উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ,দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম আওয়ামী লীগ সরকার
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী :২০০৯ সালে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ওই সময়ে আশু করণীয়, মধ্য-মেয়াদি ও দীর্ঘ-মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তারা। পরে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে করারর পাশাপাশি দশ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারো জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ধরে রাখে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। ৯ বছর একটানা সরকারের দায়িত্বগ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী মন্দা থাকা সত্বেও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম আওয়ামী লীগ সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫ সালের ৫৪৩ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। দেশে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল শুন্য দশমিক ৭৪৪ বিলিয়ন ডলার। দিন বদলের সনদ ঘোষণা দিয়ে গড়ে তোলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবনমান সহজ করা এবং উন্নত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। দেশে ১৩ কোটি মোবাইল সীম ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ৮ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন করে ব্যান্ডওয়াইথ বৃদ্ধি করা হয়েছে। গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে জনগণ ২০০ ধরনের সেবা পাচ্ছেন। সকল ধরনের সরকারি ফরমস, জমির পর্চা, পাবলিক পরীক্ষার ফল, পাসপোর্ট-ভিসা সম্পর্কিত তথ্য, কৃষিতথ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনগত ও চাকুরির তথ্য, নাগরিকত্ব সনদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রক্রিয়া, ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন বিল প্রদানের সুবিধা জনগণ পাচ্ছেন। ঘরে বসে আউটসোর্সিং-এর কাজ করে অনেক তরুণ-তরুণী স্বাবলম্বী হয়েছে। বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে প্রবাসীরা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রায় ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সে সময় এডিপির আকার ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিপির আকার ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ৩৪ দশমিক আট-পাঁচ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ছিল ৩ দশমিক চার-আট বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ৩৩ দশমিক চার-চার বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ২০০৫ সালে ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়। ২০১৭ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে ১০ লাখ ৮ হাজার ১৩০ জনের। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ২০০৫-০৬ বছরে ছিল ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেমিটেন্স এসেছে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮১৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক দুই-আট শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ১৯৯১-৯৬ সময়ে বিএনপি আমলে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ শতাংশ। ২০০১-এ আওয়ামী লীগ যখন দায়িত্ব ছাড়ে তখন মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিএনপির সময় মূল্যস্ফীতি আবার ৭ দশমিক এক-ছয় শতাংশে পৌঁছে। ২০০৮-০৯ বছরে মূল্যষ্ফীতি দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে মুল্যস্ফীতি ৫ দশমিক আট-চার শতাংশে নেমে আসে। বিগত ৯ বছরে ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। ১ হাজার ৪৫৮টি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার সাথে ৩৬৫টি কলেজ সরকারিকরণ করা হয়েছে। ৫০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম স্থাপন করেছি। বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি বই বিতরণ করা হয়েছে। স্বাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা গ্রাম পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারাদেশে সাড়ে ১৮ হাজার কম্যুনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করে সরকার। এ সময়ে ১১৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৬ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। শতকরা ৮৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদন ৪ কোটি মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে আমাদের অবস্থান ৪র্থ। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭২ বছর। বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে বেশ কয়েকটি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করছে সরকার। পদ্মা সেতুর কাজ অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকায় মেট্টোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। সমগ্র বাংলাদেশকে রেল সংযোগের আওতায় আনা হচ্ছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পরমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। খুব শিগগিরই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করা হবে। পটুয়াখালীতে পায়রা বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি এবং রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। গ্রিডবিহীন এলাকায় ৪৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। সৌর বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের কাজ শুরু হয়েছে। গ্যাসের সমস্যা দূর করতে এলএনজি আমদানি শুরু হচ্ছে। রান্নার জন্য দেশে এলপিজি গ্যাস উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে। দেশে সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট নির্মাণসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে সরকার। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ৪-লেনে উন্নীত করা হয়েছে। চন্দ্রা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক চার-লেনে উন্নয়নের কাজ চলছে। সারাদেশে ২ কোটি ২৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন কৃষকের মধ্যে কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। প্রায় ৯৮ লাখ কৃষক ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খুলে ভর্তুকির টাকা পাচ্ছেন। প্রাইমারি থেকে মাস্টারস ডিগ্রি ও পিএইচডি পর্যন্ত ২ কোটি ৩ লাখ শিক্ষার্থী বৃত্তি ও উপবৃত্তি পাচ্ছে। ১ কোটি ৩০ লাখ প্রাইমারি শিক্ষার্থীর মায়ের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৃত্তির টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। শিক্ষা খাতে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৭ হাজার। মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম
জামায়াতের প্রার্থিতা বাতিল আইনিভাবেই সম্ভব
২০০৮ সালের ১ অগাস্ট তরিকত ফেডারেশনের দায়ের করা এক রিট মামলার রায়ে হাইকোর্ট ২০১৩ সালে রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে। চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিবন্ধন বাতিল হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এ দলের ২২ নেতা এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের জোটসঙ্গী বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। স্বতন্ত্র হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৩ জননেতা। নিবন্ধন বাতিল হওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২৫ নেতার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে চার ব্যক্তির করা একটি রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ গত মঙ্গলবার (১৮ ডিসেম্বর ২০১৮) রুলসহ আদেশ দেয়। জামায়াত নেতাদের প্রার্থিতা বাতিলের পদক্ষেপ নিতে ওই চার রিটকারী নির্বাচন কমিশনে যে আবেদন করেছিলেন, তা তিনদিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলা হয় ওই আদেশে। উচ্চ আদালতের সেই আদেশের চিঠি বৃহস্পতিবার (২০ ডিসেম্বর) ইসিতে পৌঁছায়। ওইদিনই ইসি সচিব জানান, আইন শাখায় বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ইসিতে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে। এরপর ইসি তিনদিনের সময়সীমা মেনে সোমবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবে। এখানে উল্লেখ্য যে, রিটকারীরা তাদের করা রিট আবেদনে বলেছেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন নেই, তাই ওই দলের কোনো নেতা নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করতে পারছেন না। যেহেতু নিজস্ব প্রতীকে পারছেন না, সেহেতু অন্য কোনো দলের প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণেরও সুযোগ তাদের নেই। তাদের সেই সুযোগ দিয়ে নির্বাচন কমিশন হাইকোর্টের রায় ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের বিভিন্ন বিধির সঙ্গে প্রতারণা, প্রবঞ্চনা করেছে। ইতিপূর্বে, গত ২৩ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বলেছেন, জামায়াতের সদস্যদের স্বতন্ত্র বা জোটগতভাবে নির্বাচন করা থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় আইন নেই। বিদ্যমান আইনে কী করা সম্ভব তা কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে বসে পর্যালোচনা করা হবে। অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নেতারা নিবন্ধিত দলের সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচন করতে পারবেন কি-না সাংবাদিকরা জানতে চাইলে গত ৯ নভেম্বর ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, এটি আইনে কোথাও নেই। কিন্তু কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল যদি অনিবন্ধিত দলের প্রার্থীকে নমিনেশন দেয়, তাহলে তো আমরা বাধা দিতে পারব না। এ বিষয়ে আইনে কোনো ব্যাখ্যাও নেই। একই ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার (২৩ ডিসেম্বর) রাত প্রায় সাড়ে ৮টায় ইসির প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে জানতে পারলাম যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ২৫ নেতার প্রার্থিতা বহাল রেখেছে ইসি। এই প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ ইসির হাতে নেই বলেই তাদের প্রার্থিতা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিব বলেন, কমিশন সভায় জামায়াতের ২৫ প্রার্থীর প্রার্থিতা বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আদেশ বিশ্লেষণ করে কমিশন দেখেছে, বিদ্যমান আইনে এসব প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে এই ২৫ জামায়াত নেতার প্রার্থিতা বহাল থাকছে। তাহলে বোঝা গেল, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতকে নির্বাচন করা থেকে বিরত রাখার আইন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইসি হাইকোর্টের আদেশ চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে। ইসির বিজ্ঞতা ও প্রাজ্ঞতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ করাও আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে একটা কিন্তু থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২(১) অনুযায়ী, আইন অর্থ কোন আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোনো প্রথা বা রীতি। আইনের সাংবিধানিক সংজ্ঞা থেকে আমরা তাহলে দেখতে পাচ্ছি আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোন প্রথা বা রীতিও আইন হিসেবে গণ্য। বিশ্ব জুড়ে একটি অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত Legal Maxim বা আইনি রীতি হচ্ছে: What cannot be done directly cannot be done indirectly অর্থাৎ কোনো কাজ যদি সরাসরি না করা যায়, তবে সেই কাজ পরোক্ষভাবেও করা যাবে না। এই Legal Maxim টি তার যাত্রা শুরু করেছে সেই ১৮৮১ সালে কানাডাতে। তবে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮২ সালের যুক্তরাজ্যের Privy Council-এর Charles Russell vs. The Queen এবং Queens Bench Division-এর Todd vs. Robinson মামলা দুটির রায়ের মাধ্যমে। Legal Maxim টি যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় Hammer vs. Dagenhart মামলাটির মাধ্যমে। অস্ট্রেলিয়াতে প্রথমবারের মতো এই Legal Maxim কে গ্রহণ করা হয় ১৯০৪ সালের অস্ট্রেলিয়া হাই কোর্টের Sydney Municipal Council vs. Commonwealth এবং D’Emden vs. Pedder মামলা দুটিতে। তবে Legal Maxim অস্ট্রেলিয়াতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় অস্ট্রেলিয়া হাইকোর্টের ১৯০৮ সালের R vs. Barger এবং ১৯১১ সালের Osborne v. Commonwealth মামলা দুটির রায়ের মাধ্যমে। আলোচ্য Legal Maxim ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বহু মামলাতেও প্রয়োগ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়, ১৯৭৯ সালের Jagir Singh vs. Ranbir Singh, ২০০০ সালের M C Mehta vs. Kamal Nath, ২০১০ সালের Sant Lal Gupta vs. Cooperative Group Housing Society Ltd, ইত্যাদি। এখন তাহলে আইনি ব্যাপারটা আমরা একটু মিলিয়ে নেই। হাইকোর্ট ২০১৩ সালে রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত না হওয়ার কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। দল তো আর প্রার্থী হয় না, হয় দলের সদস্যরা। তাই যদি হয়ে থাকে, তবে হাই কোর্টের রায় অনুযায়ী অনিবন্ধিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলটির কোনো সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এটাই তাহলে আদালত কর্তৃক ঘোষিত আইন যাকে আমরা Judge-made Law বলি এবং আমাদের সংবিধান অনুযায়ী তা খুবই আইনসিদ্ধ। এবার আসি, বিশ্বজুড়ে সুপ্রতিষ্ঠিত খবমধষ গধীরস বা আইনি রীতি What cannot be done directly cannot be done indirectly বিষয়ে। আগেই বলেছি এই সুপ্রতিষ্ঠিত খবমধষ গধীরস বা আইনি রীতির অর্থ হচ্ছে কোনো কাজ যদি সরাসরি না করা যায়, তবে সেই কাজ পরোক্ষভাবেও করা যাবে না। তাহলে, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলটির কোনো সদস্য যদি নির্বাচনে directly (সরাসরি) অংশগ্রহণ করতে না পারে, তবে সে কি করে অন্য দলের আড়ালে লুকিয়ে নির্বাচনে directly (পরোক্ষভাবে) অংশগ্রহণ করতে পারে? সেটা কি সুপ্রতিষ্ঠিত Legal Maxim বা আইনি রীতিকে লঙ্ঘন করা হলো না? বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২(১) অনুযায়ী, আইনের সাংবিধানিক সংজ্ঞাতে যেহেতু আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোনো প্রথা বা রীতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাহলে বিএনপি দলটির আড়ালে লুকিয়ে বা স্বতন্ত্রভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলটির ২৫ জন সদস্য কিছুতেই নির্বাচনে indirectly অংশগ্রহণ করতে পারে না। আর যদি তারা সেই কাজ করে, তবে তারা নিজেরা এবং তাদের সহযোগিতা করার জন্য বিএনপি দু দলই আইন ভঙ্গের দোষে দুষ্ট যা নিঃসন্দেহে আদালত অবমাননার শামিল। জানি না, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থিতা বিষয়ে আমাদের ইসি যখন সংশ্লিষ্ট আইন খুঁজে ব্যর্থ হয়েছেন, বিশ্বজুড়ে সুপ্রতিষ্ঠিত Legal Maxim বা আইনি রীতিনীতিগুলোতেও চোখ বুলিয়েছেন কিনা! লেখক: ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ,আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক, প্রকাশিত মানবকণ্ঠ
প্রাণশক্তি স্পর্শ করা স্লোগান গ্রাম হবে শহর
অনলাইন ডেস্ক :গ্রাম শব্দটি মূলত সংস্কৃত ভাষা হতে উদ্ভূত। লোকমুখে এই গ্রাম গেরাম হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই গেরাম গাঁও গাইগাঞি গাঁ- এ রূপান্তরিত হয়েছে। কারো কারো মতে, সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন মেনে এ শব্দ গ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে। মার্কগেুয়-পুরাণের মতে, যে ভূখ-ে ভদ্রগণ ও সমৃদ্ধশালী কৃষকেরা বাস করে তার নাম গ্রাম। ইতিহাস প-িত নীহাররঞ্জন রায় এর উদ্ধৃতিতে বাংলাদেশের গ্রাম গড়ে ওঠার সমগ্র প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। একই বংশে জাত সন্তান-সন্ততি এবং তাদের বংশধরদের নিয়ে কয়েকটি পরিবারের ছোট একটি উপনিবেশ হলো গ্রামের স্বাভাবিক রূপ। গ্রামের উৎপত্তি সম্বন্ধে প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকের এই বক্তব্য সূচনায় সঠিক হলেও কালে গ্রামের এই স্বাভাবিক রূপ অক্ষুন্ন থাকেনি। বিভিন্ন জাতের ও শ্রেণির মানুষের বসতি রয়েছে গ্রামে। স্বনির্ভর হয়েছে সংশোধন। সর্বোপরি প্রভাবশালী যোদ্ধা শ্রেণি, রাজন্যবর্গ এবং ধর্মযাজক গোষ্ঠীর প্রভূত্বকে স্বীকার করে নেওয়ার ফলে গ্রামের সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনেও এসেছে পরিবর্তন যার ফলে সকল সিদ্ধান্ত কেবল পরিবারের বা গ্রাম সমাজের নিজ প্রয়োজনে নেয়া সম্ভব হয়নি। রাজ শক্তির উত্থান-পতন সামন্ত যুগে গ্রামীণ সমাজকে স্পর্শ করেছে প্রত্যক্ষভাবে। বর্তমানে গ্রাম কেবল মানুষের বসতির একটি রূপ নয়। তা এখন উন্নয়নের অংশীদার। এর অভ্যুদয়ের সাথে জড়িত ছিলো জীবিকার্জ্জনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ উৎপাদন ব্যবস্থা। আদিম যাযাবর মানুষ যখন পশু শিকার এবং ফলফূস আহরণ ছেড়ে কৃষিকাজ শিখল তখন ইে নতুন জীবিকার তাগিদেই তাকে গ্রহন করতে হলো উপযুক্ত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সেই উৎপাদন ব্যবস্থাই যাযাবর মানুষকে স্থায়ী বসতি স্থাপনে বাধ্য করলো। গ্রামীণ সমাজের আদিলগ্নে প্রাকৃতিক অর্থনীতিই ছিল প্রধান। তখন গ্রামের মানুষেরা কেবলমাত্র নিজেদের ব্যবহারের জন্য দ্রব্য সামগ্রী তৈরী করতো। আদিম সাম্যবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো যে গ্রাম ক্রমে ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পণ্য-বিনিময়ের প্রসারের ফলে তার প্রকৃতিতে পরিবর্তন হলো। শুধু প্রাকৃতিক সুষম্য নয়, আলো ও অন্ধকারের বাস্তবতায় গ্রামকে দেখার অবকাশ এখনো রয়ে গেছে। পালাবদলের পৃথিবীতে বাংলাদেশের গ্রামগুলোর সঙ্কট আর সম্ভাবনা দিব্য দৃষ্টি নিয়ে দেখার চেষ্টা করছে পুরোনো প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। গ্রামীণ বাংলার এক শাশ্বত প্রতিরূপ ভেসে উঠে হেমন্ত ও শীতের সন্ধিক্ষণে আমরা এখন তা উপলব্ধি করছি। চোখ মেলে চাইলেই চিরায়ত বাংলার সমৃদ্ধিতে ভরপুর ছবিটি দেখা যায়। কিছু উন্নয়ন আর রঙরূপ, দৃশ্যপট বদল হলেও বাংলাদেশের ভূগোলে গ্রাম এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু প্রাকৃতিক ও নান্দনিক সৌরভের গ্রামগুলোর ভেতরে রয়েছে আলো ও আঁধারের পুঞ্জীভূত অন্য এক জগৎ। গভীর অর্ন্তদৃষ্টি না থাকলে গ্রামের সেসব ছবি দেখা অসম্ভব। আর একারণেই অতি সাম্প্রতিক প্রিয় লেখক হুমায়ন আহম্মদ পূর্ণিমা ও অমাবষ্যার আলো আধার উপভোগ করতে গহীণ গ্রামে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। অতীতের সাহিত্যিকরাও গ্রামর সম্ভাবনা গভীর অনুসন্ধান করেছিলেন। বঙ্কিমের বঙ্গদেশের কৃষক ছাড়াও শরৎচন্দ্র গ্রামীণ জীবনের আলো ও অন্ধকারকে তুলে ধরেছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ইউরোপের পুঁজিবাদী দানবীয় চাহিদা সৃষ্টিকারী সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার বিরোধিতা করছিলেন রক্তকরবী নাটকে। রক্তকরবী লেখার আগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর সিটি অ্যান্ড ভিলেজ নামের ইংরেজি নিবন্ধে খেয়াল করিয়ে দিয়েছিলেন কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি প্রকৃতি-পরিবেশকে বিনষ্ট করছে। রবীন্দ্র পরবর্তী সাহিত্যিকদের মধ্যে গ্রামসমাজের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধতম তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধায়। তারাশঙ্কর নিজেও তাঁর গ্রাম-কেন্দ্রীক সাহিত্যধর্মে অবিচল ছিলেন আজীবন। দলমত নির্বিশেষে গ্রামসমাজের সাধারণ মানুষের জীবনধারাকে বুঝতে গ্রামীণ জনতার জীবনের সমস্যার নানা বাস্তব সমাধানও প্রদান করতে তৎপর হয়েছিলেন। বর্তমানের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অনেকেই গ্রামে যান বা গ্রামের সাথে সম্পর্কীত থাকেন, কিন্তু কয়জন গ্রামের রূপবৈচিত্র ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে পেরেছেন? গল্প-উপন্যাসের কৃৎ-কৌশল গ্রামের দুঃখদুর্দশা বারোয়ারী ভাষায় বর্ণনা আছে। ১৯৬৩ সালের ১৭ আগস্ট তারাশঙ্কর স্বাধীন দেশের উপরওয়ালাদের প্রসঙ্গে গ্রামের চিঠিতে বিদ্রুপ ও শ্লেষ ভরা বাক্যে লিখেছিলেন: ইহারা গ্রামের লোকের সঙ্গে সর্ম্পক রাখেন না কারণ ইহারা উপরওয়ালা। তারাশঙ্কর গ্রামকে ভেতর থেকে চিনতে ও চেনাতে চেয়েছিলেন। আমাদের রাজনীতিবিদগণ বা সাহিত্যিক, সমাজ-গবেষকরা হৃদয়ে ধারন ও লালন করে সে চেষ্টাটি সরেজমিনে অবিরাম করে যাচ্ছেন তা একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রস্ফূটিত হয়েছে। তারাশঙ্কর যে গ্রামের চেহারা দেখেছিলেন, সে চেহারা হয়তো এখন খুঁেজ পাওয়া যাবে না। রাজনীতিও জটিলতর হয়েছে। তবে গ্রাম সম্বন্ধে মূলগত সমস্যার স্বরূপ একই। তা হলো, আমরা গ্রামের উন্নয়নের কথা ভাবি, কিন্তু গ্রামকে ভেতর থেকে চেনার চেষ্ট করি না। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামবাংলার শাশ্বত শততকে দৃশ্যমানরূপে অঙ্গিকারাবদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনে জনগণ শুধু দল ও মার্কা নয়; প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, অতীত কর্মকা- ও অঙ্গীকার বিষয় বিবেচনা করেই ভোট দিয়ে থাকে। নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনা কিভাবে করা হবে তার রূপরেখাই হলো নির্বাচনী ইশতেহার। ইশতেহার রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকারপত্র। বাস্তবভিত্তিক ও যুগোপযোগী চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ নির্বাচনী ইশতেহার এবং তার পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিফলন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার সামর্থও গুরুত্বের। নির্বাচনী ইশতেহার গতানুগতিক না করে জনকেন্দ্রিক, জনকল্যাণমুখী, ভিন্নধর্মী এবং চমক দেখানোর মতো বিষয়গুলো পারদর্শীতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে আলো ও অন্ধকারের গ্রামকে দৃশ্যমান করা হয়েছে। বাংলাদেশকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনা প্রাধান্য পাচ্ছে। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটারকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের কর্মসংস্থান এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকছে। ইশতেহারে স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও গ্রাম হবে শহর। এই শ্লোগানের ফলে গ্রামগুলোতে শহরের মতো নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একটি রাষ্ট্র তখনই উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছবে যখন দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সাধিত হবে। আমাদের দেশে শহর থেকে গ্রামের আয়তন বেশি সেই সঙ্গে সস্তা শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদও বেশি, গ্রামের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের উন্নয়ন হবে স্থায়ী ও নির্ভরশীল। একটি গ্রামকে আলোকিত করতে খুব বেশি কিছু প্রয়োজন নেই; শুধু সরকারের একটু দৃষ্টি ও পরিকল্পিত রূপরেখা পালটে দিতে পারে গ্রামের চিত্র। গ্রামীণ অর্থনীতি এগিয়ে না গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। প্রতিটি গ্রামে উৎপাদনমুখী একটি গ্রাম একটি পণ্যের কুটিরশিল্প গড়ে তোলা গেলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে অন্যদিকে শহরে মানুষের চাপ কমে আসবে। এই প্রেক্ষাপটে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গ্রাম হবে শহর সেগান বাস্তবধর্মীয় ও যুগোপযোগী হয়েছে। গ্রামের স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষের আশা জেগেছে। তা সম্ভব হলে শহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাবে গ্রামীণ অর্থনীতি সাধিত হবে সামগ্রিক উন্নতি। বিশেষত এই সেগানের হাত ধরে আমাদের গ্রামে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তরুণ যুব প্রৌঢ় বৃদ্ধ সকলের সমন্বিত প্রয়াস শহর ও গ্রামকে একসঙ্গে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দেবে এমন স্বপ্ন দেখা আমরা শুরু করেছি। খন রঞ্জন রায়,Khanaranjanroy@gmail.com
নির্বাচনী ইশতেহার, প্রতিশ্রুতি চাই ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রসার
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের উদ্ভব এবং অনুশীলন শুরু হয়। বর্তমানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা দেশ শাসনের প্রচলিত ধারণাই গণতন্ত্র। গণতন্ত্র আজ বিশ্বনন্দিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা। গণতন্ত্র যেহেতু জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন, তাই নির্বাচনের এত গুরুত্ব। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্মেলন গৃহ বা পরিষদ হচ্ছে পার্লামেন্ট বা সংসদ। সংসদের দুটি প্রধান কাজ হচ্ছে দেশের আইন প্রণয়ন এবং নীতিনির্ধারণ। তাছাড়া দেশ ও জনগণের নানা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও দাবি-দাওয়ার কথা তুলে ধরা ও আলোচনা করাও সাংসদ বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ। আমাদের মতো স্বল্পোন্নত এবং স্বল্পশিক্ষিত মানুষের দেশে গণতন্ত্রের নামে যে নির্বাচন হয় তা জনস্বার্থের প্রতিফলন ঘটায় কিনা তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। তবু অনেকটা অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাকে আমরা বিশ্বাসযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেই।নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে দেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ৩০ ডিসেম্বর। এই নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরিতে ব্যস্ত। নির্বাচনে জনগণ শুধু দল ও মার্কা নয়, প্রার্থীর যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, অতীত কর্মকা- ও সার্বিক বিষয় বিবেচনা করেই ভোট দিয়ে থাকে। নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনা কিভাবে করা হবে তার রূপরেখাই হল নির্বাচনী ইশতেহার। ইশতেহার রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকারপত্র। রাজনৈতিক দলগুলোর রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং ক্ষমতায় গেলে করণীয় ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার খসড়া তুলে ধরা হয় ইশতেহারে। বাস্তব পর্যবেক্ষণে আমাদের ধারণা রাজনৈতিক দলগুলো কী নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে তা জানার জন্য মানুষ কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষা করছে। প্রতিটি দল জরুরি ভিত্তিতে সাড়া জাগানো ও জনগণকে ভোটে উদ্বুদ্ধ করতে একটি ইশতেহার ঘোষণা করে। একইভাবে মুখে মুখে স্থানীয় সাংসদও এলাকার অনেক কিছু করবেন বলে জনসভায় বলে রাখেন ভোটের আগে। ভোট শেষে জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে তা নিয়ে আলাপ আলোচনা ও বাস্তবায়নে প্রদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে তরুণরাই হবে মূলশক্তি। কারণ তাদের হাতে রয়েছে একটা বড় অংকের ভোটব্যাংক। আওয়ামীলীগ সরকারের দুই আমলে নতুন ভোটার হয়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখ ১২ হাজার ৯৯৭ জন। এর মধ্যে ২৭ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা রয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৮৪ হাজার ১৪৬ জন। আর ২১ থেকে ২২ বয়সী ভোটার রয়েছে ৮০ লাখ ২৮ হাজার ৮৩৩ জন। অন্যদিকে একেবারে নতুন অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সী ভোটার হচ্ছে ৪৬ লাখের মতো। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি তাদের চূড়ান্ত হিসেবের ফিরিস্থি এটি। ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১০,১৪,৪০৬০১ । এর সঙ্গে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছিল ৩৩,৩২,৫৯৩ জন। এখানে নতুন পুরুষ ভোটার ১৬,৩২,৯৭১ আর নারী ভোটার ১৬,৯৯,৬২২ জন যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে মৃত ভোটার ১৭,৪৮,৯৩৪ জনকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। সবশেষে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে মোট ভোটার রয়েছে ১০,৪১,৪২,৩৮১ জন। সংখ্যার দিক থেকে নতুন ভোটারদের মধ্যে তরুণরা কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে। আগামী নির্বাচনে নতুন নেতৃত্ব ও বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চায়- সে বিবেচনায় তারা ভোট প্রয়োগ করবে। তাদের ওপরই নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে বলে ধারণা করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরাও। সেক্ষেত্রে এ তরুণরা কোনো দলের জন্য নতুন সরকার গঠনে বাধা হয়েও দাঁড়াতে পারে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ যে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল, তার ১৭টি অভীষ্টের মধ্যে অন্তত ১০টির সঙ্গে যুবশক্তি সরাসরি জড়িত। কিন্তু তিন বছর পার হলেও যুবক বা তরুণদের ভাগ্যোন্নয়নে বাংলাদেশ বড় ধরণের সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এখনও আমাদের যুবকদের একাংশ দারিদ্র্যের নিগড়ে বন্দি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবাসহ মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত। আবার নানা বাধাবিঘ পেরিয়ে যেসব তরুণ উচ্চ শিক্ষা নিয়েছে, তাঁরাও চাকরি পাচ্ছে না। তরুণরা তাদের সৃজনশীল শক্তি প্রয়োগ করে গবেষণামনস্ক সমাজ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে চায়। তরুণরা লেখক, কবি, সাহিত্যিক, অভিনয় শিল্পীসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনে তাদের জয়যাত্রার পদচিহ্ন এঁকে দিতে চায়। তরুণরা সমাজ সংস্কারক, উদার মনোভাবাপন্ন এবং তারা রাষ্ট্রের উন্নয়নের নীতিমালা প্রণয়নে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চায়। এবারের নির্বাচনে তরুণদের বিকাশের পরিকল্পনার বিষয়গুলোকে অবশ্যই জোড় দিতে হবে। প্রতিটি তরুণই চায়Ñ লেখাপড়া শেষে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ মেধা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হোক। হাতেঘোনা দুই-একজন বাদে লেখাপড়া শেষে প্রায় প্রত্যেকেই কর্মসংস্থানের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। শিক্ষিত বেকারের বড় একটি অংশ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁরা পারছে না সাধারণ স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মতো শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে। আবার অফিশিয়াল কাজের সুযোগ সীমিত এবং দুষ্প্রাপ্য। ফলে তারা কর্মক্ষম হওয়া সত্বেও বেকার হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদের জন্য কোনো কোনো বিষয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রাজুয়েট আমরা তৈরি করছি, আবার কোথাও প্রয়োজনের কম প্রযুক্তিবিদ তৈরি হচ্ছে। ফলে চাকরির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলাফল দেশে অনেক বেকার জনবল আর প্রয়োজনে দেশের বাইরে থেকে লোক এনে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ সুনির্দিষ্ট পেশাভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষিত কিংবা প্রশিক্ষিতদের শুধু দেশে নয়; দেশের বাইরেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। আমাদের দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে থাকে; যাদের অধিকাংশই অদক্ষ শ্রমিক। কিন্তু তারাই আবার রেমিট্যান্স অর্জনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক শুধু দক্ষতার অভাবে নিমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। তারা যদি বাজার চাহিদাভিত্তিক কোনো ডিপ্লোমা ট্রেডে প্রশিক্ষিত হতো, তাহলে তিন থেকে চার গুণ বেশি উপার্জন করার সুযোগ পেত। কেন বেশির ভাগ মানুষ সবসময় গরীব থেকে যায়, এই বিষয়ে রবার্ট টি. কিউস্যাকির ‘ধনী পিতা গরীব পিতা’ বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবার্টের মতে, ‘গরীব থাকার অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। কারণ আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকি, ব্যবহারিক জীবনে শুধুমাত্র ১০ ভাগ শুধু কাজে লাগে, বাকি ৯০ ভাগ কোন কাজে আসে না’। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগতে পারে সেজন্য ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। কারণ এর মাধ্যমে অর্জিত সকল জ্ঞানই ব্যবহারিক ভাবে কাজে লাগে। শুধু প্রশিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমেই বেকারত্বের হার শুন্যের কোঠায় নামানো সম্ভব। বর্তমানে দেশের প্রধান সমস্যা বেকারত্ব। নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের কর্মসংস্থানের স্বীকৃতির পাশাপাশি নেতৃত্বে তরুণদের অবস্থানের কথাও থাকা দরকার। সবকিছুতেই মেধার ভূমিকা অনেক সন্দেহ নেই, কিন্তু রাজনীতিতে মেধার প্রয়োজন আরো বেশি। কারণ রাজনীতি শুধু একের নয়, বহুর; শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও; শুধু কোনো গোষ্ঠীর নয়, পুরো জাতি, সমাজ ও দেশের। অতএব সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতা, দিকনির্দেশনা, প্রজ্ঞা রাজনীতিতে বড় প্রয়োজন এবং এ সবকিছুর জন্য দরকার মেধা ও মননের। আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতিতে নানা সময়ে মেধাবী ও মননশীল ব্যক্তিত্বরা নানা ভূমিকা রেখেছেন। তাতে দেশ, জাতি ও সময় সমৃদ্ধ হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনীতি ও জনসেবা মেধাকে আকৃষ্ট করতে চায় নানাভাবে। রাজনীতিতে তরুণ মেধার আগমনকে স্বাগত জানানোর সংস্কৃতি তৈরী করতে হবে। তরুণদের ভবিষ্যৎ তৈরি করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনা ইশতেহারে জানা দরকার। আমাদের প্রত্যাশা, নির্বাচনী ইশতেহারে দল ও জোট ডিপ্লোমা শিক্ষার আলাদা বোর্ড প্রতিষ্ঠা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনিদের্শনা দেবে।খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ ৮৭, চট্টেশ্বরী রোড, চকবাজার, চট্টগ্রাম,Khanaranjanroy@gmail.com
আমরা বরকে কাঁদতে দেখি না, কিন্তু বধূদের কাঁদতে দেখি
এর মধ্যে দুজন বিখ্যাত মেয়ের বিয়ের ছবি দেখলাম আমরা। দীপিকা পাডুকোন আর প্রিয়াংকা চোপড়া। দুটো বিয়েতেই বর বধূ হাসছে। এই চিত্র কিন্তু আমাদের সমাজে নতুন। আমরা বরকে কাঁদতে দেখি না, কিন্তু বধূদের কাঁদতে দেখি, না কাঁদলেও বিষণ্ন মুখ দেখি বধূদের। যত শিক্ষিতা হোক, সুন্দরী হোক, বিষণ্নতা তাদের ঘিরে থাকে। ধর্ম তাদের যা-ই হোক, রাজনৈতিক বিশ্বাস তাদের যা-ই হোক, তারা বিষণ্ন। বিয়ের দিনেও মেয়েদের মন খারাপ, কারণ তারা একটি নতুন কিন্তু অনিশ্চিত জীবনের দিকে পা বাড়ায়। উপমহাদেশের বেশির ভাগ বিয়েই সম্বন্ধ করা বিয়ে। আর, পুরুষ সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, মেয়ের পরিবারের কাছে পণ বা যৌতুক দাবি করবেই। মুসলমান বরদের যেখানে বধূদেরই দেনমোহর দেওয়ার কথা, তাদের তো বধূর কাছ থেকে পণ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু লোভ এমনই এক ভয়ংকর জিনিস, ধর্ম বারণ করলেও তা সংবরণ করতে বেশি লোক পারে না। ধর্ম তো ঘুষ খেতেও বারণ করে, ধর্মের কারণে কজন লোক ঘুষ খাওয়া বন্ধ করেছে? আসলে, সত্যি বলতে কি, আজকাল টাকাই হয়ে উঠেছে মানুষের ঈশ্বর, টাকার পেছনে মানুষ দৌড়োয়। ছলে বলে কৌশলে মানুষের টাকা চাই। পণ যদি ঠিকঠাক সময় মতো দিতে না পারে বধূরা, তাহলে বধূদের নির্যাতন করতে, এমনকী মেরে ফেলতেও দ্বিধা করে না অনেক স্বামী আর স্বামীর স্বজন। নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি সমাজের এতটাই গভীরে প্রোথিত যে মানুষ হিসেবে মেয়েদের মর্যাদা পাওয়াটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে একটা নিয়ম ছিল, বাঙালি পুরুষেরা বিয়ে করতে যাওয়ার সময় মাকে বলে যেত,মা, তোমার জন্য দাসি আনতে যাচ্ছি। এখন অমন করে বলে না বটে তারা, কিন্তু দাসিই আনতে যায় তারা, যে দাসি স্বামীর বাড়িতে এসে স্বামীর তো বটেই, স্বামীর বাবা-মা, ভাই-বোন সবারই সেবা করবে। বাড়ি ঘর দেখে শুনে রাখবে, রান্না বান্না করবে, পরিবেশন করবে, ঘর দোর পয় পরিষ্কার করবে, আসবাবপত্র গুছিয়ে রাখবে। এমন চমৎকার দাসি, যে দাসিকে বেতন দিতে হয় না। বিয়ের সময় বরকে আমরা কাঁদতে তো দেখিই না, বিষণ্নও হতে দেখি না। বর পণের টাকা পাচ্ছে, বিনে পয়সার দাসি পাচ্ছে। বিনে পয়সার দাসি মানে বিনে পয়সার রাঁধুনি, বিনে পয়সার কাজের লোক, বিনে পয়সার মালি, নার্স, কেয়ারটেকার, যৌনদাসি, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, সবই পাচ্ছে। একের ভেতর অনেক। সুতরাং বরের আনন্দের সীমা নেই। সমাজের নিয়মগুলো মেয়েবিরোধী, তারপরও মেয়েরা এই নিয়মগুলোই মেনে নেয়, কারণ মেনে না নিলে কেউ তাদের ভালো মেয়ে বলে না। ভালো মেয়ে না হলেই সে মন্দ মেয়ে। মন্দ মেয়েদের নরক যাপন করতে হয়। নরক যাপন কে চায়? বিয়ের সময় পণ দিতে হয়, এই ভয়ে বাবা মা কন্যা সন্তান চান না। গরিবদের জন্য কন্যা সন্তান তাই অনেকটা অভিশাপের মতো। পণপ্রথা আইনত নিষিদ্ধ হলেও এখনও এই প্রথাটি এত জনপ্রিয় যে এটির আজও বিলুপ্ত হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। মেয়েরা কেন কাঁদে বিয়ের সময়? শুধু কি আত্মীয় স্বজন ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট? অনিশ্চিত জীবনের ভয় নেই? সংসারে বধূ হত্যা, বধূ নির্যাতন ঘটেই চলেছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না মেয়েরা অচেনা অপরিচিত লোকের হাতে নয়, সবচেয়ে বেশি খুন হয় স্বামী বা ঘনিষ্ঠ লোকের হাতে, খুন বাইরের চেয়ে বেশি হয় ঘরে। ঘরের মতো অনিরাপদ আর কোনও জায়গা নেই মেয়েদের জন্য। যে নতুন ঘরে মেয়েটি বিয়ে হওয়ার কারণে যায় বা যেতে বাধ্য হয়, সেই ঘরটি তার জন্য আদৌ নিরাপদ হবে কি না, মেয়েটি জানে না। মেয়েটি হয়তো অনিশ্চিত জীবনটির জন্যই নিজের অজান্তেই কাঁদে। বিয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা দেয় না। নিরাপত্তা দেয় আর্থিক স্বনির্ভরতা। পরনির্ভর মেয়েদের জীবন জড়িয়ে থাকে অনিরাপত্তায়, হীনমন্যতায়। পুরুষতন্ত্র সমাজকে শিখিয়েছে, শৈশব কৈশোরে মেয়েদের নির্ভর করতে হবে পিতার ওপর, যৌবনে স্বামীর ওপর, বৃদ্ধাকালে পুত্রের ওপর। পুরুষতন্ত্র মেয়েদের পরাধীন রাখার পক্ষপাতি। দীপিকা আর প্রিয়াংকা কেউই আর্থিকভাবে পরনির্ভর নয়। কে তাদের স্বামী হবে, তা পরিবার ঠিক করে দেয়নি, তারা নিজেরাই ঠিক করেছে। দীপিকা রনভীরের সঙ্গে কয়েক বছর মিশেছে, প্রেম করেছে, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিয়ে করার। প্রিয়াংকাও নিক জোনাসের সঙ্গে বিস্তর ঘুরে বেরিয়েছে, নিককে কাছ থেকে দেখেছে, জেনেছে, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিয়ে করার। রনভীর এবং নিক যেমন শ্বশুরবাড়িতে বাস করবে না, প্রিয়াংকা বা দীপিকাও তেমন তাদের শ্বশুরবাড়িকে নিজের ঠিকানা করবে না। তারা নিজেদের বাড়িতেই বাস করবে। তারা কোনও বধূ নির্যাতন মেনে নেবে না, তারা কোনও অসম্মান, অপমান সহ্য করবে না। স্বনির্ভর মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ পরনির্ভর মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি। অবশ্য সেই স্বনির্ভর মেয়েরা সত্যিকার স্বনির্ভর নয়, যারা টাকা পয়সা রোজগার করে পুরো টাকাটা স্বামীর হাতে তুলে দেয়, কারণ স্বামীদের মতো তারাও বিশ্বাস করে টাকা পয়সা রোজগার করতে জানলেও মেয়েরা টাকা কী খাতে খরচ করতে হবে তা জানে না, বা হিসেব নিকেষ মেয়েরা ভালো বোঝে না। অধিকাংশ নারী পুরুষ দুজনেরই ধারণা টাকা জিনিসটা পুরুষের, টাকা সে যে-ই রোজগার করুক না কেন। টাকা পয়সায়, ধন দৌলতে, সম্পদে, প্রাচুর্যে তারা তাই পুরুষালি গন্ধ পায়। দীপিকা আর প্রিয়াংকা তাদের বিয়েতে প্রাণখুলে অট্টহাসি হেসেছে। তারা আনন্দ করেছে। এ ছিল তাদের আনন্দের দিন। বিয়ে মানে বাবা মা ভাই বোনকে জন্মের মতো ছেড়ে যাওয়া নয়। যে কোনও সময় দীপিকা বা প্রিয়াংকা নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারে, ঠিক যেমন রণভীর আর নিকও তাদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে। দীপিকা বা প্রিয়াংকা কাউকে স্বামীদের দাসি হতে হবে না। যদি স্বামীরা অত্যাচার শুরু করে, নির্দ্বিধায় তারা তাদের স্বামীদের তালাক দেবে। তালাক দিলে কে তাদের ভরণপোষণ করবে, কার কাছে তারা সাহায্যের হাত পাতবে, সন্তান সন্ততি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে কি না, এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। নিজের উপার্জনে নিজেই চলতে পারে স্বাবলম্বী মেয়েরা। প্রিয়াংকা আর দীপিকার মতো অঢেল টাকা দুনিয়ার অধিকাংশ মেয়ের নেই। আত্মবিশ্বাস থাকতে হলে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে গেলে প্রচুর টাকা থাকতে হবে, তা না হলে কিচ্ছু হবে না, এ ঠিক নয়। নিজের মতো করে সসম্মানে বাঁচতে হলে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার দরকার হয় না। মেয়েদের কিছু জিনিসকে না বলার সময় এসেছে। বিয়ের দিন কান্নাকাটি নয়, হাসতে হবে। দীপিকা আর প্রিয়াংকার মতো প্রাণ খুলে হাসতে হবে। সম্বন্ধ করা বিয়ে, অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা, পণপ্রথা, গার্হস্থ্য নির্যাতন, স্বামীর ধর্ষণ, পুরুষতন্ত্র, নারী বিদ্বেষ সব কিছুকে বড় সড় না বলে দিতে হবে। মেয়েদের না বলতে শেখায়নি সমাজ। মেনে নেওয়া, আপোস করা, হজম করা, সহ্য করা, এসব মেয়েদের জন্যই। পিতৃতন্ত্র মেয়েদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে, স্বামীর সুখেই স্ত্রীর সুখ। কোনও সচেতন মেয়েই এ কথা মানবে না। সচেতন মেয়েরা স্বামীর সুখকে স্বামীর সুখ বলেই ভাবে, নিজের সুখকে ভাবে নিজের সুখ বলে। নিজের পৃথক অস্তিত্বকে তারা অস্বীকার করে না। নিজের সুখের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করে না। নিজের সুখ নিজেই আহরণ করে নেয়। মেয়েরা যেন কখনও নিজের নাম বিসর্জন দিয়ে স্বামীর নাম গ্রহণ না করে। রণভীর সিং যেমন রনভীর পাডুকোন হবে না, দীপিকাও যেন দীপিকা সিং না হয়। প্রিয়াংকাও যেন রয়ে যায় প্রিয়াংকা চোপড়া হয়ে, যেমন নিক রয়ে যাবে নিক জোনাস হয়ে। মেয়েরা যেন নিজের পরিচয় বা স্বকীয়তা বিয়ের কারণে বিসর্জন না দেয়। সমাজ মেয়েদের চায় বশ্য হতে, তাই বলে মেয়েদের বশ্য হতে হবে কেন! সমাজের নারীবিরোধী নিয়মগুলো যদি এখন বিলুপ্ত না হয়, কবে হবে?তসলিমা নাসরিন
ঠান্ডা মিয়ার গরম কথা, ভোটের পরও ভোটারের একই মর্যদা থাকা চাই
ভোট অর্থাৎ নির্বাচন,নির্বাচন যদি কাছে আসে নির্বচনের প্রার্থীরা ভোটারদের তত কাছে টানেন। মনে হয় যেন প্রার্থী আর ভোটারেরা একে অপরের আত্বার আত্বিয়। ভোটের আগে ভোটারের যত আপত্বী সব গুছিয়ে দেন র্প্রাথীরা। অনেক র্প্রাথীরা বলে থাকেন,যে আপনার বা আপনার এলাকায় কি করতে হবে আমাকে জানাবেন আমি সব করে দিব। কিস্তু ভোটের পরে পাল্টে যায় তার চিত্র। ভোটের আগে প্রার্থীদের আত্বার আত্বিয়ের মত ভোটারেরা ভোটের পর অচিন মানুষ হয়ে যায়। নির্বাচিত হওয়ার পর ভোটার যখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে যান তখন ভোটার কে প্রশ্ন করা হয়, আপনী কে, কোথায় বাস করেন। কার ছেলে, কতো আসনের ভোটার। আপনাকে কে চিনে সহ ইত্যাদি। আর এলাকার উন্নয়নের কথা বললে বলেন,সরকারী অনুদান পাওয়া যাচ্ছে না বা যত পাওয়ার কথা তত পাচ্ছি না বা সরকারকে বলেছি। দেখি কি করে সহ নানান বাহানা। তবে আমাদের দেশের সংবিধান অনুয়ায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করার জন্য প্রতি পাঁচ বছর পর পর জাতীয় নির্বাচন দেওয়া হয়। নির্বাচন মানে হচ্ছে,বেশ কয়েকজন প্রার্থী নির্বাচনে বিভিন্ন মার্কা নিয়ে প্রার্থী হন এবং দেশের জনগন যারা ভোটার তারা দেকে শুনে ভোট দিয়ে ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন প্রার্থীকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত প্রার্থীরা জাতীয় সংসদে গিয়ে তাদের স্ব-স্ব আসনের উন্নয়ন তথা ভোটারদের প্রস্তাবিত বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। তবে দুঃখের বিষয় যে, নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীরা এলাকায় ভোটারদের যে ভাবে আলিঙ্গঁন করে থাকেন বা আত্বার আত্বীয় হিসেবে আপন করে নেন। নির্বাচনের পর ঐ চিত্র সম্পূর্ন ভাবে পাল্টাতে থাকে। ভোটারদর কদর বা মর্যদা যদি নির্বাচনের পূর্বের মত একই আচরন নির্বাচনের পরেও থাকতো তাহলে সাধারন মানুষ ভোটেরেরা তাদের ন্যায্য অধিকার বা তাদের বিভিন্ন সহযোগী বা দাবী দাওয়া হইতে বঞ্চিত হতো না। তার সাথে সাথে ঐ নির্বাচিত প্রার্থীরা এলাকায় তার জনপ্রিয়তায় কমতি থাকতো না। বর্তমানে অনেক বিজ্ঞ জনে বলেছেন নির্বাচন বা রাজনিতি এখন ব্যবসায় পরিনত হয়েছে। তাই যদি হয় তাহলে দেশের সাধারন জনগন বা ভোটারদের নিয়ে ব্যবস্থা করা হবে প্রার্থীদের জন্য বা রাজনিতি বিদদের জন্য চরম ভুল। কারন বির ভাঙাগালী একত্রিত হয়ে ১৯৭১ সালে অসুভ গ্রহকে বাংলাদেশ থেকে বিতারিত করেছিলেন মাত্র নয় মাসের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে। সেই বির ভাঙালীরা যে কোন সময় একত্রিত হয়ে আবার ব্যবসায়ী মনোভাবপন্ন প্রার্থীদের কাছ থেকেও মুখ পিরিয়ে নিতে দ্বিধাবোধ করবেনা। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষন করে বলছি আসুন নির্বাচনের আগে ভোটারের যেই মর্যদা সেই মর্যদা নির্বাচনের পরও বহাল থাকে মতো সিদ্বান্ত নেন। নয়ত বাঙালীরা তাদের সঠিক সিদ্বান্তই নিবে। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক- নিউজ একাত্তর ডট কম।
ঠান্ডা মিয়ার গরম কথা, ৩০ তারিখ সারাদিন------- মার্কায় ভোট দিন!
৩০ তারিখ সারাদিন----------- মার্কায় ভোট দিন। এই আসনে প্রার্থী যারা অমুখ ভাই সবার সেরা সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখরীত হবে সারা দেশ। এখন শুধু সেই ক্ষনের অপেক্ষায় সবাই। নানন জল্পনা কল্পনার অবশান গঠিয়ে দেশের সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আশায় দেশের মানুষ একটু স্বস্থির নিশ্বাস ফেলেছেন। গত কিছু দিন আগেও যখন বিএনপি নির্বাচনে যাবেনা বলে বলেছিলেন তখন দেশের মানুষ আতংক্ষিত হয়ে পড়েন। দেশের মানুষ আশংক্ষা করেছিলেন যে দেশে আবারো ১৪ সালের মত অরাজকতা শুরু হতে যাচ্ছে। পরক্ষণে যখন নির্বাচনি তপশিল ঘোষনার পর বিএনপি নির্বাচন করবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানালেন ঠিক তখনই দেশের মানুষ স্বাস্থির নিশ্বাস পেলেন। নির্বাচন হচ্ছে একটি দেশের গনতন্ত্রের মূল চালিকা শক্তি। নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগন তাদের পছন্দের প্রর্থীকে ভোট দিয়ে সংসদে তাদের পক্ষে কথা বলার সুযোগ দিয়ে থাকেন। নির্বাচন যখন আসে তখন পাল্টে যায় দেশের চিত্র,দেশে এখন বিরাজ করছে নির্বাচনি আমেজ। শহর,বন্দর ও গ্রাম গঞ্জে চলে ভোটের হিসেব নিকেশ এবং বিভিন্ন জল্পনা কল্পনা। আর নির্বাচনি মাইকিং এবং স্লোগানে শোনা যায় বিভিন্ন রকমারি ভাষা। তবে যে যেই ভাবেই বলুক দেশের সাধারন মানুষ চাই সকল দলের অংশগ্রহনে একটি শান্তিপূর্ন নির্বাচন। জনগন যেন নির্ভয়ে তাদের ভোটাদিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই পরিবেশ সৃষ্টিই একমাত্র কামনা। মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম
২০০১-২০০৬ এর বাংলাদেশ ও বর্তমান বাংলাদেশ
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী :অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১ অক্টোবর,২০০১ সালে ।১৯৯৬ সালে চালু হওয়া তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে এটি ছিল দ্বিতীয় নির্বাচন । এইসময় তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান । নির্বাচনে বাংলাদেশ এ বিজয়ী হয়ে বিএনপি ও চারদলীয় জোট বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করে ।উক্ত সরকারের নির্বাচনী ইশতিহারে প্রায় ৩২ টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের শতাধিক অঙ্গীকারের মধ্যে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি পূরণ হয়েছিল । দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ,বিদ্যুত সমস্যার সমাধান,আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নত,দুর্নীতি দমন,বিচার বিভাগ পৃথক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্তহীন থেকেছে ।মূলত দেশের মানুষ তখন প্রত্যাশিত আলোর থেকে বেশি থেকেছে অন্ধকারেই ।সেইসময় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের উর্ধ্বগতিতে দিশেহারা ছিল সীমিত আয়ের মানুষ ।দেশের উত্তর অঞ্চলে দেখা দিয়েছিল মঙ্গা ।সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে ক্ষুদার্ত ও দারিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল ।সেইসময় দারিদ্রের হার ছিল দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৯ ভাগ ।মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল খুবই নগণ্য পর্যায়ের ।অনবরত লোডশেডিং আর দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনে দীর্ঘশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল ।দিন এনে দিন খেতে হতো সাধারন মানুষদের ।বিএনপি জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের কৃষিখাতে ধস নেমে গিয়েছিল ।সার সরবরাহ এবং সারের আকাশচুম্বি দাম কৃষকদের কপাল পুড়িয়েছিল ।বিএনপি জোট সরকারের আমলে তত্কলীন কৃষিমন্ত্রী (মতিউর রহমান নিজামী,২০০১ থেকে ২০০৩ এবং এম কে আনোয়ার ২০০৩ থেকে ২০০৬ ) বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচী (বিএডিসি) এর নাজুক অবস্থা করেছিল ।সারের দাবিতে আন্দোলনরত কৃষকদের উপর গুলি চালানো হয়েছিল, রাজশাহী,কুষ্টিয়াসহ সারাদেশে প্রায় ১৮ জন সাধারন কৃষক উক্ত গুলিতে মারা গিয়েছিল ।জোট সরকারের আমলে এ দেশে সবচেয়ে বেশি প্রসার লাভ করেছে জঙ্গি,সন্ত্রাসী মৌলবাদ ।ইসলাম কায়েমের নামে সমগ্র বাংলাদেশে নারকীয় হত্যা,বোমা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছে ব্যাপকহারে জন্ম নেওয়া মৌলবাদীরা ।এসময় খুন,ডাকাতি ও সংখ্যালগুদের উপর হামলা, ধর্ষণ ও নির্যাতন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ।ব্যাঙের ছাতার মতো দেশব্যাপী জঙ্গি ও সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছিল ।জোট সরকারের আমলে সাংসদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকান্ড সারাদেশে অস্থিরতার সৃষ্টি করেছিল ।নিহত হয়েছিল ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষক । বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শুরু হয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ।বিএনপি জোট সরকারের আমলে জন্ম নিয়েছিল কুখ্যাত বাংলা ভাই,শায়খ আব্দুর রহমান,মুফতি হান্নানসহ অসংখ্য বক-ধার্মিক ।এদের পৃষ্ঠপোষক -তায় ছিল বিএনপি জোট সরকার ।এদের সাহায্যে তত্কালীন বিরোধীদলীয় এবং আওয়ামীলীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট এক ভয়াভহ গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল বিএনপি জোট সরকার ।জঘণ্য সেই হামলায় অল্পের জন্য শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও তার একটি কান বধির হয়ে যায়,সেই স্মৃতি আজো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় ।ঐ হামলায় শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রয়াত জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান ।তাত্ক্ষণিকভাবে সেই হামলায় ২৪ জন এবং মোট প্রায় ৫০০ জন আহত হয়েছিল ।বিএনপি জোট আমলে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছিল জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ।২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট এই জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবি সারাদেশে সবকটি জেলায় (মুন্সীগঞ্জ বাদে) একসাথে একসময় সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক জঘন্যতম ঘটনা ছিল ।বিএনপি জোট সরকার বাংলাদেশের চিরশত্রু রাজাকারদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছে যা চরমভাবে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডকে কলঙ্কিত করেছে ।লাগো মানুষের রক্ত দিয়ে গড়া সংসদ ভবনে রাজাকারদের প্রবেশ ঘটিয়ে বিএনপি জাতি ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সাথে নিকৃষ্টতম বেঈমানী করেছে ।শুধু কি তাই ?বিএনপির পৃষ্টপোষকতায় রাজাকারগোষ্ঠী এই দেশে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে তুলেছে যা থেকে আয়কৃত অর্থ দিয়ে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হতো ।নিজামী,সাঈদী,মীর কাসিমসহ আরো অনেক স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিএনপি জোট সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে বাংলাদেশের সাধারন মানুষের সম্পদ লুন্ঠনে ব্যস্ত ছিল ।বিএনপি জোট আমলে দুর্নীতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঘটিত হলেও বিএনপি জোট সরকারেরই উচ্চপর্যায়ের অনেক মন্ত্রী দুর্নীতিবাজ ছিল ।সেইসময় বাংলাদেশ বিশ্ব দুর্নীতি তালিকায় পরপর কয়েকবার এক নম্বর স্থানে ছিল যাস্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবের ইতিহাসকে চরমভাবে কলঙ্কিত করেছিল ।দশ ট্রাক অস্ত্র পাচার ছিল বিএনপি জোট আমলের একটি অন্যতম ন্যাক্কারজনক ঘটনা ।২০০৪ সালে ১ এপ্রিল মধ্যরাতে চট্টগ্রামের সিইউএফএল জেটিঘাটে খালাসের সময় পুলিশ সদস্যরা আটক করে ১০ ট্রাক সমপরিমাণ অস্ত্র ।পরবর্তীতে ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায় যে,ভারতীয় বিদ্রোহী সংগঠন উলফার পরেশ বড়ুয়া এই দশ ট্রাক অস্ত্র পাচারের সাথে যুক্ত ছিলেন ।এ ব্যাপারে তিনি কয়েকবার বাংলাদেশেও এসেছিলেন । এ মামলায় বিএনপি জোট আমলে তত্কালীন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুত্ফজ্জামান বাবরের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয় । ৩০ জানুয়ারী,২০১৪ সালে এ মামলার রায়ে এ দুজনসহ মোট ১৪ জনকে ফাঁসির দন্ডাদেশ দেওয়া হয় । কথিত আছে যে,তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুত্ফজ্জামান বাবরের শোকেসে দেশ বিদেশের প্রায় ৩০০০ হাজার দামী শার্ট ছিল ।তিনি এক বারের বেশি কোন শার্ট পরতেন না ।সেইসময় কেন বাংলাদেশ দুর্নীতিতে কয়েকবার প্রথম ছিল এই বিলাসীতার চিত্র থেকেই বুঝা যায় ।বিএনপি জোট আমলে ব্যাপকহারে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে বাংলার শান্তিপ্রিয় সংখ্যালঘু সম্প্রদয় ।সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে হিন্দু জনগোষ্ঠী ।সংখ্যালঘু পল্লীগুলোয় ৫ সংস্রাধিক হামলার ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করা হলেও বিএনপি জোট সরকারের কাউকে শাস্তির আওতায় আনেনি ।জামায়াতের জঙ্গী সংগঠন শিবিরের অসংখ্য নেতা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন চালিয়েছে ।হত্যা,ধর্ষণ,গণধর্ষণের এক জঘন্য বিকৃত ইতিহাস রচনা করেছিল জামায়াত শিবির সংগঠন ।বিএনপি জোট আমলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি জামায়াত শিবির এবং মৌলবাদীগোষ্ঠীর রাহুগ্রস্থ ছিল ।প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ূন আজাদের উপর বাংলা একাডেমীতে নৃশংস হামলা চালিয়েছিল মৌলবাদীরা ।রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক পরিচালিত এই মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা বাংলা সাহিত্য,সংস্কৃতি ও ভাষাকে গলাটিপে রেখেছিল ।আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসিবিএনপি জোট আমলে আমাদের প্রিয় এই জাতীয় সঙ্গীতকে ম্লান করে রাখা হয়েছিল ।জাতীয় সংগীতের স্থানে মৌলবাদীরা স্বপ্ন দেখতো পাক সার জমিন সাদ বাদ এর ।১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশকে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত মিনি পাকিস্তান করে রাখা হয়েছিল ।মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে ভুলুন্ঠিত করা হয়েছিল ।মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা স্বপক্ষের মানুষগুলি ছিল নির্যাতিত ।২০০১ থেকে ২০০৬ এ ৫ বছরে ধর্মীয় মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের দাপটে,লুটপাট,দখলে বিপর্যস্ত ছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশটি ।তথাপি, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বেশকিছু উদ্যোগ সাধারন মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল ।তার মধ্যে একটি ছিল,গরীব-দুঃখীদের মাঝে দেশী ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিতরণ ।এই উদ্যোগটা বাংলাদেশের সাধারন মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল ।ছাগল পালনে অনেক মানুষ আশার আলো খুঁজে পেয়েছিল,সংসারে স্বচ্ছলতা খুঁজে পেয়েছিল । বিএনপি জোট আমলে অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রয়াত সাইফুর রহমান প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন বটে কিন্তু সরকারের উচ্চপর্যায়ে এবং তৃণমলে দুর্নীতির কারনে সম্পদ ও বাজেটের অসম বন্টণের জন্য সাধারন মানুষ অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজাকিভাবে কখনোই আলোর মুখ দেখেনি ।বিএনপি জোট আমলে অপরাধ দমনে গঠিন হয়েছিল রেপিড একশন ব্যাটালিয়ন (RAB)।দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতিত এই ব্যাটালিয়ন সেই থেকে এখন পর্যন্ত অপরাধ দমনে প্রশংসনীয় অবদান রেখে চলেছে ।বিএনপি জোট আমলে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছিল ।বিভাগীয় শহরগুলিতে যাতায়তের প্রধান প্রধান সড়ককে বেশ উন্নত করা হয়েছিল । কিন্তু এই উন্নয়ন ও উন্নতি কখনোই সাধারন মানুষের মন জয় করতে পারেনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের অসততা ও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য ।বাংলাদেশের শত্রু রাজাকারদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কারনে মানুষ বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ।যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ।সাধারন মানুষ এ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় এনে দিয়েছিল আওয়ামীলীগ কে ।মানুষের সেই ভালবাসা ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে ২০০৮ থেকে এই ২০১৮ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের উন্নয়নের সারথি হয়ে চলছে । সব মিলিয়ে বলা যায় যে,২০০১ থেকে ২০০৬ এই ৫ বছরে বিএনপি জোট সরকার কিছু উন্নয়ন ও পদক্ষেপ ব্যতিত সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে । শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশঃ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে সব সূচকে অগ্রগতি, সাফল্য আর উন্নয়নের ফানুস উড়িয়েই টানা দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার চার বছর পূর্ণ করল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এই সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুত্তি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন দেশের ভেতর-বাইরে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও প্রশংসিত। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র-চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ সবকিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা: সরকারের টানা নয় বছরে দেশের রাজনীতিসহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ শেখ হাসিনার হাতে থাকলেও সে পথ মসৃণ ছিল না। জ্বালাও-পোড়াও, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাসহ দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র, বাধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগোতে হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্রীড়া, পরিবেশ, কৃষি, খাদ্য, টেলিযোগাযোগ, সংস্কৃতি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এমন কোনো খাত নেই যে খাতে অগ্রগতি সাধিত হয়নি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি, মাতৃত্ব এবং শিশু স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রশংসিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলেও। এগিয়ে সব সূচকে: দেশ আর্থ-সামাজিক সূচকসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশাজনক সাফল্য অর্জন করেছে এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিসহ এখন মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রবৃদ্ধি ৫.৫৭ থেকে ৭.২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৮৪৩ থেকে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার, বিনিয়োগ ২৬.২৫ শতাংশ থেকে ৩০.২৭ শতাংশ, রফতানি ১৬.২৩ থেকে ৩৪.৮৫ বিলিয়ন ডলার, রেমিট্যান্স ১০.৯৯ থেকে ১২.৭৭ বিলিয়ন ডলার, রিজার্ভ ১০.৭৫ থেকে ৩৩.৪১ বিলিয়ন ডলার এবং এডিপি ২৮৫ বিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১০৭ বিলিয়ন টাকা। সাহসী সিদ্ধান্ত বড় প্রকল্পে: নিজস্ব অর্থে পদ্মার ওপর ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করার সাহস দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর বিশাল এ প্রকল্প হাতে নেয়ার ঘটনা অনেক দেশ ও সংস্থার সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করলেও সে স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে বাংলাদেশ। গত বছরের ৩০ নভেম্বরের পর থেকে দেশ এখন বিশ্বের ৩১টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের তালিকায়। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগও চলমান। রয়েছে মহাকাশ জয়ের লক্ষ্য। দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ আগামী মার্চে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ উপগ্রহ সফলভাবে মহকাশে গেলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। বছরে সাশ্রয় হবে ১৪ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ছাড়াও ব্যবহার করবে সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ। এ ছাড়া মেট্রোরেল, এলিভেটেট এক্সপ্রেসহ আরো কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। দেশের প্রথম ৬ লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ জানুয়ারি ফেনী জেলার মহিপালে এই ফ্লাইওভার উদ্বোধন করেন। দেশের আইটি খাতের নতুন সম্ভাবনা যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রধানমন্ত্রী ১০ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেছেন। মাতারবাড়িতে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) সুমিতোমোর নেতৃত্বাধীন জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অর্জন: বর্তমান সরকারের শাসন আমলেই কোনো রকম যুদ্ধ-সংঘাত বা বৈরিতা ছাড়াই দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র বিজয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান এলাকার প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া স্বাধীনতার পরপর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে স্থল সীমান্ত চুক্তি হয়েছিল সম্প্রতি তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা বাংলাদেশের বড় অর্জন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সর্বশেষ রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশ ও সংস্থা এই ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে পাশে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেয়েছেন মাদার অফ হিউম্যানিটি উপাধি। তলাহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র-চিকিৎসার দায়িত্বও পালন করছে। শেখ হাসিনার স্বীকৃতি: পিপলস অ্যান্ড পলিটিকস, বিশ্বের পাঁচজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিহ্নিত করেছেন, যাদের দুর্নীতি স্পর্শ করেনি, বিদেশে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই পাঁচজন সরকারপ্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়াও কাজের অবদানের জন্য তাকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে। ২০১৪ সালে ইউনেস্কো তাকে শান্তির বৃক্ষ ও ২০১৫ সালে ওমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল রফারাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে অব্যাহত সমর্থন, খাদ্য উৎপাদনে সয়ম্ভরতা অর্জন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদানের জন্য আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৫ সালে তাকে সম্মাননা সনদ প্রদান করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ-২০১৫ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নারী নেত্রীর একজন মনোনীত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা সবসময় নিজেকে প্রমাণ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক খালিজ টাইমস রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট বা পূর্বের নতুন তারকা হিসেবে আখ্যায়িত করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ডিজিটাল বাংলাদেশ: মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কাজে সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। টানা দুই মেয়াদের ক্ষমতায় বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ ও গোষ্ঠীর চাপ সত্ত্বেও শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিচার শেষে রায় কার্যকর করা হয়েছে। এই বিচার করতে পারা স্বাধীন বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় সাফল্য। সেই সঙ্গে গত কয়েক বছরে ডিজিটাইজেশনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করছে। ভূমি ব্যবস্থা ডিজিটাইজেশনের ফলে মানুষের দুর্ভোগ কমছে। ই-টেন্ডারিং, ই-জিপির ফলে দুর্নীতি কমছে। ১০ টাকায় কৃষক ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করার ঘটনাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদাহরণ হিসেবে কাজে লাগছে। মসৃণ ছিল না এই যাত্রা: প্রথম মেয়াদ শেষ করা ও টানা দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু ও তার চার বছরে অনেক সফলতা আসলেও এই যাত্রা মসৃণ ছিল না। এই সময়ে পিছু ছাড়েনি ষড়যন্ত্র। সামনে এসেছে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ। বিএনপি-জামায়াতের চরম রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলা করে দেশ যখন স্থিতিশীল পরিবেশে অর্থনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক ধারায়, ঠিক তখনই আবার নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে জঙ্গিবাদ। তবে এসব চ্যালেঞ্জের বেশিরভাগই স্বাভাবিকভাবে সৃষ্ট নয়, বরং ষড়যন্ত্রমূলকও। সরকারকে বিপাকে ফেলে চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড-অগ্রযাত্রা স্তিমিত করে দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলা, কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদের জামাতে জঙ্গি হামলা, মসজিদ-মন্দিরে হামলা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সবশেষ এক নারী জঙ্গির আত্মঘাতীর ঘটনা সেটিই প্রমাণ করে। তবে সব ষড়যন্ত্র আর চ্যালেঞ্জ প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করেই পথ চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লেখক :মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক, নিউজ একাত্তর ডট কম
পাকিস্তানে যা হচ্ছে তা যেন বাংলাদেশে না হয়
তসলিমা নাসরিন :পাকিস্তানের দরিদ্র এবং দুর্ভাগা মানুষটির নাম আসিয়া নুরিন। আসিয়াকে আমি দুর্ভাগা বলছি কারণ কী অপরাধ তিনি করেছেন, তা বোঝার আগেই তাঁকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। লাহোর হাই কোর্ট সেই মৃত্যুদন্ডাদেশ যদিও স্থগিত করেছিল, চার বছর জেলের ভিতর বন্দীজীবন কাটিয়েছেন আসিয়া। চার বছর পর সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মৃত্যুদন্ড বাতিল করেছে। তাঁকে মুক্তি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট, কিন্তু জেলের বাইরে বেরোনোর সব পথ তাঁর বন্ধ। পাকিস্তানের বাইরে বেরোনোর দরজাও বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বন্ধ করেছে, কট্টরপন্থিরা চেয়েছে বলে। আসিয়ার মুক্তির দাবিতে সরব সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠন। পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট এবং পোপ ফ্রান্সিস, পরপর দুই খ্রিস্টান ধর্মগুরু আসিয়ার মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাতে কোনও লাভ হয়নি। কারণ পাকিস্তানের ধর্মান্ধ জনগণ এবং জঙ্গি সংগঠনগুলো মৃত্যুদন্ড চায় আসিয়ার। পাকিস্তানের কোনও সরকারেরই এদের উপেক্ষা করার শক্তি নেই। ঘটনার শুরু ২০০৯ সালে। পাঞ্জাবের শিকরপুরা গ্রামে ফল তুলতে গিয়ে দুই প্রতিবেশী মহিলার সঙ্গে ঝগড়া বাধে আসিয়ার। ঝগড়াটা এক বালতি পানি নিয়ে। আসিয়া ওই বালতি থেকে এক কাপ পানি নিয়ে পান করেছিলেন। আসিয়া পান করেছেন বলে প্রতিবেশী মহিলারা পানি পান করবেন না। কারণ আসিয়া মুসলমান নয়, আসিয়া খ্রিস্টান। খ্রিস্টান যে পাত্র থেকে পানি পান করে, সেই পাত্র নোংরা হয়ে গেছে, সেই পানিও দূষিত হয়ে গেছে। সুতরাং সেই পাত্র থেকে সেই পানি আর যার পক্ষেই পান করা সম্ভব, মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়। মুসলমান প্রতিবেশীরা এ কথা সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন। আসিয়াকে তাঁরা ধর্মান্তরিত হতে বলেন। খ্রিস্টান থেকে মুসলমান হওয়ার জন্য রীতিমতো চাপ দেন। কিন্তু মুসলমান তো আসিয়া হনইনি, বরং ইসলামের নবী সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। আসিয়া বলেননি এ কথা, বলেছেন প্রতিবেশী মুসলমান মহিলারা। আসিয়া স্বীকার করেননি যে তিনি নবী সম্পর্কে আদৌ কিছু বলেছেন। বাদী দাবি করেছেন প্রতিবেশী মহিলারা আসিয়ার বাড়ি গিয়ে আসিয়াকে প্রচুর মারধর করার পর নাকি আসিয়া স্বীকার করেছেন তিনি নবীকে নিয়ে বলেছেন। গ্রামের একটি অশিক্ষিত মহিলা আসিয়া। খ্রিস্টান এই মহিলা নবী সম্পর্কে জানেনই বা কী, বলবেনই বা কী। অনুমান করা সহজ যে আহমদিয়া আর খ্রিস্টানদের যেমন আহমদিয়া আর খ্রিস্টান হওয়ার শাস্তি দেওয়া হয়, তেমনই আসিয়াকে দেওয়া হয়েছে। মূলত সুন্নি মুসলমান না হওয়ার শাস্তি। পাকিস্তানের শিয়াদের ওপরও সুন্নিদের নির্যাতনের কোনও শেষ নেই। ইসলাম অবমাননা করেছে এই দাবি করে বিধর্মীদের ফাঁসানো পাকিস্তানে নতুন ঘটনা নয়। কেউ কেউ এ কারণে পাকিস্তানে জীবন দিয়েছেন, কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আসিয়াকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন বলে বা ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে কিছু বলেছিলেন বলে খুন করা হয়েছিল সংখ্যালঘু মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিকে। পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকেও একই কারণে খুন করেছিলেন তাঁরই দেহরক্ষী মুমতাজ কাদরি। মুমতাজ কাদরির পক্ষে ছিল লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানি। এমনকী হাই কোর্টের উকিলরাও গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে মুমতাজ কাদরির প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়েছিলেন। কাদরির পরে ফাঁসি হয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানের ধর্মান্ধরা ফাঁসিকে ভয় পায় না। আসিয়াকে নাগালে পেলে তারা খুন করতে দ্বিধা করবে না। খুন করে ফাঁসিতে ঝুলতেও তাদের আপত্তি নেই। অল্প বয়স থেকেই ধর্মগুরুরা তাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে ধর্মের সমালোচনা যে করবে, তাকে মেরে ফেলাই সাচ্চা মুসলমানের কাজ। শুধু তাই নয় মুসলমানের দেশে অমুসলিমদের কোনও ঠাঁই নেই, হয় তারা কলেমা পড়ে মুসলমান হবে, নয় তারা মরবে। আসিয়ার সে কারণে মুক্তি হলেও সত্যিকারের মুক্তি হয় না। সর্বোচ্চ আদালতের যে বিচারপতিরা আসিয়ার মৃত্যুদন্ড বাতিল করেছিলেন, তাঁদের জীবনের ওপর হুমকি এসেছে। আসিয়ার আইনজীবীও প্রাণ বাঁচানোর জন্য পাকিস্তান থেকে পালিয়েছেন। আসিয়াকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ইউরোপের দেশগুলো চাইছে, কিন্তু আসিয়া কী করে পাকিস্তান ছাড়বেন! ছুরিতে শান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মন্সটার। ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মতো মন্সটার তৈরি করেছিল পাকিস্তান। মন্সটার এখন পাকিস্তানকে ছাড়ছে না। আসিয়ার মৃত্যুদ- বাতিল হয়ে যাওয়ার পর সারা পাকিস্তানকে অচল করে দিয়েছিল সেইসব মন্সটার। সে কারণে পাকিস্তান-সরকার ৫ দফা চুক্তি করেছে মন্সটার কট্টরপন্থিদের সঙ্গে। এই চুক্তিই পাকিস্তানকে আরও শত বছর পিছিয়ে দিল। আসিয়ার মৃত্যুদন্ড বাতিল হওয়ার পর পাকিস্তানের পাশে ছিল সভ্য দেশগুলো, ছিল মানবাধিকারে বিশ্বাস করা সভ্য মানুষ। অপশক্তির সঙ্গে আপসের কোনও প্রয়োজন পাকিস্তান সরকারের ছিল না। সর্বনাশকে সম্ভবত এভাবেই ডেকে নিয়ে আসা হয়। একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঙালি স্বাধীনতাসংগ্রামীরা বাংলাদেশ নামে নতুন একটি দেশ জম্ম দিয়েছেন বটে, কিন্তু বাংলাদেশ নামে কোনও দেশ যারা চাননি, তাঁরা যেভাবে শুরু থেকে কট্টরপন্থিদের প্রশ্রয় দিয়েছেন, এক সময় স্বাধীনতাসংগ্রামীরাও সেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন কট্টরপন্থিদের। পাকিস্তানের অনুকরণ করতে গিয়ে দেশের সংবিধান বদলে দিয়েছেন এক দল, রাষ্ট্রধর্ম নামে কোনও কিছুর অস্তিত্ব ছিল না, সেটিকে, বলা নেই কওয়া নেই, কোত্থেকে এনে, একেবারে ঢুকিয়ে দিয়েছেন সংবিধানে। আরেক দল সেই সংবিধান বদলাবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েও বদলাননি। সেক্যুলার বাংলাদেশ তাই দেখতে শুনতে অনেকটা এখন পাকিস্তানের মতোই। পাকিস্তানে আছে ব্লাসফেমির জন্য মৃত্যুদন্ডের আইন, বাংলাদেশে সেটি আমদানির জন্য মৌলবাদীরা প্রায়ই রাস্তায় নেমে উম্মাাদের মতো আচরণ করে। কে জানে কখন আবার মৌলবাদীদের ভোট পাওয়ার আশায় কোন সরকার ব্লাসফেমির জন্য মৃত্যুদন্ড বৈধ করে দেয়। কে ভেবেছিল শেখ হাসিনার মতো প্রগতিশীল প্রধানমন্ত্রী একদিন হেফাজতে ইসলামের মতো ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের ‘কওমি মাতা’ হয়ে যাবেন! হেফাজতে ইসলামের লোকেরা নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। আজ নিজেদের স্বার্থে তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পথে নামছে না বটে, কিন্তু এক তুড়িতে সক্কলে নারী নেতৃত্বের পক্ষে চলে গেছে, এ ভাবাটা হাস্যকর। ভোটের জন্য এমন বিশাল এক জনসংখ্যাকে বাগে আনা চমৎকার এক রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, কিন্তু আল্টিমেটলি এটি পাকিস্তানের পদাঙ্কই অনুসরণ করা। পাকিস্তানে যুগের পর যুগ সরকার আপস করেছে কট্টরপন্থি দলের সঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোও জোট বেঁধেছে ওদের সঙ্গে। এই করে করে কট্টরপন্থিরা ফুলে ফেঁপে বড় হয়েছে, কট্টরপন্থিদের জঠর থেকে জম্ম নিয়েছে সন্ত্রাসী। ধর্মের নামে সন্ত্রাস করার লোক, মানুষ কোপানোর লোক পাকিস্তানে যেমন আছে, বাংলাদেশেও আছে। এভাবে চললে পাকিস্তানের চেয়ে মোটেও পিছিয়ে থাকবে না বাংলাদেশ। এভাবে আপস করে চললে একাত্তরে পাকিস্তানের সঙ্গে এক দেশ হয়ে না থাকার যে প্রখর যুক্তি ছিল, সেগুলো ক্রমেই হাস্যকর মনে হবে। পাকিস্তান পারতো কট্টরপন্থিদের সঙ্গে ৫ দফা আপসে না গিয়ে আসিয়াকে জেল থেকে বের করা, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা, রাখা সম্ভব না হলে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সেটা হতে পারত বড় একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ইমরান খান সেটা করলেন না। না করে যে ভুলটা করেছেন, সেই ভুল কওমি ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রির সমতুল্য করে দিয়ে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা করেছেন। কট্টরপন্থি দলের সংবর্ধনা গ্রহণ করে একই ভুল করেছেন। দেশের ভালো চাইলে কট্টরপন্থা নির্মূল করতে হয়, কট্টরপন্থার সঙ্গে হাত মেলাতে হয় না। আশা করি ইমরান খান এবং শেখ হাসিনা দুজনই নিজেদের ভুলত্রুটি শোধরাবেন, যেন সেই অপশক্তি যারা গণতন্ত্রে, নারী স্বাধীনতায়, মানবাধিকারে, মতপ্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করে না, তাদের হাতে দেশ চলে না যায়।লেখক : নির্বাসিত লেখিকা , সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর