পত্রিকা পাড়ার আব্দুল গণি: সাহেনা আক্তার হেনা
২৪নভেম্বর,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: চেরাগী পাহাড়ের আব্দুল গণি। খুবই পরিচিত একটি নাম। লেখক-সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, গবেষক-সংগঠক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ সবাই তাকে এক নামেই চিনেন যুগ-যুগ ধরে। প্রায় ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে- বোয়ালখালীর গণি ষ্টোর নামের স্টলের মাধ্যমে পত্রিকা বিক্রি করে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের পত্রিকা পাড়াখ্যাত চেরাগি পাহাড়ের আব্দুল গণি। দীর্ঘ ৩৭ বছর একটি মাত্র পেশায় জড়িত থাকা সদা হাস্যোজ্জল আব্দুল গণি স্বাবলম্বী হতে না পারলেও কোনো রকম স্ত্রী সন্তান নিয়ে এই ব্যবসার মাধ্যমে মোটামুটি ভালোভাবে জীবন যাপন করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। আব্দুল গণি বোয়ালখালী উপজেলার চরখিজিরপুর এলাকার মৃত আব্দুল সালাম সওদাগরের পুত্র। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে আব্দুল গণি ছিলেন বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। লেখাপড়ার প্রবল ইচ্ছে থাকলেও দারিদ্র্যের যাতাকলে পড়ে বেশীদূর এগোতে পারেন নি। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়াকে সম্বল করেই নেমে যান জীবন সংগ্রামে। ফড়িং ধরা, মাছ ধরা, পুকুরে সাতাঁর কাটা, হা-ডু-ডু, ফুটবল খেলা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়াসহ শৈশবের কোনোকিছুই তাকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। অভাব-অনটনের আলিঙ্গনে কখনো দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার মতো শৈশব-কৈশোরের আনন্দ উচ্ছ্ল দিন তাঁর জীবনে যেন অধরা স্বপ্ন। বর্তমানে পত্রিকা বিক্রির মাধ্যমে মোটামুটি সচল হয়ে উঠা জীবনের কিছু আনন্দ স্বপ্ন দেখায় তাঁর বেঁচে থাকার। তিনি ১৯৯১ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তিন পুত্র সন্তান নিয়ে বিত্তের প্রাচুর্য না থাকলেও বর্তমানে অভাবহীন সুখী-সুন্দর পরিবার তার। নিজে পড়ালেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেও ছেলেদের মোটামুটিভাবে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। তবে আব্দুল গণির এই ব্যবসায় সহযোগিতা করে তার দ্বিতীয় মো. পুত্র আরিফ। সারাদিন পত্রিকা বিক্রি করে ৩ থেকে ৫ শত টাকা আয় করা যায় বলে জানান তিনি। আব্দুল গণি এক সময় অত্যন্ত দারিদ্রতার যাতাকলে থাকলেও সম্পুর্ন নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতে বর্তমানে উঠে এসেছেন এ পর্যায়ে। দীর্ঘ এ পথ পরিক্রমায় তিনি কারো সাহায্য পান নি বললেই চলে। ছোট বড় দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক বা যেকোন ম্যাগাজিনসহ সব ধরনের পত্র-পত্রিকা পাওয়া যায় তার ছোট্ট পরিসরের পসরায়। কাক ডাকা ভোর হতে রাত পর্যন্ত লেখক-পাঠক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ক্রেতাসহ পত্রিকা সংশ্লিষ্ট সকলের আনাগোনা থাকে তার পসরায়। সব ধরনের পত্রিকা তার দোকানে পাওয়া যায় বলে পাঠকরা এখানে পত্রিকা ক্রয় ছাড়াও পড়ার জন্য ভীড় জমায়। এতে তিনি বা তার পুত্র একটুও বিরক্তবোধ করেন না। পাঠকদের মন জয় করতে পারাতেই যেন তার আনন্দ। বোয়ালখালীর এই গণি ষ্টোরে পাওয়া যায় বহুদিন-বছর আগের পূরনো পত্রিকাও। আর এতে করে সকলের সাথে তার গড়ে উঠেছে নিবিড় এক বন্ধনের সম্পর্ক। সবসময় চেহারায় স্বভাব সুলভ লাবন্য মাখা সদা হাস্যোজ্জ্বল আব্দুল গণিকে সকলে গনি ভাই বলেই ডাকে। চেরাগী পাহাড় এলাকার পত্রিকা বিক্রেতা এক নামে পরিচিত গনি ভাই, সকলের কাছেই অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তবে গনি জানান, পারিবারিক সূত্রে আামার নামের পরে সওদাগর টাইটেল আছে। আমার পিতার নাম ছিল আব্দুল সালাম সওদাগর। তবে গনি ভাই হিসাবেই তিনি সকলের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পত্রিকা বিক্রির এই ব্যবসাটা যদি আরেকটু প্রসার করা যেত তাহলে ভালো লাগতো। তবে এর জন্য বেশকিছু পুঁজির প্রয়োজন যা তার নেই। তার শেষ ইচ্ছে পত্রিকার স্টলটি কারেন্ট বুক সেন্টারের মতো বড় পরিসরে করার। কথা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ঢাকার পত্রিকা ছাড়াও চট্টগ্রামের পত্রিকাগুলোসহ অন্যান্য সব ধরনের বইগুলো এখানে বেশী চলে। তিনি তার ছোট্ট এ ইচ্ছে পুরণে সমাজের বিত্তবান বা সরকারি কোন সংস্থার সুদৃষ্টি কামনা করছেন। তার এমন সৎ ও কর্মমুখী সদইচ্ছা পূরণে আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে।- লেখক : সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
সীতাকুণ্ডের অবিসংবাদিত নেতা কাসেম মাস্টারের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা
২৪নভেম্বর,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: সীতাকুণ্ডের দুইবারের সাবেক এমপি ও প্যানেল-স্পিকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি ও সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সভাপতি এ বি এম আবুল কাসেম মাস্টারের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৫ সালের এ দিনেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রয়াত এ নেতার মৃত্যু দিবসে এ বি এম আবুল কাসেম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে স্মরণসভাসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ত্যাগী এ নেতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক-জীবনাবলম্বনে প্রকাশিত হয়েছে- কাসেম মাস্টার শিরোনাম শীর্ষক এ বি এম আবুল কাসেম স্মারকগ্রন্থ। কাসেম মাস্টার ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি সীতাকুণ্ড উপজেলার দক্ষিণ সলিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল জলিল, মা আমেনা খাতুন। তিনি পড়াশোনা করেন কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে। কাট্টলী হাইস্কুলে তিনি শিক্ষকতাও করেন। এ কারণেই তিনি কাসেম মাস্টার হিসেবে পরিচিত। তাই তার জীবনাবলম্বনে রচিত স্মারকগ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে- কাসেম মাস্টার। জনসেবার মহান ব্রত নিয়ে যারা রাজনীতিতে আসেন, যারা ভোগ নয়, ত্যাগেই বিশ্বাসী, ব্যক্তিস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে যারা আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেন, কাসেম মাস্টার তাঁদেরই একজন। কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতা করেছেন বলে কাসেম মাস্টার হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। দেশ, মাটি ও নীতি আদর্শকে ভালোবেসে তিনি রাজনীতির শেকড় থেকে শিখরে ওঠেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে নিবেদিতপ্রাণ এ কর্মীবান্ধব নেতা সীতাকুণ্ডের- নেলসন ম্যাণ্ডেলা হিসেবে সম্মোধন করতাম। ধৈর্যের পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে আওয়ামী লীগ থেকে ৫বার মনোনয়ন দিয়েছিলেন। পঁচাত্তরোত্তর আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয়ের ঝুঁকি নিতে সীতাকুণ্ডের কোনো নেতা যখন সাহস করতেন না, তখন কাসেম মাস্টার বারবার এমপি প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের ঝাণ্ডা উড্ডীন রেখেছিলেন। কাসেম মাস্টার সত্যিকার অর্থে তৃণমূল থেকে গড়ে ওঠা একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি এমপি নির্বাচিত হননি। শেকড় থেকে তিনি শিখরে উঠেছিলেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছর তিনি সলিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। দু'বার তিনি চট্টগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সমিতির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সীতাকুণ্ড সংসদীয় এলাকা থেকে দুইবার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে প্রথম এমপি নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ-সদস্য থাকাকালীন তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি সংসদীয় দলের সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন। দ্বিতীয়বার এমপি হওয়ার পর কাসেম মাস্টার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি বাংলাদেশ-কোরিয়া পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কাসেম মাস্টার আওয়ামী লীগের একজন পোড়খাওয়া ত্যাগী নেতা ছিলেন। টানা এক যুগের বেশি সময় তিনি সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগেরও তিনি আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন। দীর্ঘ সময়ে তিনি সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা ছিলেন। বলা যায়, এমপি থাকাকালীন সীতাকুণ্ডের আওয়ামী রাজনীতি ছিল তারই একক নিয়ন্ত্রণে। দলের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়। তার স্মরণশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক ছিল। তাদের নামধাম ছিল তার নখদর্পণে। সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর থেকে সলিমপুর পর্যন্ত বিয়ে-শাদি থেকে শুরু করে সামাজিক যে কোনো ছোটখাটো অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি সবার নজর কাড়তো। কাসেম মাস্টার একজন সমাজহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। লতিফপুর আলহাজ আবদুল জলিল উচ্চ বিদ্যালয়, দক্ষিণ সলিমপুর আমেনা বিদ্যানিকেতন, সলিমপুর আবাসিক এলাকা বিদ্যাপীঠ, বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ধর্মপুর আবুল কাসেম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ, সীতাকুণ্ড বালিকা বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়, বিজয়স্মরণী কলেজ, মোস্তফা হাকিম কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন। অন্যদিকে তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের পরিদর্শক ছাড়াও এলাকার বহু সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। সীতাকুণ্ড এলাকার সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এ জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একক প্রচেষ্টায় সীতাকুণ্ড সদর ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তর করা হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এমপি আবুল কাসেম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে সীতাকুণ্ডে এনে যুগান্তকারী নানা উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। আজকের এই দিনে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।
প্রশ্নবিদ্ধ স্বাস্থ্যখাত: দুষ্টচক্র নির্মূল করতে হবে- মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা
২৩নভেম্বর,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: একের পর এক অনিয়মে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যখাত। স্বাস্থ্য হলো মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি। দেশের যেকোন সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার জনগণের দৌরগোড়ায় চিকিৎসা সুবিধা পৌঁছে দেয়া। কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনো আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, পদে-পদে হচ্ছে প্রতারণার শিকার। এর উপর অপচিকিৎসা, ওষুধে ভেজাল ও খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণ মানুষকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নকল-ভেজাল ওষুধ আর ভূয়া চিকিৎসক এ দুয়ে মিলে আজ মানুষের জীবন বিপন্ন। দেশের গ্রামগঞ্জ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানগুলো ক্রেতাদের কাছে আসল ও কার্যকর ওষুধ বিক্রি করছে কিনা তা এখন একটি যেমন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, তেমনি চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা চান্দগাঁও থানার পুরাতন কালুরঘাটের তারানন্দ যুগী আশ্রমের কালি মন্দিরের সামনের একটি বিল্ডিং থেকে ভেজাল ওষুধ ও ওষুধ তৈরীর সরঞ্জামাদি উদ্ধারের ঘটনায় সাধারণ মানুষ শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি অভিযান দল রাতভর ওই বিল্ডিংয়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ ও ওষুধ তৈরির সরঞ্জামাদিসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন বিকেলে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মুহাম্মদ আলী হোসেন সাংবাদিকদের জানান, গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ হোসেন নামের ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নামিদামি কোম্পানির ওষুধের নাম ব্যবহার করত এবং সেগুলো ভেজালভাবে প্রস্তুত করে উচ্চ দামে বাজারজাত করে আসছিল। এসব নকল ওষুধ খেলে মানুষের স্বাস্থ্যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি এসব ওষুধ তৈরীতে বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করতো এবং কারিহো ল্যাবরেটরিজ নাম দিয়ে ওষুধগুলো বাজারে বিক্রি করতো। ওই অভিযানে প্রায় ২৫ লাখ টাকার ওষুধ ও ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। অপরদিকে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় ১৪৪ জন ভূয়া চিকিৎসকের সন্ধান মিলেছে। যারা সবাই নামের আগে ডাক্তার লিখেন। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, চলতি বছরের ২৭ জুলাই পটুয়াখালীর বাউফল থানার একটি জিআর মামলায় একজন হাজতীকে তার আইনজীবি বিজ্ঞ আদালতে হাজির করেন। একইসঙ্গে একটি প্রেসক্রিপশন দাখিল করে হাজতীকে অসুস্থ বলে দাবী করেন তিনি। বিজ্ঞ আদালত সেটি পর্যালোচনা করে দেখেন, পেসক্রিপশন প্রদানকারি ডাক্তার এমবিবিএস ডিগ্রীধারী নন। এমনকি বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০-এর অধীন নিবন্ধিতও নন। প্রেসক্রিপশনে ওই মহিলা ডাক্তার তাঁর ডিগ্রী হিসেবে বিভিডি-এ ঢাকা উল্লেখ করেন। বিজ্ঞ আদালত সেদিনই ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পাশাপাশী পটুয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন স্বঃপ্রনোদিত হয়ে বাউফল উপজেলায় অনিবন্ধিত অন্য কোনো চিকিৎসক রয়েছে কি না তা, ন্যায় বিচারের স্বার্থে তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে আদেশ দেন। এজন্য তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০-এর অধীন নিবন্ধিত নন; কিন্তু চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে বেআইনীভাবে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন, তদন্তের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রণয়ন করে আদালতে জমা দিতে বাউফল সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশ মোতাবেক ওই সহকারি পুলিশ সুপার সম্প্রতি ১৪৪ জন ভূয়া চিকিৎসকের একটি তালিকা আদালতে জমা দেন। একটি উপজেলায় ১৪৪ জন ভূয়া চিকিৎসকের অস্তিত্ব পাওয়া যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বিস্মিত ও শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে করোনার এ সময়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে- এতোদিন আমরা প্রতারিত, অর্থ অপচয় ছাড়াও ভূয়া চিকিৎসকের অপ-চিকিৎসা ভেজাল ও নিন্মমানের ওষুধ সেবন করে নিজেদের জীবনকে তিল-তিল করে শেষ করেছি। অন্তহীন সমস্যার দেশ বাংলাদেশ। এদেশে কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, শিশু-বৃদ্ধ, তরুণ কেউই শান্তিতে স্বস্তিতে নেই। একদিকে অভাব-অনটন অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যবস্থা অব্যবস্থা মানুষকে প্রতিদিনই নিত্য-নতুন সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারি প্রশাসন, সেবা সেক্টরগুলো যদিও জনগণের কল্যাণ ও সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু বাস্তবতাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। শুধু বাউফল নয়, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ভূয়া চিকিৎসক আর ভেজাল ওষুধের বহু পিলে চমকানো তথ্য অতীতে দেশের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এখনো হচ্ছে। এসব সংবাদ কতটা ভয়ংকর ও উদ্বেগের তা বলার অপেক্ষা রাখে না! কেবল এক উপজেলায় যদি ১৪৪ জন ভুয়া চিকিৎসকের সন্ধান মেলে, তাহলে সারাদেশে কত ভুয়া চিকিৎসক রয়েছেন, তা বলা মুশকিল। ভুয়া চিকিৎসক আর ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা প্রায়শই পত্রিকান্তরে প্রকাশ পায়। এনিয়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। তবুও কমছে না এদের দৌরাত্ম্য। বরং ধর-পাকড় শুরু হলে, কিছুদিন চেম্বার গুটিয়ে নতুবা নামের আগে বসানো ডাক্তার লিখাটি কৌশলে মুছে ওষুধ বিক্রেতা সেজে দিব্যি প্রতারণা চালায়। এসব ভুয়া চিকিৎসকের কেউ-কেউ রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। অধিকাংশ ভুয়া চিকিৎসক নগরীর বস্তি এলাকাগুলোকে টার্গেট করে। চট্টগ্রামের বাকলিয়া, বায়েজিদ, চাঁন্দগাও, কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন এলাকার বস্তিগুলোতে টার্গেট করে ভূয়া চিকিৎসকরা চাকচিক্য চেম্বার খুলে বাহারি সাইন বোর্ডে ডাক্তার ও বিভিন্ন উপাধি লিখে অশিক্ষিত অজ্ঞ মানুষের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের চেম্বারে ফার্মেসিসহ থাকায় নিন্মমানের ওষুধগুলোই তারা প্রেসক্রাইব করে। অতীতে তারা গ্রেপ্তার হলেও বেরিয়ে এসে আবারো একই কর্মে লিপ্ত হয়েছে। এসব চিকিৎসকরা খৎনা থেকে শুরু করে পায়ের তালু থেকে মাথার তালু পর্যন্ত চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে জাহির করে অপচিকিৎসা দেয়। একই সাথে নকল-ভেজাল এবং নিন্মানের ওষুধও বিক্রি করে। থানা পুলিশের নাকের ডগায় বসেও কেউ-কেউ প্রতারণা অব্যাহত রেখেছে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে দেশের মানুষ কোন চিকিৎসকের উপর আস্থা রাখতে পারবেন? প্রায় ডাক্তারের নামের পাশে কয়েক লাইন ধরে নানা রকম ডিগ্রি লিখা থাকে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব ডিগ্রির অর্থ বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এটাই তাদের বড় ধরনের বাণিজ্য। মানুষকে বোকা বানানোর এ ধরনের সাইনবোর্ড প্রশাসনের সামনেই ঝুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় এ ধরনের চিকিৎসকদের খোঁজে বের করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি পুলিশ Rab ও অভিযান চালিয়ে কিছু ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে। তাতে কাজের কাজ কতটুকু হয়েছে, তা বলা যাচ্ছে না। যারা জনগণের সাথে এ ধরনের জঘন্য প্রতারণা করছে, তারা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করছে। সুতারাং কোনভাবে তাদেরকে ছাড় দেয়া হলে, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা চরম হুমকির মুখে পড়বে। এসব ভুয়া চিকিৎসকরা ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ব্যক্তিগত চেম্বার বা ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখেন। তারা বাহারি সাইনবোর্ডও ভিজিটিং কার্ডে যেসব ডিগ্রি ব্যবহার করছেন, তার সবই ভুয়া। ইতিপূর্বে অনেক কথিত চিকিৎক তাদের ডিগ্রি সংক্রান্ত তথ্য সঠিক নয় বলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে স্বীকারও করেছেন। অনেকে একাধিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডিগ্রিও ব্যবহার করেছেন। এদের মধ্যে কেউ-কেউ অল্টারনেটিভ মেডিসিন (এএম) বা বিকল্প চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র। এদের হাতে রোগীর জীবন মোটেই নিরাপদ নয়। এই প্রতারণার সাথে যারা জড়িত তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত । কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত তাদেরও যারা নকল-ভেজাল ও নিন্মমানের ওষুধ বেচা-বিক্রির সাথে জড়িত। শুধু পটুয়াখালীর বাউফল, ঢাকা-চট্টগ্রাম নগরীই নয় দেশের কোনো এলাকার মানুষই নকল ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ক্ষতিকর ওষুদের আওতা থেকে মুক্ত নয়। এর শিকার রোগনিরাময় প্রত্যাশী দেশের প্রত্যেক এলাকার মানুষ। অর্থ সম্পদ খরচ করে যে মৃত্যুকে ঠেকানোর জন্য রোগাক্রান্ত মানুষের আকুল প্রচেষ্টা, সেই মৃত্যুকেই যে আহবান করা হচ্ছে ওই সব বিপজ্জনক ওষুধ সেবন করে তা অনেক হতভাগ্য রোগীর ও তাদের অভিভাবকদের অজানা থেকে যায়। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে সংবাদপত্রে। কিন্তু জনঅকল্যাণকর এ হীন ব্যবসা বা প্রতারণা বন্ধে কেউ কখনো এগিয়ে আসেনি। দেশে চলমান এমন প্রাণঘাতী আয়োজন বন্ধ করতে হবে। আর তাই ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, ওষুধ শিল্পের মঙ্গল বিধান এবং রোগ নিরাময় প্রত্যাশী মানুষের জীবন রক্ষা ও ক্রেতাস্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওই দুষ্টচক্রকে স্থায়ীভাবে নির্মূলের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবেন। এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। - লেখকদ্বয় : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
সাইবার ক্রাইম, দুষ্টচক্র নির্মূল করতে হবে: মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার
১৬নভেম্বর,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: আমাদের সমাজে বর্তমানে যে অবক্ষয় দেখা দিয়েছে, তার মূলে রয়েছে ফেসবুক হয়রানি। ফেসবুক হয়রানি এখন মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। উপর্যূপরি এসব হয়রানির ঘটনায় নারী-পুরুষ সর্বত্রই বিশেষ করে অভিভাবক মহলে দেখা দিয়েছে চরম উৎকন্ঠা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদাসীনতার কারণে দিন-দিন এ হয়রানির মাত্রা বাড়ছে ভয় কমছে না। একশ্রেণীর সমাজ বিরোধি ও দুষ্টচক্রের দল ইন্টারনেট, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ওয়েবসাইটে বেনামি একাউন্ট ব্যবহার করে সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষসহ স্কুল-কলেজ পড়-য়া ছাত্রীদের আপত্তিকর ছবি, ক্ষেত্রবিশেষে ভিডিও ক্লিপসসহ বিদ্বেষমূলক নানা তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে বিস্তর তথ্য ছাপা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। তবুও নিয়োজিত সংস্থা এর প্রতিকারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। এ যেন চলছে এবং চলতেই থাকবে। অবস্থাদৃষ্টে মনেই হয় না আমরা আদৌ কোনো সুস্থ সভ্য সমাজে বাস করছি। চারদিকে অজস্র আলো- সূর্যের ও বিজলি বাতির, জ্ঞানবিজ্ঞান ও সভ্যতার, মনন ও অগ্রসরতার। তবুও আমরা নিয়ত অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছি। জীবনানন্দ দাশের সেই অদ্ভুত আধার এক আমাদের বেপথু করছে; অসভ্য জঙ্গলি এক মধ্যযুগীয় বর্বরতায় মানুষ নামের জীবশ্রেষ্ঠ গর্বিত সত্তাকে ক্রমাগত অমানুষে পরিনত করছে যেন। আমরা এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে রাত-দিন অতিক্রান্ত করছি। বলাবাহুল্য যে, সাইবার ক্রাইমে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তিই কম-বেশি শিক্ষিত। বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদগুলো বিশ্লেষন করলে এটাই পরিস্কার বোঝা যায় যে ইন্টারনেট হয়রানির কারণে পরিবারে এবং সামাজিক জীবনে বড় ধরনের সঙ্কটে পড়তে হচ্ছে দেশের এক-তৃতীয়াংশ নারীকে। সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুক খুললেই দেখা যায় নারীদের নিয়ে নানা আপত্তিকর ছবি ও তথ্য ছড়ানো। এছাড়া ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে কথিত প্রেমিকের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে অনেক মেয়ে সর্বশান্ত হয়েছে। আবার দেখা যায় কেউ-কেউ কৌশলে কিংবা প্রেমের অভিনয় করে মোবাইলে মেয়েদের আপত্তিকর ছবি তুলে সেই মেয়েটিরই নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে নানা আবেদন-নিবেদন তুলে ধরছে। অথচ ওই মেয়েটি এর কিছুই জানে না। এসব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভূয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অনৈতিক কর্মকান্ড করা হচ্ছে। এ নিয়ে অতীতে পত্রিকাগুলোয় বিস্তর লেখা ছাপা হয়েছে, কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। সাইবার জগতে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোয় নারীদের হয়রানির ঘটনা যে ক্রমে বাড়ছে- বিটিআরসি গঠিত বাংলাদেশ কম্পিউটার সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমে (বিডিসিএসআইআরটি)-তে বিভিন্ন সাম্প্রতিক সময়ে জমা পড়া বেশকিছু অভিযোগই তার প্রমান। বর্তমান আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশে বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত নানা সুবিধা যখন মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছছে, ঠিক তখনি তা যেন বুমেরাং হয়ে ফিরে যাচ্ছে। দেখা দিচ্ছে অভিশাপ হয়ে। ব্যাপক তথ্য অনুসন্ধান মতে, সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে ২০১২ সালের ২৫ জানুয়ারি বিডিসিএসআইআরটি সেল গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক ওয়েবসাইট ব্লক করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছড়ায় এমন সাইটসহ আরো কিছু সাইটের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ওই সময়ে বেশকিছু ওয়েবসাইট বন্ধ করতে পারলেও ফেসবুকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে নি। সবমিলিয়ে বুঝা যাচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভালো দিকগুলোকে কাজে না লাগিয়ে একটি দুষ্টচক্র ব্যবহারে কারচুপির মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে একরকম অভিশাপ হিসেবে উপস্থাপন করছে। বর্তমানে সাইবার ক্রাইম এতটাই বেড়ে গেছে যে নরম হাতে এদের দমন করা কঠিন হয়ে পড়বে। সম্ভবত নিয়োজিত সংস্থা অবস্থা আঁচ করতে পেরে বেশ কয়েক বছর পূর্বে একটি গোয়েন্দা সংস্থারও সহযোগীতা নিয়েছিল। ওই সময়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অভিযোগের কিছুটা সুরাহা হলেও নারীদের নিয়ে যৌন হয়রানির মতো ঘৃণ্য ও জঘন্যতম বিষয়গুলোর আশানুরুপ ফল পাওয়া য়ায় নি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, যেসব ভূয়া অ্যাকাউন্ট থেকে আপত্তিকর ছবি, তথ্য ও বার্তা ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হলেও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওই দুষ্টচক্র আবার নতুন করে অ্যাকাউন্ট খুলে একই কাজ করে যাচ্ছে। আবার বৈধ অ্যাকাউন্ট ধারিরাও তাদেরই বন্ধু-বান্ধবীদের মধ্যে ফেসবুক বা ফেসবুকের গ্রুপের মাধ্যমে যে অশ্লীল কথাবার্তা এবং আপত্তিকর ছবি শেয়ার করছে তা চোখে পড়লে, যে কাউকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে। তাই আমরা চাই সুস্থ-সভ্য ও সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় অনতিবিলম্বে সাইবার ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত এই দুষ্টচক্রকে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নির্মূল করা হোক।- লেখকদ্বয় : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করতে হবে: মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা
১৪নভেম্বর,শনিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: সমাজের রন্দ্রে-রন্দ্রে আজ মাদকের ভয়াল বিস্তার। সর্বনাশা মাদকদ্রব্য আমাদের গোটা সমাজকে গ্রাস করেই চলেছে। এর শিকার যুব-তরুণ সমাজ। মাদক নিয়ে অতীতে অনেক লেখালেখি হয়েছে, এখনো হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারি সংস্থা সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে নানা পদক্ষেপও নিয়েছে। তবুও তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। মাদকের বিরুদ্ধে যতই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, ততই অভিনব কৌশলে বাড়ছে এর ব্যবহার। মাদক ব্যবসা আর ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে বেড়েই চলেছে চুরি-ছিনতাই, বখাটেপনা ইভটিজিং, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সীমান্ত পথ দিয়ে মাদকের চালান এনে সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে এরা গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় আসল হোতারা। ফলে ওই সিন্ডিকেটের তৎপরতায় দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে মাদক ব্যবসায়িরা পুনরায় আগের পেশায় ফিরে যায়। আবার মাদকের বিস্তার নিয়ে একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য নানা অপকৌশল, হানাহানি, খুন-খারাবি, মামলা-পাল্টা মামলা প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর বাইরে মাদকাসক্তির কারণে সামাজিক অবক্ষয়ের নানা কুৎসিতও চিত্র ধরা পড়ছে একের পর এক। নানা ঘটন-অঘটনের নেপথ্যে রয়েছে মাদক ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার কারণে। মাদকের ব্যবহারজনিত সমস্যাটি নতুন নয়। আশির দশক থেকে শুরু হয়ে ক্রমে তা আজ মারাত্মক সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যতই পদক্ষেপ গ্রহণের কথা মিডিয়ায় বলছে এবং অভিযান চালাচ্ছে, কার্যত: কোনোভাবেই যেন বন্ধ করা যাচ্ছে না এ ব্যবসা। উপরন্তু প্রশাসনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিত্যনতুন নামে মাদকের প্রসার ঘটিয়ে চলছে মুনাফালোভী দুষ্টচক্রের দল। ইয়াবা, ফেনসিডিল গাঁজাসহ নানা নামের মাদকদ্রব্যের চালান নিয়ে আসছে দেশে এবং ছড়িয়ে দিচ্ছে সব জায়গায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য প্রবেশ করছে জল-স্থল-অন্তরীক্ষে। মিয়ানমার ও ভারত থেকে অবাধে প্রবেশ করছে এসব মাদকদ্রব্য। ফলে অভিভাবকরাও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। মাদকদ্রব্য এখন সহজলভ্য হওয়ায় বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে উঠতি বয়সের যুবক ও স্কুল-কলেজের ছাত্ররাও হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলে আসক্ত হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। আমরা মনে করি মাদকদ্রব্যের অবাধ বিস্তার ও অপব্যবহার রোধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের কবল থেকে রক্ষার জন্য সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্ব পালন এবং মাদক ব্যবসায় জড়িতদেও আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য যাতে দেশে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য দেশের অভ্যন্তরে এদের যে চেইন রয়েছে, তা ভেঙে দিতে হবে। এ জন্য ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশ ও সমাজকে মাদকমুক্ত করতে হবে। -লেখকদ্বয় : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী, প্রখর যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন: মো.এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা
১৩নভেম্বর,শুক্রবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: চট্টগ্রামের বহুল প্রচারিত, স্বনামধন্য পত্রিকা দৈনিক পূর্বকোণ-এর সম্পাদক কর্মবীর স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী একজন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী অসাম্প্রদায়িক ও প্রখর যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক পূূর্বকোণ চট্টগ্রামের উন্নয়ন তথা জনস্বার্থমূলক সকল ইস্যুতে বরাবরই ছিল সোচ্ছার। তিনি বিলাসি নয় পরিশ্রমী ও শ্রমজীবী মানুষদের সবসময় পছন্দ করতেন। আতপ্রচার বিমুখ এই মণিষী নিজেকে আড়াল রাখতে পছন্দ করতেন। মানবীয় গুণ সম্পন্ন এই ব্যক্তিত্ব অসংখ্য শিক্ষা, সেবামূলক ও রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পিতা দৈনিক পূর্বকোণের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরীর মৃত্যুর পরে যোগ্য ও বলিষ্ট হাতে পত্রিকার হাল ধরেছিলেন তিনি। দেশ এবং জনগনের কল্যানের ও জন সেবার লক্ষ্যেই এই জগতকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টিশীল চিন্তা-ভাবনা, প্রতিভা ও মেধা দিয়ে ঢেলে সাজানো দৈনিক পূর্বকোণ হয়ে ওঠেছিল পাঠক প্রিয়, জননন্দিত এবং পৌঁছে যায় সর্বস্থরের জনগণের পছন্দের সর্বোচ্চ শিখরে। কেননা গণ মানুষের চাহিদা, সমস্যা-সম্ভাবনা তুলে ধরতে, বস্তুনিষ্ঠ সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন তিনি। এছাড়া তিনিই ছিলেন সৎ সাংবাদিকতাসহ দেশ ও জনগণের পাশে থেকে জন কল্যাণকর সংবাদপত্র বিকাশের ও প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম এক অগ্রসৈনিক। তিনি ছিলেন চিন্তা-চেতনায় সমাজ সচেতন ও দায়বদ্ধ, সংস্কারমুক্ত, ধর্মপ্রাণ, দায়িত্বপ্রবন, চিন্তায় ও মননের আধুনিক এবং স্পষ্টভাষী এক আলোকিত মানুষ। স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার হাজ্বী বাড়ী নিবাসী, আধুনিক সংবাদপত্রের রুপকার চট্টলদরদী, ব্যবসা উদ্যোক্তার পথিকৃৎ, দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইউসুফ চৌধুরী ও মাতা মরহুমা জোহরা বেগম চৌধুরীর সূযোগ্য সন্তান। ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি আন্দরকিল্লা রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তিনি সেন্ট মেরিস ও সেন্ট প্লাসিডস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্র জীবনে তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ অনুধ্যান শিক্ষার্থী। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ছাত্র জীবন থেকেই তিনি শিল্প-সংস্কৃতি সাহিত্যের প্রতি ছিলেন গভীর অনুরাগী। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বুয়েট থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। স্থাপত্যবিদ্যা ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্যও জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। অসংখ্য দুর্লভ বই, পত্র- পত্রিকা সংগ্রহে রাখা ছাড়াও চিত্রকলা, গান, রন্ধন শিল্প, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফির বিষয়ে গভীর আগ্রহী ছিলেন তিনি। ১৯৮৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারী দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এই বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী, কর্মবীর স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী একাধারে বাসস ও চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের পরিচালক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর উন্নয়ন কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সাইসেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রির ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চাপ্টারের সভাপতি, চিটাগাং ক্লাব লিমিটেডের সদস্য, চিটাগাং বোট ক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্য, নিউজ পেপার ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর নির্বাহী কমিটির সদস্য, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য, বাংলাদেশ করোগেটেড কার্টন এন্ড এক্সেসরিজ এন্ড এক্সপোর্ট এসোসিয়েশনের প্রথম সহ-সভাপতি ও এডভাইজার, ওল্ড ফৌজিয়ান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম সংবাদপত্র পরিষদের সদস্য, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের সদস্য, স্যার মরিস ব্রাউন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের প্রেসিডেন্ট, চিটাগাং ডেইরি ফার্ম এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, চাটগাঁ ভাষা পরিষদের উপদেষ্টা, রাউজান মডেল ইনস্টিটিউট ও ঢেউয়া হাজিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া যোগ্য পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দূরদর্শিতার জন্য তাকে ২০০৭ সালে পূর্বকোণ গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে মনোনীত করা হয়। দীর্ঘ ২৪ বছর এক দুরারোগ্য ব্যাধির সাথে লড়ে অবশেষে ২০১৭ সালে ঢাকার ধানমন্ডি রেঁনেসা হাসপাতাল এন্ড রির্সাচ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৫ নভেম্বর তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে প্রায় দেড়যুগের বেশি সময় লড়তে-লড়তেও মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশ ও মানুষের সেবায় কাজ করে গেছেন। একজন বিরল প্রতিভাদীপ্ত, কীর্তিমান, নিরলস পরিশ্রমী, দৈনিক পূর্বকোনের প্রয়াত সম্পাদক স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী তাঁর সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্যেই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব দান করুন। আমিন।- লেখকদ্বয় : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
মাদকে আসক্ত পথ শিশুরা, এদের রক্ষা করতে হবে: মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার
১২নভেম্বর,বৃহস্পতিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: মরণ নেশা ভয়াল মাদকে জড়িয়ে পড়ছে পথ শিশুরা। দারিদ্র্যের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অবহেলা, অযত্ন আর অনাদরে বেড়ে উঠা ঠিকানাবিহীন হাজার-হাজার পথ শিশু মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন বস্তির আনাচে-কানাচে টোকাইয়ের কাজ করে এমন শিশুদের মাদক সেবনের দৃশ্য দেখলে যে কেউ শিউরে উঠবে। সারাদিন কাগজ বা অন্যান্য ভাঙ্গারির মালামাল কুঁড়িয়ে তা সংশ্লিষ্ট দোকানে বিক্রি করে যে টাকা আয় করে, তার একটি অংশ তারা ব্যয় করে মাদক সেবনে। পথ শিশুদের এমন অবস্থার অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে বেড়িয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা কাহিনী। যা রীতিমত আতকে উঠার মতো। পথশিশু বলতে আমরা অভিভাবকহীন বা ঠিকানাবিহীন কোনো শিশুকে পথ শিশু মনে করি। কিন্তু বাস্ততাটা হচ্ছে ভিন্নরূপ। অধিক মুনাফালোভী এক শ্রেণির ভাঙ্গারী ব্যবসায়িরা স্কুলে পড়ুয়া এমন শিশুদেরও টোকাই বানিয়ে ফেলছে কৌশলে। করিম (ছদ্মনাম) থাকে বায়েজিদের একটি বস্তিতে। বাবা রিক্সা চালক আর মা গার্মেন্টস শ্রমিক। সে স্থানীয় একটি ব্রাক স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। প্রায়শ : স্কুল চুরি করে মাঠে খেলা করে নতুবা ভিসিডি প্রদর্শিত হয় এমন চায়ের দোকানগুলোতে ৫-১০ টাকা খরচ করলে সময় কাটানো যায়, এমন সব দোকানে বসে সময় কাটায়। একদিন মুখচেনা এক ভাঙ্গারি ব্যবসায়ি তাকে ডেকে ২০টি টাকা হাতে দিয়ে চা-নাস্তা খেতে বলে। সে নিতে না চাইলে, বলে নাও পরে পরিশোধ করে দিবে। কিন্তু কিভাবে পরিশোধ করবে প্রশ্ন করলে ওই ব্যবসায়ি অন্য টোকাইদের দেখিয়ে দিয়ে বলে, ওদের মতো ভাঙ্গারি মালামাল খুঁজে এনে দিলেই হবে। ব্যস সেই থেকে করিম টোকাই। শুধু এখানেই শেষ নয়। আসক্ত হয়ে পড়ে মাদকে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পরিবার থেকেও। ঠিকানাবিহীন শিশু ছাড়াও করিমের মতো অনেক পথ শিশু আমাদের চারপাশে আছে। ভাঙ্গারি ব্যবসায়ি ছাড়াও পথ শিশুরা মাদকাসক্ত হয়ে উঠার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদেও ব্যবহার করছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও মাদক ব্যবসায়িরা। এতে করে এক সময় জড়িয়ে পড়ছে তারা নানা অপরাধের সাথে। এদের বয়স সাধারণত : ১১ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। ১৯৭৪ সালের শিশু আইন অনুযায়ী ১৬ বছরের কম বয়সিদের শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি মানব সন্তানই শিশু এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এ শিশুর ১৪ এবং কিশোরের বয়স ১৮ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপির) বিভিন্ন থানায় বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোর অপরাধীদের আদালতে সোপর্দ করা হলে, আদালতের মাধ্যমে প্রথমে তাদের কারাগারে প্রেরণ করা হয়। পরে চট্টগ্রাম জেলা কারাগার থেকে এসব কিশোরদের গাজীপুরে টঙ্গির কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া কিশোরি অপরাধীদের হাটহাজারীস্থ শেল্টার হোমে প্রেরণ করা হয়। এরপরও শিশু-কিশোর অপরাধ বেড়েই চলেছে। মাদক সেবন থেকেই তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধের সঙ্গে। এসব পথ শিশুরদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মাদক ব্যবসাও চালানো হচ্ছে। চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ এমনকি হত্যার মতো ঘৃণ্য অপরাধেও শিশু-কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার বহু প্রমাণ অতীতে পুলিশ, Rab ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পেয়েছে। বলাবাহুল্য যে, পথশিশুদের ভবিষ্যত আজ কতটা অন্ধকারে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এদের কাছে মাদকের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মরণঘাতি নেশা ড্যান্ডি। তারা জানায়, ড্যান্ডি খুব সহজলভ্য নেশা। জুতা জোড়া লাগানোর কাজে ব্যবহৃত আইকা গাম ড্যান্ডির প্রধান উপকরণ। মাদক সেবনের মাধ্যমে পথ শিশুরা মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত হওয়া ছাড়াও ধীরে-ধীরে মাদকের ছোবলে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক-মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে পথ শিশুরা সংখ্যায় প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে বিভিন্ন বস্তি এলাকা ছাড়াও বহদ্দারহাট, রেলওয়ে স্টেশন, কোতোয়ালি ও রিয়াজউদ্দিন বাজার, বায়েজিদ ও বাকলিয়া এলাকায় ২-৩ হাজার। এদের মধ্যে কেউ-কেউ মাদক পাচারসহ নানা অপরাধের সাথেও জড়িত। দিন-দিন নগরীতে বাড়ছে এসব পথ শিশুদের সংখ্যা। তাদের দ্বারা বাড়ছে অপরাধ। সেই সাথে বাড়ছে মাদক সেবনকারির সংখ্যাও। এসব শিশু-কিশোরদের যারা মাদক সেবনে উৎসাহিত করছে, অপরাধি বানাচ্ছে, মাদক পাচারের সাথে জড়াচ্ছে তাদের খুঁজে বের করা দরকার। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও রাখে। একই সাথে এসব পথ শিশুদের রক্ষায় দ্রত ব্যবস্থা নেয়া না হলে, তারা অন্ধকারে নিমর্জ্জিত হয়ে ধীরে-ধীরে মৃত্যুর দিকে চলে যাবে। জড়িয়ে পড়বে অপরাধে। এদের পুনর্বাসন করে মাদকমুক্ত জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সেটাই প্রত্যাশিত।- লেখকদ্বয় : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে: মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা
১১নভেম্বর,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা দিন-দিন মাত্রাতিরক্তভাবে বেড়েই চলেছে। উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাদের আচরনে। চট্টগ্রাম মহানগর ও আশ-পাশের বিভিন্ন এলাকায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোররা নানা অপরাধ সংগঠিত করে যাচ্ছে এমন সংবাদ প্রায়শ: পত্রিকান্তরে প্রকাশ পাচ্ছে। সামাজিক মূল্যবোধহীন এক সমাজে বেড়ে ওঠা এসব কিশোররা যেমনি ক্রমেই অস্থির ও সহিংস হয়ে উঠেছে, তেমনি বিভিন্ন বস্তি, রাস্তা-ফুটপাতে বেড়ে উঠা সমাজের দারিদ্র-লাঞ্চিত, ভাগ্যবিড়ান্ধিত ও বখে যাওয়া কিশোরদের ব্যবহার করে একাধিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠি গড়ে তুলেছে ভয়ঙ্কর অপরাধ জগত। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক আনা-নেয়া বা বেচা-বিক্রিতে ব্যবহার করছে শিশু-কিশোরদের। এলাকার ওঠতি বয়সি কিশোররা বড়দের সামনেই একের পর এক সিগারেট খাচ্ছে। মেয়েদের সাথে ইভটিজিং করছে। এলাকায় নতুন কোনো লোক দেখলে পথ আগলে নানা প্রশ্ন করে। এক কথায় তাদের চক্ষুলজ্জা বলতে কিছুই নেই। সালাম দেওয়া দূরের কথা, ভালো ভাবে কথা বলার সৌজন্যতাও তাদের নেই। তাদের ভবিষ্যত নিয়ে অভিভাবকরাও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। শিশু-কিশোর ও তরুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের আচরণে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বড়দের সম্মান করা কিংবা অভিভাবকদের নির্দেশ মেনে চলার মানসিকতা নেই অধিকাংশের। রাজনৈতিক ও পারিবারিক অস্থিরতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার অভিভাবকদের অবৈধ সম্পত্তি, সুস্থ বিনোদনের অভাব, শিক্ষাব্যাবস্থার বিভাজন, অভিভাবকদের সঙ্গ না পাওয়া ও অসৎ সঙ্গের কারনে ছেলে-মেয়েদের আচরণে পরিবর্তন হচ্ছে। তারা রাত জেগে মোবাইল ফোনে কাথোপকথন করছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এবং ধীরে-ধীরে তারা অস্থির ও সহিংস হয়ে উঠছে। এর উদাহরণ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একাধিক ধর্ষণের ঘটনা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কিশোর অপরাধের বিষয়টি শুধুমাত্র আমাদের দেশেই নয়, ইউরোপের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বৃটেনের সাম্প্রতিক দাঙ্গা এবং লুটতরাজের ঘটনায়ও কিশোররা অপরাধ সংঘটন করেছে। সে বিবেচনায় অবশ্যই বলা যায়, অপরাধ মোকাবেলায় কোনো না কোনোভাবে কিশোররা এক নতুন সমস্যা আর সংকটের কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রাম মহানগরীতে কিশোর সন্ত্রাসীরা দিন-দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। নগরীর বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও কথিত বড় ভাইদের নামে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১৭ বছরের কিশোরেরা গ্রুপ বা বাহিনী গড়ে তুলেছে। এরা স্ব-স্ব এলাকায় মাস্তানী-চাঁদাবাজি, ছিনতাই জায়গা-জমি দখল-বেদখলে সহযোগীতা এবং আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে নানা দাঙ্গাঁ-হাঙ্গামা করে যাচ্ছে। কেউ-কেউ মাদক সেবনের মতো মরন নেশায় জড়ানোর পাশাপাশি মাদকদ্রব্য আনা-নেয়া ও বেচা-বিক্রির কাজ ও চালাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, ১০ থেকে ১৭ বছরের এসব কিশোররা পান থেকে চুন খসলেই দলবদ্ধভাবে লাঠি-সোটাসহ নানারকম আগ্মেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের উপর। (যদিও বর্তমানে প্রশাসনিক তৎপরতার কারণে কিশোর গ্যাংয়ের আস্ফালন কিছুটা কমেছে)। এসব কিশোররা রাজনৈতিক আশ্রয়-পশ্রয়ে থাকার কারনে প্রশাসনও এদের বিরূদ্ধে সহজে এ্যাকশনে যায়না। ১৯৭৪ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশু বলতে ১৬ বছরের কম বয়স্ক কোনো ব্যক্তিকে বোঝায়। আবার আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি মানব সন্তানই শিশু এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এ শিশুর ১৪ এবং কিশোরের বয়স ১৮ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপির) বিভিন্ন থানায় বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোর অপরাধীদের আদালতে সোপর্দ করা হলে, আদালতের মাধ্যমে প্রথমে তাদের কারাগারে প্রেরন করা হয়। পরে চট্টগ্রাম জেলা কারাগার থেকে এসব কিশোরদের গাজীপুরে টঙ্গীর কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। এছাড়া কিশোরী অপরাধীদের হাটহাজারীস্থ শেল্টার হোমে প্রেরন করা হয়। এরপরও কিশোর অপরাধ উদ্ধেগজনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধের সঙ্গে। নানা কৌশল অবলম্বন করেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এদের যেমনি নিয়ন্ত্রনে আনতে পারছেনা তেমনি রাজনৈতিক শেল্টারের কারনে অনেক সময় নিরব ভূমিকা পালন করে থাকে পুলিশ। অপরাধ জগতের দাগী শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আর এলাকাভিত্তিক দলীয় বড় ভাইয়েরা এসব কিশোরদের সন্ত্রাসী বানাচ্ছে। এরপর কিশোর সন্ত্রাসীদের নানাভাবে ব্যবহার করে ফায়দা লুটছে। সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের পাশাপাশী কিশোর সন্ত্রাসীদের দিয়ে কোটি-কোটি টাকার মাদক ব্যবসাও চালানো হচ্ছে। চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরন এমনকি হত্যার মতো ঘৃন্য অপরাধেও কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার বহু প্রমান পুলিশ, Rab ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পেয়েছে। সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-পশ্রয় ছাড়াও পারিবারীক নিয়ন্ত্রনহীনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং আকাশ সংস্কৃতির কু-প্রভাবের কারনেই কিশোরদের অপরাধি হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সঙ্গত কারনেই একটি সুস্থ, সুন্দর, আদর্শবান ও উন্নত সমাজ গঠনের বিবেচনায় কিশোর অপরাধের বিষয়টি গভীর মনোযোগের দাবী রাখে। এদের কঠোর হস্তে দমনেরও দাবী রাখে। অন্যথায় এরা আরো ভয়ঙ্কর শক্তিধর সন্ত্রাসীতে রূপান্তর হবে। দুরন্তপনার শিশু বয়স পেরিয়ে যৌবনে পদার্পনের মধ্যবর্তী বয়সকে কিশোর হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। বর্তমানে শিশু বয়সসীমা আইনগতভাবে পরিবর্তিত হলেও তাতে বাস্তবে কোনো কিছুই পরিবর্তন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়না। আমাদের সমাজে কিশোরদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্নতর। ঠিক যেভাবে আদরে-যতেœ শিশুরা বেড়ে উঠার কথা সেভাবে কিশোরদের বেড়ে উঠার সূযোগ-সুবিধা হয়না। এতে করে প্রতিটি কিশোরের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কিছু মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা থেকেই যায়। এই বিশেষ সময়ে পরিবারের পিতা-মাতা, অভিভাবক, গুরুজন এবং সমাজ পরিচালকরা সতর্ক দৃষ্টি না দিলে যে কোন শিশু-কিশোরের বখে যাওয়ার শতভাগ আশঙ্কা থাকে। অভাবী ও বেকার এবং বখে যাওয়া শিশু-কিশোরদের এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপরাধ জগতের সন্ত্রাসীরা নানা লোভ-লালসা দেখিয়ে অতি সহজেই তাদের দিয়ে অনেক বড়-বড় অপরাধ সংঘটন করিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে রোমান্টিকতা ও অপরাধ সংঘটনের কাজ করে থাকে। কিশোররা প্রায় অপরাধ কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে সন্দেহের উর্ধ্বে থাকে বিধায় আইনগত যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা লাভ করে বলে সন্ত্রাসী অপরাধী চক্রগুলো তাদের ফায়দা হাসিল করতে এসব কিশোরদের ব্যবহার করে। এ পর্যন্ত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশীত বিভিন্ন খবর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শুধুমাত্র প্রচলিত অপরাধ জগতের সাথেই নয়, বরং সমাজের উচ্চবিত্ত অনেক পরিবারের অনেক কিশোর সঙ্গ দোষে অথবা এ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে এমন সব অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে যা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। ভয়ঙ্করভাবে মাদকাসক্তি, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ডাকাতি, অপহরণ, খুন, গুমসহ নানা অপরাধে জড়িত হয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে, সর্বনাশা মাদকাসক্তি ও নীতি এবং আদর্শহীন অসৎ সম্পর্ক অধিকাংশ কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবনতা বৃদ্ধি করে চলেছে। বিশেষ করে মোবাইল ফোনের যথেচ্ছা ব্যবহারের কারনে এসব অপরাধ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনের ব্যবহারে বয়স সংক্রান্ত আইন পাস করা হলেও এর কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছেনা। ১০ থেকে ১৭ বছরের প্রায় প্রতিটি কিশোরই অবাধে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর বস্তিগুলো, পাড়া-মহল্লায় এবং প্রায় সব অলি-গলিতে বর্তমানে একশ্রেণীর কিশোর সন্ত্রাসী রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এদের রাজনৈতিক গডফাদার রয়েছে। আগেকার দিনে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক কারনে পোষ্টার লাগানো বা এ ধরনের কাজের জন্য কিশোরদের ব্যবহারের যে নিয়মনীতি ছিল বর্তমানে সেটাই এক ধরনের সুবিধাবাদী রাজনৈতিক পশ্রয়ে ও সন্ত্রাসীদের আশ্রয়ে সাধারণ নাগরিকদের জন্য বড়ধরনের সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে পরিবারের বন্ধনহীনতা, সমাজের উদাসীনতা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় কিশোর অপরাধ এখন জাতীয় সমস্যায় উপনীত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। কিশোর অপরাধী আর প্রাপ্ত বয়স্ক অপরাধী আইনের চোখে একভাবে বিবেচিত না হওয়ায় গুরুতর অপরাধ করেও কিশোর অপরাধীরা লঘুদন্ড পাচ্ছে। এ অবস্থা অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং অপরাধ প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানের লঘু সাজা পাওয়া অপরাধি পরবর্তীতে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হয়ে আত্ম-প্রকাশের সুযোগ লাভ করছে। আমাদের দেশে কিশোর অপরাধ সংশোধনের জন্য সরকারীভাবে যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা মোটেও কার্যকর নয়। এক্ষেত্রে বেসরকারীভাবে অন্য কোনো উদ্ব্যোগ নেয়া যায় কিনা সেটাই ভেবে দেখা একান্ত প্রয়োজন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, কিশোর অপরাধ দমন এবং প্রতিকারে পারিবারিক বন্ধন আর পিতা-মাতার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি জরুরী।- লেখকদ্বয় : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
মুজিব কোট কোনও অন্যায়কারী দুর্নীতিবাজের পরিধান নয়
১২সেপ্টেম্বর,শনিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ফেসবুকে লোপা তালুকদার নামের এক নারীর মুজিব কোট পরিধেয় ছবি নিয়ে বেশ হইচই চলছে। তার ফেসবুক প্রোফাইলে কর্ম আর গুনের বিশাল ফিরিস্তি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সকল স্তরের উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রী নেতাদের সবার সাথে ছবি। যে কেউ দেখলেই ভাববেন লোপা তালুকদার কতটা ক্ষমতাধর। হয়তো তার কর্মগুণ ক্ষমতা সবই আছে। সে আলোচনা সাপেক্ষে বিষয়। তবে এমন করিৎকর্মা নারী আওয়ামী লীগের একটি অংগ সংগঠনের বিশেষ পদ ধারণ করে শিশু অপহরণ কেন করছে তা সত্যি চিন্তনীয়। বর্তমান সময়ে কেবল লোপা তালুকদার নয়, দেশে সংঘটিত দুর্নীতি বা অন্য অপরাধসমুহের হোতাদের খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, অপরাধীরা কোনও না কোনভাবে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত। সরকার হিসাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে দীর্ঘ সময় ধরে। আর এতে করে দলে পরগাছার পরিমান বৃদ্ধি পাওয়া অমূলক কিছু নয়। এ পরগাছাকে 'কাউয়া হাইব্রিড' নানা উপাধি দেয়া হয়। যে নামই দেয়া হোক না কেন এরা ক্রমশ মহীরুহ হয়ে উঠছে। কারণ এদের ছেঁটে ফেলার মত কোনও উদ্যোগ নেয়া হয় না। পাপিয়া, শাহেদ, সাবরিনার ঘটনার রেশ না কাটতেই মুজিব কোট পরিহিত লোপা তালুকদার আবার প্রশ্নবিদ্ধ করছে দলের কর্মকাণ্ডকে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের পরিচালক, সাংবাদিক, কবি সাহিত্যিক সব পদবীর ধারণ করার এ নারীর বিরুদ্ধে হত্যাসহ আরও মামলা আছে বলে গণমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে। আর জিনিয়াকে অপহরন কেন করা হয়েছে তা পুলিশের তদন্তে বের হয়ে আসবে বলে বিশ্বাস। এ মুহূর্তে যে প্রশ্নটি বারবার মানুষের সামনে আসছে তা হলো দলের ভেতরে অবস্থান করে যেসব দূর্নীতিবাজ, অসৎ ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর আর্দশকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে এর প্রতিকার কি? হঠাৎ করে মুজিব কোট পরিধান করে আর্বিভূত এসব মানুষ কি জানে বঙ্গবন্ধুর মুজিব কোট শুধু ফ্যাশন নয়। এ কোট বাংলার ইতিহাসে কতটা জায়গা জুড়ে আছে। বলা হয়ে থাকে মুজিব কোটের ৬ টি বোতাম বাংলার মানুষের ছয় দফার প্রতীক। যে ছয় দফাকে সামনে রেখে বাঙালি স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল। প্রকৃত দেশ প্রেম থাকলে মুজিব কোট পরিধান করে অন্যায় করা যায় না। আর এ কোটের দেশ প্রেমের সাহস, প্রেরনাকে যারা উপেক্ষা করতে পারে তারা এ সমাজের কীট। এরা দেশের ক্ষতি করতে পিছপা হয় না তা অতীতে ও প্রমাণিত হয়েছে। এ দুর্ভাগা জাতি মুজিব কোটের মর্যাদা দিতে পারেনি সেই ১৯৭৫ সাল থেকে। খন্দকার মোশতাকের মুজিব কোট পরিহিত ছবিকে জাতি ভুলে যায় বলে শাহেদ, লোপারা আশ্রয় পায় আওয়ামী লীগে। মিথ্যা বুলি দিয়ে মিথ্যা লেবাসধারীরা আওয়ামী সরকারের অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। দেশের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন। অথচ সে লড়াইয়ের পথকে রুদ্ধ করছে নিজের দলের ভেতর অনুপ্রবেশকারীরা। এ নব্য আওয়ামী প্রেমীদের মুখে এক, মনে আরেক রয়েছে বলে বাড়ছে দুর্নীতি, অন্যায় ও অপরাধ। এরা ব্যক্তি স্বার্থ হাসিল করতে মুজিব কোট পরে মুজিব প্রেমী হয়। নির্মম সত্য হলো মুজিব কোট পরিধান করলেই মুজিব প্রেমী হতে পারে না। নিজের ভেতরে মুজিব আর তার ইতিহাসকে ধারণ করতে হবে। এ কারণেই মুজিব কোটকে অন্যায় আর দুর্নীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। তা না হলে আগামীতে দেশের মানুষ আওয়ামী সরকারের ভালোটুকু ভুলে গিয়ে মন্দটুকুই মনে রাখবে। সময়ের সাথে আজ অনেক কিছু বদলে গেছে, তা বাস্তবতাতে সুস্পষ্ট। তাই দলের ভেতর আওয়ামী লীগের আর্দশ আর বিশ্বাসকে যারা শেষ করে দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না সত্যিকারের দলের ত্যাগী নেতা কর্মীরা। কারণ তাদের যে মুজিব কোটের লেবাসে উচ্চ পর্যায়ের নেতা কিংবা হর্তাকর্তাদের সাথে ছবি বা যোগাযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে যারা আলাদা করে চিন্তা করতে পারে না কিংবা যারা নেত্রীর সাথে ছবি তোলার চেয়ে রাজপথের আন্দোলনকে মূল কাজ মনে করেছে আজ তারা মূল্যহীন। তাই লোপা তালুকদার, শাহেদদের পরনের মুজিব কোট লজ্জিত করে বঙ্গবন্ধুর আর্দশধারণকারী দেশপ্রেমীকে। লেখক: হাসিনা আকতার নিগার,কলামিস্ট।- বিডি-প্রতিদিন

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর