প্রকাশ : 2020-11-29

স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নই হোক বিজয়ের মাসের অঙ্গিকার: সাহেনা আক্তার হেনা

২৮নভেম্বর,শনিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: স্বাধীনতা অমূল্য সম্পদ। স্বাধীনতা যেকোন মুক্তি পিপাসু মানুষের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। মানুষ ক্রীতদাস হয়ে বাঁচতে চায় না। সে চায় তার স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে স্ব গৌরবে বিরাজ করতে। বায়ু ছাড়া যেমন মানুষ বেঁচে থাকতে পারেনা, তেমনি স্বাধীনতা ছাড়া কোন জাতি আত্নবিকশিত হতে পারেনা। মানুষের আত্মার বিকাশের জন্য চাই স্বাধীনতা। ডিসেম্বর মাস মহান বিজয় দিবসের মাস। এই বিজয় দিবসেই আমরা বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। ১৯৭১ সালের এই মাসেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মাত্যাগ, ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়ের দিনটিতে আনন্দের পাশাপাশি বেদনাও বাজে বাঙালির বুকে। বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল এই স্বাধীনতার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ২শত ১৪ বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ে মুক্তির সোপান তলে কতো-কতো প্রাণ যে বলিদান হয়েছে, তার হিসেব ইতিহাসের পাতায় অসম্পূর্ণ। দীর্ঘ যুগের দীর্ঘ শতাব্দীর বঞ্চনার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের পূর্ব পুরুষ বার-বার জ্বলে উঠেছে শৃঙ্খল ভাঙ্গার লড়াইয়ে। সে লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ১৯৪৭-এ একটি ভুল স্বাধীনতার নাগাল আমরা পেয়েছিলাম। তা ছিল স্বাধীনতার নামে এক নব্য পরাধীনতার ক্রান্তিকাল। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ৪৭-এ লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে যদি আমাদের এই বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুক্তি আসতো, তবে হয়তো একাত্তর পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হতোনা। ৪৭-এ দেশ ভাগ হয়েছিল সাম্পদায়িক ভাবনা থেকে। যার ফলে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের অধীনস্থ হয়েই পরাধীনতার শেকল পরে এই বাঙলার ভূখন্ডের সহজ-সরল মানুষ নতুন করে আটকে যায় শোষণের জালে। তখন দেশ ভাগের বছর না ঘুরতেই প্রথমেই নামে মাতৃভাষার অধিকার হরণের খড়গ। বাঙলার কত বীর সন্তানেরা মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছে এই খড়গের নিচে। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা পেলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-চাকরীসহ সব দিকেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও ছিল পশ্চিমা উগ্র বৈষম্যবাদীদের কব্জায়। এমন অবস্থায় স্বাধীনভাবে স্বনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যয়ে বিদ্রোহী বাঙালি সৃষ্টি করেছিল এক ইতিহাস। পশ্চিমা বৈষম্যবাদী শাসক ও শোষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মাতৃভাষার অধিকার, শিক্ষা আন্দোলন, গনঅভ্যুত্থান, ৬দফা আন্দোলনসহ সবশেষে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকন্ঠের ডাকে এই দেশের নিরীহ-নিরস্ত্র-নিপীড়িত-অধিকার বঞ্চিত মানুষগুলো তাদের স্বীয় অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। করেছিল মুক্তির জন্য যুদ্ধ। এনেছিল স্বাধীনতা, এনেছিল বিজয়। এই বিজয়ের মাসের জন্য, স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ সালে বাঙালী সর্বস্ব দিয়ে পাকিস্তানি নারকিয়তা ও পশুশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে চরম ত্যাগ ও পরম বীরত্বে স্বাধীন ভূ-খন্ডই কেবল পায়নি, একইসাথে পেয়েছিল রক্তাক্ত এক উত্তরাধিকার। কিন্তু, যে কথা আজ না বললেই নয়; স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য অনিবার্য এই যুদ্ধের অর্ধ শতাব্দীর পরও আমরা যখন দেখি এই স্বাধিন বাংলার পতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য্যকে টেনে নামিয়ে ফেলার হুংকার আসে তখন মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি পেরেছি জাতির পিতার প্রতি সম্মান দেখাতে? আমরা কি পেয়েছি আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা? যদিও আমরাই আমাদের সব কিছুর নিয়ন্ত্রক। তবুও আমরা নিয়ত অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমরা স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বাধীনতাটাও যেন হারাতে বসেছি। নিজেরা নিজেদের মধ্যে হানাহানীতে লিপ্ত হচ্ছি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সন্ত্রাস, হানাহানি, রাহজানি, অগ্নিসন্ত্রাস, ধর্ষন, অপহরণ ঘটেই চলছে। এ যেন, এক টুকরো স্বস্তির নিঃশ্বাস পেতে বা নিজেদের মনের অব্যক্ত হাহাকার ব্যক্ত করতে নেই এতটুকু আশ্রয়। অবস্থাদৃষ্টে মনেই হয় না যে আদৌ আমরা কোন সভ্য সমাজে বসবাস করছি। বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। চলমান মুক্তির জন্য যুদ্ধ এবং স্বধীন সার্বভৌম স্বদেশ অর্জনের লক্ষ্যে ছিনিয়ে আনা ১৬ডিসেম্বরের এই বীর বিজয় আমাদের উত্তর প্রজন্মের চির প্রদীপ্ত অক্ষয় এক পটভূমি, অন্তহীন এক অনুপ্রেরণা, অনিঃশেষ এক অহংকার। কিন্তু, স্বাধীন দেশের কি চিত্র রেখে যাচ্ছি আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য? স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু এ স্বাধীনতা অর্জন এবং তা রক্ষাকরণে যা সর্বাধিক প্রয়োজন, তা হচ্ছে স্বার্থহীন সত্যনিষ্ট ও ন্যায়পরায়নতা। এখনি সময় অনেক বিড়ম্বনা সহ্য করে দূর্নিবার আন্দোলন আর প্রতিরোধে যে স্বাধীনতা তা রক্ষা করতে প্রত্যেকের হীন স্বার্থসিদ্ধির লোলুপ মনমানসিকতা থেকে বের হয়ে আসার। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব এবং মানুষ মানুষের জন্যেই। মানুষ স্বাধীন সত্ত নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে। শুধু তাই নয়, মানুষ জন্মগতভাবে সমঅধিকার ও মর্যাদা সম্পন্ন প্রাণী। যদি এটাই সত্যি হয়, তবে আসুন আমরা আমাদের মানবিক ভাবনার শুভ ও কল্যাণকর দিকগুলোকে প্রগতিশীল চিন্তায় স্নাত করে সব অপরাধ, স্বার্থপরতা, হিংস্রতা জলাঞ্জলী দিয়ে অপরাধহীন, কুলসহীন, গনতান্ত্রিক একটি সুন্দর সমাজ ও দেশ গড়ার হৃদয়স্পর্শী প্রত্যয়ে সকলে মিলে একাত্মতা ঘোষণা করে নির্মোহ দৃষ্টিতে নিজেরদের না হয় আরো একবার পরিশুদ্ধ করি। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই আমরা আমাদের স্বাধীন সত্ত্বার কাছে, নতুন প্রজন্মের জন্য একটি অপরাধহীন, সন্ত্রাসহীন সুখী সমৃদ্ধ নির্মল দেশ গড়ে দেবার মানুসিকতায়। আর তাই সব ধরনের স্বার্থপরতা আর অপরাধ, দুর্নীতিসহ বিকৃত মানসিকতা রুখতে শুধু আইনের প্রতি নির্ভরশীলতা বা শুধু আইন প্রয়োগই নয় প্রণীত আইনের সঠিক প্রয়োগ, সচেতনতা, সামাজিক সম্প্রীতি, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করার পাশাপাশি ধর্মীয় ও পারিবারিক সঠিক শিক্ষাদ্বারা তাদের আমূল পরিবর্তন, নারী নির্যাতন ও ধর্ষন প্রতিরোধে প্রতিটি এলাকায় নারী সংগঠেনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক সভা-সমাবেশ সেমিনারসহ নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা এবং আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠে দেশ ও সমাজের আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকারসহ স্বাধীনতার পরিপূর্ণতায় বাস্তবায়িত গনতান্ত্রিক ও একটি সুন্দর, সূখী-সমৃদ্ধশালী এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসি। এটাই হোক এবারের মহান বিজয়ের মাসের অঙ্গিকার। -লেখক : সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর