শুক্রবার, মে ২৯, ২০২০
তথ্যমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই
২১মে,বৃহস্পতিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ঝুঁকিতে থাকা সংবাদকর্মীদের জন্য সরকারের বিশেষ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ ঘোষণা দেন। তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সম্প্রতি চাকরিচ্যুতি, ছয় মাস ধরে কর্মহীনতা বা দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া এ তিন কারণে সংকটে পড়া সাংবাদিকদের জন্য দলমত নির্বিশেষে আপদকালীন সহায়তার পরিমাণ হবে এককালীন ১০ হাজার টাকা।সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষকে সংবাদ দেওয়ার জন্য কাজ করছেন। করোনাকালের শুরু থেকে এ পেশাজীবীর মানুষ অবসর নেননি। সবাই যে যার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এর মধ্যে করোনা ধরা পড়েছে কয়েকজন মানুষের। একাধিক সাংবাদিক মারাও গেছেন আক্রান্ত হয়ে।সম্প্রতি করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরীক্ষার জন্যে ব্র্যাকের সহযোগিতায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে নমুনা সংগ্রহের জন্য একটি বুথ চালু করা হয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) উদ্যোগে চালু করা এ বুথে ক্লাব ও ডিইউজে-এর সদস্য, তার স্ত্রী/স্বামী ও সন্তানরা সেবা গ্রহণ করতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রমের সূচনা করেন জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি সাইফুল আলম, ডিইউজে সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক মাঈনুল আলম বিএফইজের নির্বাহী পরিষদ সদস্য শেখ মামুনুর রশীদ ও ডিইউজের সাংগঠনিক সম্পাদক জিহাদুর রহমান জিহাদ। উপস্থিত ছিলেন ডিইউজের প্রচার সম্পাদক আছাদুজ্জামান, জনকল্যাণ সম্পাদক সোহেলী চৌধুরী ও দফতর সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস সোহেল।এদিকে গত ১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রণোদনা চেয়ে আবেদন করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা। ওইদিন বিকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএফইউজে এবং ডিইউজে নেতারা আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে এ বিষয়ে আবেদনপত্র হস্তান্তর করেন। এই আপদকালে সাংবাদিকদের শীর্ষ দুই সংগঠন যে উদ্যোগ নিয়েছে আমরা সেটাকে সাধুবাদ জানাই। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে এর মাধ্যমে অনাকাক্সিক্ষত ঝক্কি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে। এমন উদ্যোগের পাশাপাশি সাংবাদিকদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভালোমন্দ বিষয়েও সংশ্লিষ্টরা খোঁজ রাখবেন বলেই আমরা প্রত্যাশা করি। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক,কলামিষ্ট ,সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম ও চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান,দৈনিক আজকের বিজনেস বাংলাদেশ ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ছড়ানো হচ্ছে গুজব
১৮ মে,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আর হাতে হাতে স্মার্টফোন মানুষকে করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমমুখী। বিশ্বায়ন আর শিল্পায়নের এ যুগে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। আর সাধারন জীবন ছাপিয়ে তাই সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বিচিত্র সব গুজব। কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় বড় ঘটনা যেমন ছড়ায়, ঠিক তেমনি ব্যক্তি পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ে গুজব। না জেনে, না বুঝে যাচাই বাছাই ছাড়াই মানুষ সেগুলো শেয়ার দিচ্ছে, বিশ্বাস করছে। আর এই সুযোগটাই নিতে চায় স্বার্থান্বেষী মহল। আর নেবেই বা না কেন? সোশ্যাল মিডিয়া চালানোর ক্ষেত্রে আমরা কতটা সচেতন? একটি পোস্ট বা তথ্য সামনে এলে সেটি কতটা বিচার বিশ্লেষণ করি। একজন মানুষ কিংবা একটি ঘটনা সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরির আগেই সেটি বিশ্বাস করতে শুরু করি। ঘটনার গভীরে যাওয়া কিংবা বিষয়টির সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের কোনো চেষ্টাই কারো মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। ঘটনা ব্যক্তি পর্যায়ের হোক আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের হোক। আমরা গুজবের হুজুগে হামলে পড়ি। ফলাফল- বিভ্রান্তি আর সামাজিক নৈরাজ্য। ফেসবুকের কথাই ধরা যাক। এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ ফেসবুকের নীল জগতে বুঁদ হয়ে থাকেন। মানুষের আবেগ-অনুভূতি, মতামত, বন্ধুত্ব সবকিছু এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। নানা সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেপথ্যেও এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ শক্তিকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র ছড়িয়ে দিচ্ছে নানা ধরনের গুজব। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফেসবুকে ছড়ানো গুজবে কান দিয়ে বেশ কয়েকটি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। পণ্ডশ্রম কবিতায় কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,/ চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।/ কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে, আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।/ নেইকো খালে, নেইকো বিলে, নেইকো মাঠে গাছে; কান যেখানে ছিল আগে সেখানটাতেই আছে।বৃথাই মাথার ঘাম ফেলেছি, পণ্ড হল শ্রম। অর্থাৎ কান চিলে নিয়েছে এমন খবরে কানে হাত না দিয়েই চিলের পেছনে ছুটেছিল একদল লোক। সম্প্রতি বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেই কান চিল নেয়ার ঘটনার মতো মানুষ কোনো কিছু বিবেচনা না করেই গুজবে কান দিয়েছে, গুজব নিউজ শেয়ার করেছে কখনওবা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সহিংস হয়েছে। গত এক বছরে গুজবের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪০ জন। গুজব ছড়াচ্ছে কেন এমন প্রশ্নে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ফিল্টারিং ছাড়া তথ্য বা মতামত দেয়া হয়, যেটা অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বলা চলে সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক দিকটাও মানবসৃষ্ট। যেহেতু ব্যবহারকারীদের বেশিরভাগই তরুণ, তাই যেকোনো সমস্যায় বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন তরুণেরাই। সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে নেহাত মজার ছলে কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার জের ধরে ভুয়া খবর রটিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত ও অহেতুক হয়রানি করার ঘটনা অহরহ ঘটছে। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে এখন অনেকে মিথ্যা মনে করে এড়িয়ে যান। এখানে এমনকি জীবিত মানুষকে মৃত ঘোষণা করে আবার মৃত মানুষকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার মতো ভুয়া খবরও আমাদের সবার চোখেই পড়ে। একশ্রেণির মানুষ কাউকে ট্রল করতে, অন্যকে নিয়ে সোশ্যাল সাইটগুলোতে বাজে মন্তব্য করতে গিয়ে দু বার ভাবে না। উসকানিমূলক মন্তব্য করে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কোন্দল সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনার নজিরও আছে। আর ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অবলীলায় এই মানুষগুলো তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কাউকে আক্রমণ করার জন্য ফেসবুকসহ অন্যান্য সোশ্যাল সাইট যেন এখন ধারালো অস্ত্রের মতোই কাজ করছে। অন্যদিকে, অনেকেই মাথায় যখন যা ঘুরপাক খায় সেটাই ফেসবুকে পোস্ট করেন, তা যতই ব্যক্তিগত হোক না কেন! আমাদের ফ্রেন্ডলিস্টের সবার সঙ্গেই যে আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো এমন তো নয়। কখনো রাগের মাথায়, কখনোবা খুব ইমোশোনাল হয়ে আমরা ফেসবুকে এমন কোনো কিছু পোস্ট করে ফেলি, যেটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরক্ষণেই ডিলিট করে ফেলি। কিন্তু এটুকু সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যাটা হয়তো অনেকের চায়ের আড্ডার মুখোরোচক বিষয় হয়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে যে, ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে সমস্যা শেয়ার করে সমাধান খুঁজতে গিয়ে সমস্যার সমাধান তো হয়-ই না, বরং নানা উটকো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তা ছাড়া খুব কাছের মানুষ, বন্ধু বা পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে মতের অমিল কিংবা মন কষাকষি হলে সেটাও অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে ফেলেন। দুই পক্ষের এই সমস্যাগুলো অনেক সময় তারা নিজেরা চাইলেই খুব সহজে মিটমাট করতে পারেন। কিন্তু পাবলিকলি শেয়ার করার ফলে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ কখনো কখনো দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করে না দিতে পারলেও, শেষ চেষ্টা করার অবশিষ্ট পথটাও বন্ধ করে দিয়ে যায়। তাই নিজের ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের কিছু বিষয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঠিক কতটুকু, কিভাবে উপস্থাপন করা উচিত তার একটা সীমা নির্ধারণ করে, একটু সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করলে এই সমস্যাগুলো হয়তো অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হবে। ফেসবুকের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এখন জনপ্রিয় এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ছড়ানো হচ্ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ আর বিভিন্ন গুজব। এখন পর্যন্ত দেশে ধর্মকে কেন্দ্র করে যতগুলো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সব কিছুর মূলে এ ফেসবুককেন্দ্রিক গুজব সংবাদ। এই সময়ে গোটা বিশ্ব লড়াই করছে করোনাভাইরাস মহামারির সঙ্গে। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটির সংক্রমণের পর ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। আর করোনা ভাইরাস ছড়ানোর পর থেকে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নিয়ে শুরু হয় নানা ধরণের গুজব। আর এই গুজব ভাইরাসের চেয়ে বেশি দ্রুত ছড়ানোয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রবণতার নাম দিয়েছে ইনফোডেমিক। আর এই জন্য ইন্টারনেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানিকে গুজবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনা ভাইরাস ছড়ানোর পর কখনো শোনা গেছে নিউমোনিয়ার ওষুধ করোনার প্রতিষেধক, আবার কখনো শোনা গেছে রসুন খেলে সারবে করোনা ভাইরাস। তবে এই সব ব্যাপারকে ইনফোডেমিকের অংশ বলেই ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অর্থাৎ এগুলো আসলে গুজব। করোনা প্রতিরোধে এসবের কোন ভূমিকা নেই। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে ভারতে লাইন ধরে গোমূত্র পান শুরু হয়। বাংলাদেশে বেড়ে যায় থানকুনি পাতা আর আদা খাওয়ার প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ ছড়িয়েছেন ধূমপায়ীদের করোনা হয় না। আবার আরেক পক্ষ ছড়িয়েছে অ্যালকোহল করোনা প্রতিরোধ করে। অথচ এতোসব গুজবের কোনটিই সঠিক নয়। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে বা ছেলেধরা বেরিয়েছে এমন গুজব সারা দেশেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায়। একদল লোক প্রকৃত ঘটনা যাচাই-বাছাই না করেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সন্দেহভাজনদের পিটুনি দিয়েছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে গুজবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে একের পর এক গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। ছেলেধরা গুজবে মানুষের গণপিটুনিতে প্রাণ হারান অন্তত ২০ জন। ফেসবুক ব্যবহার করে অভিনব কায়দায় মেডিকেলসহ বিভিন্ন পাবলিক ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন, এসএসসি, এইচএসসি এমনকি জেডিসি বা জেএসসি পরীক্ষারও প্রশ্নফাঁস কিংবা গুজব ছড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। এরকম আরো অনেক রাষ্ট্রীয় বিষয় ফেসবুক আর সোশ্যাল মিডিয়ার কারনে তৈরি করেছে ভ্রান্তি আর ঝামেলার। আর সোশ্যাল মিডিয়ার এমন যথেচ্ছ ব্যবহারের কারনে বেড়েছে সাইবার ক্রাইম ও উটকো ঝামেলাও। ইদানীং ফেসবুকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, আইডি ডিজেবল হয়ে যাওয়া। ফেক আইডি, ফেক নাম, ভুল তথ্যের কারণে তো ডিজেবল হয়ই; কিন্তু এখন যে কেউ গ্রুপিং করে রিপোর্ট করে যে কারও আইডি ডিজেবল করে দিতে পারে। কয়েকজন মিলে যদি কোনো আইডিতে প্রিটেন্ডিং রিপোর্ট করে, ফেসবুক সেটা যাচাই না করেই ডিজেবল করে দেয়; এমনকি সেটি ১০ বছর ধরে চালানো রিয়েল আইডি হলেও। আরেকটি ভয়ংকর সমস্যা হল হ্যাকিং। গ্রুপ, পেজ, আইডি সবই হ্যাক হচ্ছে। ইদানীং অনেকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাক বেশি হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ আইডি হ্যাক করে অনেক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেসবুকীয় বিভিন্ন সমস্যার মূলে আছে সিকিউরিটি সমস্যা এবং পর্যাপ্ত হিউম্যান হেল্প না থাকা। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে ফেসবুকের অফিস নেই। যেখানে আছে, সেখানেও সবার প্রবেশাধিকার নেই; কারণ তারা বলে, এসব সমস্যা তারা অফলাইনে নয়, অনলাইনেই সমাধান করে। অথচ সারা বিশ্বেই বহু মানুষ ফেসবুকের এমন বাজে পদ্ধতির কারণে ভুক্তভোগী। সরকার এসব নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সাইবার ক্রাইম আইনে পরিবর্তন এনেছে। সাইবার ক্রাইম ইউনিট এসব অপরাধীর ব্যাপারে সচেষ্ট আছে। সেখান থেকে বারবার বলা হচ্ছে গুজবে কান না দিতে। চোখের সামনে কোনোকিছু একটা পড়ল আর অমনি নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করে দিলাম এমনটা করা যাবে না। বিভ্রান্তি বা দাঙ্গা সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো পোস্ট নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করার আগে অবশ্যই তথ্যের সত্যতা যাচাই করে নিতে হবে। মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়ালে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে তিন বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সবার উচিত সচেতন থাকা। আমরা সবাই এখন কম বেশ ফেসবুক, টুইটার ও ইন্সটাগ্রাম ব্যবহার করি। এই সোশ্যাল সাইটগুলোতে নিজেদের ছবি দেওয়ার আগে ভালো মতো এডিট করে মোটা লাগলে চিকন করে নিই, ভালোমতো ফর্সা করি। এতে করে নিজের নিজস্বতা আর থাকে না। আমি হয়ে যাই এক অন্য আমি। আর অন্য আমির জন্যই কমেন্ট বক্স প্রশংসায় ভেসে যায়। ইদানীং সেলফি তোলাও একটা মহামারী রোগের আকার ধারণ করেছে। আবার এই অনলাইনেই ট্রল করার ব্যাপারটাও বেশ ভালোভাবেই হচ্ছে এখন। মজার কিছু হোক বা না হোক সবাই সব জায়গায় মজা নিতে পটু হয়ে যাচ্ছে। কেউ তার বোনের সঙ্গে ছবি দিল ফেসবুকে, দেখা যাবে মানুষ কমেন্ট করছে নতুন বান্ধবীর সঙ্গে ভালো লাগছে। আবার উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারো সম্পর্কে ছড়ানো হয় মিথ্যা তথ্য। অনেকেই না বুঝে সেটিকে শেয়ার দেন। মিথ্যা এই পোস্ট বা তথ্য শেয়ারের কারনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটির কতো বড় ক্ষতি হয়ে গেল সেকথা কেউ ভাবেন না। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারীকারীদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে সংবাদ আহরণের প্রধান মাধ্যম ফেসবুক। এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমের খবরের শিরোনামও তারা খুঁজে বেড়ান ফেসবুকে। তাই এদের কাছে ভুয়া খবর, গুজব পরিবেশন করা হলে তা চক্রবৃদ্ধিহারে সামাজিকভাবে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব টের পাওয়া যায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়ায়। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে ভুয়া খবর ও গুজবের প্রতি সরকারের যেমন মনোযোগ দেওয়া দরকার তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও সজাগ থাকা দরকার কিভাবে এই ভুয়া খবর ও গুজবকে ব্যবহার করে জনমতকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং সাম্প্রতিক কিছু বিপর্যয়ে ফেসবুক কেন্দ্রিক ভুয়া খবরের ভাইরাল হওয়া দায়ী। তাই সবারই উচিত ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ব্যবহারে সচেতন হওয়া। অযথা কাউকে আক্রমণ করে পোস্ট না দেয়া, বিনা কারনে কাউকে ট্রল না করা। একটা কিছু সামনে পড়লেই সেটি শেয়ার না দেয়া। সাইবার ক্রাইম বা অপরাধ যেমন তেমন আপনার ভাবা উচিত এমন ট্রলিং কিংবা গুজবের শিকার আপনি নিজেও হতে পারেন। তাই আসুন হুজুগে গুজবে নয়- সচেতন হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সোশ্যাল থাকি। মেহেদী হাসান বাবু, সম্পাদক ও প্রকাশক, আজকের বিজনেস বাংলাদেশ
করোনাকাল! পুলিশের মানবিকতা
০৭মে,বৃহস্পতিবার,মুক্তকলাম,নিউজ একাত্তর ডট কম: পুলিশ! শব্দটি শুনলে অধিকাংশ মানুষ হঠাৎ ভয়ে অতকে উঠেন। কারণ তাদের বিরুদ্ধে মানুষের রয়েছে বিস্তর অভিযোগের ঢালি। যেমন, মানুষ পেটানো, শারিরীক নির্যাতন, মিথ্যা মামলায় হয়রানী, থানা হাজতে আঁটকিয়ে রাখা, অসৌজন্যমূলক আচরণ, যত্রতত্র ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষার্থে পুলিশ বাহিনী 'দুষ্টের দমন ও সৃষ্টের পালনে' যা যা করা প্রয়োজন তাই করতে পারবে এমনটাই রাষ্ট্রের সংবিধানে লিপিবদ্ধ আছে। কাগজে কলমে এটা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন মাত্র। একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাদের ব্যক্তিগত কোন বৈরিতা বা শক্রুতা থাকার প্রশ্নই উঠে না। তারপরও যদি কেহ এধরনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন তাহলে তিনিও আইনে উর্ধ্বে নয়। কারণ আইন সবার জন্য সমান। পুলিশ সদস্যরা কোন বিন্নগ্রহের মানুষ নয়। তারা আপনার আমার সন্তান, ভাই-বোন ও বন্ধু-বান্ধব। পুলিশ সদস্যদের একটি বিপুল অংশ গ্রাম বাংলার খেটে খাওয়া সাধারণ পরিবারের সন্তান। প্রতিটি পুলিশ সদস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের পরিবার, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা বা বৃদ্ধ বাবা-মা। জড়িয়ে আছে তাদের পারিবারিক সম্মান যার সব কিছু মনের আড়াল করে তারা রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখার শপথ নিয়ে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে কাজ করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নৌডুবি, সড়ক দুর্ঘটনা, সন্ত্রাস ও ডাকাত দলের হাত থেকে জানমাল রক্ষা, রাজনৈতিক হিংসা এবং দলাদলির সহিংস পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বত্রই পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। বাংলাদেশে পুলিশের ভূমিকা গৌরবের। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলী ছাড়া পুলিশের মূল অংশ জনসাধারণের পাশে থেকেছে এমন উদাহরণই বেশি। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধেও এ বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। সাম্প্রতি দেশব্যাপী মহামারী করোনার ক্রান্তিকালে সবাই যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রামন থেকে বাঁচার জন্য দিশেহারা। তখন করোনার এ সঙ্কটে বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের ত্যাগ স্বীকার আবারও মানবসমাজে অন্যতম নজির স্থাপন করেছে। সকল নিয়ম প্রথা ভেঙ্গে সরকারী নির্দেশের বাইরেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সর্বক্ষণ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন পুলিশ নামের মানুষগুলো। একজন সন্মুখ সারির অন্যতম যোদ্ধা হিসেবে বাড়িতে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেবার দুরুহ কাজটি করে যাচ্ছেন তারা। আবার কখনো একজন সমাজকর্মীর মতো মানুষের পাশে গিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এ যেন মানুষের জন্য তাদের এক অন্যরকম সহানুভূতি। প্রতিনিয়ত প্রস্ফুটিত হচ্ছে পুলিশের মানবিক গুণাবলি। মানুষ, মানবিকতা ও দেশ এ তিনটি মন্ত্রে যেন তারা এখন দীক্ষিত। পত্রিকার পাতায় পুলিশকে নিয়ে ভালো খবর দেখলে আমাদের মন আন্দোলিত হয়। যখন দেখি লক ডাউনের মধ্যে রাতের আধারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বাড়িতে নিজে কাঁধে করে খাবার পৌঁছানো, জরুরী ওষুধ কিনে এনে কারও হাতে তুলে দেওয়া, রাস্তায় হাজার হাজার ভাসমান, ভবঘুরে ক্ষুর্ধাত মানুষের মুখে রাম্না করা খাবার বিতরণ, আবার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে উদ্দেশ্য বের হওয়া রোগীকে নিজের গাড়িতে করে গন্তব্য নিয়ে যাওয়া, সন্তান সম্ভবা বিপন্ন মাকে কাঁধে করে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিছবি আমাদের ঘুমন্ত হৃদয়কে জাগ্রত করে। তখন বজ্রকন্ঠে বুক চাঁপড়িয়ে বলতে ইচ্ছা করে, দেখ! আমার দেশের পুলিশ বাহিনী, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব ও অহংকার করতে পারি। আমাদের সন্তানরা তাদের পিতা মাতার শিখানো নীতি-আদর্শ এবং মর্মত্ববোধ বির্সজন দেননি। ভুলে যাননি এ মাটির ঋণ। দেশ ও জনগণের জন্য তারা জীবন বাজি রেখে হাঁসতে হাঁসতে মরতে পারে। পুলিশ করোনা সঙ্কটের শুরু থেকে ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে মানুষের সঙ্গে মিশে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মানুষের সংস্পর্শে থাকা পুলিশের কর্মরত সদস্যরা সমাবেশ ও লোকসমাগমে আইনি ব্যবস্থা, খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরী সেবা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা, অপরাধ দমন, মজুদদারি, মুনাফখোর ও কালোবাজারি রোধ, সরকারী ত্রাণ ও টিসিবির পণ্য বিতরণে সহযোগিতা, সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়ন, খোলা স্থানে বাজার স্থানান্তর ও ব্যবস্থাপনাসহ নানা কার্যক্রম চালাচ্ছে পুলিশ। এতে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি কিন্তু এসব উপেক্ষা করেও তারা সর্বক্ষন মানুষকে ভালো রাখতে করে যাচ্ছে। আর এর ফলে দুর্ভাগ্যবশত পুলিশের অনেক সদস্য ইতিমধ্যে নিজের অজান্তেই করোনায় ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এমনকি মৃত্যুবরণও করেছেন। এত কিছুর পরও কিন্তু একমুর্হুতের জন্য থেমে নেই তাদের দায়িত্ব পালন। তাদের সঙ্গে এ যুদ্ধে মাঠে রয়েছেন চিকিৎসক, নার্স, সাংবাদিক, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। প্রতিদিন স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যনুযায়ী দেখা যাচ্ছে দেশে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলছে। এভাবে বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। সরকার এই যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই যুদ্ধের প্রথম সারির সৈনিক পুলিশের আক্রান্ত সীমিত পর্যায়ে না থাকলে আমাদের যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন হবে পড়বে। গণমাধ্যমে তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে এ পর্যন্ত পুলিশের ১২০০ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর নিহতের সংখ্যা ৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাধীন আছেন ৫২৮ জন। আইসিইউতে আছে ৭ জন। তাছাড়া অফিসিয়াল কোয়ারেন্টাইনে আছেন ১৭৪ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যগনই বেশি। এভাবে পুলিশ বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্য যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে দেশে আপনার-আমার বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকবে না। তাই আমাদের সকলের কর্তব্য হবে পুলিশ যেন আমাদের পাশে থেকে তার মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে তার জন্য তাদের সহায়তা করা। তবেই আমরা জয়ী হবো ইনশাআল্লাহ। লেখকঃ মুহাম্মদ মহরম হোসাইন,সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, নিবার্হী সদস্য, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)।
সরকার কঠিন সাত চ্যালেঞ্জের মুখে
২৭এপ্রিল,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম:পৃথিবীজুড়ে অভিশপ্ত করোনার চলমান ধ্বংসলীলায় নেমে আসা সংকটে সরকার কঠিন সাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার সরকারকেই প্রথম এমন চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ উন্নত রাষ্ট্রগুলোও এমন সংকটে পতিত হয়নি। বাংলাদেশকে মহামারী করোনাভাইরাস এই নতুন সংকটে মানুষ ও অর্থনীতি বাঁচানোর কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। এটা সরকারেরই নয়, যেন রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ সাতটি হচ্ছে- ১. করোনাভাইরাসে দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে আক্রান্ত ও প্রাণহানি নিয়ন্ত্রণে রাখা। ২. লকডাউনে পতিত দেশের কর্মহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য বা ত্রাণসামগ্রী বিতরণে সফলতা অর্জন এবং রিলিফ দুর্নীতি অনিয়ম কঠোর হাতে দমন। ৩. রমজানসহ করোনাকালে বাজারে কৃষিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যাপক সরবরাহ নিশ্চিত করে মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা। ৪. বোরো ফসল বা ধান প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসার আগেই দ্রুত কেটে কৃষকের ঘরে তুলে দেওয়া এবং ধানের প্রকৃত মূল্য প্রান্তিক চাষিদের দেওয়া নিশ্চিত করা। ৫. লকডাউনের কারণে মুখ থুবড়ে পড়া সরকারের সকল মেগা প্রকল্পসহ উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন এবং দেশের শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন চালু করে আসন্ন বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কবল থেকে দেশের আর্থিক খাত ও কর্মসংস্থান রক্ষা। ৬. বিদেশের শ্রমবাজারকে আরও প্রসারিত করে রেমিট্যান্স প্রাপ্তি ধরে রাখা। ৭. করোনা-উত্তর দুর্ভিক্ষ রুখে দেওয়া। এই কঠিন সাত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে দরজায় করা নাড়া ডেঙ্গু ও আসন্ন বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে করুণ বিপর্যয়ে থাকা শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করার চ্যালেঞ্জ করোনা নতুন করে নিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে দেশজুড়ে চলমান দুর্নীতি ব্যাংক লুট বিদেশে অর্থ পাচারের মতো অনিয়মকে কঠোর হাতে দমনের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ তো আছেই। করোনার ভয়াবহতায় বিশ্বজুড়েই আগামীতে কঠিন অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনি দেখছেন রাষ্ট্রনায়ক অর্থনীতিবিদরা। বিশ্ব অর্থনীতি এখন ভয়াবহ মন্দার মুখে। এখানে উৎপাদন আর সচল পরিবহন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ কোটি মানুষ বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে। আমেরিকাতে ইতিমধ্যেই ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। বিশ্বের ধনকুবেররা দেখছেন কঠিন সময়। দেশে দেশে লকডাউন সামাজিক দূরত্ব বা ঘরবন্দী জীবনের কোয়ারেন্টাইনের সঙ্গে নেমে এসেছে সকল উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নিস্তব্ধতা। ধনাঢ্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য যেখানে পরিস্থিতি উত্তরণ চ্যালেঞ্জের সেখানে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও ২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কবলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ অর্থনৈতিক দুঃসময় দেখেছে সেখানে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা দেশের অর্থনীতিকে সেই থাবা থেকে রক্ষা করেছেন। প্রণোদনাসহ নানা পদক্ষেপের পাশে দেশের কৃষি ও রেমিট্যান্স শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল। সেই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল সরকার। করোনাভাইরাসে দেশ আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এবার শেখ হাসিনা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছেন। দেশে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী থেকে কৃষি খাতও এ ভর্তুকির আওতায়। স্বল্প সুদে এ ঋণদান হলেও অনেকে বলছেন ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক সুদ মওকুফ করতে। রেমিট্যান্স জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। যা ছিল গত এক দশকের রেকর্ড সাফল্য। কিন্তু করোনায় এখন সেটাতে মহাধস। এপ্রিলের প্রথম ২২ দিনে ৬৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশি টাকায় প্রবাসী আয়ের এ পরিমাণ ৫ হাজার ৬৪০ কোটি টাকার মতো। এ অংক আগের মাসগুলোর তুলনায় প্রায় অর্ধেক কম; মার্চের ২২ দিনে ১১০ কোটি ডলারের মতো রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে মধ্যপাচ্য থেকে। জ্বালানি তেলের দাম একদম কমে আসায় তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোতেও দেখা দিয়েছে বড় সংকট। এসব দেশ স্বাভাবিক হতে ২ থেকে ৩ বছর লেগে যেতে পারে। তবে মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করছেন তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, পরিস্থিতি কারও হাতে নেই। এখন যা হবে তা মেনে নিতে হবে। বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো। দেশে অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্সই শুধু আশার আলো জাগিয়ে রেখেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, মার্চে ১২৮ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের মার্চের চেয়ে ১৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম। আর আগের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১২ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। ১ বছর ৩ মাসের মধ্যে মার্চের রেমিট্যান্স সবচেয়ে কম ছিল। এর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ১২০ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারী রূপ নেওয়ার পর মার্চেই অনেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন। এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফিরে আসেন ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫৩০ জন। এ ছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে সাময়িক বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও বিদেশ ঘুরে দাঁড়ানোরকালে আমাদের শ্রমবাজারের দুয়ার খুলবে। শেখ হাসিনা পাঁচ কোটি মানুষকে খাদ্যসহায়তা দিয়েছেন। শিল্পপতি থেকে রাজনৈতিক মন্ত্রী, এমপি, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ মানুষও মানবিক টানে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সরকারি ত্রাণে ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের একটি ক্ষুদ্র অংশ লুটপাট করলেও সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। শাস্তির খড়গ নেমেছে। ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ে প্রতি জেলায় মন্ত্রীদের সমন্বয়ের দায়িত্ব না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দলকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে সচিবদের জেলায় জেলায় সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। বলেছেন, দল বিবেচনা নয়, গরিব-কর্মহীন মানুষকে অগ্রাধিকার দিতে। জেলা প্রশাসন তালিকা করে দিচ্ছে। এতে অনিয়ম হলে দায় তাদেরই বহন করতে হবে। নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদসহ আন্তর্জাতিক গবেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক মন্দা ও কর্মসংস্থানের বিপর্যয়ের সত্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। লকডাউন অর্থনীতি ও মানুষের কাজের বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ। অন্যদিকে করোনার সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব ও সঙ্গরোধ বা কোয়ারেন্টাইনের বিকল্প নেই। কিন্তু যেখানে ধনাঢ্য দেশগুলোরও দীর্ঘসময় বসিয়ে খাবার দেওয়া সম্ভব নয় সেখানে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য কঠিন। পশ্চিমা শক্তির বৈরিতার মুখে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর কিউবা করোনা রুখে এখন সবাইকে সাহায্য দিচ্ছে, করোনাক্রান্ত ভারতের কেরালা প্রতিরোধ করেছে, নেপাল প্রস্তুতি আগাম নিয়ে সফল হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিরোধ করে সফলতায় নির্বাচন করে সরকারি দল ফের বিজয়ী হয়েছে। আমরা সময় পেয়েও ব্যর্থ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কারণে পারিনি। একটি মন্ত্রণালয়ের দেউলিয়াত্বের মাশুল দিচ্ছে সরকার মানুষ ও অর্থনীতি। পশ্চিমা দুনিয়ায় লকডাউন তুলে নেওয়ার দাবি, উদ্যোগও নিতে হচ্ছে দেশগুলোর সরকারকে। দেশে দেশে একই অবস্থা। সেখানে বাংলাদেশেও লকডাউন শিথিল করে করোনা মোকাবিলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্প-কলকারখানা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করার অনিবার্যতা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন শুরুর চাপ বাড়ছে। এমনিতেই জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া আমদানি-রপ্তানি বন্ধ। এয়ারলাইনস বাণিজ্যের বিপর্যয় কাটাতেই ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত শুরু না হলে অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করা কঠিন। শিল্প-কারখানা ধীরে ধীরে চালু না হলে অর্থনীতি অচল হয়ে যাবে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ২০ শতাংশ আয় ও ক্রয়ক্ষমতা হারালেই করোনায় ২ কোটি মানুষ নতুন করে গরিব হবে। এ অবস্থায় যেমন কলকারখানার উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করে আমাদের অভ্যন্তরীণ কৃষি ও শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে। মানুষের চাহিদা বাড়াতে হবে। টাকার সরবরাহও বাড়াতে হবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিত চক্রবর্তীও বলেছেন টাকা ছেপে বাজারে ছাড়তে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিপর্যয়ে আমদানিনির্ভর দেশের অবস্থা বেশি খারাপ হবে। যেমন আমরা আমদানিনির্ভর দেশ। তবে আমাদের ইতিবাচক দিক হচ্ছে খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটা সচল রাখার সঙ্গে আমাদের স্থানীয় চাহিদা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ মানুষকে কাজ দিতে হবে। তাহলে মোটা দাগের ক্ষতি হবে না। যেমন ২০০৯ এ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল ইউরোপ। আর এবার আমেরিকার। সেবারও আমরা অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখতে পেরেছিলাম অভ্যন্তরীণ উৎপাদন আর চাহিদা সচল রেখে। চ্যালেঞ্জর এ যুদ্ধে জয়ী হলে এবারও রাখা সম্ভব। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, এবার আমাদের দরিদ্র মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে কিছু মানুষ দরিদ্র হচ্ছে। তাদের জন্য সরকারের নেওয়া খাদ্য কর্মসূচি সফল করতে হবে। আর দেশের উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে হবে। অন্যথায় আমরা ভয়াবহ সংকটের দিকেই এগিয়ে যাব। রবিবার থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ ১৮ মন্ত্রণালয় খুলেছে। গার্মেন্ট খুলেছে স্বল্প পরিসরে। লকডাউন শিথিলে ধীরে ধীরে শিল্প-কারখানাও খুলবে। করোনার ভয়াবহতায় বাংলাদেশে সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত। দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ কর্তারা সমালোচিত। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের সমন্বয়ে পরিকল্পিত প্রতিরোধ গড়তে না পারা, চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষায় মানসম্পন্ন পিপিই ও এন-৯৫ মাস্ক দিতে না পারার দেউলিয়াত্ব তো ছিলই। নকল এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহে জালিয়াতির অভিযোগ বহাল। করোনাকালেও ২২ কোটি টাকার অনিয়মের গরমিল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মানুষ চিকিৎসাসেবায় যেমন অবহেলার শিকার তেমনি পরিকল্পনা না থাকায় চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মী কেউ মারা গেলেও, অনেকে করোনাক্রান্ত হলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠরা লড়ছেন। অন্য দেশের তুলনায় এখানে আক্রান্ত ও মৃতের হার এখনো কম থাকায় মন্ত্রণালয় তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেও অনেকে বলছেন পর্যাপ্ত পরীক্ষা না বাড়ানোর কারণে আক্রান্তের সঠিক তথ্য আসছে না। তেমনি অনেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে থেকে মোকাবিলা করছেন। সামনে কী হয় এ নিয়ে ভয় সবখানে। অন্যদিকে গার্মেন্ট খুলে দেওয়া, মানুষের স্রোতের মতো ছুটিতে বাড়ি ফেরা ও হাটবাজারসহ সবখানে অসচেতনতায় আড্ডাবাজি, ধর্মান্ধতায় সামাজিক দূরত্বের নিষেধাজ্ঞা চরম লঙ্ঘন করে করোনাভাইরাস ছড়াতে জনগণের একাংশের দায়ও কম নয়। তবে এখন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরীক্ষা ল্যাব আইসিইউ বেড ভেন্টিলেশন বাড়িয়ে করোনা থেকে মানুষের জীবন রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য এখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পর সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার অভিযোগ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে। এই মন্ত্রী বরাবর সমালোচিত। আগোগোড়া বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ। এখন করোনাকালে চরমে। মুনাফাখোরদের চরিত্রও বদলায়নি। তার মাঝে নকল মাস্কের সঙ্গে ভেজাল খাদ্যপণ্যও ধরা পড়ছে। বাজারে সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মুখ থুবড়ে পড়ছে। এবার বাম্পার ধানের ফলনে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করবে। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক সবখানে ছুটছেন। কর্মহীন মানুষ ত্রাণের গাড়িতে হামলে পড়লেও ধান কাটতে আগ্রহী নয়। করোনার ভয়ে। মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মীরা উদ্দীপনা ছড়াতে নামছেন। ধান কাটার প্রকৃত শ্রমিক বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঠানো হচ্ছে। ৪৪ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আগামী কদিনে ধান সব তুলতে না পারলে প্রাকৃতিক আঘাতে অতিবৃষ্টির বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধান কাটা হলে প্রান্তিক কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিলে দেশ খাদ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। সবজি চাষিরা বাজারে সরবরাহ করতে না পারায় বাজারে যেমন দাম চড়া, তেমনি তারা ন্যায্যমূল্যের অভাবে খেতের গর্তে ফেলে দেওয়ারও খবর আসছে। এটার প্রতিকার অনিবার্য। বিশ্বজুড়ে আশঙ্কা, অনেক দেশ করোনার বিপর্যয়ের পর দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হবে। বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ রুখতে সরকারকে সর্বাত্মক প্রস্তুতির সঙ্গে মানুষকেও কৃচ্ছ্রতাসাধন ও সামর্থ্যবানদের মানুষের পাশে মানবিক কারণে সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখতে হবে। সরকার বলছে কেউ না খেয়ে মরবে না, বিনা চিকিৎসায়ও তার আগে মরতে দেওয়া যাবে না। করোনা নিয়ন্ত্রণ করেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের দুয়ার খুলতে হবে, নইলে বিপর্যয়ে চেহারা ভয়াবহ রূপ নেবে। করোনার হাত ধরেই হানা দেবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। অতীতের অভিজ্ঞতা ব্যর্থতার। বেদনার। তার চ্যালেঞ্জ এখনই নিতে হবে। নিতে হবে আসন্ন বন্যার। আর দীর্ঘদিনের কবরে শায়িত শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করার চ্যালেঞ্জ তো আছেই। আর প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার সঠিক স্বচ্ছ বিতরণ, সেই সঙ্গে দেশের ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, বিদেশে অর্থ পাচার কঠোর হাতে দমন করে সুশাসন নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ সময়ের দাবি। লেখক : পীর হাবিবুর রহমান,নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
অবিলম্বে ইতিহাসের নায়ক যত্রীন্দ্র সেন গুপ্তের পরিবারের মুল্যায়ন করার দাবী জানাচ্ছি
২২এপ্রিল,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: বীর মুক্তিযোদ্ধার গায়ে পোশাক থাকে না। অথচ রাজাকারদের গাড়িতে পতাকা উড়ে,তাদের সন্তানরাও এমপি-মন্ত্রী হয়।।। পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির নাম মিলন সেনগুপ্ত। পরার মতো একটি মাত্র জামা আছে তাঁর। সেইদিন ধুয়ে দিয়েছিলেন। তাই খালি গায়ে রয়েছেন তিনি। শুকানোর আগ পর্যন্ত এভাবেই থাকতে হবে তাঁকে। মিলন সেনগুপ্ত সাধারণ কোনো পরিবারের মানুষ নন, চট্টগ্রামের কীর্তিমান পুরুষ, উপমহাদেশের বিখ্যাত বাঙালি আইনজীবী, রাজনীতিক ও সমাজকর্মী যাত্রামোহন সেনগুপ্ত এর একমাত্র বংশধর। টলমটল চোখে তাকিয়ে থাকা মিলন সেনগুপ্ত মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন জীবনের মুল্যবান সময় নষ্ট করে যুদ্ধ করে কিন্তু স্বীকৃতি পাননি।শেষ দিনগুলো তাঁর কেমন যাচ্ছে সহজে অনুমান করা যায়।যা বললে খুব বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক লাগবে। তবুও জীবনের মত জীবন সংগ্রাম চলছে।তার এক একটা দিন খুবই মর্মাহত। চলমান করোনা দুর্যোগের কারণে চট্রগ্রামের চন্দনাইশ থানার ওসি তাঁর বাড়িতে গিয়ে এই অবস্থার কথা জানান। তিনি এই মহান মুক্তিযোদ্ধাকে কিছু উপহার সামগ্রীও প্রধান করেন।যা অত্যন্ত আনন্দদায়ক সেজন্য স্যালুট পুলিশ। কিন্তু এই এলাকার এমপি,উপজেলা চেয়ারম্যান,মেয়র,চেয়ারম্যান ও মেম্বারগুলো কি সব মরে গেছে? ইতিহাসের অংশ তাঁর পূর্বপুরুষ যাত্রামোহন সেন (জেএম সেন) যিনি প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম শহরে টাউন হল (জেএম সেন হল) ডাঃ খাস্তগীর মাধ্যমিক বালিকা স্কুলসহ অনেক শিক্ষা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, মন্দির এমনকি নূর মহম্মদ তরফ নামে মসজিদের ভূমিও দান করেছিলেন। জেএম সেনের পুত্র দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ছিলেন আরেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। যিনি প্রথম সারির কংগ্রেস নেতা ও ব্যারিস্টার। যিনি উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সশস্ত্র বিপ্লবীদের সাথে লড়াই করেছেন।জেল খেটে মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের স্ত্রী ভিনদেশী নেলি গ্রে (নেলি সেনগুপ্ত) ছিলেন আরেক বিখ্যাত মানুষ রাজনীতিক ও সমাজকর্মী। তিনিও হেঁটেছিলেন স্বামীর পথ ধরে।ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী হয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মানবিক বরমার সেন পরিবারের মানুষ উপমহাদেশের রাজনৈকিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং শিক্ষাবিস্তারে যে অবদান রেখে গেছেন তা ইতিহাসের অংশ। আজীবন মানুষ তাদেরকে স্মরণ করে রাখবে। সেই ইতিহাসের কথা ভুলার নয়।বই পুস্তকে লিপিবদ্ধ আছেন।যা আমাদের জন্য শিক্ষনীয়। ইতিহাস হচ্ছে বড়ই নিষ্ঠুর আর খামখেয়ালি।তাদের অনেক সম্পদ রয়েছে কিন্তু শুনেছি তাদের অবশিষ্ঠ সব সম্পদ বেদখল হয়ে গেছে।এলাকার প্রভাবশালী লোকেরা তা দখল করে আছে যা আমাদের জন্য লজ্জার।এই লজ্জা রাষ্ট্র,সমাজ, সভ্যতার,আমাদের সবার।যা আমাদের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে যায়।আমরা যত্রীন্দ্র সেন গুপ্তের পরিবারের জন্য কিছুই করতে পারিনি। সবকিছু চিন্তাভাবনা করলে দেখতে পাব আসলে সত্যে একদিন বেরিয়ে এসেছে। এ সত্যের জন্য আমাদের রাজনীতি করি আর সমাজের অসংগতি গুলো তুলে ধরে যত্রীন্দ্র সেন গুপ্তের পরিবারের জন্য কিছুই করার জন্য সরকারের প্রতি দষ্টি আকর্ষণ করছি। অবশ্য তার পরিবারের সব সুযোগ সুবিধা ও জায়গা সম্পত্তি উদ্ধার করে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। তাহলে যত্রীন্দ্র সেন গুপ্তের আক্ত্বা শান্তি পাবে।লেখক -তসলিম উদ্দিন রানা, সাবেক ছাত্রনেতা
মানুষের ঐক্যই পারে শ্রেণী-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে
১৩এপ্রিল,সোমবার,আহাম্মদ হোসেন ভুইয়া,নিউজ একাত্তর ডট কম:১৭০৩ সালে জন্ম নেন একজন ভারতীয় চিন্তাবিদ, দার্শনিক, সুফী সাধক যিনি তৎকালীন সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভীত নতুন করে গেড়েছিলেন। ধনী-গরীব বৈষম্য ঘুচাতে, ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে মজলুম মানুষকে মুক্তি দিতে শুধু দান-খয়রাত যথেষ্ট নয়, নেতৃত্ব বদল করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। সকল কালে, যে কোন জাতিকে সার্বিকভাবে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে যে সমাজব্যবস্থা তার বর্ণনা তিনি রেখেছেন তাঁর অমর গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা-তে। সেই সাথে তিনি রেখে গেছেন একটি মতবাদ যা বিভিন্ন সময়ে দেশে দেশে উচ্চারিত হয়েছে, আরবি উচ্চারণে বলা হয়- ফুক্কা কুল্লে নেজামিন। বাংলা করলে যার মানে দাঁড়ায়, বিদ্যমান সকল ব্যবস্থা (যা জুলুম ও শোষণের সহায়ক) নির্মূল করে দাও। ১৭৪৮ সালে দেয়া এই মতবাদের প্রবক্তা হলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রঃ)। ১৭৬২ সালে তাঁর ইন্তেকালে এ মতবাদ কিন্তু ঘুচে যায়নি। তাঁর যোগ্য তিন ছেলে পিতার ঝান্ডা উঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন শাহ ওয়ালিউল্লাহর (রঃ) বড় ছেলে মহাজ্ঞানী শাহ আবদুল আজিজ (রঃ)। তৎকালীন সময়ে মূলত তাঁরা যুদ্ধ চালিয়ে যান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। একে একে নেতৃত্বে আসেন সৈয়দ আহমদ বেরলভি (রঃ), সৈয়দ নিসার আলি তিতুমির (রঃ), শায়খুল মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (রঃ) প্রমুখ। ঠিক ১০০ বছর পর ১৮৪৮ সালে পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন আঙ্গিকে একটি স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে। এক্ষেত্রে বইয়ের নাম দ্য ক্যাপিটাল, লেখক জার্মান কার্ল মার্ক্স আর স্লোগানটি হল- দুনিয়ার মজদুর/ এক হও, এক হও। এই আন্দোলনের ঝান্ডার বাহক হলেন ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্টালিন, মাও-সে-তুং, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা গ্রন্থে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রঃ) লিখেছেন, যদি কোন মানব গোষ্ঠীর মধ্যে সভ্যতার বিকাশ ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে তাদের শিল্পকলা পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে। তারপরে শাসকগোষ্ঠী যদি ভোগ বিলাস, আরাম-আয়েসে ঐশ্বর্যের মোহে আচ্ছন্ন জীবনকেই বেছে নেয়, তাহলে সেই আয়েসী জীবনের বোঝা মজদুর শ্রেণির উপরই চাপে; ফলে সমাজে অধিকাংশ লোক মানবতা শূণ্য পশুর জীবন যাপনে বাধ্য হয়। গোটা সমাজ-জীবনের নৈতিক কাঠামো তখনই বিপর্যস্ত হয় যখন তাকে বাধ্য বাধকতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে জীবনযাপনে বাধ্য করা হয়। তখন সাধারণ মানুষকে রুটি রুজির জন্য ঠিক পশুর মতোই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। মানবতার এবং অর্থনৈতিক দুর্যোগের চরম মুহূর্তের এ অভিশাপ থেকে মুক্তি দিবার জন্য স্রষ্টা নিজেই বিপ্লবের আয়োজন করেন। রোমান এবং পারসিক শাসকগোষ্ঠীও যে জুলুমবাজির পথে এগিয়ে গিয়েছিল, তাদের ঐশ্বর্য এবং বিলাসের যোগান দিতে জনসাধারণকে পশুরস্তরে নেমে আসতে হয়েছিল। এ জুলুমশাহির প্রতিকারের জন্যই আরবের জনগণের মধ্যে হজরত রসুলে করিম (সাঃ) কে অবতীর্ণ করা হয়েছিল।অর্থাৎ এক শ্রেণির বিলাসী জীবনের ভার যদি মজদুর শ্রেণির কাঁধে নেমে আসে তবে সে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া রাসুলের (সাঃ) সুন্নত। কমিউনিজমের প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উক্তি হল-এতোদিন দার্শনিকেরা কেবল বিশ্বকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাই করে গেছেন, কিন্তু আসল কাজ হল তা পরিবর্তন করা। তাঁর বই, যা এখন বিশ্বের অর্থনীতির ও সমাজবিজ্ঞানের প্রতিটি ছাত্রের জন্য অবশ্য পাঠ্য, সেখানে তিনি শাণিত যুক্তিতে, বাস্তবতার নিরিখে, অতীত-বর্তমানের ইতিহাস-পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রমাণ করেছেন যে মানব সমাজের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস, অর্থ হলো পুঁজিপতিদের হাতে শ্রমিক শোষণের হাতিয়ার। সকল পেশার শ্রমজীবী মানুষ একাট্টা হয়েই শুধু পারে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যেখানে শ্রেণীবিভেদ থাকবে না, অসাম্য থাকবে না, এককথায়-সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। তবে তার আগে করণীয় হল, বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ১০০ বছরের ব্যবধানে দুটি মহান মতবাদ প্রচারিত হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায়, সম্পূর্ণ আলাদা প্রেক্ষাপটে। তবে, উভয়ের সারাংশ একটি লাইনে আনলে মর্মার্থ দাঁড়ায়-যে সকল ব্যবস্থা শোষণ ও জুলুমের সহায়ক, দুনিয়ার মজদুর মানুষের ঐক্যই পারে তা নির্মূল করে শ্রেণী-বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। তবে হ্যা, শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রঃ) এবং কার্ল মার্ক্সের মতবাদের এক জায়গায় বিশাল পার্থক্য- ধর্ম। তাঁরা যার যার সময়ে, নিজ নিজ দেশে, আপন ভঙ্গিমায়, নিজস্ব ভাষায় নিজের মতবাদটি ব্যাখ্যা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। প্রশ্ন হল, এখন যার অন্তরে খোদাভীতি ও নবীপ্রেম আছে কিন্তু বিবেক-বুদ্ধিতে মার্ক্সিস্ট, তার উপায় কি? আদর্শিক ব্যাখ্যায়, এমনকি নিয়তে দুই মতবাদ একে অপরের সাথে মিশে যায়, কিন্তু বর্তমান যুগে, আমার দেশে যদি আমি মতবাদদ্বয়কে ধারণ করতে চাই, তাহলে প্রশ্নের বাণে আমি জর্জরিত। এখন আমার কান্ডারি কে হবে? এখানেই আসে মওলানা ভাসানী এবং তাঁর রবুবিয়াত, হুকুমতে রব্বানিয়া এবং ইসলামী সমাজতন্ত্রের কথা। সমাজতন্ত্রের কথা উঠতেই আলেমওলামারা তওবা কেটেছেন, কমিউনিস্টদের সাথে ওঠা বসা? কিছুতেই না! একবারও ঘেটে দেখেননি এই ইসলামী সমাজতন্ত্র আঠারো শতকের ফুক্কা কুল্লে নেজামিন-এর বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটের ব্যাখ্যা। আবার সে সময়ের অনেক কমিউনিস্ট মওলানা ভাসানীকে এক অর্থে এড়িয়ে গেছেন কার্ল মার্ক্সের সমাজতন্ত্রের সাথে ইসলামী শব্দটি যোগ করার জন্য। একটি বারের জন্য বুঝতে চাননি, যে মানুষের জন্য, যে সমাজের জন্য তাঁরা লড়াই করছেন, সেই মানুষটি ধর্মপ্রাণ, সেই সমাজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এ দেশের মজদুর জার্মান একজন নেতার আদর্শে, হোক তিনি মহাজ্ঞানী, হুট করে ধর্মবিহীন কোন সমাজে আস্থা রাখবে না। তার চেয়ে বড় কথা, যে কোন সমাজ ব্যবস্থা হোক, মতবাদ হোক আর আদর্শই হোক- সে তো মানুষের মুক্তির জন্য। যদি পূর্ব প্রচলিত কোন আদর্শকে যুগের প্রয়োজনে নতুন ব্যাখ্যায় নতুন নিয়মে সামনে আনা হয় তবে কি সেটা ভুল হয়ে যায়? ইসলামী সমাজতন্ত্রের বিপক্ষের আলেম-ওলামা এবং কমিউনিস্টরা সে সময় আচরণ করেছেন সেসব নাগরিকদের মত যারা সক্রেটিসকে বিষ পান করিয়েছিলেন। অহং বাদ দিয়ে তারা জানতে চায়নি এ মতবাদের মাহাত্ম্য ও মর্মার্থ কী। ভাসানী যখন ইউরোপে গ্রন্থে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেছেন, ইউরোপের যুক্তি নির্ভর এবং বাস্তববাদী অধিবাসীরা মওলানা ভাসানীকে কোন ছাঁচে ফেলতে পারেননি। যিনি একই সাথে ফুক্কা কুল্লে নেজামিন এবং দুনিয়ার মজদুর, এক হও- এর ধারক-বাহক, তাঁকে প্রচলিত ধারণায় খাপ না খাওয়াতে পারাই স্বাভাবিক। তিনি একই সাথে বাংলার মজলুমের জন্য সুফী, তিনি একই সাথে বাংলার কমিউনিস্টদের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী, তিনি একই সাথে জাতীয়তাবাদীদের পথপ্রদর্শক। তাঁর সময়ে, তাঁর ভাষায় তিনি স্লোগান দিয়েছেন- লড়াই লড়াই লড়াই চাই/লড়াই করে বাঁচতে চাই; হুকুমতে রব্বানিয়ার ভিত্তিতে কৃষক-শ্রমিক-মজুর রাজ কায়েম কর; গড়িতে হইলে আগে ভাঙ্গিতে হয়, মানুষের মুক্তি আপোষ রফায় আসে না; দুনিয়ার মজদুর/এক হও। তাই তো মওলানা ভাসানী আফ্রো-এশিয়া-ল্যাটিন আমেরিকার সকল দেশের মজলুম মানুষের নেতা। মুশকিল শুধু এটাই যে, অনুসন্ধানীরা কার্ল মার্ক্সের কমিউনিজমের সাথে মওলানার কতটুকু সাদৃশ্য তা খুঁজতে চায় কিংবা একজন মওলানা কিভাবে আন্দোলন করেন সেটা দেখতে চায়- কমিউনিজমের ১০০ বছর আগের ফুক্কা কুল্লে নেজামিন-কে কেউ খুঁজতে যান না। তাই মওলানা ভাসানীকেও বারে বারে হারিয়ে ফেলেন। রেড মওলানার একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি- কমিউনিস্টরা ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ কামনা করেন বটে, কিন্তু তাহাদের মতে উহা আল্লাহর নামে না হইয়া রাষ্ট্রের নামে হইতে হইবে। আলেম-ওলামারা সকল কিছুতে আল্লাহর মালিকানা মানিয়া লইয়া থাকেন বটে, কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ কামনা করেন না। এইভাবে হুকুমতে রব্বানিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী দুইটা মতবাদ রহিয়াছে, ইহা আমার অনুসারীদের বুঝিয়া লইতে হইবে।লেখক: আহাম্মদ হোসেন ভুইয়া,নির্বাহী সম্পাদক,নিউজ একাত্তর ডট কম
সময় এসেছে জেগে উঠার!
১৩এপ্রিল,সোমবার,নিউজএকাত্তরডটকম:এমনটিতো হবার কথা ছিল না, পন্যের অতিরিক্ত মূল্যের দাবীর প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হলাম। তবে এব্যপারে মনে বিন্দুমাত্র কষ্ট পাইনি। কারণ,অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে বেঁচে থাকা মানেই মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা।ছাত্রজীবন থেকেই মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম জীবন চলার পথে ,যতই নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হয়, কিন্তু অন্যায় ও জুলুম দেখলে প্রতিবাদ করবোই। এর মানে কারো থেকে বাহ্বা পেতে এবং প্রতিপক্ষ কাউকে হেয় করার জন্য নয়। ইদানিং মনের ভিতর বার বার কয়েকটি প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারছে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় অন্যায়কারী ও লুটেরাই কি মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকবে? আর অন্যদিকে দুর্বলরা বার বার মার খেয়ে যাবে? এজন্যই কি বাংলার অগণিত আবাল, বৃদ্ধা, যুবকদের এক সাগর রক্ত ও লাখ লাখ মা-বোনেদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতার লাল সূর্য রচিত হয়েছিলো? জুলুমবাজ ও লুটেরাদের শক্তি বেশি না ইমানদারদের? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মাঝেও মন বলে সময় এসেছে জেগে উঠার। আর শিশুকালে পড়া বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত, 'আমি হবো' কবিতার লাইন দুটি বেশি বেশি মনে পড়ে, আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে, তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে আসুন স্বদেশ ও স্বদেশের প্রতিটি অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করি, যার যার অবস্হান থেকে তাদের পাশে দাঁড়াই। নইতো শহীদদের আত্মা আমাদের প্রতিনিয়ত অভিশাপ দিবে। আর আমরা হবো নিকৃষ্টদের দলে অন্তর্ভূক্ত। লেখকঃ মুহাম্মদ মহরম হোসাইন নির্বাহী সদস্য চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নে
ভয়াবহ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিল
২৩জানুয়ারী,বৃহস্পতিবার,মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,নিউজ একাত্তর ডট কম: ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে কালবিলম্ব না করে রাতে তিনি পাকিস্তানের পিআইএর একটি বিমানে লন্ডন যাত্রা করে ৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁঁছেন। অনেক আনুষ্ঠানিকতা শেষে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রাজকীয় কমেট বিমানে ৯ জানুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু দেশের উদ্দেশে রওনা হলেন। পথে তেল নেওয়ার জন্য সাইপ্রাসে যাত্রাবিরতি ঘটেছিল বিমানের। ১০ জানুয়ারি সকালে বঙ্গবন্ধু দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিতে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য কথাবার্তার পর ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানেই যাত্রা করেছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। ব্রিটিশ কমেট বিমানটি তেজগাঁও বিমানবন্দর স্পর্শ করে বিকেল ৩টায়। সেখান থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বাঙালির ভালোবাসা আর স্নেহের পরশ ভেদ করে পৌঁছাতে তাঁর সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা। রেসকোর্সে লাখো জনতার মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছেন সন্ধ্যা পৌনে ৬টায়। এত দীর্ঘ পথযাত্রা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা, জনসভা, আবেগ-উচ্ছ্বাস-কান্না বিনিময়ের পর ১১ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু সব ক্লান্তি-ভাবাবেগ উপেক্ষা করে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দেশ পরিচালনা শুরু করেন। সেদিনই মন্ত্রিসভার সঙ্গে দুদফা বৈঠক করেন এবং বৈঠকে সংবিধান প্রণয়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু অস্থায়ী সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকে বস্তুত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাসহ সারা দেশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলতে থাকে। এবং সেনাবাহিনীর বাঙালি অংশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে। ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ বাংলার জনগণ ও প্রগতিশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দাবিতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করেন। এক ঘোষণায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের কল্যাণের জন্যই তাঁকে এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে। তিনি সুস্পষ্টভাবে দেশবাসীকে জানান, এই শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করার অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতা। জনগণ যেন তা রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত থাকে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের মুক্তির স্পৃহাকে স্তব্ধ করা যাবে না। আমাদের কেউ পরাভূত করতে পারবে না। কারণ প্রয়োজনে আমরা প্রত্যেকে মরণ বরণ করতে প্রস্তুত। জীবনের বিনিময়ে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের স্বাধীন দেশের মুক্ত মানুষ হিসেবে স্বাধীনভাবে আর আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাস করার নিশ্চয়তা দিয়ে যেতে চাই। মুক্তির লক্ষ্যে না পৌঁছা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম নবতর উদ্দীপনা নিয়ে অব্যাহত থাকবে। আমি জনগণকে যেকোনো ত্যাগের জন্য এবং সম্ভাব্য সব কিছু নিয়ে যেকোনো শক্তির মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে আবেদন জানাই।(দৈনিক পূর্বদেশ, ১৬ মার্চ ১৯৭১)। বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণাও স্বাধীনতার ঘোষণার নামান্তর। বঙ্গবন্ধু দেশের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ৩৫টি বিধি জারি করেন, যার মাধ্যমে ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশ পরিচালিত হয়। বস্তুত ১৫ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। দেশের শাসনভার স্বহস্তে গ্রহণ করার পর জনসাধারণ ও সরকারি কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করতে লাগলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সর্বত্র ছিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর ধ্বংসলীলার ক্ষতচিহ্ন। নাগরিকদের খাদ্য-বস্ত্র, বাসস্থানের অভাব ছিল প্রকট। কলকারখানায় উৎপাদন শূন্যের কোঠায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু রাখা ও এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনসহ দেশের সমস্যা ছিল অগণিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ছিল বঙ্গবন্ধুর সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, যা তিনি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করেন। স্বাধীনতা-উত্তর কালের বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থার পর্যালোচনা করে বিশ্বজুড়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ৫০ লাখ মানুষ অনাহারে প্রাণ হারাবে, দেখা দেবে দুর্ভিক্ষ। এমনি এক ভয়াবহ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ শাসনভার গ্রহণ করেছিল। নিঃসন্দেহে তাঁর পরিচালনায় আওয়ামী লীগ সরকার প্রাথমিক অসুবিধা ও সংকটগুলো কাটিয়ে উঠেছিলেন। দেশের প্রথম পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সে অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রাথমিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে একটি সুনিশ্চিত পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য অর্জন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের উল্লেখযোগ্য কিছু দিক হলো : মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন : মুক্তি বাহিনীর জওয়ানদের কাজে লাগানোর জন্য বঙ্গবন্ধু ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী, মিলিশিয়া, রিজার্ভ বাহিনী সংগঠনের বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্সা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া দেশ গড়ার বিভিন্ন কাজে যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করেন। ত্রাণ কার্যক্রম : রিলিফ ও পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসংখ্যার ভিত্তিতে মঞ্জুরি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ : মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্র নিজেদের কাছে না রেখে তা ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সমর্পণের আহ্বান জানান। এতে সব মুক্তিযোদ্ধা সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দেন। স্বাধীন বাংলার প্রশাসনিক পদক্ষেপ : ঢাকা মুক্ত হওয়ার পর একটা প্রশাসনিক শূন্যতা বিরাজ করছিল রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র। নিরাপত্তার বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তনের পর প্রশাসনকে কর্মোপযোগী করে তোলেন। ভারতীয় বাহিনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : ১২ মার্চ ১৯৭২ ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রত্যাবর্তন করে। ১৯৭২ সালের সংবিধান : ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তারই আদর্শ হিসেবে রচিত হলো রক্তে লেখা এক সংবিধান ৪ নভেম্বর ১৯৭২। সাধারণ নির্বাচন : ১৯৭৩ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের জনগণের দ্রারিদ্র্য দূরীকরণ তথা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে জাতির জনক প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই পরিকল্পনার লক্ষ্যগুলো ছিল, ক. মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ। এ জন্য যারা কর্মহীন বা আংশিক কর্মহীন তাদের সবার কর্মসংস্থানের আয়োজন প্রয়োজন। তা ছাড়া জাতীয় আয় বৃদ্ধির সঙ্গে এই আয় বণ্টনের জন্য যথাযথ আর্থিক ও মুদ্রানীতি প্রণয়ন ত্বরান্বিত হওয়া প্রয়োজন। খ. জনগণের অত্যাবশ্যক পণ্যের চাহিদা যাতে মেটে সে জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর (খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, ভোজ্য তেল, কেরোসিন ও চিনি) উত্পাদন বাড়াতে হবে। গ. কৃষির প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগতকাঠামোতে এমনভাবে রূপান্তর সাধন প্রয়োজন, যাতে খাদ্যশস্যের উত্পাদনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়, কৃষিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং শ্রমশক্তির শহরমুখী অভিবাসন বন্ধ হয়। পররাষ্ট্রনীতি : বঙ্গবন্ধু পররাষ্ট্রনীতি সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরী মনোভাব নয়। প্রথম তিন মাসের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ ৬৩টি দেশের স্বীকৃতি লাভ। ৩ মাস ২১ দিনের মধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় দুই বছর দুই মাসের মধ্যে। সর্বমোট ১২১টি দেশ স্বীকৃতি প্রদান করে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন : ইসলামের যথার্থ শিক্ষা ও মর্মবাণী সঠিকভাবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচার-প্রসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ইসলাম আদর্শের যথাযথ প্রকাশ তথা ইসলামের উদার মানবতাবাদী চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা ছিল জাতির জনকের সুদূরপ্রসারী চিন্তার এক অমিত সম্ভাবনাময় ফসল। যুদ্ধাপরাধীর বিচার : বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কোলাবরেটরস স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল অর্ডার জারি করে। এতে দালাল, যোগসাজশকারী কিংবা কোলাবরেটরদের সংজ্ঞায়িত করা হয় এভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে বস্তুগত সহযোগিতা প্রদান বা কোনো কথা, চুক্তি ও কার্যাবলির মাধ্যমে হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধের চেষ্টা করা। মুক্তিবাহিনীর তত্পরতার বিরুদ্ধে ও মুক্তিকামী জনগণের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা। পাকিস্তানি বাহিনীর অনুকূলে কোনো বিবৃতি প্রদান বা প্রচারে অংশ নেওয়া এবং পাকিস্তানি বাহিনীর কোনো প্রতিনিধিদল বা কমিটির সদস্য হওয়া। হানাদারদের আয়োজনে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া। চার ধরনের অপরাধীর বিচার : পরবর্তীকালে একই বছরে এই আইন দুই দফা সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনীতেও চার ধরনের অপরাধীকে ক্ষমা করা হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে নেই, তাদের ক্ষমা করা হয়। কিন্তু যারা লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যাএই চারটি অপরাধ করেছে, তাদের ক্ষমা করা হয়নি। ১৯৭৩ সালে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৭ হাজার ৪৭১ জনকে দালাল আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৮১৮টি মামলার সিদ্ধান্ত হয়। এতে একজনের মৃত্যুদণ্ডসহ ৭৫২ দালাল দণ্ডিত হয়। তৎকালীন সরকার আইনগত ব্যবস্থা ত্বরিত করার জন্য ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ১১ হাজার আটক থাকে। উপরন্তু বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালের ১৯ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট জারি করেন, যা পরবর্তী সময়ে আইন হিসেবে সংবিধানে সংযোজিত হয় এবং অদ্যাবধি তা বহাল রয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধানের ১২ ও ৩৮ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সংবিধানের ৬৬ ও ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ীদের ভোটাধিকার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার বাতিল করা হয়েছিল। হজে প্রেরণ : ১৯৭২ সালে সৌদি আরবে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে ছয় সহস্রাধিক বাংলাদেশি মুসলমানকে হজ পালনে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি : ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত হয় ২৫ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীচুক্তি। শিক্ষা কমিশন গঠন : কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন। যমুনা সেতু : ১৯৭৩ সালের ১৮-২৪ অক্টোবর জাপান সফরকালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সূচনা করেন। বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ : জাতিসংঘের বেশির ভাগ সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্যপদ গ্রহণ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন : স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক সুসজ্জিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ : ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলাদেশের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভাষণ প্রদান। প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৪-২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন। ঐতিহাসিক কিছু পদক্ষেপ : ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ, পাঁচ হাজার টাকার ওপরে কৃষিঋণ মওকুফকরণ এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে এনে সামাজিক অর্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জমি মালিকানার সিলিং পুনর্নির্ধারণ ছিল ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। স্বাস্থ্যব্যবস্থা : বঙ্গবন্ধু সরকার নগর ভিত্তিক ও গ্রামীণজীবনের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূরীকরণের পদক্ষেপ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ৫০০ ডাক্তারকে গ্রামে নিয়োগ করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে আইজিএমআর শাহবাগ হোটেলে স্থানান্তর হয়। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে থানা স্বাস্থ্য প্রকল্প গ্রহণ বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আজও স্বীকৃত। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি : ১৯৭৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশকে শিল্প-সংস্কৃতিবদ্ধ সৃজনশীল মানবিক বাংলাদেশ গঠন এবং বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ধরে রেখে আরো সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশি শিল্পকলা একাডেমি গঠন করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান। বৈদেশিক বাণিজ্য শুরু : শূন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারকে শুরু করতে হয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্য। এ ছাড়া জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে বঙ্গবন্ধু তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের ছাপ রাখতে সমর্থ হন। পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধ এবং বিশ্বশান্তির প্রতি ছিল তাঁর দৃঢ় সমর্থন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে প্রদান করে জুলিওকুরি শান্তিপদক। দুর্নীতির বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা : ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ তমিস্রায় ছেয়ে যাবে। দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাচালানি, মজুদদারি, কালোবাজারি ও মুনাফাখোরদের সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু বলে আখ্যায়িত করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এদের শায়েস্তা করে জাতীয় জীবনকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে আওয়ামী লীগের দুই যুগের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানের গৌরবও ম্লান হয়ে যেতে পারে। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক,কলামিষ্ট ,সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম ও চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান,দৈনিক আজকের বিজনেস বাংলাদেশ । সূত্র : বঙ্গবন্ধু আর্কাইভ
আওয়ামী লীগের ইতিহাস মানে বাঙালি জাতির সংগ্রাম ও গৌরবের ইতিহাস
১৯ডিসেম্বর,বৃহস্পতিবার,মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,নিউজ একাত্তর ডট কম: বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এক ও অভিন্ন এবং বাঙালি জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আওয়ামী লীগের ইতিহাস মানে বাঙালি জাতির সংগ্রাম ও গৌরবের ইতিহাস। এ রাজনৈতিক দলটি এদেশের সুদীর্ঘ রাজনীতি এবং বাঙালি জাতির আন্দোলন-সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ দলটির নেতৃত্বেই এদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। রোজগার্ডেনে জন্মগ্রহণের পর থেকে নানা লড়াই, সংগ্রাম, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দলটি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। আওয়ামী লীগের ইতিহাস থেকে জানা যায়, এ দেশের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও তরুণ মুসলিম লীগ নেতাদের উদ্যোগে ১৯৪৯ সালের ২৩-২৪ জুন পুরনো ঢাকার কেএম দাস লেনের বশির সাহেবের রোজ গার্ডেনের বাসভবনে একটি রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতা-কর্মীরা সংগঠন থেকে বেড়িয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রথম সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন প্রথম কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক। ১৯৬৬ সালের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির একচ্ছত্র নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির জনক। ৬৯-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির যে জাগরণ ও বিজয় সূচিত হয়, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ এবং এই আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি জাতি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর নেতৃত্ব শূন্যতায় পড়ে আওয়ামী লীগ। এর পর দলের মধ্যে ভাঙনও দেখা দেয়। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। তার নেতৃত্বে দ্বিধা-বিভক্ত আওয়ামী লীগ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়। তিন দশক ধরে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পরিচালিত হচ্ছে। এই সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি তিন বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে দলটি। আবার ৬৭ বছরের মধ্যে প্রায় ৫০ বছরই আওয়ামী লীগকে থাকতে হয়েছে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছর এবং ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৫ বছর, ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনা করছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর অনেকটা সুসংহত হতে সক্ষম হয়ে জোটসরকার বিরোধী আন্দোলনে সফলতার পরিচয়ও দিয়েছিল দলটি। কিন্তু এই আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিলে আবারো নতুন সংকটের মুখে পড়ে যায় দলটি। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাসহ প্রথম সারির অসংখ্য নেতারা গ্রেফতার এবং একাংশের সংস্কার তৎপরতায় কিছুটা সংকটে পড়ে দলীয় কার্যক্রম। তবে সকল প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি গঠিত হয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত জোটের শত প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে নির্বাচনের বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং তৃতীয় বারের মত প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হন। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর সুখী, সমৃদ্ধ ডিজটাল বাংলাদেশ গড়াসহ বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছে দলটি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু দেশের পুরনো ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলই নয়, এটি হচ্ছে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের মূলধারাও। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ আমাদের সমাজ-রাজনীতির এ ধারাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই এই দলের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ প্রথম শুরু করেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক,কলামিষ্ট ,সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম ও চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান,দৈনিক আজকের বিজনেস বাংলাদেশ ।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর