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। তবে হ্যা, শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রঃ) এবং কার্ল মার্ক্সের মতবাদের এক জায়গায় বিশাল পার্থক্য- ধর্ম। তাঁরা যার যার সময়ে, নিজ নিজ দেশে, আপন ভঙ্গিমায়, নিজস্ব ভাষায় নিজের মতবাদটি ব্যাখ্যা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। প্রশ্ন হল, এখন যার অন্তরে খোদাভীতি ও নবীপ্রেম আছে কিন্তু বিবেক-বুদ্ধিতে মার্ক্সিস্ট, তার উপায় কি? আদর্শিক ব্যাখ্যায়, এমনকি নিয়তে দুই মতবাদ একে অপরের সাথে মিশে যায়, কিন্তু বর্তমান যুগে, আমার দেশে যদি আমি মতবাদদ্বয়কে ধারণ করতে চাই, তাহলে প্রশ্নের বাণে আমি জর্জরিত। এখন আমার কান্ডারি কে হবে? এখানেই আসে মওলানা ভাসানী এবং তাঁর রবুবিয়াত, হুকুমতে রব্বানিয়া এবং ইসলামী সমাজতন্ত্রের কথা। সমাজতন্ত্রের কথা উঠতেই আলেমওলামারা তওবা কেটেছেন, কমিউনিস্টদের সাথে ওঠা বসা? কিছুতেই না! একবারও ঘেটে দেখেননি এই ইসলামী সমাজতন্ত্র আঠারো শতকের ফুক্কা কুল্লে নেজামিন-এর বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটের ব্যাখ্যা। আবার সে সময়ের অনেক কমিউনিস্ট মওলানা ভাসানীকে এক অর্থে এড়িয়ে গেছেন কার্ল মার্ক্সের সমাজতন্ত্রের সাথে ইসলামী শব্দটি যোগ করার জন্য। একটি বারের জন্য বুঝতে চাননি, যে মানুষের জন্য, যে সমাজের জন্য তাঁরা লড়াই করছেন, সেই মানুষটি ধর্মপ্রাণ, সেই সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এ দেশের মজদুর জার্মান একজন নেতার আদর্শে, হোক তিনি মহাজ্ঞানী, হুট করে ধর্মবিহীন কোন সমাজে আস্থা রাখবে না। তার চেয়ে বড় কথা, যে কোন সমাজ ব্যবস্থা হোক, মতবাদ হোক আর আদর্শই হোক- সে তো মানুষের মুক্তির জন্য। যদি পূর্ব প্রচলিত কোন আদর্শকে যুগের প্রয়োজনে নতুন ব্যাখ্যায় নতুন নিয়মে সামনে আনা হয় তবে কি সেটা ভুল হয়ে যায়? ইসলামী সমাজতন্ত্রের বিপক্ষের আলেম-ওলামা এবং কমিউনিস্টরা সে সময় আচরণ করেছেন সেসব নাগরিকদের মত যারা সক্রেটিসকে বিষ পান করিয়েছিলেন। অহং বাদ দিয়ে তারা জানতে চায়নি এ মতবাদের মাহাত্ম্য ও মর্মার্থ কী। ভাসানী যখন ইউরোপে গ্রন্থে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেছেন, ইউরোপের যুক্তি নির্ভর এবং বাস্তববাদী অধিবাসীরা মওলানা ভাসানীকে কোন ছাঁচে ফেলতে পারেননি। যিনি একই সাথে ফুক্কা কুল্লে নেজামিন এবং দুনিয়ার মজদুর, এক হও- এর ধারক-বাহক, তাঁকে প্রচলিত ধারণায় খাপ না খাওয়াতে পারাই স্বাভাবিক। তিনি একই সাথে বাংলার মজলুমের জন্য সুফী, তিনি একই সাথে বাংলার কমিউনিস্টদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী, তিনি একই সাথে জাতীয়তাবাদীদের পথপ্রদর্শক। তাঁর সময়ে, তাঁর ভাষায় তিনি স্লোগান দিয়েছেন- লড়াই লড়াই লড়াই চাই/লড়াই করে বাঁচতে চাই; হুকুমতে রব্বানিয়ার ভিত্তিতে কৃষক-শ্রমিক-মজুর রাজ কায়েম কর; গড়িতে হইলে আগে ভাঙ্গিতে হয়, মানুষের মুক্তি আপোষ রফায় আসে না; দুনিয়ার মজদুর/এক হও। তাই তো মওলানা ভাসানী আফ্রো-এশিয়া-ল্যাটিন আমেরিকার সকল দেশের মজলুম মানুষের নেতা। মুশকিল শুধু এটাই যে, অনুসন্ধানীরা কার্ল মার্ক্সের কমিউনিজমের সাথে মওলানার কতটুকু সাদৃশ্য তা খুঁজতে চায় কিংবা একজন মওলানা কিভাবে আন্দোলন করেন সেটা দেখতে চায়- কমিউনিজমের ১০০ বছর আগের ফুক্কা কুল্লে নেজামিন-কে কেউ খুঁজতে যান না। তাই মওলানা ভাসানীকেও বারে বারে হারিয়ে ফেলেন। রেড মওলানার একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি- কমিউনিস্টরা ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ কামনা করেন বটে, কিন্তু তাহাদের মতে উহা আল্লাহর নামে না হইয়া রাষ্ট্রের নামে হইতে হইবে। আলেম-ওলামারা সকল কিছুতে আল্লাহর মালিকানা মানিয়া লইয়া থাকেন বটে, কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ কামনা করেন না। এইভাবে হুকুমতে রব্বানিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী দুইটা মতবাদ রহিয়াছে, ইহা আমার অনুসারীদের বুঝিয়া লইতে হইবে।লেখক: আহাম্মদ হোসেন ভুইয়া,নির্বাহী সম্পাদক,নিউজ একাত্তর ডট কম

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর