প্রকাশ : 2020-12-13

বিনম্র শ্রদ্ধায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ

১৩,ডিসেম্বর,রবিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অগণিত প্রাণের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের রাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশ। যুদ্ধের পেছনে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম। ছাত্ররা, শ্রমিকরা সংগ্রাম করেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে সব মানুষ সংগ্রাম করেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের বিজয়।বিজয়ের মাসের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতি আজ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করছে। প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এদিন বাংলার সূর্যসন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। যখন পরাজয় সুনিশ্চিত তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একে একে হত্যা করে এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের। এদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক, লেখক, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রকৌশলীসহ নানা পেশাজীবী। দেশকে মেধাশূন্য করার পৈশাচিক পরিকল্পনা নেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে মাস্টারমাইন্ডের ভূমিকায় ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সঙ্গেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫ মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী আলবদর এবং আল-শামস বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে। যেখানে এসব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।মুক্তিবাহিনী যখন বীরবিক্রমে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ একের পর এক উড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন দিশাহারা হয়ে পড়ে বর্বর পাকিস্তানিরা। পরাজয়ের চরম প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে ওরা। আঁকে নতুন ছক।এর আগে ডিসেম্বরের ৪ তারিখ থেকে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন হয়। অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখকসহ চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসররা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। ওই দিন প্রায় ২০০ জনের মতো বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ অন্যান্য আরও অনেক স্থানে অবস্থিত নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ওপর বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাদের নৃশংসভাবে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়। এ দুটি স্থান এখন বধ্যভূমি হিসেবে সংরক্ষিত।শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন- অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ডা. আলিম চৌধুরী, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, ড. ফজলে রাব্বী, সিরাজউদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক জিসি দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক খন্দকার আবু তাহের, নিজামউদ্দিন আহমেদ, এস এ মান্নান (লাডু ভাই), এ এন এম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, সেলিনা পারভীনসহ আরও অনেকে। কিন্তু কী অপরাধ ছিল জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের? শুধু মেধাশূন্য করে বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতেই এই গভীর এবং ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ঠিক দুই দিন পর ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞের স্মরণে বাঙালি জাতি সশ্রদ্ধচিত্তে সেই ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে আসছে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ ১৪ ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষণা করেছিলেন কারণ, অপহরণ ও পরে নির্বিচারে হত্যা এই ১৪ ডিসেম্বরেই অর্থাৎ পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাঙালির বিজয় অর্জন তথা বিজয় দিবসের ঠিক দুই দিন আগে সংঘটিত হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। জাতিকে পঙ্গু করার প্রয়াসে ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে সারা দেশে টার্গেট করে প্রায় দুই হাজার শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এর মধ্যে ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর ঢাকাতেই খুন হন প্রায় ১ হাজার ১০০। যুদ্ধের পরও কয়েকজন শহীদ হয়েছেন, যাদের মধ্যে জহির রায়হান অন্যতম।দৈনিক পত্রিকাগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গোপন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে ১৮ ডিসেম্বরে একদল সাংবাদিক ঢাকার পশ্চিমে রায়েরবাজার এলাকায় পচনশীল, ক্ষতবিক্ষত লাশের একটি গণকবরের সন্ধান লাভ করে। জাতির মেধাবী ব্যক্তিবর্গের দেহগুলো অত্যাচারের সুস্পষ্ট চিহ্ন নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, একে-অন্যের নিচে চাপা পড়ে ছিল। লালমাটিয়ায় শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাংবাদিকরা একটি বন্দীশালা আবিষ্কার করেন, যা ছিল রাজাকার, আলবদর, আল-শামসদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এবং কামালউদ্দিন, চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আবদুল আলিম চৌধুরী, আবুল খায়েরের পচনশীল লাশগুলো পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন সেদিনই। সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের লাশ শনাক্ত করা হয় পরের দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সিরাজুল হক, ফাইজুল মাহী এবং চিকিৎসক গোলাম মুর্তোজা, আজহারুল হক, হুমায়ুন কবীর ও মনসুর আলীর লাশ পরবর্তীতে চিহ্নিত করা হয়। লাশ শনাক্তকরণের সময় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। এরকম আরও বধ্যভূমি ছিল মিরপুর এবং রায়েরবাজার এলাকায়, তেজগাঁওয়ের কৃষি বর্ধিতকরণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহাখালীর টিবি হাসপাতালসহ সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায়। অনেক লাশই পরবর্তীতে শনাক্তকরণের পর্যায়ে ছিল না।শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সেই আত্মত্যাগের স্মরণেই আধুনিক স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে রায়েরবাজারে গড়ে তোলা হয়- শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। এই সৌধটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯৯৬ সালে। ৬ দশমিক ৫১ একর জমির ওপর এ সৌধটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর।একাত্তরের সেই বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে।বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের পরও আমাদের ভেতরে ক্রোধ জাগছে না; স্বপ্ন সৃষ্টি হচ্ছে না হারানো বুদ্ধিজীবীদের মতো বা তাঁদের চেয়ে বড় বুদ্ধিজীবী সমাজ গড়ে তোলার। তরুণদের আমরা পাঠাগার থেকে পার্কে নিয়ে গিয়েছি। স্বদেশি চেতনা ভুলে দিন দিন বিদেশপ্রেমী হয়েছি, রোধ করতে পারছি না মেধা পাচার। যা হোক, এক কথায় হলো আমরা আমাদের তরুণদের বুদ্ধিজীবীতে রূপান্তরের কার্যক্রমে ভীষণভাবে পিছিয়ে রয়েছি। কী উপায়ে শোককে প্রকৃতপক্ষে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি আমরা? উপায় সহজ! শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মূল তাৎপর্য তরুণদের মধ্যে তুলে ধরা। অবিরত বুদ্ধির চর্চা, বুদ্ধির বিকাশে সহনশীলতা বাড়িয়ে বিতর্কে উদ্বুদ্ধ করা। পাকিস্তানিরা আমাদের যে ক্ষতি ১৪ ডিসেম্বরে করেছে, ঝাঁকে ঝাঁকে শক্তিশালী তরুণ বুদ্ধিজীবী সৃষ্টি করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাঁকে বাঁকে বিশ্বের মাঝে শ্রেষ্ঠ অবস্থান অর্জন করে তার প্রতিশোধ নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। অর্থাৎ শোককে শক্তিতে রূপান্তর মূলত জাতিগতভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। এটাই মূলত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের শপথ রক্ষা করার উত্তম পথ।- লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর