প্রকাশ : 2020-12-14

ধর্ষনের অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল আবশ্যক

১৪,ডিসেম্বর,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তিন মাসে ২৫৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৫০টি ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। ১২ জন নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। আর চার জন নারী ধর্ষণের পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ৪০০টি। এ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ধর্ষণের হার ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে প্রায় চার জন নারী-শিশুকেই ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে, যা স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে সব সরকারি অফিস ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর সমগ্র বাংলাদেশকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে ঘরে থাকার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিদিন দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের জনগণ প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও ধর্ষণ থামেনি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই জামালপুরে করোনা আক্রান্ত রোগী তল্লাশির নামে পুলিশ পরিচয়ে ঘরে ঢুকে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। গত ৫ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জে ত্রাণ দেয়ার নাম করে ১০ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ৭ এপ্রিল বরগুনার তালতলীতে এক দিনমজুরের মেয়েকে ত্রাণের কথা বলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। গত ৯ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ৯ বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। সর্বশেষ গাজীপুরে এক প্রবাসীর স্ত্রী ও দুই মেয়ে এবং এক ছেলে হত্যার ঘটনায় জানা যায় যে, হত্যার পূর্বে প্রবাসীর স্ত্রী ও দুটি শিশু মেয়েকে ধর্ষণ করা হয় এবং আসামিদের মধ্যে দুজন ছিল বাবা-ছেলে। কত ঘৃণ্য মানসিকতার ও বর্বর হলে বাবা-ছেলে মিলেও ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না! এতক্ষণ বাংলাদেশে ধর্ষণের সার্বিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এবার আইনগত বিষয়ে আসা যাক। ২০০০ সালের আগে বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার হতো ১৮৬০ সনের দন্ডবিধি অনুযায়ী। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও বৃদ্ধি পায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। বেড়ে যায় যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ অপহরণের ঘটনা। এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা প্রকাশিত হলেও বেশিরভাগ ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় লোকলজ্জার কারণে। এসব ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমন করার জন্য সরকার ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন নামে বিশেষ আইন পাস করে। এই আইনের আওতায় ৫৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে গঠিত হয় ৪১টি এবং সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুতে অর্থাৎ আরো ছয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছয়টি মিলে এখন দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা হবে ১০১টি। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের ট্রাইব্যুনালে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল যদি ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার কারণ সংবলিত একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করতে হবে। যার একটি অনুলিপি সরকারকেও দিতে হবে। তাছাড়া এক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে কারণ উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করবেন। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ছাড়াও নারী পাচার, শিশু পাচার, নারী ও শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচণা, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দাহ্য পদার্থ দ্বারা জখম বা মৃত্যু ঘটানো ইত্যাদি অপরাধের বিচার করা হয়। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের চলতি সময় পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মামলা বিচারাধীন আছে। অর্থাৎ এসব মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক হাজার ৭০০টি। ফলে ধর্ষণ ও এ সংক্রান্ত মামলাসমূহ প্রত্যাশিত হারে দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি সম্ভবপর হচ্ছে না। অথচ ধর্ষণ এমন একটি জঘন্য অপরাধ যাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করাও অযৌক্তিক হবে না। এই জঘন্য অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচার করা উচিত। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার উত্তরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র ধর্ষকের দ্রুত বিচার দাবিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এমনকি জাতীয় সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্য ধর্ষণ নির্মূলে ক্রসফায়ার দাবি করেন। যদিও এর কোন আইনগত ভিত্তি নেই। কিন্তু জনগণ চায় দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে পৃথক আইন পাস করে পৃথক ট্র্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা। এবার আলোচনা করা যাক প্রস্তাবিত আইনে কোন কোন বিষয় থাকা উচিত। আইনে বলা থাকতে পারে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে একটি করে পৃথক ট্রাইব্যুনাল হবে। জেলা জজ পদ মর্যাদার একজন বিচারক হবেন এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক। এই ট্রাইব্যুনাল কেবল ধর্ষণ ও ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধসমূহ বিচার করবে। যে সংস্থার হাতেই তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হোক না কেন; তদন্তের সময়সীমা ১০ দিন পর্যন্ত বেঁধে দেয়া যেতে পারে এবং তদন্ত কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। আর বিচার শেষ করে দুই মাসের মধ্যে ট্রাইব্যুনালকে রায় দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হবেন অবশ্যই একজন নারী আইনজীবী। আইনে বলে দিতে হবে, এই ধরনের ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালীন অভিযোগকারী পক্ষ এবং আসামী পক্ষ এবং উভয়পক্ষের আইনজীবী ছাড়া অন্য কেউ আদালত কক্ষে থাকবে না। সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে এ ধরনের মামলার তদন্ত তদারকি করার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে এবং তিনি খেয়াল রাখবেন যাতে নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে এ ধরণের মামলার তদন্তভার দেয়া হয়। নারী পুলিশ কর্মকর্তা পাওয়া না গেলে যাতে সবচেয়ে দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে তদন্তভার দেয়া হয়। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও গত বছর তদন্ত ও বিচারের জন্য খুব সংক্ষিপ্ত সময় দিয়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণ সংক্রান্ত মামালাসমূহ বিচারের জন্য অন্ধ্রপ্রদেশ দিশা এ্যাক্ট, ২০১৯ নামে নতুন আইন পাস করা হয়। বাংলাদেশে ধর্ষণের যেসব মামলায় বিচার হয়েছে, তার মধ্যে দ্রুততম সময়ে বিচারের উদাহরণ হলো টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে কলেজছাত্রী ধর্ষণের মামলা। উক্ত ঘটনায় দ্রততম সময়ে অর্থাৎ মামলা দায়েরের ১৭১তম দিনে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে রায় প্রচার করা হয়। রায়ে চারজনের ফাঁসি, একজনকে দেয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদন্ড। অন্তত বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলে এভাবে প্রত্যেকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলা দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হবে। এতে কিছুটা হলেও সম্ভাব্য আসামিরা ভয় পাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় আমরা অঙ্গীকার করেছি আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। সেই অঙ্গিকার মাথায় রেখে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধানসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য সরকার এবং জনগণকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনই হবে মূলমন্ত্র।- লেখক: শেখ সাদী রহমান, সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর