সৌদি আরবে মেয়েদের কোনও নিরাপত্তা নেই
তসলিমা নাসরিন :ছোটবেলায় মা আমাকে তার স্বপ্নগুলো বলতো। মা’র স্বপ্নের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল একবার স্বচক্ষে সৌদি আরব দেখা। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র দেশ, মা মনে করতো সৌদি আরব। ওই দেশে জন্মেছেন আল্লাহর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ওই দেশে ইসলাম ধর্মের জন্ম। ওই দেশের ভাষা কোরআনের ভাষা। ওই দেশে কাবা শরিফ, রওজা শরিফ। মা মক্কা-মদিনার কথা বলতে বলতে আবেগে কাঁদতো। ওই পবিত্র দেশটির, ছোটবেলায় আমার মনে হতো, সব নিখুঁত; কোনও ভুল নেই, কোনও ত্রুটি নেই। যত বড় হচ্ছিলাম, যত চারদিক দেখছিলাম, পৃথিবীটাকে জানছিলাম, মা’র স্বপ্নের ওই দেশটি সম্পর্কে আমার মধুর মধুর ধারণাগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল। সৌদি আরবে গণতন্ত্র নেই, আছে রাজতন্ত্র। রাজপরিবার দেশটিকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করবে, কারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই। দেশটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, নারীর অধিকার বলতে প্রায় কিছুই নেই। পাবলিক প্লেসে টেনে নিয়ে গিয়ে পাবলিককে দেখিয়ে তরবারির এক কোপে অভিযুক্তদের মুণ্ডু কেটে ফেলে সরকারি জল্লাদেরা। মুণ্ডুটা রাস্তার এক পাশ থেকে আরেক পাশে ফুটবলের মতো গড়িয়ে চলে যায়। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে পাবলিক। এই বীভৎসতা দেখা যায় না। সৌদি আরবে বাকস্বাধীনতা নেই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা তো নেই-ই। সৌদি মুক্তচিন্তক রাউফ বাদাবিকে আজও জেলে ভরে রাখা হয়েছে। পুরুষগুলোর যত খুশি উপপত্নী। মেয়েদের কপালে দুটো চুল এসে পড়লে ধর্ম পুলিশ দোররা মারবে। মেয়েরা গাড়ি চালাতে পারবে না। মেয়েরা প্রতিবাদ করতে পারবে না। মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হলে মেয়েদেরই শাস্তি দেওয়া হবে। কোনও অমুসলমানের মক্কা আর মদিনায় যাওয়ার অধিকার নেই। অধিকার নেই সৌদি নাগরিকত্ব পাওয়ার, অধিকার নেই গির্জা মন্দির গড়ার। এই সৌদি আরবের তেলের খনিতে পঞ্চাশ-ষাট দশকে একসময় সৌদি শ্রমিকরা কাজ করতো। তারপর এলো প্রতিবেশী আরব দেশ থেকে শ্রমিক, তাও এক সময় বন্ধ হলো। আশির দশকের শুরু থেকে শুরু হলো এশিয়া থেকে শ্রমিক নেওয়া। এই শ্রমিকরা শ্রমিক হিসেবে তো নয়ই, মানুষ হিসেবেও সামান্য মর্যাদা পায় না সৌদি আরবে। নারী শ্রমিকরা যৌন হেনস্থা, শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার, আরও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শ্রমিকের অধিকার আর নিরাপত্তার তো প্রশ্ন ওঠে না। কী করে সৌদি পুরুষেরা গৃহকর্মীদের পেটায়, কী করে যৌন নির্যাতন করে— সেসবের চিত্র গুগল আর ইউটিউব ঘাঁটলেই মেলে। বাংলাদেশের মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার এত বেশি হয়েছে যে আর আরবমুখো হতে চায় না। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কার মেয়েদের আর সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে পাঠানো হচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েদের নেওয়ার জন্য সমন পাঠিয়েছে সৌদি আরব। তারা মেয়ে-শ্রমিক চাইছে। মেয়ে-শ্রমিক না বলে আসলে ওদের ক্রীতদাসী বলা উচিত। সৌদি পুরুষেরা অত্যাচারী প্রভুর মতোই আচরণ করে গৃহশ্রমিকদের সঙ্গে। সেদিনও একটি ভিডিওতে দেখলাম এক বাঙালি মেয়েকে জনসমক্ষে পিটিয়ে চ্যাংদোলা করে এক দশাসই সৌদি পুরুষ তার গাড়িতে ওঠালো। মেয়েটি দুজন বাঙালি পুরুষের কাছে কাঁদছিল যেন তাকে বাঁচায়। না, কেউ তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেনি। বরং সৌদি পুরুষটিকেই সাহায্য করেছে মেয়েটিকে গায়ের জোরে গাড়িতে ওঠানোর জন্য। পুরুষ- শ্রমিকেরাও মেয়ে-শ্রমিকের পক্ষ না নিয়ে পুরুষ-মালিকের পক্ষ নেয়। শ্রেণির চেয়েও হয়তো বড় হয়ে ওঠে লিঙ্গ! অদ্ভুত একটা দেশ বটে। শ্রমিকদের কাজ করিয়ে টাকা পয়সা না দিলেও সৌদি নাগরিকদের কোনও শাস্তি হয় না। ধর্ষণ করলেও হয় না, নির্যাতন করলেও না। মালিকদের কোনও আন্তর্জাতিক শ্রমিক আইন মানতে হয় না, যত খুশি বর্বর হওয়ার অধিকার তাদের আছে। শ্রমিকেরা বন্দী জীবন থেকে বেরিয়ে নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, কিন্তু অনেক সময় খাঁচা থেকে বেরোনোর বা শেকল ছেঁড়ার কোনও ক্ষমতা তাদের থাকে না। সৌদি আইন শ্রমিকের পক্ষে যায় না, অত্যাচারিতা, ধর্ষিতদের পক্ষে যায় না। সৌদি আইন থাকে পুরুষের পক্ষে, ধনীর, শাসকের, মালিকের পক্ষে। সৌদি আরব দুই লাখ শ্রমিক চেয়েছে বাংলাদেশের কাছে। বাংলাদেশ থেকে মাসে দশ হাজার মেয়ে-শ্রমিক সৌদি আরবে পাঠানোর আয়োজন চলছে। সৌদি আরবে কোনও নিরাপত্তা মেয়েদের নেই। সৌদি মেয়েরাই নিরাপত্তা পায় না, শ্রমিক মেয়েরা কী করে পাবে! মেয়ে-শ্রমিকেরা কয়েক মাস পর পর দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে, কেউ কেউ গর্ভবতী হয়ে ফিরে আসছে। সামান্য টাকা পয়সার জন্য জলজ্যান্ত নরকে মেয়েদের আর পাঠানোর চেষ্টা না করাই ভালো। সৌদি পুরুষেরা যখন গৃহশ্রমিকদের মারে, মারে পা দিয়ে, পায়ের জুতো দিয়ে, চাবুক দিয়ে। ভেবে অবাক হই, মুসলমানেরা মুসলমানের দেশে পরাধীন, অথচ খ্রিস্টান-নাস্তিকদের দেশে তারা তুলনায় বেশি স্বাধীন, তাদের মানবাধিকার বেশি সম্মানিত, তাদের নিরাপত্তা বেশি জোটে। মুসলমানরা মুসলমানের ভাই, এ কথা বারবার ভুল প্রমাণিত হয়। অধিকাংশ ধনী-মুসলমানদের কোনও আগ্রহ নেই দরিদ্র-মুসলমানের দারিদ্র্য ঘোচানোর। সৌদি আরব গরিব মুসলিম দেশের শুভাকাঙ্ক্ষী কখনো ছিল না, এখনো নয়। শ্রমিক তারা নেয় বটে, শ্রমিকের স্বার্থে নয়, নেয় নিজেদের স্বার্থে। নিজেরা নোংরা কাজ, ছোট কাজ, করতে চায় না বলে নেয়। সৌদি আরবের নারী বিদ্বেষী পুরুষেরা নিজেদের নারীকেও অসম্মান করে, বহিরাগত নারীকেও অসম্মান করে। নারীরা সৌদি আরবে ততদিন নিরাপদ নয় যতদিন সৌদি পুরুষের মধ্যে নারী বিদ্বেষ থাকবে, যতদিন নারীকে তারা যৌনবস্তু বলে ভাববে। অদূর ভবিষ্যতে সৌদি পুরুষদের মানসিকতা আমূল বদলে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। যে নারীরা সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে যায়, তারা শ্রমিক, তারা পতিতা নয়। অথচ তাদের পতিতার মতো ব্যবহার করতে চায় পুরুষেরা। স্ত্রী ঘুমিয়ে গেলে পরিচারিকার ঘরে শুতে আসে গৃহকর্তা। পরিচারিকা রাজি না হলে তার ওপর চলে শারীরিক অত্যাচার। কোথায় বাংলাদেশের সরকার সৌদি সরকারকে বলে দেবে আমরা মেয়ে পাঠাবো না, তা নয়, বলছে মেয়েরা বাংলাদেশে আরও বেশি নির্যাতিত। তার মানে, মেয়েরা যেহেতু বাংলাদেশেও নির্যাতিত, সুতরাং সৌদি আরবে নির্যাতিত হলে কোনও অসুবিধে নেই। পুরুষেরা সাধারণত তাদের নারী বিদ্বেষ জনসমক্ষে আড়াল করে, কিন্তু বাংলাদেশের পুরুষদের এসব প্রকাশ করতে এতটুকু লজ্জা হয় না। সৌদি আরবের নারীবিদ্বেষী পুরুষেরা বাইরের লোক, বাংলাদেশের নারী বিদ্বেষী পুরুষেরা ঘরের লোক। ঘরে যারা মেয়েদের নির্যাতন করে, বাইরেও মেয়েরা নির্যাতিত হলে তাদের কিছু যায় আসে না। আমি ঘরের অত্যাচার মেনে নিয়ে বাইরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি না। আমি ঘর এবং বাইরের দু’রকম অত্যাচারের বিরুদ্ধেই লড়তে চাইছি। লেখক : নির্বাসিত লেখিকা
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ও বর্তমান বিশ্ব ফুটবল
বাজতে শুরু করেছে বিশ্বকাপের বাঁশি। রাশিয়া বিশ্বকাপ মাতাতে প্রস্তুত ফুটবলের বড় বড় সব তারকারা। নিজের দেশের হয়ে মনে রাখার মতো কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই রাশিয়া যাচ্ছেন তারা। বিশ্বকাপের উত্তাপের আঁচটা গায়ে লাগতে শুরু করেছে। সেই আঁচ পেতে রাশিয়া বা জার্মানি বা ল্যাতিন আমেরিকায় যেতে হবে না। বাংলাদেশে বসেই পাওয়া যাচ্ছে সেই উত্তেজনা; বাংলাদেশে বসে নয় শুধু, ঘরে বসেই টের পাচ্ছি বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চেয়ে বাংলাদেশ কম নয়। বিশ্বের অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষও ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে গেছে। মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-ভালবাসা, আবেগ অনুভূতি সব এখন ভার্চুয়াল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষ ফেইসবুকে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। এখন চলছে ওয়ার্মআপ। কে কোন পক্ষ তা জানান দেওয়া, নিজেদের দল ভারী করা, ট্রল করা চলছে সমানতালে। ফেইসবুকের নিউজফিডে বিশ্বকাপের হরেক রকমের তথ্যের ছড়াছড়ি। নিজের পছন্দের দলের সাফল্য উদযাপনের চেয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই মানুষের আগ্রহ বেশি। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কথা বললে মনে হবে বিশ্বকাপে দুটি দল খেলে- ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের দিগন্ত ছেয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায়। বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে ফুটবল। একাত্তর সালের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা আমরা সবাই জানি। এই দলটি শুধু একাত্তর সালে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন করেছে। ব্যয়বহুল যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছে। অনেকেই হয়ত জানি না স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্ম ইতিহাস। ক্ষেত্র বিশেষে প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করে সুবিধাভোগীরা বনে যান এর ইতিহাসের নায়ক। তবে সত্য কখনও চাপা থাকে না। যেমনটি চাপা থাকেনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সত্যিকার ইতিহাসের ক্ষেত্রে। এখন বেরিয়ে আসছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন আর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল এই দল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল থেকেই ফুটবলে আমাদের যাত্রা শুরু। ১৯৭১ সালে ভারতে ১৩টি ম্যাচ খেলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল এই দলটি। ভারত এবং ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন মুজিবনগর সরকারের সহযোগিতায় কলকাতায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি। সামছুল হককে সভাপতি ও লুৎফর রহমানকে সম্পাদক করে গঠিত কমিটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ১. স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গড়া, ২. তহবিল সংগ্রহ ও ৩. পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে পাকিস্তান সরকার ঢাকায় কোনো টুর্নামেন্ট যেন আয়োজন না করতে পারে। প্রথম সভাপতি ছিলেন মন্ত্রী শামসুল হক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সভাপতি হলেন এমএনএ আশরাফ আলী চৌধুরী ও এন এ চৌধুরী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন লুৎফর রহমান। কোষাধ্যক্ষ হলো মোহাম্মদ মহসীন। সদস্য ছিলেন এমএ হাকিম, এমএম মতিন, গাজি গোলাম মোস্তফা, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নজিবুর রহমান ভূঁইয়া। ফুটবল দলের প্রস্তাবক ও সংগঠক ছিলেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনে পর্যায়ক্রমে ভারত সরকারেরও অনুমোদন ছিল। খেলোয়াড়দের অনুশীলনের জন্য সার্কাস মাঠ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে ক্রীড়া সমিতি ৩৫ সদস্যের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করে। দলের খেলোয়াড়রা হলেন- জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), আইনুল হক (সহ-অধিনায়ক), প্রতাপ শঙ্কর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), শাহজাহান আলম, কায়কোবাদ, তসলিম উদ্দিন আহমেদ, আলী ইমাম, সাইদুর রহমান প্যাটেল, আশরাফ নুরুন্নবী, নওশের এনায়েত, সালাহউদ্দিন (তুর্জ হাজরা), লালু, অমলেশ সেন, বিমল, হাকিম, খোকন, সুভাষ, লুৎফর, মজিবুর, শিরু, সাঈদ, পেয়ারা, নিহার, গোবিন্দ, অনিরুদ্ধ, সাত্তার, বিরু, মোমেন, সুরুজ, মাহমুদ, সঞ্জীব, খালেক ও মোজাম্মেল। কোচ হলেন- ননী বশাক ও ম্যানেজার তানভীর মাজহার তান্না। এ দল গঠনে যারা সহযোগিতা করেছেন তারা হলেন- নাজির হোসেন, খসরু, ক্রিকেটার রকিবুল, হেমায়েত সিদ্দিকী, মঈন সিনহা, আবুল কাশেম, অরুণ নন্দী (সাতারু) ও আতাউল হক মল্লিক। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ জুলাই নদীয়ায়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল যে ইতিহাস গড়েছে, তা নিয়ে অবশ্যই গর্ব করা যায়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে ইউনেসকো যে কারণে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, একইভাবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অবদানের কথা ফিফাকে যথাযথভাবে অবহিত করা হলে এ দলটিও স্বীকৃতি পেতে পারে। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি অংশ। অথচ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক এবং খেলোয়াড়রাও মুক্তিযুদ্ধের ‘ফুটবল সৈনিক’। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের দীপ্তিমান গৌরব। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ অর্জন করে মহান স্বাধীনতা। এই নয় মাসের যুদ্ধে প্রাণ দেন প্রায় ত্রিশ লক্ষ শহীদ। ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা অগণিত। সেইসাথে আছে অবকাঠামোগত আর আর্থিক সংকট। পৃথিবীর বুকে নতুন জন্ম নেয়া শিশুদেশ বাংলাদেশের পথ চলা। রাজনৈতিক আর আর্থসামাজিক সঙ্কটের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের প্রথম দিন থেকেই চেষ্টা করেছে ঘুরে দাঁড়াতে। অন্যান্য খাতের মতো খেলাধুলার ক্ষেত্রেও যার ব্যতিক্রম ছিল না। সেই সূত্রধরেই ফের চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয় দেশের ফুটবলকে। স্বাধীনতা লাভের পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই গঠন করা হয় বাংলাদেশ ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। দেখতে দেখতে বাংলাদেশের বয়স যেমন বাড়ছে ফুটবলের ঐতিহসিক অর্জনও ম্লান হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিকমানের একটি ফুটবল দল গঠন হয়নি। বিশ্বকাপের আসর তো কল্পনা বিলাসী। দেশের ফুটবলের আজকের যে দৈন্যদশা, তা কিন্তু একদিনের তৈরি হয়নি। মুলতঃ ভুটান বিপর্যয়ের পরেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই দুদর্শার চিত্রটা। ভুটান লজ্জার আগে মালদ্বীপের বিপক্ষে ৫ গোল হজমেও বুঝা গিয়েছে কোথায় অবস্থান করছে বাংলাদেশের ফুটবল। এছাড়া টানা তিনটি সাফ ফুটবলের গ্রুপ পর্ব থেকে বাংলাদেশের বিদায়ের করুণ গল্পতো আছেই। শেষ ২০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশ গোল হজম করেছে ৫৫টি। যেখানে গোল দিয়েছে মাত্র ১১টি। ৪ জয়ের বিপরীতে ৩ ড্র, ১৩ হার। বাংলাদেশের ফুটবল যে একেবারেই লক্ষ্যহীন একথা এখন চায়ের দোকানেও হরহামেশাই আলোচনা হয়। একটি সুন্দর সম্ভাবনাময় ফুটবল দল হতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সংগঠকদের আন্তরিকতা। তাদের দায়িত্বশীল আচরণ। বিপন্ন ফুটবলের হারানো গৌরব ফেরাতে হবে। ফুটবল এমন একটি খেলা, যা দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও টিম স্পিরিটের সঙ্গে খানিকটা ক্লাব্য, কিছুটা উচ্ছৃঙ্খলতা ও এক খামচা পাগলামোর এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকেএসপি শিক্ষা কোর্স কারিকুলামে ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় টেক্সট বুক পাঠ্যসূচি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডকে অনুসরণ করে। শিক্ষার্থীদেরকে খেলাধুলার উপর সংক্ষিপ্ত খ-কালীন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিকেএসপিতে যেসব শিক্ষক কর্মরত তাদের কারোর ফুটবলের উপর প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা এমনকি ডিপ্লোমা কোর্সের প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেননি। বিকেএসপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকমানের ফুটবলার যেমন তৈরি করতে পারছেনা তেমনি যোগ্য কোন ক্রীড়া সংগঠক ও তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্ব স্বীকৃত ৪ বছর মেয়াদি ফুটবল খেলার শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স সংকট মোচনে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে। লেখক:খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।Khanaranjanroy@gmail.com
মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দেশে দেশে
কলম্বিয়াঃ কোকেন উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ কলম্বিয়া। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশটিতে মাদক সংশ্লিষ্ট হত্যাকান্ডের সংখ্যা সাড়ে চার লাখ ছাড়িয়েছে। শুধু নিহতের সংখ্যা দিয়ে দেশটির মাদকযুদ্ধের ব্যাপ্তি অনুধাবন করা যায় না। ১৯৮০-র দশক থেকে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তচ্যুত হয়েছে আড়াই থেকে চার মিলিয়ন মানুষ। নিরাপত্তার জন্য এসব মানুষ নিজেদের বাড়িঘর রেখে ছুটেছেন অন্যত্র। একই সময়ে কয়েক হাজার হেক্টর বন কেটে ফেলা হয়েছে। এসব বনে কোকা উৎপাদন ও কোকেন তৈরির কারখানা ছিল। প্রতি হেক্টর কোকা ক্ষেতের জন্য তিন হেক্টর বন ধ্বংস করা হয়েছে। দেশটির মাদক সম্রাটদের হাতে ৫ মিলিয়ন হেক্টর ভূমি রয়েছে। যার কারণে কোকেন উৎপাদন কোনোভাবেই কমানো সম্ভব হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র : ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক ভাষণের মধ্য দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। দুই বছরের মাথায় নিক্সন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেন। রিগ্যানের ঘোষণার পরই মাদকবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ও লোকবল নিয়োগ বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবছর ৫১ বিলিয়ন ডলার। ১৯৮০ থেকে সালে গ্রেফতারকৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখের বেশি। ১৯৮৪ সালে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে শুধু না বলুন প্রচারণায় রূপ দেন নিক্সনের স্ত্রী ন্যান্সি। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে মেক্সিকো, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অভিযান চালায় ও সহযোগিতা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৯ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শব্দবন্ধ ব্যবহার না করার ইঙ্গিত দেয়। সর্বশেষ গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন পুনরায় মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। মেক্সিকো : ১৯৬০ সালে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করা মাদক মেক্সিকোতে। ২০০৬ সালে দেশটিতে মাদকবিরোধী যুদ্ধে নামানো হয় সেনাবাহিনীকে। মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত মেক্সিকো। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফেলিপ চালডেরন ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাড়ে ছয় হাজার সেনা সদস্যকে মিচোয়াচান রাজ্যে মোতায়েন করেন। সরকারি তথ্য অনুসারে, ওই বছর ১১ হাজার ৮০৬টি হত্যাকান্ড ঘটে, ২০১৬ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৩৪০টি। অপরাধীচক্র, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। মেক্সিকোর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের জীবিত বা মৃত খুঁজে পাওয়ার ছিল তখন মাত্র ২৫ শতাংশ। ব্রাজিল : মাদকের করালগ্রাস থেকে রেহাই পায়নি ব্রাজিলও। ব্রাজিলে ১৯৭০-এর দশকে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৪ সালে দেশটিতে প্রায় ৬০ হাজার হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কতটি হত্যাকা- মাদকসংশ্লিষ্ট তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে রিও ডি জেনিরো শহরের ৪৮০টি হত্যাকান্ডের মধ্যে ৪০০টিই ছিল মাদক সংশ্লিষ্ট।মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ব্রাজিলে মাদকবিরোধী যুদ্ধের পুলিশের অভিযান মানেই মৃত্যু। সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালেই ব্রাজিল পুলিশ ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। যদিও পুলিশ বরাবরই দাবি করে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জের ধরে। ফিলিপাইন : নিহতের গলায় কার্ডবোর্ডে লেখা থাকে, আমি একজন মাতাল। আমাকে পছন্দ করবেন না। সন্দেহভাজন মাদকসেবী ও বিক্রেতার লাশ অন্ধকারে, ব্রিজের নিচে ও ময়লার স্তুপে পড়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুয়াতে প্রায় দুই বছর আগে ফিলিপাইনের ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তার এই যুদ্ধ ছিল অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের নিহতের সঠিক সংখ্যা এমনকি পুলিশও জানে না। অনেক সময় লাশের সংখ্যা বাড়ছে কালুকান, মালাবন, নাভোটাস ও ভালেনজুয়েলা জেলায়। রাজধানী ম্যানিলা থেকে দূরে ঘনবসতিপূর্ণ এসব জেলা আবাসিক ও শিল্প এলাকা হলেও হত্যাক্ষেত্র হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। ফিলিপাইনে মাদকবিরোধী যুদ্ধে এ পর্যন্ত কতজন নিহত হয়েছেন তা নিয়ে গ্রহণযোগ্য কোনও তথ্য নেই। মানবাধিকার সংগঠন ও নিহতের পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। মানবাধিকার গোষ্ঠী, সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের নিহতের সংখ্যা নিয়ে পৃথক পরিসংখ্যান রয়েছে। সরকার নিজেই জানিয়েছে, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে মাদক সংশ্লিষ্ট হত্যাকান্ডের সংখ্যা ছিল ২০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৩৫৫টি হত্যাকান্ডের তদন্ত চলছে এবং ৩ হাজার ৯৬৭টি হত্যাকান্ড ঘটেছে পুলিশি অভিযানে। বাংলাদেশ : চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। এ বছরের ১৪ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানোর জন্য র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দেন। বাংলাদেশে এ ঘোষণার পর র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে অনেক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। আইন শৃখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি এরা সবাই মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত এবং পুলিশ বা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার কারণে পাল্টা হামলায় নিহত হয়েছে। থাইল্যান্ড : তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা মাদক বা ইয়াবা বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী ২০০৩ সালে ইয়াবা পাচার ও ব্যবহার বন্ধের উদ্দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম তিন মাসেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয় ২ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ। ইয়াবাকে থাইল্যান্ডে বলা হয় ক্রেজি ড্রাগস। ৩ লাখ ২০ হাজার মাদকসেবী চিকিৎসার জন্য আত্মসমর্পণ করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের করা কালো তালিকা অনুযায়ী গ্রেফতার ও হত্যাকান্ড চালানো হতো। আফগানিস্তান : ড্রোন দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয় আফগানিস্তানে। দক্ষিণ আফগানিস্তানের বিমান ঘাঁটিগুলোতে স্কোয়াড্রন এ-১০সি ওয়ারথগ থান্ডাররোল্ট জঙ্গি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন ও আফগান বাহিনীর যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে এগুলো দিয়ে তালেবানদের মাদক কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।সংগৃহিত।
সাম্প্রদায়িকতা চাই না
তসলিমা নাসরিন :ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস এবং ঘৃণা কখনও সুপ্ত, কখনও বিকটভাবে প্রকাশিত। আমরা ভুলিনি ১৯৪৬-এর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, নোয়াখালী দাঙ্গা, মালাবার দাঙ্গা, নাগপুর দাঙ্গা, নিলি দাঙ্গা, রাচি দাঙ্গা, ১৯৬৯-এর গুজরাত দাঙ্গা, ১৯৮৪-এর বিভান্দি দাঙ্গা, মীরাট দাঙ্গা, ভাগলপুর দাঙ্গা, নব্বইয়ের দশকে হায়দারাবাদ দাঙ্গা, বোম্বে দাঙ্গা, ২০০২ সালে ফের গুজরাত দাঙ্গা, গত কয়েক বছরে ক্যানিং দাঙ্গা, মুজাফফরনগর দাঙ্গা, কালিয়াচক দাঙ্গা। এইসব দাঙ্গায় হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই মৃত্যু ঘটেছে। হিন্দু আর মুসলমানের শান্তির জন্য, দাঙ্গা এড়াতে, মানুষের মৃত্যু এড়াতে, দেশকে ভাগ করা হলো। যখন রেলগাড়িতে চড়ে এপারের মুসলমান ওপারে যাচ্ছিল আর ওপারের হিন্দু এপারে আসছিল, তখন ১০ লাখ হিন্দু-মুসলমান খুন হয় পরস্পরের হাতে। মাঝে মাঝে মনে হয়, হিন্দু আর মুসলমান বোধহয় কোনও দিনই বন্ধুর মতো বা আত্মীয়ের মতো পাশাপাশি বাস করতে পারবে না। বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা হয় না ঠিকই, তবে সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনাচার নিরবধি চলতেই থাকে, ভয়ে সংখ্যালঘুদের অনেকেই দেশ ছাড়ে অথবা ধর্মান্তরণ করে। মুসলিম মৌলবাদিরা যেমন বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে যা নয় তাই করছে, হিন্দু মৌলবাদিরাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ভারতবর্ষে। সব দেশেই সংখ্যালঘুরা বিপন্ন বোধ করছে। বাংলাদেশ আর পাকিস্তান থেকে সংখ্যালঘুরা ভারতে পাড়ি দেয়। ভারতের সংখ্যালঘু কিন্তু ভারত ছেড়ে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে বসবাস করতে একেবারেই রাজি নয়। সম্ভবত তারা মনে করে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের চেয়ে কম অসহায় নয়। হিন্দু মুসলমানে দাঙ্গা হাঙ্গামা হিংসে হিংসির মধ্যেও এ ক’দিনে ভারতে কিছু অভিনব ঘটনা ঘটেছে। বিহারের সদর হাসপাতালে রাজেশ কুমার নামের এক ৮ বছর বয়সী থ্যালাসেমিয়ার রোগী ভর্তি হয়েছিল। রাজেশের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। রক্তের দরকার হয়। রাজেশের রক্তের সঙ্গে মেলে এমন রক্ত সহজে মেলে না। হাসপাতালের মেঝে পরিষ্কার করে আনোয়ার হোসেন নামের এক লোক, সে লোক খবর দেন বন্ধু আলম জাওয়াদকে। আলম জাওয়াদ ছুটে এসে নিজের রক্ত দেন রাজেশকে। আলমকে তার রোজা ভাঙতে হয় রক্ত দেওয়ার জন্য। আলমের রক্ত পেয়ে রাজেশ বেঁচে যায়। বিহারেরই দ্বারভাঙ্গায় এরকম আরো একটি ঘটনা ঘটে। খবর যা পেয়েছি, তা হলো—‘রমেশকুমার সিংহের স্ত্রী আরতিদেবী প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে এক নার্সিং হোমে ভর্তি হয়ে নবজাতকের জন্ম দেন। কিন্তু জন্মের পরেই নবজাতকের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাকে নার্সিংহোমের এনআইসিইউ-তে রাখা হয়। চিকিৎসকেরা পরিবারের সদস্যদের জানান, ওই সদ্যোজাতকে বাঁচাতে গেলে ‘ও নেগেটিভ’ গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন। সাধারণ ভাবে ‘নেগেটিভ’ গ্রুপের রক্ত পাওয়া সহজ নয়। পরিবারের চেনাজানা কারও রক্তই আবার ওই গ্রুপের নয়। পরিবারের সদস্যরা তাই গোটা বিষয়টি জানিয়ে ফেসবুক এবং বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আবেদন করেন। বিভিন্ন জায়গায় এসএসবি জওয়ানদেরও বার্তা পাঠানো হয়। গতকাল দ্বারভাঙ্গারই বাসিন্দা মহম্মদ আশফাক ফেসবুকে সেই আর্তিভরা বার্তা দেখেন। আশফাকের রক্তের গ্রুপ ‘ও নেগেটিভ’। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি রমেশ সিংহের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পৌঁছে যান নার্সিংহোমে। চিকিৎসকেরা তাঁকে পরীক্ষা করেন। কিন্তু রমজানের উপবাস থাকায় তাঁরা রক্ত নিতে পারবেন না বলে জানান। উপবাসের মধ্যে রক্ত দিলে আশফাকই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। নবজাতকের প্রাণ বাঁচাতে উপবাস ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। হাসপাতালেই খাবার খান। ফোনে আশফাক বলেন, ‘রোজা অন্য সময়ে ফের রাখা যেতে পারে। আসলে আল্লাই আমাকে দিয়ে এই কাজ করিয়ে নিয়েছেন।’ পরিবারের সদস্যরাও আশফাকের উদারতায় কৃতজ্ঞ। তাঁদের কথায়, ‘ধর্মের নামে ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করেন যাঁরা, তাঁরা আশফাকের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন!’ এই দুটো ঘটনাই আমাকে মুগ্ধ করেছে। হিন্দুর জন্য মুসলমান যুবকেরা নিজের রোজা ভাঙতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। মানবতার ধর্মের চেয়ে বড় কোনও ধর্ম নেই কোথাও। আলম জাওয়াদ আর মহম্মদ আশফাক নিজেরা ধার্মিক হয়েও অন্য ধর্মের লোকদের ঘৃণা তো করেনইনি, বরং তাদের দুঃসময়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন। ধর্মের সবচেয়ে বড় দিক মানবতা। মানবতা উধাও হয়ে গেলে ধর্মে যা থাকে, তা হলো নরক থেকে বাঁচতে বা স্বর্গের পথে যেতে প্রভুর স্তুতি গাওয়া। ধর্ম থেকে মানবতা উধাও হতে আমরা অনেক দেখেছি। কিন্তু ঘৃণা হিংসে অবিশ্বাস নিয়ে জীবনভর পাশাপাশি বাস করা যায় না। শিক্ষিত সচেতন সংস্কৃতিমান মানুষ কখনও একই জনগোষ্ঠীকে ধর্মবিশ্বাস ভিন্ন হওয়ার কারণে বিভক্ত হতে দিতে চাইবে না। দুই সম্প্রদায়ে মানবতার চর্চা না হলে দুই সম্প্রদায়ই ধ্বংস হবে একে অপরের অস্ত্রে। শুধু মুসলমানের মানবতাই নয়, হিন্দুর মানবতাও দেখছি ভারতবর্ষে। যশপাল সাক্সেনা যা করেছেন, তারও কোনও তুলনা হয় না। খবরে পেলাম—‘গত ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম দিল্লির রঘুবরনগরে নিজের বাড়ির কাছেই গলা কেটে খুন করা হয় তাঁর বছর তেইশের ছেলে অঙ্কিতকে। অঙ্কিত ফটোগ্রাফার ছিল, প্রেম করতো এক মুসলিম মেয়ের সঙ্গে। দুজনের এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি মুসলিম প্রেমিকার আত্মীয়রা। এ নিয়েই দুপক্ষে ঝগড়া চলাকালীন অঙ্কিতের গলায় ছুরি চালিয়ে দেয় মেয়েটির বাবা। এই খুনের সঙ্গে ধর্মকে জড়িয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টাও কম হয়নি। রুখে দাঁড়িয়েছিলেন যশপাল। ক্ষোভ জানিয়ে বলেছিলেন, তাঁর ছেলের খুনের ঘটনায় যেন সাম্প্রদায়িক রং না লাগানো হয়। এবার নিজে সম্প্রীতির বার্তা দিতে চান ছেলের নামে তৈরি ট্রাস্ট থেকে। যশপালের কথায়, ‘আমার ছেলেকে খুনে যারা দোষী, তাদের ধর্মের জন্য ওই ধর্মের অন্যদের কেন দায়ী করা হবে? আমি ও আমার স্ত্রী দু’জনেই অসুস্থ। আমাদের দু’জনকে তো রোজ সঙ্গ দেন, খাবার খাওয়ান আশপাশের বহু মুসলিম পড়শি। আমাদের পাশের বাড়ির ইজহার আলম এবং ওঁর ছেলে আজহারই আমাদের ইফতার পার্টির প্রস্তাবটা দেন। ওঁরা তো আমাদের পরিবারেই অংশ।’ ছেলে নেই। তবে তাঁর স্মৃতি যেন থাকে। তাঁর নাম যেন ছড়িয়ে যায় সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে। এই আশায় ৩ জুন ইফতার পার্টির আয়োজন করছেন দিল্লিতে নিহত অঙ্কিত সাক্সেনার বাবা যশপাল। মঙ্গলবার তিনি ফোনে বলেন, ‘অঙ্কিতের নামে ট্রাস্ট তৈরি করছি আমরা। এই অনুষ্ঠানেই সেটির পথচলা শুরু হবে।’ পুত্রহারা যশপাল মনে করিয়ে দেন, বন্ধু অঙ্কিতের শেষকৃত্যে যাবতীয় আচার পালন করেছিলেন আজহারই। আর এই বাস্তবকেই ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। যশপাল বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের ছেলের নাম সবার মনে থাকুক। সেটা কোনও ভাল কাজের মধ্যে দিয়েই সম্ভব। আর এজন্য তো আমাদের শক্ত হতেই হবে। প্রথমে ভেবেছিলাম ছোট আয়োজন হবে। কিন্তু এত ভাল সাড়া পাচ্ছি যে ঠিক করেছি, এলাকার কোনও পার্কেই ইফতার পার্টি হবে।’ যশপাল সাক্সেনা, মহম্মদ আশফাক, আলম জাওয়াদের মতো লোক আছে বলেই মনে হয় হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠা সম্ভব।বাংলাদেশেও হিন্দুদের ইসকন বা বৌদ্ধদের মন্দির রোজার সময় গরিব মুসলমানদের ইফতার খাওয়ায়। মুসলমানরা কি মসজিদ থেকে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের ধর্মীয় পরবে উৎসবে দান খয়রাত করেন? যদি দু’পক্ষ থেকেই মানবিকতার চর্চা হয়, তাহলে দু’পক্ষের ধর্মই মানবিক ধর্ম হিসেবে পরিচিত হবে। এটিই তো সভ্য হওয়ার লক্ষণ। ধর্মের কারণে যুদ্ধ বিগ্রহ অত্যাচার নির্যাতন হানাহানি কাটাকাটির ইতিহাস আমরা বইয়ে পড়েছি। হানাহানির ইতিহাসকে সম্প্রীতির ইতিহাসে পরিণত করতে শুভবুদ্ধির মানুষই পারেন। একে অপরের সাহায্যে আমরা পাশে দাঁড়াবো, রমজানের পবিত্র মাসে এ-ই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক। লেখক : নির্বাসিত লেখিকা। -বাংলাদেশ প্রতিদিন
তরুণ জনশক্তি হয়ে উঠুক মানবপুঁজি
সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রতিবছর বেকার থেকে যাচ্ছে। তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে দেশে বিনিয়োগ কম হওয়ায় শিল্প খাতে নতুন প্রকল্প হচ্ছে কম। সরকারি খাত বড় কিছু বিনিয়োগ হলেও এতে কর্মসংস্থানের গতি খুবই ধীর। অন্যদিকে দেশের আইটি খাতে চাহিদার তুলনায় বর্তমানে শ্রমিক কম রয়েছে ১৭ লাখ ২৭ হাজারের বেশি। সঙ্গে রয়েছে মধ্যম সারির কর্মকর্তা সংকটও। ফলে অনেক বেশি বেতনে বিদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি আনতে হচ্ছে বিভিন্ন সেক্টরে। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০ লাখ ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী পেশাজীবী বিভিন্ন এনজিও, তৈরি পোশাক, বস্ত্র খাতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। বছরে তারা বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন ২০ হাজার কোটি টাকা। ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ দেশে বেকারের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। তার মধ্যে শিক্ষিত বেকার হচ্ছে ২ কোটি ২০ লাখ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন বেসরকারি খাতে শ্রমিক ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের দরকার হয় ৭০ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতদের ৯০ শতাংশই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, যার সঙ্গে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা সর্ম্পক থাকে না। চাকরি বা সন্তোষজনক চাকরি পাওয়া নিয়ে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। অথচ শিক্ষা পরিচালনা কর্তৃপক্ষ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নতুন বিভাগ খুলছেন, কিন্তু এসব বিভাগের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা পরখ করে দেখছেন না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার উপাত্ত মতে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তি বছরে গড়ে ২ শতাংশ হারে বাড়ছে। এক হাজার শূণ্যপদের বিপরীতে এক লাখ মানুষের আবেদন পড়লে তা কাজের কথা নয়। সরকারের কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার ভূমিকা ছাড়া এই বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার যথাযথ রাষ্ট্রীয় নীতি, যা সব সরকারকে মেনে চলতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শুধু বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখবে না, তাকে সবারটাই দেখতে হবে। সকলের কর্মক্ষম শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা ১৯৭১ এর ত্যাগের মহিমাকে ধারণ করে নিজস্ব শক্তিমত্তার ওপর দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনায় না গিয়ে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, প্রশাসন সবকিছুর জন্য বিদেশিদের সাহায্যের ওপর নির্ভর করেছি। এতে শ্রেণি বিশেষের বিত্তবৈভব বাড়লেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান তেমন বাড়েনি। শিক্ষা হয়ে পড়েছে অর্জনমুখী, কর্মমুখী নয়। কর্মঅর্জন শিক্ষায় বিকল্পতার কারণে এখনও মোট জনগোষ্ঠীর এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ প্রায় চার কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে। আজও মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির আশায় নৌকা ভর্তি হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করছে। সচ্ছল জীবনের আশায় দেশের মেয়েরা মধ্যপ্রাচ্যে শেখদের হাতে দৈহিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, যা শুধু দুঃখজনক নয়, বিপুল আত্মত্যাগ পাওয়া স্বাধীন দেশের জন্য অমর্যাদাকর। এতকাল উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে শুধুই অভাবের কথা বলা হতো। এখন কিন্তু তা নয়। অর্থ এখন গৌণ। মূখ্য বিষয় শিক্ষার বিষয় বৈচিত্র্যতা। গতানুগতিক শিক্ষার ধারা থেকে বেড়িয়ে আসা। কর্মের হাতছানি দেওয়া শিক্ষাকে প্রতিপালন করা। অথচ আমরা দেখি ২০১৭ সাল বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে আরও অনেক গুরুতর চ্যালেঞ্জ রেখে গেছে, যেগুলো এ বছর এবং তারও পরে জাতির ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে। ক্রমেই এক অন্ধকারের মধ্যে আমরা প্রবেশ করছি। বিগত কিছু ঘটনা পর্ববেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, আমাদের জাতিয় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে পঙ্গু করতেই সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। এই আক্রমণ ভেতর ও বাইরে- দুই জায়গা থেকে হচ্ছে। আক্রমণ হচ্ছে আমাদের তরুণ সমাজের ওপর মাদক নামক হাতিয়ারের ব্যবহারের মাধ্যমে। আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাংক লুট আর হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচারের মাধ্যমে। কত হাজার কোটি টাকা এ পর্যন্ত পাচার হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো নির্লজ্জভাবে লুণ্ঠিত হচ্ছে। আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনও আছে। আমাদের তরুণদের লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত করছে। শুধু চাকরি করাটাই জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না। আমদের উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা অর্জন করা জরুরি। উদ্যোক্ত হওয়াটা নিজের নয়, সমাজ ও জাতির রাষ্ট্রকে এর জন্য শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, উপকরণ যোগানের ব্যবস্থা করতে হবে। সহজে ব্যাংক ঋণ সরবরাহ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র দেখি। যাঁরা ঋণ ফেরত দেবেন না, তাঁদেরই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। এটা আর্থিক খাতের সুশাসনজনিত সমস্যা, যার সমাধান করতে পারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকার। বর্তমান পৃথিবী দ্রুত পরবর্তনশীল, পরিবর্তনই তার একমাত্র নিয়তি। দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আনতে প্রতিনিয়ত আসছে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। এ কারণে প্রযুক্তিবিশ্বের কোন প্রযুক্তিগুলো শীর্ষে থাকবে, তা বলা কঠিন। তবে প্রযুক্তিবিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রিপ্টো-কারেন্সি ও স্বচালিত বাহন- তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্যোশাল মিডিয়া বিহেভিয়ার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তৃত ব্যবহার, ব্যবসায় ডিপ লার্নিং, এআই ও আইওটিভিত্তিক আর্থিক সেবা এবং অগমেন্টেড রিয়ালিটিতে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটবে। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাংকিং খাতে ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটির ব্যবহার বাড়বে। ইউরোপে লেনদেন সেবা নিয়ে নতুন নীতিমালা প্রকাশ করা হবে। এতে আর্থিক খাতের প্রযুক্তি বা ফিনটেকভিত্তিক স্টার্টআপগুলো ব্যাংক গ্রাহকদের তথ্য কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে। এতে ব্যাংকিং খাতে নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বছরটায় আমাদের ব্যবহার করা অনেক যন্ত্র যেমন চাবির রিং, স্মার্টফোন, ইন্টারনেটে যুক্ত গাড়ি, স্মার্টঘড়ি লেনদেনের যন্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হবে। ২০১৯ সালের মধ্যে ৫জি ফোন বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসেবে ৫জি নেটওয়ার্ক চালুর বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন করতে হবে ২০১৮ সালের মধ্যেই। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে ৫ জি নিয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে। পরীক্ষামূলকভাবে একাধিবার চালু করে দেখা গেছে, তাতে ৪জির তুলনায় ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি গতির ইন্টারনেট পাওয়া সম্ভব, যা ইন্টারনেট অব থিংসের ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দেবে। এখন শুরু হবে পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক। এবছর রাস্তায় নেমে আসবে রোবট। রেস্তোঁরা কিংবা হাসপাতালে মানুষকে সাহায্য করতে বা খাবার সরবরাহের কাজে রোবট নিয়ে কাজ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এ রোবটগুলো জিপিএস, সেন্সর ও ক্যামেরার সাহায্যে চলাচল করে। এর সংখ্যা বাড়বে এবছরে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলেজিন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছি আমরা। এই প্রযুক্তি দিন দিন শুধু যে উন্নত হচ্ছে তা নয়, একই সঙ্গে বাড়ছে এর ব্যবহারও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। আগে শুধু কিছু গেম এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য এ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন নিত্যনতুন প্রায় সব ধরনের প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপ কিংবা ডিভাইসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জুড়ে দেওয়ার হচ্ছে। এসবের সাথে সংযুক্তির মেলবন্ধন সমসাময়িক শিক্ষা দিকদর্শনভিত্তিক শিক্ষা বৈক্যলের ফলে তরুণের প্রতিভা ও মেধাশক্তি থাকলেও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে একধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি হয়েছে। তবে ঢালাওভাবে বিষয়টি সত্য নয়। সামাজিক, বৈজ্ঞিানিক, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা যেতে পারে যন্ত্রমানব সোফিয়াকে দেশে আনার মাধ্যমে একটা ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। সোফিয়াকে আনার পর আমরা জানতে পেরেছি, আমাদের মেধাবী তরুণরা ডিজিটাল বাংলাদেশের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছে। আমাদের মতো দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ডিপ্লোমা শিক্ষার অভাব। এটা না থাকায় দেশে প্রযুক্তিদক্ষ লোকবলের অভাবে কাক্সিক্ষত হারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না। পণ্য ও পেশাভিত্তিক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ নিশ্চিত করতে পারে সরকার। সরকার যদি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তাহলে বেকারত্ব সমস্যা এমনিতেই অনেকটা ঘুচে যাবে। এটাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। অন্যদিকে আমাদের মধ্যবিত্তের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনা জরুরি। তাদের ছেলে মেয়েরা যেন ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয়। ক্ষুদ্র ভূখ-ের অধিক জনসংখ্যার ঘনবসতির এই দেশকে গড়ে তুলতে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হবে প্রতিটি তরুণকে। আজ ও আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণদের মধ্যে এর ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যেখানে নেতিবাচক বিষয়গুলো হবে নির্বাসিত। শিক্ষাও প্রযুক্তিকে উপেক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে বিশ্ব। এই বিপ্লবের প্রধান হাতিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি। আর তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছে সরকার। এই কার্যক্রম আরও বেগবান করতে ডিপ্লোমা শিক্ষাকে তৃণমূলে প্রসার ঘটাতে হবে। প্রতিবছর ১৪ লক্ষ তরুণ এসএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়। এরমধ্যে ১১ লক্ষই গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, জেলে, তাঁতী, কামার, কুমারের ছেলে। তারা দুর্গম হাওর, বাওড়, দ্বীপ, উপকূল, বরেন্দ্র, পাহাড়, পর্বত সীমান্তের অধিবাসী। তাদের মেধা ও মণনে শহরের আলালের দুলালের চেয়ে কম নয়। তাদের রোগ প্রতিরোগ ক্ষমতা বেশী। সামান্য সোহাগ ভালবাসা দিক নির্দেশনা অর্থ ও মামার জোরের অভাবে তারা সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। অথচ গ্রামকে ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করা হয়। তারা শহরমুখী হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। গ্রামে যদি গ্রাম বাংলার গর্বিত সন্তানদের সম্মান ও কদর না থাকে তাহলে তারা গ্রামে যাবে কেনো? মনে রাখতে হবে গুণীর কদর যে সমাজে নেই সে সমাজে গুণী জন্মায় না। তারপরও নাড়ির টানে আমাদেরকে গ্রামে যেতে হবে, গ্রামকে বাঁচাতে হবে, রক্ষা করতে হবে গ্রামের পরিবেশকে। আমাদের অনিন্দ্য-সুন্দর গ্রামগুলোকে সব দিক থেকেই এগিয়ে নিতে হবে। এছাড়া যে আমাদের গত্যন্তর নেই। গ্রামের অপরিচিত ছেলে মেয়েটাই ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণ করে কদিন পরে হয়ে উঠতে পারে তুমুল জনপ্রিয় কেউ। আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা, প্রতিভা আর পরিশ্রম সব কিছু দিয়ে চমকে দিতে পারে সবাইকে। প্রত্যয়ী এই তরুণদের নিজেকে তুলে ধরার মঞ্চ তেরি করার সময় এখনই। গ্রামের অধিকাংশ তরুণকে ডিপ্লোমা শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণ করে নিজ গ্রামে শিল্প খামার, হাসপাতাল ক্লিনিক স্কুল গড়ে তোলার আদর্শে প্রনীত হবে। বেকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে নারী, পুরুষ, প্রতিবন্ধী সবার জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষা। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে ১০টি সরকারি/বেসরকারিভাবে কৃষি, ভেটেরিনারি, লেদার, পলিটেকনিক, টেক্সটাইল, মেডিক্যাল টেকনোলজি, নার্সিং, ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি অ্যাডুকেশন, মেডিকেল ও ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইনস্টিটিউট স্থাপনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষা-দীক্ষা ব্যবসা-বাণিজ্যে গ্রামগুলোতে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসবে। পূরণ হবে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা। খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লে¬ামা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ। Khanaranjanroy@gmail.com
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নির্দ্রিষ্টকরণ তবেই শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন
শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদ- তেমনি শিক্ষক হলেন শিক্ষার মেরুদ-। শিক্ষকদের মাধ্যমেই শিক্ষার বাস্তব রূপ ফুটে উঠে। শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের মূল কারণ শিক্ষক। প্রত্যেক শিক্ষার্থী শিক্ষকের দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষার্থীদের অনুসরণ ও অনুপ্রেরণার জীবন্ত উৎস হলেন শিক্ষক। শিক্ষকের জ্ঞান-প্রতিভা, আচার-ব্যবহার, অঙ্গ-ভঙ্গী শিক্ষার্থীর অবচেতন মনে দাগ কেটে যায়। শিক্ষার্থীরা সবকিছু সরলভাবে গ্রহণ করতে চায়, সেই অর্ধগঠিত ও অস্থির চিত্তকে সঠিক পথে চালিত করার গুরুদায়িত্ব শিক্ষকের উপরই ন্যস্ত। একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিতে তিনিই হতাশায় বাতি জ্বালিয়ে ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। তাই একজন আদর্শবান ও জ্ঞানী শিক্ষক যেমন জাতি গড়ার কারিগর, তেমনি আদর্শহীন শিক্ষক দেশকে রসাতলে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। বস্তুত শিক্ষকের জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতার উপরই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা দেশের উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নির্ভরশলি। বিশিষ্ট বিশ্লেষকগণ ইংরেজি TEACHER শব্দকে এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন- T- Talent, Truthful, Trained E- Education, Energetic, Effective A- Ameable, Active, Adoptibility, Artist C- Creative, Character, Concious, Courtisy H- Honest, Helpful, Humble, Healthy E- Efficient, Equity, Emotional R- responsible, Religious, Reader, Regularity, Resercher. একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রথম ও অপরিহার্য বৈশিষ্ট হল তিনি যে বিষয়ে শিখাবেন সে সর্ম্পকে গভীর জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী হবেন। সংশ্লিষ্ট বিষয় সর্ম্পকে তিনি শুধু জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না বরং তিনি সে বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ হবেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সর্বশেষ (Up to date) সব আবিস্কার সর্ম্পকে তিনি ওয়াকিবহাল থাকবেন। জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাদান অবিচ্ছেদ্য। প্রকৌশলী যেমন মজবুত ও মানসম্পন্ন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দেশের কাছে দায়বদ্ধ, তেমিন শিক্ষকও জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে উন্নত জাতি গঠনে দায়বদ্ধ। একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন বইমুখী, অধ্যয়নপ্রিয় ও অনুসন্ধিৎসু। তাঁকে হতে হবে আনন্দের মাধ্যমে শিখানোর বিষয়ে প্রাজ্ঞ ও যত শীল। তিনি পড়ানোর মাধ্যমটিকে আনন্দময় করে তুলবেন। কেবল চাকরির খাতিরে দায়িত্ব পালন না করে তিনি তাঁর কাজে আন্তরিকতা ও নিপুণতা প্রদর্শন করবেন। ইদানিং মানসম্মত শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে, যা এখন সময়ের দাবি। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭নং ধারায় রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষালাভকে জনগণের একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, সরকারিভাবে মুখে যতটা শিক্ষার মনোন্নয়নের কথা বলেছে, কাজের কাজ কিন্তু কিছুই হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প নেই। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতা পুননির্ধারণ প্রয়োজেন। প্রশিক্ষণ সাফল্য অর্জনের মূল হাতিয়ার। পেশাজীবনে প্রবেশের পূর্বে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, শিক্ষাজীবন শেষ করার পর পেশাজীবনে প্রবেশের আগেই শুধু প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক এ সময়ে চাকরিরত অবস্থায়ও পেশাজীবনে উন্নতির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগনীতিমালায় ৪ (চার) বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি অ্যাডুকেশন ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা আছে। তারা প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা অনুপাতে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশে ৮৭ হাজার ৬৪২ টি সরকারি/বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন এবং ১৮ হাজার ৪১২ টি মাদ্রাসার জন্য ২৯ টি প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কোর্সের মেয়াদ মাত্র ১৮ মাস। শিক্ষাক্রম পরিচালনা করে ময়মনসিংহস্থ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (ন্যাপ)। ১৮ মাসের প্রশিক্ষণ আমাদের দেশের অন্যান্য পেশাগত শিক্ষাক্রমের সাথেও বেমানান না হাতুড়ে না ডিপ্লোমা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সার্টিফিকেটের কোন মূল্য নেই। পৃথিবীর কোন দেশেই ন্যাপ পরিচালিত সনদ প্রদর্শন করে চাকরি কিংবা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা যায় না। ২৯ টি পিটিআই দ্বারা জাতির আশা আকাক্সক্ষা পূরণ হচ্ছে না। অবৈজ্ঞানিক ও অগ্রহণযোগ্যভাবে Diploma in Primary Education কোর্সের মেয়াদ দেড় বছর। ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষে প্রথম সাতটি বিভাগীয় প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে Pilot Project হিসেবে এই Course চালু হয়। বর্তমান আরও ২২টি পিটিআই-তে এই কোর্স চালু হয়েছে। প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, নৈতিক, মানবিক এবং সাংস্কৃতিক গুণাবলিসম্পন্ন এবং ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। এখানে লক্ষণীয় যে, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণের আগে ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্যও প্রশিক্ষণ খুব জরুরি। কেননা একজন শিক্ষক যতই শিক্ষিত হোক না কেন তার নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ এবং আচরণ সঠিক না হলে তিনি শিক্ষার্থীকে সঠিক জ্ঞান দিতে বা মহৎ করে তুলতে পারবেন না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীকে যতটা প্রভাবিত করতে পারেন, অন্য কেউ এমনকি শিক্ষার্থীর পরিবারের আপনজনও তা পারেন না। তাই ১৮ মাসের শিক্ষক প্রশিক্ষণে প্রাইমারি শিক্ষকদের প্রকৃত শিক্ষক হতে বাধাগ্রস্থ করছে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বাতিল করে নিয়মিত শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। দেড় বছর মেয়াদি অগ্রহণযোগ্য কোর্স বাতিল করে আন্তর্জাতিকমানের ৪ (চার) বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন কোর্স চালু করতে হবে। পিটিআই নাম পরিবর্তন করে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স (IPT) করতে হবে। প্রাইমারি স্কুলগ্রামী ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা, স্কুলের সংখ্যা এবং শিক্ষকদের পদ বিবেচনা করে আনুপাতিক হারে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স সংখ্যানুপাতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উপজেলাভিত্তিক সরকারি বেসরকারিভাবে একাধিক ইপিটি প্রতিষ্ঠার প্রদক্ষেপ নিতে হবে। আপদকালীন প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের পদ পূরণে মর্ণিং, ডে, ইভিনিং, নাইট চার শিফট শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে ব্যর্থ ময়মনসিংহস্থ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী কর্র্তৃক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন কোর্স পরিচালনার জন্য পৃথকভাবে ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠাই হতে পারে এর বুদ্ধিদীপ্ত ন্যায়সংগত সহজ সমাধান। লেখক: খন রঞ্জন রায় Khanaranjanroy@gmail.com
ধণীর সন্তান সুকান্ত গরিবেরটি ক্যবলাক্যান্ত
ধণীর সন্তান সুকান্ত গরিবেরটি ক্যবলাক্যান্ত টোকাই ও বলা যায়। তেমনি গরিবের বউ সকলের ভাবি, ধণীর বউ ম্যাডাম। হায়রে বিধি কেমন তোমার বিধান মানুষে মানুষে হেথা আজ কত ব্যবধান। আসলে এখানে ছোটর নেই কোন স্থান, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,তের চৌদ্দ বছরের ছেলেরা বলাই আমিতো বলি ভালই, কেন তা পরে বলবো। কবি গুরু বলেন,তাদের কাচামাখা কথা ন্যাকামি আর আধাপাখা কথা জ্যাটামি সব দোষ যেন তাদের। আহারে বাঙ্গালী আসলে আমরা যেন সবাই কাঙ্গালী তাই দিন বন্ধু মিত্রনিল দর্পন নাটকে বলেছেন কাঙ্গালির কথা বাসি হলে ফলে। কত বাসী? পুরান চালের ভাত বাড় পুরান কথা তর্কে সার, অত টাইম কারো নাই। তবে সব্জি দুয়েক বেলায় বাসী হলে মজে ভালো তাই মজাও হয় ভালো। এখন আবার প্রেশার কুকারের যুগ চাপ দিয়ে তরকারি মজিয়ে ফেলে তাই বাসী হওয়ার আর দরকার হয় না। তাই তো যুক যার মুল্লুক তার- আর কথাটি সার্থক দেখুন না,বস ভুল করলে হয় অভিঞ্জতা আর কর্মি করলে অঞ্জতা। বসের কথা বানী কর্মির কথা পানি। আসলে ছোট যেন সব জায়গায় অবহেলিত। এটি ঠিক না, আমরা দেখি ইশফের গল্পে ক্ষুদ্র ইদুর বিশাল সিংহকে বাচিঁয়েছে,পিপড়ে ঘুঘুকে বাঁচিয়েছে। আবার ভিখারির ছেলেকে রাজা হতে দেখেছি এবং রাজার ছেলেকে দেখেছি ভিখারি হতে। তাই ছোট বলে কখনো অবহেলা করতে নেই। যেহেতু গরিবের বউ একাধটু ঠাট্টা-মশকারা তো সবাই করবে। তাই বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মোটেই উচিত না। সকলকে আবশ্যক জ্ঞান করা ভালো। এক সময় আমাদের দেশে একটি গান বড় চাউর হয়েছিল, রিক্সাওয়ালা বলে কাকে তুমি আজ ঘৃণা কর। এর পর হতে দেখলাম মানুষের রুচিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অনেক খানদানি লোক দেখলাম বিউটি পার্লারের নাম দিয়ে নাপিতের কাজ করছে, পল্ট্রি নাম দিয়ে মুরগী দোকান, ডেইরি নাম দিয়ে গোয়ালার কাম,এমনকি মিট শপ নাম দিয়ে কসাই কাজ পর্যন্ত করছেন। অথচ এক সময় ছিলো খানদানি লোকেরা ডাক্তারি করতেন না আর আজ ডাক্তারি হলো এক নম্বর পেশা!যুগে যুগে অবশ্য নেশা পরিবর্তন আসে পেশার পরিবর্তন আসে, তেমনি রুচির ও পরিবর্তন আসে কিন্তু ছোটকে অবহেলা-এটি এখনো তেমন পরিবর্তন হয়নি। কথায় বলে ছোটর জায়গা যেখানে সেখানে,বড়র জায়গা নেই কোনখানে। কথাটি কত টুকু ঠিক জানি না। তবে আমরা দেখি সব খানে বড়রাই আগে জায়গা করে নেই। আরো বলে, বড় হবি তো আগে ছোট হ! এখন কত ছোট হবো, ইজ্জত-সম্মান সব ফেলে দিয়ে? একটি কৌতুক মনে পড়ে গেল ঃ মালিক ভৃত্যকে বলেছেন, বুঝলি গেঁদা; বড় হতে গেলে নিজেকে আগে ছোট হতে হয়। গেঁদা; কত ছোট? মালিক; যত ছোট হলে নিজেকে তোর আর মানুষ বলে মনে হবে না। গেঁদা; তাহলে কী বলে মনে হবে? মালিক; মনে হবে তুই আস্থ একটা পশু! গেঁদা; তা কেমনে? মালিক; তাতো তুই ঠিক করবি। গেঁদা; পড়লো মহাভাবনায়। তার পর একদিন পুরো দিগম্বর হয়ে মালিকের সামনে হাজির! মালিক বিষ্মিত হয়ে, এটি কি? গেঁদা; কেন, আপনি বলেছেন পশু হতে তাই পশু হয়েছি, একমাত্র পশুরাই তো কাপড় পড়ে না! তেমন বড় অবশ্য আমরা হতে চাই না, কারণ এতে সম্মান নেই। পৃথিবিতে অর্থ আয়ের অনেক উপায় আছে তাই বলে বউ বেটি ভাড়া দিয়ে অর্থ আয় কারো কাম্য নয় বড় হওয়ার ও তেমন অনেক উপায় আছে তবে তা সম্মানের সহিত হতে হবে। তাই বড় হওয়ার জন্যে ছোট অবশ্যই হবো তবে তা সম্মানের সাথে।
২০১৭ সালে যাদেরকে হারিয়েছি
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যারা রাজনৈতিক মাঠ জমজমাট রাখতেন। হামলা-মামলা দিয়ে যাদেরকে ধমিয়ে রাখা যায়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত রাজনীতি করেছেন। দল ও দেশের কল্যাণে আত্মপ্রত্যয়ী সেসব রাজনৈতিক নেতাদের হারিয়েছি ২০১৭ সালে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীন নেতার মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক অন্যতম। প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক: শনিবার (১৬ ডিসেম্বর) সকাল ৮টা ৩৯ মিনিটে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মুহাম্মদ ছায়েদুল হক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান প্রবীণ এই নেতা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: গত ৫ ফেব্রুয়ারি দেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মারা গেছেন। যিনি জাতীয় সংসদে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাতবার। ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সুরঞ্জিত রক্তে হিমোগ্লোবিন স্বল্পতাজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। রাজনীতিতে রয়েছে তার বর্নাঢ্য ক্যারিয়ার। মন্ত্রী পরিষদের সদস্যও ছিলেন তিনি। মেয়র আনিসুল হক: গত (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২৩ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। এই অল্প সময়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ঢাকাবাসীর মন জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা। এরপর তাঁকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তাঁর কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে মেয়রের পরিবারের একজন সদস্য বলেন, রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁকে আবার আইসিইউতে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাতে মেয়রকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী: আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতা ও চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা গেছেন। চট্টগ্রাম নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মুত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭৪ বছর। হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত মহিউদ্দিনকে গতমাসে সিঙ্গাপুরে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। অবস্থার একটু উন্নতি হলে ঢাকা থেকে দুদিন আগে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু সেই উন্নতি স্থায়ী হয়নি। সাবেক এই মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামবাসীর প্রিয় মানুষ ছিলেন। গোলাম মোস্তফা আহমেদ এমপি: গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা আহমেদ সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল পৌনে নয়টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ। গত ১৮ নভেম্বর (শনিবার) টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন এমপি গোলাম মোস্তফা। এরপর তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। উল্লেখ্য, ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার নাটিয়াপাড়ায় বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে আহত হন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফাসহ চারজন। নুরুল ইসলাম খলিফা: গত বুধবার (১১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬ টার সময় শহরের কাপুড়িয়া পট্টি নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঝালকাঠি জেলা শাখার উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য, প্রবীণ রাজনীতিক ও ঝালকাঠি চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোঃ নুরুল ইসলাম খলিফা (৮০। আছর বাদ জানাযা নামাজ শেষে পশ্চিম ঝালকাঠির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে। ইসহাক মিয়া: গত (২৪ জুলাই) সোমবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সাবেক গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইসহাক মিয়া (৮৮) ইন্তেকাল করেছেন। আবদুর রশিদ জব্বার: গত মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টায় তার নিজ বাড়িতে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আবদুর রশিদ জব্বার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। এছাড়াও জেলা, উপজেলা পর্যায়সহ আওয়ামী লীগ ২০১৭ সালে প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে হারিয়েছেন। দলের জন্য তাদের অবদান কখনো ভুলবার নয়। তারা আজীবন বেঁচে থাকবেন আওয়ামী লীগের ও দেশের মানুষের মধ্যে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বিজয়ের বাংলাদেশ
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ইতিহাস থেকে এ নাম কখনো মুছে যাবে না। কর্মের মাঝে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অমর হয়ে থাকবেন বাঙালির ইতিহাসে হাজার-লক্ষ-কোটি বছর। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এই নামে সমগ্র বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সম্প্রতি ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটিকে ইউনেসকো কর্তৃক স্বীকৃতি প্রদান করায় বিশ্বব্যাপী আবারও আলোচিত হলো বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মহান স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বিজয়ের বাংলাদেশ প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি সম্মান ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত হিসেবে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম করে বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে আজো তিনি মিশে আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি। তাই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। যতদিন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালির ইতিহাস থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন অমর অবিনশ্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিরূপে বঙ্গবন্ধু থাকবেন চিরজাগ্রত। রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইউএসবির (টঝই) ভাষায় বঙ্গবন্ধু । সভ্যতার শুরু থেকেই বারবার মানবতা হয়েছে ভূ-লুণ্ঠিত। শোষক ও শোষিতের ব্যবধান বেড়েছে। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে শোষণের মাত্রা। হোক তা প্রাচ্য কি তার বিপরীত গোলার্ধ। তাই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের উপর অমানুষিক নির্যাতন বন্ধে, মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন পড়েছিল একজন মার্টিন লুথার কিং বা ম্যালকম ম্যাক্সের। ঠিক তেমনি বাঙালিদের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সীমাহীন বৈষম্য রোধ করতে দরকার হয়েছিল একজন শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহানায়কের। পাকিস্তান কেবল অর্থনৈতিকভাবে আমাদের শোষণ করতে চায়নি, বরং তাদের আগ্রামী হাত দিয়েছিল আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ, শিক্ষা ইত্যাদির উপর। সামরিক স্বৈরশাসনের শাসনের মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ, অনিশ্চয়তা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে যখন বাঙালিদের এরা হাতে ধরা সুতোয় পুতুলের মতো নাচাতে চেয়েছিল, ঠিক তখনই স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন নিষ্ঠা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, একাগ্রতা, সাহসিকতায় এবং সর্বোপরি দৃঢ়তায় এই বজ্রকণ্ঠস্বরধারী মানুষটি। বাঙালির স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সেই ঐকান্তিক প্রয়োজনের সময়। বঙ্গবন্ধু বরাবরই অটল থেকেছেন তাঁর নীতিতে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন অহিংস পন্থায় বাঙালির অধিকার অর্জনের এ আন্দোলনে সফল হতে। তাই দেখা যায়, ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ক্ষমতা তাদের না দেওয়ার পরও তিনি সহিংসতায় না গিয়ে তিনি ভুট্টোর ক্ষমতাভাগের দাবির তীব্র সমালোচনা করেন। যুক্তিসঙ্গত দাবি না মানার পর পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়াতেই ৭ মার্চ তাঁকে রচনা করতে হয় বাঙালির জীবনের এক অনন্য সাধারণ মানব মুক্তির কবিতা। ১৯৬৩ এর ২৮ আগস্ট বর্ণবাদী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং এর সেই আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম মহাকাব্যের পর আরো একটি মহাকাব্য রচিত হয় ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য তাঁর ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য রচনার মাহেন্দ্রক্ষণ যা দিয়েছে আমাদের লাল সবুজের পতাকার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনব্যাপী একটিই সাধনা করে গেছেন, তা হলো বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা। তাঁর এই সাধনার শুরু ১৯৪৮ থেকে। তাই ১৯৪৮-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে গঠন করেছিলেন ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯-এর জুনের ২৩ তারিখে আওয়ামী লীগ। সেই থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি আন্দোলনকে সুপরিকল্পিতভাবে নেতৃত্ব প্রদান করে ধাপে ধাপে এগিয়ৈ নিয়ে গেছেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিরেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান্ বাল্যকাল ও কৈশোর থেকেই যে সংগ্রামের শুরু, তা থেমে থাকেনি। বরং কালক্রমে তা বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়ে সমগ্র বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের এক মহৎ প্রচ্ছদপট এঁকে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহামানব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। তিনি তো সবসময় বলতেন, এমনকি দু-দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি বলেছেন, ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলল, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। বিশাল হৃদয়ের মহৎ মনের মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের সবকিছুই জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। সরল সাদামাটা জীবন ছিল তাঁর। রাষ্ট্র ক্ষমতার আসীন হয়েও ছিমছাম আর আটপৌরে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন। একবার এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, একজন মানুষ আর কী চাইতে পারে, আমি যখন ভাবি দূরে এক জনশূন্য পথের ধারে আধো আলো-ছায়ায় এক লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমাকে এক নজর দেখবে বলে, তখন মনে হয়, একজন মানুষের পক্ষে আর কী চাওয়া-পাওয়ার থাকতে পারে। নিরন্ন, হতদরিদ্র, মেহনতী মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল প্রগাঢ় ভালোবাসা। তা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর প্রতিটি কর্মে ও চিন্তায়। ১৯৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর, আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত, শোষক ও শোষিত। আমি শোষিত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল সারাংশ ছিল শোষণ-নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি অর্থাৎ শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। সেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ১৯ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু সেই স্বপ্নই দেখিয়েছিরেন ৭ কোটি বাঙালিকে। তিনি দেখিয়েছিলেন এদেশের নিপীড়িত শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নেই বাঙালির মনে জাগ্রত করেছিল অদম্য স্পৃহা। আর সেই ভিত্তিতেই দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালির রক্ত আর অগণিত মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় সেই কাক্সিক্ষত মুক্তি মহান স্বাধীনতা। শুরু হয় বাংলাদেশ নামের দেশের নতুন যাত্রা। বাংলাদেশের মহান রাষ্ট্রপতিরূপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যাত্রা। সোনার বাংলার সোনার মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের রাষ্ট্রপতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি সমগ্র বাংলাদেশে কাজ করে চলেছিলেন। বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিকের হাতকে শক্তিশালী করে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য এগিয়ে চলছিলেন। তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী ঘাতক সেনাসদস্যদের গুলিতে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির এগিয়ে চলাকে যবনিকা ঘটার চেষ্টা চালায়। কিন্তু না, যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে দেখিয়েছিলেন সেই স্বপ্ন কি স্বপ্নই থেকে যাবে? না, বাঙালি জাতি আবারও এগিয়ে চলল। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিরূপে দেশে প্রত্যাবর্তন করে জনগণের হাতকে শক্তিশালীরূপে ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়ে নেত্রীকে বিজয়ের মালা পরিয়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী করেছেন জনগণ। সে শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য জীবন-মরণ বাজি রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শতবাধা ডিঙিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপে প্রতিষ্ঠা করে বর্তমানে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর স্বপ্ন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া। এই যাত্রা শুভ ও সফল হোক। লেখক:লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই, বিশিষ্ট মরমী গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর