প্রকাশ : 2020-12-07

বেগম রোকেয়া : নারীমুক্তি ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পথিকৃৎ- মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা

০৭ডিসেম্বর,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ঊনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ছিলেন, একজন নারীমুক্তি, সমাজ সংস্কার ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পথিকৃৎ। তিনি কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিধিনিষেধের অন্ধকার যুগে শৃঙ্খলিত বাঙালি মুসলিম নারীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পর্দার অন্তরালে থেকেই নারীশিক্ষা বিস্তারে অগ্রসর হন এবং মুসলিম নারী সমাজকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ সুগমের অগ্রসেনানী ছিলেন। বেগম রোকেয়া সামাজিক নানা বিধিনিষেধ, নিয়ম-নীতির বেড়াজাল উপেক্ষা করে আবির্ভূত হয়েছিলেন, অবরোধবাসিনীদের মুক্তিদূত হিসেবে। নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ১৯৩০ সালের দুই ডিসেম্বর প্রথম মুসলিম মহিলা হিসেবে উড়োজাহাজে চড়ে আকাশভ্রমণের সুযোগও গ্রহণ করেছিলেন রোকেয়া। তাঁর এ-সংক্রান্ত লেখা বায়ুুযানে পঞ্চাশ মাইল এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ৯ ডিসেম্বর বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার ১৪০তম জন্ম ও ৮৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাই দিনটি বেগম রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময়কার সমাজ ব্যবস্থা ছিল নানাবিধ কুসংস্কারে পূর্ণ। তিনি সম্ভ্রান্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ক্রমান্বয়ে নারী জাগরণের অগ্রদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। বেগম রোকেয়ার প্রকৃত নাম ছিল রোকেয়া খাতুন। বৈবাহিকসূত্রে নাম হয় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু বেগম রোকেয়া নামেই তিনি সর্বময় পরিচিত। তাঁর জীবন পর্যালোচনায় জানা যায়, ছোট বেলাতেই তৎকালীন সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটেও রোকেয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে পরিবেশ অনুকূলে আনা যাচ্ছিলো না। কারণ বাবা জহির উদ্দীন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের সমাজ ব্যবস্থার নীতিতে অটল ছিলেন। তিন ভাই, তিন বোনের মধ্যে রোকেয়া ছিলেন পঞ্চম। তাঁর বড় ভাইদের মধ্যে ইব্রাহিম সাবের প্রথম এবং দ্বিতীয় ভাই খলিলুর রহমান সাবের, তৃতীয় জন ছিলেন ইসরাইল সাবের যিনি অল্প বয়সেই মারা যান। বোনদের মধ্যে বড় ছিলেন করিমুন্নেসা খানম আর ছোট ছিলেন বেগম রোকেয়া এবং তৃতীয় বোন হোমায়রা খানম। তখন তাদের পরিবারে উর্দু ভাষার প্রচলন ছিল। তবে বেগম রোকেয়ার ভাইয়েরা উচ্চ শিক্ষিত ছিল। দুই ভাই কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। অথচ বেগম রোকেয়া ও তার বোনদের বাইরে পড়াশুনা করতে পাঠানো হয়নি, তাদের ঘরে আরবি ও উর্দু শেখানো হয়। তবে রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিকমনা ছিলেন। তিনি রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখান। বেগম রোকেয়া ১৮ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তাঁর আধুনিক পড়ালেখা আরও পুরোদমে শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি সাহিত্যাঙ্গনেও পদার্পণের সুযোগ পান। এসময় তিনি বেশ কয়েকটি স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক সকল কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত রাখেন। বেগম রোকেয়ার ভাষায়, আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করে। আর সেই সব গ্রন্থের দোহাই দিয়া নারীদের অন্তঃপুরে আবদ্ধ করিয়া রাখে তারা। এরপর বয়ে গেলো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের আরো অনেক ইতিহাস। দুই কন্যা সন্তানের জননী ছিলেন, তিনি। কিন্তু নিয়তির কারণে তিনি বেশিদিন কন্যা সন্তানের মা ডাক শোনতে পান নি। মারা যান দুই কন্যা। এরপর স্বামীও মারা যান। স্বামী পূর্ব বিবাহিতা হওয়ায় স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বামীর বাড়ীর কোনো সহযোগীতা পেলেন না তিনি। এক পর্যায়ে তিনি ১৯১৬ সালে মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা , যার অনূদিত রূপ সুলতানার স্বপ্ন। এটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। তার অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলো- পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, মতিচুর। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তখনকার প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা বেগম রোকেয়ার বহুবিধ অবদানের জন্য ঊনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান এ বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারককে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করা হয়। বলাবাহুল্য যে মহীয়সী এই নারী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগমূহুত্বেও লেখালেখি করেছেন। মৃত্যুর পর তাঁর টেবিলে পেপারওয়েটের নিচে- নারীর অধিকার শীর্ষক একটি অর্ধসমাপ্ত লেখা পাওয়া গিয়েছিল। বেগম রোকেয়ার প্রতিটি নিশ^াস-বিশ্বাস, কর্ম ও ধ্যানে মৃত্যুর আগমূহুর্ত্ব পর্যন্ত একই চিন্তাধারাকে লালন করে গেছেন। নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, নারীকে মানুষ হিসেবে মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য ১৯১১ সালে মাত্র ৮জন ছাত্রী নিয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরী করে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। এই স্কুলটি ছিল ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদানকারী প্রথম মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়। এই আটজন ছাত্রীর যাতায়াতের জন্য কলকাতার একজন ব্যবসায়ী প্রথম একটি ঘোড়ার গাড়ী উপহার দিয়েছিলেন। কিছু দানশীল ব্যক্তির সাহায্য এবং স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মাসিক চাঁদার ওপর নির্ভর করে স্কুলটি চালিয়ে গেলেন। এরপর ১৯১৫ সালে ছাত্রীসংখ্যা ৪০-এ উন্নীত হলে স্কুলটিতে পঞ্চম শ্রেণি চালু করলেন এবং একে একটি উচ্চবিদ্যালয়ে উন্নীত করলেন। ১৯৩১ সালে ওই স্কুল থেকে তিনজন ছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণও হলো। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে মেয়েরা ধীরে-ধীরে শিক্ষার আলো পেতে শুরু করেছে। তিনি সবসময় মনে করতেন নারী-পুরুষের মধ্যে বিভাজন নয়; বরং সহযোগীতা প্রয়োজন। প্রগতিশীল মনা মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া উন্নত মানসিকতা, দূরদর্শী চিন্তা, যুক্তিপূর্ণ মতামত প্রদান ও বিশ্লেষণ, উদার মানবতাবোধের অবতারণা এবং সর্বোপরি দৃঢ় মনোবল দিয়ে তৎকালীন নারী সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর জীবনাদর্শ ও কর্ম দেশের নারী সমাজের অগ্রযাত্রায় পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। তাই বেগম রোকেয়ার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে নিজেদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে অগ্রগতির পথে দেশের যে যাত্রা তা আরো গতিময় করতে এদেশের নারীসমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে। এটাই হোক বেগম রোকেয়া দিবসের অঙ্গিকার।- লেখকদ্বয় : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর