প্রকাশ : 2018-11-15

২০০১-২০০৬ এর বাংলাদেশ ও বর্তমান বাংলাদেশ

মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী :অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১ অক্টোবর,২০০১ সালে ।১৯৯৬ সালে চালু হওয়া তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে এটি ছিল দ্বিতীয় নির্বাচন । এইসময় তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান । নির্বাচনে বাংলাদেশ এ বিজয়ী হয়ে বিএনপি ও চারদলীয় জোট বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে ।উক্ত সরকারের নির্বাচনী ইশতিহারে প্রায় ৩২ টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের শতাধিক অঙ্গীকারের মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি পূরণ হয়েছিল । দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ,বিদ্যুত সমস্যার সমাধান,আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নত,দুর্নীতি দমন,বিচার বিভাগ পৃথক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্তহীন থেকেছে ।মূলত দেশের মানুষ তখন প্রত্যাশিত আলোর থেকে বেশি থেকেছে অন্ধকারেই ।সেইসময় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের উর্ধ্বগতিতে দিশেহারা ছিল সীমিত আয়ের মানুষ ।দেশের উত্তর অঞ্চলে দেখা দিয়েছিল মঙ্গা ।সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে ক্ষুদার্ত ও দারিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল ।সেইসময় দারিদ্রের হার ছিল দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৯ ভাগ ।মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল খুবই নগণ্য পর্যায়ের ।অনবরত লোডশেডিং আর দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনে দীর্ঘশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল ।দিন এনে দিন খেতে হতো সাধারন মানুষদের ।বিএনপি জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের কৃষিখাতে ধস নেমে গিয়েছিল ।সার সরবরাহ এবং সারের আকাশচুম্বি দাম কৃষকদের কপাল পুড়িয়েছিল ।বিএনপি জোট সরকারের আমলে তত্কলীন কৃষিমন্ত্রী (মতিউর রহমান নিজামী,২০০১ থেকে ২০০৩ এবং এম কে আনোয়ার ২০০৩ থেকে ২০০৬ ) বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচী (বিএডিসি) এর নাজুক অবস্থা করেছিল ।সারের দাবিতে আন্দোলনরত কৃষকদের উপর গুলি চালানো হয়েছিল, রাজশাহী,কুষ্টিয়াসহ সারাদেশে প্রায় ১৮ জন সাধারন কৃষক উক্ত গুলিতে মারা গিয়েছিল ।জোট সরকারের আমলে এ দেশে সবচেয়ে বেশি প্রসার লাভ করেছে জঙ্গি,সন্ত্রাসী মৌলবাদ ।ইসলাম কায়েমের নামে সমগ্র বাংলাদেশে নারকীয় হত্যা,বোমা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছে ব্যাপকহারে জন্ম নেওয়া মৌলবাদীরা ।এসময় খুন,ডাকাতি ও সংখ্যালগুদের উপর হামলা, ধর্ষণ ও নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ।ব্যাঙের ছাতার মতো দেশব্যাপী জঙ্গি ও সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছিল ।জোট সরকারের আমলে সাংসদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকান্ড সারাদেশে অস্থিরতার সৃষ্টি করেছিল ।নিহত হয়েছিল ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষক । বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শুরু হয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ।বিএনপি জোট সরকারের আমলে জন্ম নিয়েছিল কুখ্যাত বাংলা ভাই,শায়খ আব্দুর রহমান,মুফতি হান্নানসহ অসংখ্য বক-ধার্মিক ।এদের পৃষ্ঠপোষক -তায় ছিল বিএনপি জোট সরকার ।এদের সাহায্যে তত্কালীন বিরোধীদলীয় এবং আওয়ামীলীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এক ভয়াভহ গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল বিএনপি জোট সরকার ।জঘণ্য সেই হামলায় অল্পের জন্য শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও তার একটি কান বধির হয়ে যায়,সেই স্মৃতি আজো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় ।ঐ হামলায় শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রয়াত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান ।তাত্ক্ষণিকভাবে সেই হামলায় ২৪ জন এবং মোট প্রায় ৫০০ জন আহত হয়েছিল ।বিএনপি জোট আমলে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছিল জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ।২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট এই জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবি সারাদেশে সবকটি জেলায় (মুন্সীগঞ্জ বাদে) একসাথে একসময় সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক জঘন্যতম ঘটনা ছিল ।বিএনপি জোট সরকার বাংলাদেশের চিরশত্রু রাজাকারদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছে যা চরমভাবে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডকে কলঙ্কিত করেছে ।লাগো মানুষের রক্ত দিয়ে গড়া সংসদ ভবনে রাজাকারদের প্রবেশ ঘটিয়ে বিএনপি জাতি ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সাথে নিকৃষ্টতম বেঈমানী করেছে ।শুধু কি তাই ?বিএনপির পৃষ্টপোষকতায় রাজাকারগোষ্ঠী এই দেশে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে তুলেছে যা থেকে আয়কৃত অর্থ দিয়ে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হতো ।নিজামী,সাঈদী,মীর কাসিমসহ আরো অনেক স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিএনপি জোট সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে বাংলাদেশের সাধারন মানুষের সম্পদ লুন্ঠনে ব্যস্ত ছিল ।বিএনপি জোট আমলে দুর্নীতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঘটিত হলেও বিএনপি জোট সরকারেরই উচ্চপর্যায়ের অনেক মন্ত্রী দুর্নীতিবাজ ছিল ।সেইসময় বাংলাদেশ বিশ্ব দুর্নীতি তালিকায় পরপর কয়েকবার এক নম্বর স্থানে ছিল যাস্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবের ইতিহাসকে চরমভাবে কলঙ্কিত করেছিল ।দশ ট্রাক অস্ত্র পাচার ছিল বিএনপি জোট আমলের একটি অন্যতম ন্যাক্কারজনক ঘটনা ।২০০৪ সালে ১ এপ্রিল মধ্যরাতে চট্টগ্রামের সিইউএফএল জেটিঘাটে খালাসের সময় পুলিশ সদস্যরা আটক করে ১০ ট্রাক সমপরিমাণ অস্ত্র ।পরবর্তীতে ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায় যে,ভারতীয় বিদ্রোহী সংগঠন উলফার পরেশ বড়ুয়া এই দশ ট্রাক অস্ত্র পাচারের সাথে যুক্ত ছিলেন ।এ ব্যাপারে তিনি কয়েকবার বাংলাদেশেও এসেছিলেন । এ মামলায় বিএনপি জোট আমলে তত্কালীন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুত্ফজ্জামান বাবরের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয় । ৩০ জানুয়ারী,২০১৪ সালে এ মামলার রায়ে এ দুজনসহ মোট ১৪ জনকে ফাঁসির দন্ডাদেশ দেওয়া হয় । কথিত আছে যে,তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুত্ফজ্জামান বাবরের শোকেসে দেশ বিদেশের প্রায় ৩০০০ হাজার দামী শার্ট ছিল ।তিনি এক বারের বেশি কোন শার্ট পরতেন না ।সেইসময় কেন বাংলাদেশ দুর্নীতিতে কয়েকবার প্রথম ছিল এই বিলাসীতার চিত্র থেকেই বুঝা যায় ।বিএনপি জোট আমলে ব্যাপকহারে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে বাংলার শান্তিপ্রিয় সংখ্যালঘু সম্প্রদয় ।সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে হিন্দু জনগোষ্ঠী ।সংখ্যালঘু পল্লীগুলোয় ৫ সংস্রাধিক হামলার ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করা হলেও বিএনপি জোট সরকারের কাউকে শাস্তির আওতায় আনেনি ।জামায়াতের জঙ্গী সংগঠন শিবিরের অসংখ্য নেতা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন চালিয়েছে ।হত্যা,ধর্ষণ,গণধর্ষণের এক জঘন্য বিকৃত ইতিহাস রচনা করেছিল জামায়াত শিবির সংগঠন ।বিএনপি জোট আমলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জামায়াত শিবির এবং মৌলবাদীগোষ্ঠীর রাহুগ্রস্থ ছিল ।প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ূন আজাদের উপর বাংলা একাডেমীতে নৃশংস হামলা চালিয়েছিল মৌলবাদীরা ।রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক পরিচালিত এই মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা বাংলা সাহিত্য,সংস্কৃতি ও ভাষাকে গলাটিপে রেখেছিল ।আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসিবিএনপি জোট আমলে আমাদের প্রিয় এই জাতীয় সঙ্গীতকে ম্লান করে রাখা হয়েছিল ।জাতীয় সংগীতের স্থানে মৌলবাদীরা স্বপ্ন দেখতো পাক সার জমিন সাদ বাদ এর ।১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশকে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত মিনি পাকিস্তান করে রাখা হয়েছিল ।মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে ভুলুন্ঠিত করা হয়েছিল ।মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা স্বপক্ষের মানুষগুলি ছিল নির্যাতিত ।২০০১ থেকে ২০০৬ এ ৫ বছরে ধর্মীয় মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের দাপটে,লুটপাট,দখলে বিপর্যস্ত ছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশটি ।তথাপি, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বেশকিছু উদ্যোগ সাধারন মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল ।তার মধ্যে একটি ছিল,গরীব-দুঃখীদের মাঝে দেশী ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিতরণ ।এই উদ্যোগটা বাংলাদেশের সাধারন মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল ।ছাগল পালনে অনেক মানুষ আশার আলো খুঁজে পেয়েছিল,সংসারে স্বচ্ছলতা খুঁজে পেয়েছিল । বিএনপি জোট আমলে অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রয়াত সাইফুর রহমান প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন বটে কিন্তু সরকারের উচ্চপর্যায়ে এবং তৃণমলে দুর্নীতির কারনে সম্পদ ও বাজেটের অসম বন্টণের জন্য সাধারন মানুষ অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজাকিভাবে কখনোই আলোর মুখ দেখেনি ।বিএনপি জোট আমলে অপরাধ দমনে গঠিন হয়েছিল রেপিড একশন ব্যাটালিয়ন (RAB)।দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতিত এই ব্যাটালিয়ন সেই থেকে এখন পর্যন্ত অপরাধ দমনে প্রশংসনীয় অবদান রেখে চলেছে ।বিএনপি জোট আমলে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছিল ।বিভাগীয় শহরগুলিতে যাতায়তের প্রধান প্রধান সড়ককে বেশ উন্নত করা হয়েছিল । কিন্তু এই উন্নয়ন ও উন্নতি কখনোই সাধারন মানুষের মন জয় করতে পারেনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের অসততা ও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য ।বাংলাদেশের শত্রু রাজাকারদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কারনে মানুষ বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ।যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ।সাধারন মানুষ এ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় এনে দিয়েছিল আওয়ামীলীগ কে ।মানুষের সেই ভালবাসা ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে ২০০৮ থেকে এই ২০১৮ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের উন্নয়নের সারথি হয়ে চলছে । সব মিলিয়ে বলা যায় যে,২০০১ থেকে ২০০৬ এই ৫ বছরে বিএনপি জোট সরকার কিছু উন্নয়ন ও পদক্ষেপ ব্যতিত সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে । শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশঃ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সব সূচকে অগ্রগতি, সাফল্য আর উন্নয়নের ফানুস উড়িয়েই টানা দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার চার বছর পূর্ণ করল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এই সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুত্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন দেশের ভেতর-বাইরে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও প্রশংসিত। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র-চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা: সরকারের টানা নয় বছরে দেশের রাজনীতিসহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ শেখ হাসিনার হাতে থাকলেও সে পথ মসৃণ ছিল না। জ্বালাও-পোড়াও, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাসহ দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র, বাধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগোতে হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া, পরিবেশ, কৃষি, খাদ্য, টেলিযোগাযোগ, সংস্কৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এমন কোনো খাত নেই যে খাতে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি, মাতৃত্ব এবং শিশু স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। এগিয়ে সব সূচকে: দেশ আর্থ-সামাজিক সূচকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশাজনক সাফল্য অর্জন করেছে এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ এখন মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রবৃদ্ধি ৫.৫৭ থেকে ৭.২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৮৪৩ থেকে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার, বিনিয়োগ ২৬.২৫ শতাংশ থেকে ৩০.২৭ শতাংশ, রফতানি ১৬.২৩ থেকে ৩৪.৮৫ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্স ১০.৯৯ থেকে ১২.৭৭ বিলিয়ন ডলার, রিজার্ভ ১০.৭৫ থেকে ৩৩.৪১ বিলিয়ন ডলার এবং এডিপি ২৮৫ বিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১০৭ বিলিয়ন টাকা। সাহসী সিদ্ধান্ত বড় প্রকল্পে: নিজস্ব অর্থে পদ্মার ওপর ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর বিশাল এ প্রকল্প হাতে নেয়ার ঘটনা অনেক দেশ ও সংস্থার সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করলেও সে স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে বাংলাদেশ। গত বছরের ৩০ নভেম্বরের পর থেকে দেশ এখন বিশ্বের ৩১টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের তালিকায়। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও চলমান। রয়েছে মহাকাশ জয়ের লক্ষ্য। দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ আগামী মার্চে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ উপগ্রহ সফলভাবে মহকাশে গেলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। বছরে সাশ্রয় হবে ১৪ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ছাড়াও ব্যবহার করবে সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ। এ ছাড়া মেট্রোরেল, এলিভেটেট এক্সপ্রেসহ আরো কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। দেশের প্রথম ৬ লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ জানুয়ারি ফেনী জেলার মহিপালে এই ফ্লাইওভার উদ্বোধন করেন। দেশের আইটি খাতের নতুন সম্ভাবনা যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রধানমন্ত্রী ১০ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেছেন। মাতারবাড়িতে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) সুমিতোমোর নেতৃত্বাধীন জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অর্জন: বর্তমান সরকারের শাসন আমলেই কোনো রকম যুদ্ধ-সংঘাত বা বৈরিতা ছাড়াই দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র বিজয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান এলাকার প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া স্বাধীনতার পরপর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে স্থল সীমান্ত চুক্তি হয়েছিল সম্প্রতি তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা বাংলাদেশের বড় অর্জন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সর্বশেষ রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশ ও সংস্থা এই ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে পাশে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেয়েছেন মাদার অফ হিউম্যানিটি উপাধি। তলাহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র-চিকিৎসার দায়িত্বও পালন করছে। শেখ হাসিনার স্বীকৃতি: পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস, বিশ্বের পাঁচজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিহ্নিত করেছেন, যাদের দুর্নীতি স্পর্শ করেনি, বিদেশে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই পাঁচজন সরকারপ্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়াও কাজের অবদানের জন্য তাকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে। ২০১৪ সালে ইউনেস্কো তাকে শান্তির বৃক্ষ ও ২০১৫ সালে ওমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল রফারাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে অব্যাহত সমর্থন, খাদ্য উৎপাদনে সয়ম্ভরতা অর্জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদানের জন্য আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালে তাকে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ-২০১৫ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা সবসময় নিজেকে প্রমাণ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক খালিজ টাইমস রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট বা পূর্বের নতুন তারকা হিসেবে আখ্যায়িত করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ডিজিটাল বাংলাদেশ: মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কাজে সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। টানা দুই মেয়াদের ক্ষমতায় বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ ও গোষ্ঠীর চাপ সত্ত্বেও শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিচার শেষে রায় কার্যকর করা হয়েছে। এই বিচার করতে পারা স্বাধীন বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য। সেই সঙ্গে গত কয়েক বছরে ডিজিটাইজেশনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করছে। ভূমি ব্যবস্থা ডিজিটাইজেশনের ফলে মানুষের দুর্ভোগ কমছে। ই-টেন্ডারিং, ই-জিপির ফলে দুর্নীতি কমছে। ১০ টাকায় কৃষক ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করার ঘটনাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদাহরণ হিসেবে কাজে লাগছে। মসৃণ ছিল না এই যাত্রা: প্রথম মেয়াদ শেষ করা ও টানা দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু ও তার চার বছরে অনেক সফলতা আসলেও এই যাত্রা মসৃণ ছিল না। এই সময়ে পিছু ছাড়েনি ষড়যন্ত্র। সামনে এসেছে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ। বিএনপি-জামায়াতের চরম রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলা করে দেশ যখন স্থিতিশীল পরিবেশে অর্থনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারায়, ঠিক তখনই আবার নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে জঙ্গিবাদ। তবে এসব চ্যালেঞ্জের বেশিরভাগই স্বাভাবিকভাবে সৃষ্ট নয়, বরং ষড়যন্ত্রমূলকও। সরকারকে বিপাকে ফেলে চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড-অগ্রযাত্রা স্তিমিত করে দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলা, কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদের জামাতে জঙ্গি হামলা, মসজিদ-মন্দিরে হামলা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সবশেষ এক নারী জঙ্গির আত্মঘাতীর ঘটনা সেটিই প্রমাণ করে। তবে সব ষড়যন্ত্র আর চ্যালেঞ্জ প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করেই পথ চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লেখক :মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক, নিউজ একাত্তর ডট কম

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর