বুধবার, এপ্রিল ২১, ২০২১
ধর্ষনের অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচারের জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল আবশ্যক
১৪,ডিসেম্বর,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তিন মাসে ২৫৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৫০টি ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। ১২ জন নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। আর চার জন নারী ধর্ষণের পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ৪০০টি। এ তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ধর্ষণের হার ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে প্রায় চার জন নারী-শিশুকেই ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে, যা স্মরণকালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে সব সরকারি অফিস ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদফতর সমগ্র বাংলাদেশকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে ঘরে থাকার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিদিন দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের জনগণ প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও ধর্ষণ থামেনি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই জামালপুরে করোনা আক্রান্ত রোগী তল্লাশির নামে পুলিশ পরিচয়ে ঘরে ঢুকে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। গত ৫ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জে ত্রাণ দেয়ার নাম করে ১০ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ৭ এপ্রিল বরগুনার তালতলীতে এক দিনমজুরের মেয়েকে ত্রাণের কথা বলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। গত ৯ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ৯ বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। সর্বশেষ গাজীপুরে এক প্রবাসীর স্ত্রী ও দুই মেয়ে এবং এক ছেলে হত্যার ঘটনায় জানা যায় যে, হত্যার পূর্বে প্রবাসীর স্ত্রী ও দুটি শিশু মেয়েকে ধর্ষণ করা হয় এবং আসামিদের মধ্যে দুজন ছিল বাবা-ছেলে। কত ঘৃণ্য মানসিকতার ও বর্বর হলে বাবা-ছেলে মিলেও ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না! এতক্ষণ বাংলাদেশে ধর্ষণের সার্বিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এবার আইনগত বিষয়ে আসা যাক। ২০০০ সালের আগে বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার হতো ১৮৬০ সনের দন্ডবিধি অনুযায়ী। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও বৃদ্ধি পায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। বেড়ে যায় যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ অপহরণের ঘটনা। এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা প্রকাশিত হলেও বেশিরভাগ ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় লোকলজ্জার কারণে। এসব ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমন করার জন্য সরকার ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন নামে বিশেষ আইন পাস করে। এই আইনের আওতায় ৫৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে গঠিত হয় ৪১টি এবং সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুতে অর্থাৎ আরো ছয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছয়টি মিলে এখন দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা হবে ১০১টি। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের ট্রাইব্যুনালে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল যদি ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার কারণ সংবলিত একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করতে হবে। যার একটি অনুলিপি সরকারকেও দিতে হবে। তাছাড়া এক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে কারণ উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করবেন। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ছাড়াও নারী পাচার, শিশু পাচার, নারী ও শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচণা, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দাহ্য পদার্থ দ্বারা জখম বা মৃত্যু ঘটানো ইত্যাদি অপরাধের বিচার করা হয়। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের চলতি সময় পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মামলা বিচারাধীন আছে। অর্থাৎ এসব মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক হাজার ৭০০টি। ফলে ধর্ষণ ও এ সংক্রান্ত মামলাসমূহ প্রত্যাশিত হারে দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি সম্ভবপর হচ্ছে না। অথচ ধর্ষণ এমন একটি জঘন্য অপরাধ যাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করাও অযৌক্তিক হবে না। এই জঘন্য অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচার করা উচিত। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার উত্তরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র ধর্ষকের দ্রুত বিচার দাবিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এমনকি জাতীয় সংসদে কয়েকজন সংসদ সদস্য ধর্ষণ নির্মূলে ক্রসফায়ার দাবি করেন। যদিও এর কোন আইনগত ভিত্তি নেই। কিন্তু জনগণ চায় দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে পৃথক আইন পাস করে পৃথক ট্র্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা। এবার আলোচনা করা যাক প্রস্তাবিত আইনে কোন কোন বিষয় থাকা উচিত। আইনে বলা থাকতে পারে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে একটি করে পৃথক ট্রাইব্যুনাল হবে। জেলা জজ পদ মর্যাদার একজন বিচারক হবেন এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক। এই ট্রাইব্যুনাল কেবল ধর্ষণ ও ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধসমূহ বিচার করবে। যে সংস্থার হাতেই তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হোক না কেন; তদন্তের সময়সীমা ১০ দিন পর্যন্ত বেঁধে দেয়া যেতে পারে এবং তদন্ত কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। আর বিচার শেষ করে দুই মাসের মধ্যে ট্রাইব্যুনালকে রায় দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হবেন অবশ্যই একজন নারী আইনজীবী। আইনে বলে দিতে হবে, এই ধরনের ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালীন অভিযোগকারী পক্ষ এবং আসামী পক্ষ এবং উভয়পক্ষের আইনজীবী ছাড়া অন্য কেউ আদালত কক্ষে থাকবে না। সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে এ ধরনের মামলার তদন্ত তদারকি করার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে এবং তিনি খেয়াল রাখবেন যাতে নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে এ ধরণের মামলার তদন্তভার দেয়া হয়। নারী পুলিশ কর্মকর্তা পাওয়া না গেলে যাতে সবচেয়ে দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে তদন্তভার দেয়া হয়। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও গত বছর তদন্ত ও বিচারের জন্য খুব সংক্ষিপ্ত সময় দিয়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণ সংক্রান্ত মামালাসমূহ বিচারের জন্য অন্ধ্রপ্রদেশ দিশা এ্যাক্ট, ২০১৯ নামে নতুন আইন পাস করা হয়। বাংলাদেশে ধর্ষণের যেসব মামলায় বিচার হয়েছে, তার মধ্যে দ্রুততম সময়ে বিচারের উদাহরণ হলো টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে কলেজছাত্রী ধর্ষণের মামলা। উক্ত ঘটনায় দ্রততম সময়ে অর্থাৎ মামলা দায়েরের ১৭১তম দিনে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে রায় প্রচার করা হয়। রায়ে চারজনের ফাঁসি, একজনকে দেয়া হয়েছে সাত বছরের কারাদন্ড। অন্তত বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলে এভাবে প্রত্যেকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলা দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হবে। এতে কিছুটা হলেও সম্ভাব্য আসামিরা ভয় পাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় আমরা অঙ্গীকার করেছি আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। সেই অঙ্গিকার মাথায় রেখে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধানসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য সরকার এবং জনগণকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনই হবে মূলমন্ত্র।- লেখক: শেখ সাদী রহমান, সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা
বিনম্র শ্রদ্ধায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ
১৩,ডিসেম্বর,রবিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অগণিত প্রাণের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের রাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশ। যুদ্ধের পেছনে আছে দীর্ঘ সংগ্রাম। ছাত্ররা, শ্রমিকরা সংগ্রাম করেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে সব মানুষ সংগ্রাম করেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের বিজয়।বিজয়ের মাসের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতি আজ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করছে। প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এদিন বাংলার সূর্যসন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। যখন পরাজয় সুনিশ্চিত তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একে একে হত্যা করে এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের। এদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক, লেখক, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রকৌশলীসহ নানা পেশাজীবী। দেশকে মেধাশূন্য করার পৈশাচিক পরিকল্পনা নেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে মাস্টারমাইন্ডের ভূমিকায় ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সঙ্গেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫ মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী আলবদর এবং আল-শামস বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে। যেখানে এসব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।মুক্তিবাহিনী যখন বীরবিক্রমে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ একের পর এক উড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন দিশাহারা হয়ে পড়ে বর্বর পাকিস্তানিরা। পরাজয়ের চরম প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে ওরা। আঁকে নতুন ছক।এর আগে ডিসেম্বরের ৪ তারিখ থেকে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন হয়। অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখকসহ চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসররা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। ওই দিন প্রায় ২০০ জনের মতো বুদ্ধিজীবীকে তাদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, রাজারবাগসহ অন্যান্য আরও অনেক স্থানে অবস্থিত নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ওপর বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাদের নৃশংসভাবে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়। এ দুটি স্থান এখন বধ্যভূমি হিসেবে সংরক্ষিত।শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন- অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ডা. আলিম চৌধুরী, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, ড. ফজলে রাব্বী, সিরাজউদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, অধ্যাপক জিসি দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সাংবাদিক খন্দকার আবু তাহের, নিজামউদ্দিন আহমেদ, এস এ মান্নান (লাডু ভাই), এ এন এম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, সেলিনা পারভীনসহ আরও অনেকে। কিন্তু কী অপরাধ ছিল জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের? শুধু মেধাশূন্য করে বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতেই এই গভীর এবং ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ঠিক দুই দিন পর ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞের স্মরণে বাঙালি জাতি সশ্রদ্ধচিত্তে সেই ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে আসছে। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ ১৪ ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষণা করেছিলেন কারণ, অপহরণ ও পরে নির্বিচারে হত্যা এই ১৪ ডিসেম্বরেই অর্থাৎ পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাঙালির বিজয় অর্জন তথা বিজয় দিবসের ঠিক দুই দিন আগে সংঘটিত হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। জাতিকে পঙ্গু করার প্রয়াসে ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে সারা দেশে টার্গেট করে প্রায় দুই হাজার শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এর মধ্যে ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর ঢাকাতেই খুন হন প্রায় ১ হাজার ১০০। যুদ্ধের পরও কয়েকজন শহীদ হয়েছেন, যাদের মধ্যে জহির রায়হান অন্যতম।দৈনিক পত্রিকাগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গোপন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে ১৮ ডিসেম্বরে একদল সাংবাদিক ঢাকার পশ্চিমে রায়েরবাজার এলাকায় পচনশীল, ক্ষতবিক্ষত লাশের একটি গণকবরের সন্ধান লাভ করে। জাতির মেধাবী ব্যক্তিবর্গের দেহগুলো অত্যাচারের সুস্পষ্ট চিহ্ন নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, একে-অন্যের নিচে চাপা পড়ে ছিল। লালমাটিয়ায় শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাংবাদিকরা একটি বন্দীশালা আবিষ্কার করেন, যা ছিল রাজাকার, আলবদর, আল-শামসদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এবং কামালউদ্দিন, চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আবদুল আলিম চৌধুরী, আবুল খায়েরের পচনশীল লাশগুলো পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন সেদিনই। সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের লাশ শনাক্ত করা হয় পরের দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সিরাজুল হক, ফাইজুল মাহী এবং চিকিৎসক গোলাম মুর্তোজা, আজহারুল হক, হুমায়ুন কবীর ও মনসুর আলীর লাশ পরবর্তীতে চিহ্নিত করা হয়। লাশ শনাক্তকরণের সময় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। এরকম আরও বধ্যভূমি ছিল মিরপুর এবং রায়েরবাজার এলাকায়, তেজগাঁওয়ের কৃষি বর্ধিতকরণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহাখালীর টিবি হাসপাতালসহ সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায়। অনেক লাশই পরবর্তীতে শনাক্তকরণের পর্যায়ে ছিল না।শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সেই আত্মত্যাগের স্মরণেই আধুনিক স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে রায়েরবাজারে গড়ে তোলা হয়- শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। এই সৌধটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১৯৯৬ সালে। ৬ দশমিক ৫১ একর জমির ওপর এ সৌধটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর।একাত্তরের সেই বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে।বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের পরও আমাদের ভেতরে ক্রোধ জাগছে না; স্বপ্ন সৃষ্টি হচ্ছে না হারানো বুদ্ধিজীবীদের মতো বা তাঁদের চেয়ে বড় বুদ্ধিজীবী সমাজ গড়ে তোলার। তরুণদের আমরা পাঠাগার থেকে পার্কে নিয়ে গিয়েছি। স্বদেশি চেতনা ভুলে দিন দিন বিদেশপ্রেমী হয়েছি, রোধ করতে পারছি না মেধা পাচার। যা হোক, এক কথায় হলো আমরা আমাদের তরুণদের বুদ্ধিজীবীতে রূপান্তরের কার্যক্রমে ভীষণভাবে পিছিয়ে রয়েছি। কী উপায়ে শোককে প্রকৃতপক্ষে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি আমরা? উপায় সহজ! শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মূল তাৎপর্য তরুণদের মধ্যে তুলে ধরা। অবিরত বুদ্ধির চর্চা, বুদ্ধির বিকাশে সহনশীলতা বাড়িয়ে বিতর্কে উদ্বুদ্ধ করা। পাকিস্তানিরা আমাদের যে ক্ষতি ১৪ ডিসেম্বরে করেছে, ঝাঁকে ঝাঁকে শক্তিশালী তরুণ বুদ্ধিজীবী সৃষ্টি করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাঁকে বাঁকে বিশ্বের মাঝে শ্রেষ্ঠ অবস্থান অর্জন করে তার প্রতিশোধ নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। অর্থাৎ শোককে শক্তিতে রূপান্তর মূলত জাতিগতভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। এটাই মূলত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের শপথ রক্ষা করার উত্তম পথ।- লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।
প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম পথচলার ৯ বছর : আমাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা
১২,ডিসেম্বর,শনিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: গৌরব, ঐতিহ্য আর সফলতার নবম বর্ষে পা রাখলো- প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম। সকলের সহযোগীতা ও আন্তরিকতায় হাটি-হাটি পা-পা করে ৮ বছর অতিক্রম করে ১২ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ৯ বছরে পর্দাপণ করলো আমাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠনটি। প্রতিবছর ঘটা করে পালিত হয় বর্ষপূর্তির এ দিনটি। কিন্তু এবারের করোনা মহামারির কারণে সভা-সমাবেশের উপর বিধিনিষেধ থাকায় বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের চিন্তা-ভাবনা আপাতত আমাদের মাথায় না থাকলেও সামান্যতম ঘরোয়া আয়োজনের ব্যবস্থা হয়তো এ মাসেই করা হবে। বর্ষপূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে সংগঠনের কেন্দ্রিয় কমিটির পক্ষথেকে সকলের প্রতি রইল আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। দুহাজার বারো খ্রীষ্টাব্দের বারোই ডিসেম্বর মহান বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ও আদর্শকে সমুন্নত রেখে ও ধারণ করে একটি গঠনমূলক সচেতন পাঠক-লেখক, তরুণ ও যুবসমাজ গঠন এবং সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা সত্য ও সুন্দরের পক্ষে, দেশ ও জনগণের কল্যাণের পক্ষে এ শ্লোগান নিয়ে সামনে এগিয়েছি। এখনও সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়েই আমাদের পথচলা অব্যাহত। বিগত ৮ বছরে আমরা কতটুকু সফল হয়েছি, তা, দেশের সংবাদপত্রগুলো এবং এ সংগঠনের সাথে যারা সম্পৃক্ত, যারা সবসময় পাশে থেকেছেন, সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন, কাছথেকে দেখেছেন তাঁরাই মূল্যায়ন করবেন, তবে আমরা সত্য ও সুন্দরের পক্ষে আমাদের এ উদ্দেশ্যকে সততার সাথে লালন করার প্রাণপণ প্রচেষ্টা এখনো চালিয়ে যাচ্ছি। ম্যাজিক ডেট- ১২-১২-১২ খ্রীষ্টাব্দে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বিশিষ্ট লেখক- সংগঠক ও সাংবাদিক মো. এনামুল হক লিটন। তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বে প্রগতির পথে অপ্রতিরোধ্যভাবে হেঁটে চলেছি আমরা। এভাবেই হাঁটতে-হাঁটতে আমরা পৌঁছে যেতে চাই সমৃদ্ধির শীর্ষে। বারো. বারো. দুই হাজার বিশ খ্রীষ্টাব্দে ৮ বছর অতিক্রম করে সফলতার নবম বর্ষে পদার্পণ করেছে- প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম। প্রতিবছর বর্ষপূর্তির দিনটি যখন ঘনিয়ে আসে তখন আমাদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। জম্মদিনের এই শুভক্ষণে শুরুতেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি, সংগঠনের প্রয়াত প্রধান পৃষ্ঠপোষক, ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে বাঙালীর অধিকারের অগ্নিঝরা সংগ্রামের অগ্রসৈনিক ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধকালীন বিএলএফ-এর গ্রুপ কমান্ডার, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামি লীগের সাবেক বিপ্লবী সাধারণ সম্পাদক, তুখোর রাজনীতিবীদ, লেখক-সাহিত্যিক কাজী ইনামুল হক দানু প্রকাশ আমাদের দানু ভাইকে। সেই সাথে কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি সকল শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক, সম্পাদকীয় বিভাগের সকল বিভাগীয় সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি। প্রচারেই প্রসার কথাটি যদি সত্যি হয় তবে, আমাদের ৮টি বছরের সাফল্যের পেছনে সবচাইতে বড় অবদান হচ্ছে, সংবাদপত্র গুলোর। সংবাদপত্রের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের পক্ষে আজকের অবস্থানে আসাটা ছিল অনেক কঠিন। এক্ষেত্রে আরো যাদের অবদানের বিষয়টি আমরা কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করি তাঁরা হলেন, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক, চসিক মেয়র প্রার্থী, বিশিষ্ট লেখক-গবেষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব এম রেজাউল করিম চৌধুরী, প্রতিষ্ঠাকালিন উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী সদস্য, সাংবাদিক মুজাহিদুল ইসলাম, দৈনিক সাঙ্গু ও দৈনিক বায়ান্নের প্রকাশক সম্পাদক কবির হোসেন সিদ্দিকী, চসিক ১৬ নং চকবাজার ওয়ার্ডের সাবেক সফল জনপ্রিয় ও কাউন্সিলর সাইয়্যেদ গোলাম হায়দার মিন্টু, ৩৬ নং নিমতলা-গোসাইল ডাঙ্গা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ২নং জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আলহাজ শাহেদ ইকবাল বাবু, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ্ব আব্দুল নবী লেদু, প্রবীণ শ্রমিক লীগ নেতা মো. নুরুল হক জেহাদী ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও সাংবাদিক আলী আহমেদ শাহীন। একইসাথে এই সংগঠনের সাথে যারা সম্পৃক্ত যাদের ঐকান্তিক প্রচষ্টায় আমরা সফলভাবে ৮ বছর অতিক্রম করতে পেরেছি, তাদের সকলের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তাদের সহযোগীতা, উৎসাহ-অনুপ্রেরণা আমাদের প্রচন্ড সাহস যুগিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বিগত সময়ে এই সংগঠনের কমপক্ষে তিনশ পাঠক এবং কয়েক শতাধিক লেখক সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া অনেক নেতা-কর্মি, সদস্যরা লেখার সম্মানি হিসেবে বিভিন্ন পত্রিকা থেকে পূরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে আমরা নিজেদেরকে সার্থক মনে করি। মিথ্যাচার, বিভ্রান্তি, হিংসা-বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্রসহ নানা পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আজকের অবস্থানে আসাটা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের কাজ ছিল। শুরু থেকেই আমরা সমাজের দারিদ্র-পীড়িত ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের পাশে থেকে চালিয়ে গেছি কলম যুদ্ধ। শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ, নগরীর বিভিন্নস্থানে ব্লাডগ্রুপিং ক্যাম্পেইন, দারিদ্র-পীড়িত এলাকায় মাদক, যৌতুক বিরোধি জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচী পালন, বাল্য বিবাহ বন্ধে ব্যাপক প্রচারনা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীসহ সামাজিক কর্মকান্ডেও সম্পৃক্ত ছিলাম এবং দুর্যোগাক্রান্ত, অধিকার বঞ্চিত ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস ও মানসিকতা আছে আমাদের। বিগত ৮ বছরে নানা প্রতিকুলতার মুখোমূখি হয়েও আমরা এগিয়ে গেছি। সকলের ভালবাসা আর আন্তরিকতায় আমাদেরকে দীর্ঘ পথ চলতে উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত করেছে। এর জন্য মহান আল-াহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি। আমাদের এক ঝাঁক নেতা-কর্মি, সদস্য স্ব-স্ব এলাকা ভিত্তিক বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে দেশ প্রেম, স্বজাগবৌধ জাগ্রত ও সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের শহর ও শহরতলীতে বসবাসকারি সর্বস্থরের জনগনের মধ্যে দেশাত্নবোধ জাগ্রত ও চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করে, সার্বিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের মূলস্রোতে পাঠক-লেখকরা সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত হওয়া এবং অধিকার বঞ্চিত মানুষের কল্যাণ সাধন, তাদের মধ্যে সপ্রীতি ও সৌহাদ্যপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গণ-গ্রন্থাগারভিত্তিক পাঠক লেখকদের সম্পৃক্ত করে ব্যাপক প্রচারনা, উদ্যোগ গ্রহণসহ নাগরিক, সামাজিক সমস্যা-সমাধানে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ও সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করাই এই সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। যা জন্মলগ্ন থেকেই আমরা অনুধাবন করতে চেয়েছি। চলার পথে আমরা নানা আলোচনা-সমালোচনা, সহযোগিতা ছাড়াও পেয়েছি নানা অসহযোগীতাও। অবশেষে বহু শ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষা পেরিয়ে অসীম সাহসিকতা ও দৃঢ় মনোবলের সহিত আমরা এগিয়ে গেছি এবং ৮ বছর পেরিয়ে দুই হাজার বিশ খ্রীষ্টাব্দের বারোই ডিসেম্বর নবম বর্ষে যাত্রা শুরু করেছি। এ যাত্রায় আমরা প্রগতির পথে অবিচল হেঁটে যাব-এ লক্ষ্যে আগামীতেও সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। একইসাথে সবাইকে প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম কেন্দ্রিয় কমিটির পক্ষথেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।-লেখক : সাহেনা আক্তার হেনা, সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম,কেন্দ্রিয় কমিটি।
এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বীর চট্টলার গণমানুষের নেতা ছিলেন- মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা
১১ডিসেম্বর,শুক্রবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র চট্টলবীর আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী আমৃত্যু মানব কল্যাণে কাজ করে একজন গণমানুষের নেতা হিসেবে সকলের মণিকুঠায় ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। অদম্য এই রাজনীতিবীদ কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন নি। ২০০৫ সালের চসিক মেয়র নির্বাচনে তিনি তৎকালিন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন মন্ত্রীকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কয়েক দফায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নগর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত ৩:৩০ মিনিটে ৭৩ বছর বয়সে তিনি হৃদরোগ, কিডনি জটিলতাসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। মেধা-মনন, সততার প্রতিক, ত্যাগী ও নিষ্ঠাবান এই নেতার আজ বড়ই প্রয়োজন। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ক্ষমতা মোহের উর্ধ্বে যিনি ছিলেন গণমানুষের নেতা। ছাত্র রাজনীতি দিয়ে শুরু করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর রাজনীতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী, সৃষ্টিধর্মী ও সেবাধর্মী। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সিটি মেয়র থাকার সময় এ শহরে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছেন। এছাড়া জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ব্যাপক কাজ করার পাশাপাশী তিনি শ্রমিক আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ষীয়ান এ নেতা চট্টগ্রামকে এতটাই ভালোবাসতেন যে ১৯৯৮ সালে জাপান গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য তিনি কী-কী করেছেন। চট্টগ্রামের স্বার্থে বন্দর ও এয়ারপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের বিরোধিতা করতেও দ্বিধা করেননি তিনি। মেয়র থাকাকালীন চট্টগ্রামের কোনো প্রকল্প নিয়ে একনেকে তদবির করতে যাননি। তিনি নিজের উদ্যোগে উন্নয়ন কাজ করতেন। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়ও মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের মেয়র হয়েছিলেন বীর চট্টলার গণমানুষের নেতা ছিলেন বলে। তিনি মেয়র থাকার সময় দোকানের ছোট-ছোট সাইনবোডের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষে কোনো ট্যাক্স নিতেন না। গরীব রিকশা চালকের রিকশার লাইসেন্স নবায়নের জন্য কোনো টাকা নিতেন না। এভাবেই তিনি সেবাধর্মী রাজনীতি করেছেন। ১৯৯৪ সাল থেকে টানা তিনবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জনপ্রিয় এই সাবেক মেয়রের বাড়ি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার ষোলো শহরের চশমা হিলে। তাঁর বাসার গলিটি চট্টগ্রামবাসীর কাছে মেয়র গলি হিসেবে পরিচিত। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী পাকিস্তান আমলে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত থাকায়, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশ শত্রু মুক্ত করার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যাকান্ডের পর দলের অস্তিত্ব ধরে রাখায় বার-বার শাসক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়েছিলেন। তারপরও থেমে থাকেন নি। কখনো ছাড়েননি রাজনীতির হাল। বারবার জেল-জুলুম, আঘাত পেয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। বর্ষীয়ান এই নেতা রাজনীতিতে বহুমাত্রিক প্রতিভার কারিশমা দেখিয়েছেন এবং শিখিয়েছেন। এভাবেই তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে গিয়ে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় রাজনীতিবীদ হয়ে উঠেছিলেন। পেয়েছিলেন চট্টলবীর-এর উপাধি। চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার গহিরার শান্তিরদ্বীপ গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়িতে পহেলা ডিসেম্বর ১৯৪৪ সালে এবি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী জন্মগ্রহন করেন। পিতার নাম হোসেন আহমদ চৌধুরী ও মাতা বেদুরা বেগম। বাবা ছিল একজন চাকরিজীবী। তাঁর দাদার নাম আশরাফ আলী চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। নানা দলিলুর রহমান ছিলেন পোস্ট মাস্টার। তাঁর পূর্বপুরুষ তৎকালীন বার্মার আকিয়াবে বানিজ্য করতো। ইস্টার্ন রেলওয়েতে পিতা হোসেন আহমদ চৌধুরীর চাকরির সুবাদে প্রাইমারি থেকে এসএসসি পর্যন্ত তাঁকে বারবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বদলাতে হয়েছে। পিতা হোসেন আহমদ চৌধুরী দীর্ঘদিন রেলওয়েতে চাকরি করে সর্বশেষ স্টেশন মাস্টার পদে থেকে অবসর গ্রহন করেন। পিতার ইচ্ছায় তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল সীতাকুন্ডের মনিন্দ্রনাথ প্রাইমারি স্কুলে। ঐ স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় ক্লাশে ছাত্রদের মধ্যে প্রথম হয়ে তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন। এরপর দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন সীতাকুন্ড হাই স্কুলে। ঐ স্কুল থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পিতার বদলির সুবাদে তাঁকে আবার চলে যেতে হয় নোয়াখালী জিলা হাই স্কুলে। এরপর আবার পটিয়া রাহাত আলী হাইস্কুল, চট্টগ্রামের প্রবর্তক বিদ্যাপীঠ, কাজেম আলী হাইস্কুল এবং সর্বশেষ হাটহাজারী খন্দকিয়া শিকারপুর হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে মেট্রিক পাস করে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ভর্তি হন। প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাবস্থায় পিতার ইচ্ছায় চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিউটে ভর্তি হন। প্রায় দুই বছর তিনি পলিটেকনিকে পড়াশুনা করেন। ছাত্র আন্দোলনে নের্তৃত্ব দিতে গিয়ে ওই কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর পুনরায় ভর্তি হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজে। ১৯৬৫ সালে উক্ত কলেজ থেকে এইচ এস সি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ডিগ্রি লাভ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মনোনয়ন পেয়ে চাকসু নির্বাচনে ভি পি প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু জয়লাভে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর কিছুদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে আইন শাস্ত্রে পড়াশুনা শুরু করলেন। কিন্তু পরীক্ষায় গঠন টোকাটুকির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তাঁর আইন বিষয়ে পড়াশুনা আর হলো না। ছাত্র জীবনে তিনি কাব, স্কাউট, সি স্কাউট ও রোভার স্কাউট ছিলেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িত হয়ে পড়েন। তিনি যখন পূর্ব পাকিস্তান চট্টগ্রাম সিটি ছাত্রলীগ শাখার সাধারণ সম্পাদক তখন তার নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন বিকশিত হতে থাকে। তখন সভাপতি ছিলেন মৌলভী সৈয়দ আহমদ। তাদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম কলেজ, সিটি কলেজ, কর্মাস কলেজ, মেডিকেল কলেজ, আইন কলেজ, পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিউট ও এমই এস কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ সাফল্য অর্জন করে। তিনি চট্টগ্রাম শহর এলাকার স্কুল-কলেজ এবং ওয়ার্ডে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করে শক্তিশালী সংগঠন হিসাবে দাঁড় করাতে কঠোর পরিশ্রম করেন। ষাটের দশকে ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে তাঁর ছিল সাহসী নেতৃত্ব। তিনি ছিলেন, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা। হরতালের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন বালুচড়া থেকে গ্রেপ্তার হয়ে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেন। এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী ছিলেন একজন পরিশ্রমী ছাত্রনেতা যার ফলশ্রুতিতে তাঁর একাগ্রতা ও সাধনার বলে তিনি অল্পসময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের প্রথম কাতারের ছাত্রনেতা ও আন্দোলন সংগ্রামের দিক নির্দেশক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ১৯৬৬-৬৭ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজকে ছাত্রলীগের দূর্গ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তৎকালীন পাকিস্তানী শাসন-শোষণের বিরুদ্বে যখনই কোন হরতাল ডাকা হতো তার আগের দিন মিছিল, মশাল মিছিল, পিকেটিং ও খন্ড-খন্ড পথসভা করে চট্টগ্রামের রাজপথ প্রকম্পিত করতেন বীর চট্টলার বীর মহিউদ্দিন চৌধুরী ও অন্যান্য ছাত্রলীগ নেতারা। হরতালের আগের দিন গভীর রাতে তাঁরা রাস্তায় ব্যারিকেট তৈরী করতেন। এভাবে ধীরে-ধীরে ছয় দফার আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন বেগবান হয়। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে মৌলভী সৈয়দ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহর ছাত্রলীগের কমিটিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ আর এক বছর বর্ধিত করার সিদ্বান্ত গ্রহন করে। ১৯৬৯ সালে ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করেল মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘সামরিক আইন’ বিরোধী মিছিল বের করা হয়। পরিকল্পনা করে সামরিক আইন ভাঙ্গা হয়। মুসলিমলীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর দৈনিক আজান পত্রিকার অফিস জ্বালিয়ে দেয়া হয়। পাকিস্তানের শাসন বিরোধী বক্তৃতা, সাময়িক আইন ভঙ্গ করে সভা এবং মিছিল, মুসলিম লীগের মুখপত্র দৈনিক আজান পত্রিকায় হামলা ও জ¦ালিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েকৃত মামলায় সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত শহর ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ ইউনুসের নয় মাস সশ্রম কারাদন্ড হয়। ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণ দিয়ে অ্যাসেম্বলি বন্ধ ঘোষণা করেন। এই ঘোষনার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের ছাত্রজনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। প্রতিবাদে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমাবেশ শুরু হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা পরদিন হরতাল ও ঐতিহাসিক লালদিঘির মাঠে জনসভার ডাক দিলেন। ২রা মার্চ ঐতিহাসিক লালদিঘির ময়দানে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও অন্যান্য ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি পতাকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছে খবর এলো ঢাকায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের নতুন পতাকা বানানো হয়েছে। সাথে-সাথে মহিউদ্দিন চৌধুরী নগরীর রিয়াজ উদ্দিন বাজার থেকে কাপড় কিনে এনে বাংলাদেশের অনুরূপ পতাকা তৈরি করেন। এসব পতাকা নিয়ে ছাত্র-জনতার মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। সিটি কলেজে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরবর্তীতে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করার জন্য মৌলভী সৈয়দ আহমদকে প্রধান ও মহিউদ্দিন চৌধুরীকে উপ-প্রধান করে জয় বাংলা বাহিনী গঠন করা হয়। গোপনে সিটি কলেজে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ ঝাঁউতলার পাহাড়তলী ওয়ারলেস্ কলোনীতে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা শুরু হয়। এসময় পাকিস্তানী নৌবাহিনীর গুলিতে প্রথম শহীদ হন ভিক্টোরিয়া জুট মিলের শ্রমিক আবুল কালাম। টাইগারপাস থেকে বিশাল মিছিল মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে লালদীঘি ময়দানে পৌঁছে। ঐ সমাবেশে তিনি অবাঙালিদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া একটি অস্ত্র প্রর্দশন করলে, জনতা খুবই উত্তেজিত হয়ে অবাঙালিদের আক্রমন করার জন্য এগিয়ে যেতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ মৌলভী সৈয়দ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাামের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের একটি দল ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগদান করেন। তখন ছাত্র জনতার গগন বিদায়ী শ্লোগানে বাংলাদেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠল। জনতার শ্লোগান ছিল মুজিব তুমি ঘোষণা কর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর, বীর বাঙালি অস্ত্রধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর। তুমি কে? আমি কে? বাঙালি-বাঙালি, তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা, মেঘনা-যমুনা, রক্ত সূর্য উঠেছে বীর বাঙালী জেগেছে। জয় বাংলা। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পাওয়ার পর চট্টগ্রাম ফিরে মহিউদ্দীন চৌধুরী ও অন্যান্য ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ কর্মীরা রাইফেল ক্লাব ও মাদার বাড়ি এলাকার অস্ত্র গুদাম থেকে বিপুল পরিমান অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করে নেয়। শুরু হয় জনযুদ্ধের প্রস্তুতি। লালদীঘি ময়দানে জয় বাংলা কুচকাওয়াজ হলো। প্রস্তুতি শুরু হলো সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের। উত্তাল পরিস্তিতিতে অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর সদস্য, তৎকালীন ইপিআর, পুলিশ বাহিনীদের সংগঠিত হতে ছাত্রলীগের কর্মীরা মাইকিং করে প্রচার করতে থাকে এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত কন্ট্রোলরুমে যোগাযোগের আহবান জানানো হয়। এই ঘোষণার পর এসব বাহিনীরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। এরা সকলে আন্দরকিল্লা ও স্টেশন রোডস্থ রেস্ট হাউজের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এসে যোগাযোগ করতে লাগল। আর ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতারা এদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সকালে বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণাটি জহুর আহমদ চৌধুরীর দামপাড়াস্থ বাসায় পাঠানো হয়। তাঁর স্ত্রী ডা. নুরুন্নাহার জহুর বার্তাটি গ্রহণ করেন। ওই সময়ে জহুর আহমদ চৌধুরী বাসায় ছিলেন না। খবর পেয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী দ্রুত তাঁর বাসায় গেলেন। বার্তাটি তিনি নুর আহম্মদ সড়কের গেস্টেট নার নামের একটি পাইভেট প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বেশ কিছু কপি সাইক্লোস্টাইন করে বিলির ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে মহিউদ্দিন চৌধুরী, মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ ইউনুছ, বেঙ্গল রেজিমেন্টের নায়েক সুবেদার সিদ্দিকুর রহমানসহ অন্যান্যরা রেস্ট হাউজ থেকে খাবার-দাবার নিয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ক্যাম্পের দিকে রওনা হন। তাদের হাতে ছিল রাইফেল, তাদের বহনকারী জিপ গাড়িটি জুবিলী রোডের নেভাল অ্যাভিনিউর মোড়ে গেলে পাকিস্তানী নৌ-কমান্ডো দ্বারা আক্রান্ত হন। ওই সংঘর্ষের পর মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ সকলে গ্রেপ্তার হন। তাদেরকে আমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনে মহিউদ্দিন চৌধুরীর কলারবোন ভেঙ্গে যায়। এক পর্যায়ে তাদেরকে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগার থেকে তাদেরকে চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে শ্রমিকের কাজে লাগানো হতো। তৎকালিন চট্টগ্রাম কারাগারের জেলার ছিলেন, বাঙালি অফিসার খালেক। পাকিস্তান বাহিনীর স্টেশন কমান্ডার ছিলেন, এক বেলুচ ক্যাপ্টেন। তিনি জেল পরিদর্শনে এসে জেলারের সাথে পরামর্শ করে পাগল জাতীয় বন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। এ খবর গোপনে পৌঁছে দেওয়া হলো, মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ তার সাথীদের। তখন তাঁর ইশারায় সকলে পাগলের অভিনয় করতে থাকলেন। একপর্যায়ে তাঁদেরকে পাগল ভেবে ছেড়েও দেয়া হলো। মুক্তি পেল মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ত্রিশজন। মুক্তিলাভের কয়েকদিন পর তিনি ভারতে চলে যান গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্য। এসময় তিনিসহ তাঁর দল আগরতলায় শ্রীধর ভিলায় চলে যান। সেখান থেকে একদিন শেখ ফজলুল হক মনি কোলকাতায় নিয়ে যান মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। সহযোদ্ধাদের পাঠানো হয় উত্তর প্রদেশের টান্ডুয়া সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। টান্ডুয়া সামরিক অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের ১৩তম স্কোয়াড কমান্ডার নিযুক্ত হন মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর ভারতে উচ্চতর গেরিলা লির্ডাস প্রশিক্ষণে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে পূর্বাঞ্চলীয় মাউন্ট ব্যাটালিয়নের প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে পাকবাহিনীর এবং তাদের দোসর মিজু বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই লড়াই ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আঠার ডিসেম্বর তিনি তাঁর দলবল নিয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছেন। এরপর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুর্ণগঠনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহিত হলে, তিনি হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপÍ হন। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে যান। পরে জামিন লাভ করে অসীম সাহসী কয়েকজন সহযোদ্ধাদের নিয়ে আন্ডারপ্রাউন্ডে চলে যান। এসময় মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্বে চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। এ অবস্থায় গ্রেফতার এড়াতে তিনি ভারতে চলে যান। রাজনৈতিক কারণে ফেরার জীবনের তাগিদে তাকে ভারতের কোলকাতায় চায়ের দোকানে চাকরি নিতে হয় এবং এর পাশাপাশি বাড়তি রোজগারের জন্য হাওয়া রেলস্টেশনে হকারের কাজ করতে হয়। ভারতে তাঁর ফেরার জীবন কাটে দুই বছর। ভারত থেকে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে রাউজানে সংসদ নির্বাচন করেন। কিন্তু বিজয় ছিনিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। ১৯৯১ সালে তিনি চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালী আসন থেকে দ্বিতীয় দফায় সংসদ নির্বাচন করেন। এবারও তিনি জয়লাভ করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েন নি। চট্টগ্রাম শহরে আওয়ামী লীগ সংগঠনকে ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে সু-সংগঠিত করতে লাগলো। শুধু সংগঠন নয়, নগরীর প্রতিটি এলাকার সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করার জন্য তিনি তাদের বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমস্যার সমাধানের জন্য তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। এছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন মিল কারখানায় শ্রমিক লীগকে সংগঠিত করে তিনি নেতৃত্ব দিতে লাগলেন। ধীরে-ধীরে তিনি চট্টগ্রামের একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাতে পরিণত হলেন। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯৪ সালের মেয়র নির্বাচনে চট্টগ্রামবাসী তাঁকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে সিটি মেয়র নির্বাচিত করলেন। ফলশ্রুতিতে তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হলেন। ১৯৯৪ সালের ১১ মার্চ শপথ গ্রহণ করেন। পাঁচ বছর মেয়র হিসেবে সাফল্য অর্জনের পর ২০০০ সালের পহেলা মার্চ বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় দ্বিতীয় বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে তিনি তৃতীয় দফায় চট্টগ্রামবাসীর ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘদিন অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সাথে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র থাকাকালীন এক-এগার সরকার ক্ষমতা এসে ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালে মুক্তিলাভ করেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী ছাত্রলীগের রাজনীতির ইতি টেনে যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন। তিনি যুবলীগ নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রিয় প্রেসিডিয়ামের সদস্য ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম শ্রমিক রাজনীতিরও প্রাণপুরুষ ছিলেন। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০০৬ সালে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহন করেন। মৃত্যুর আগমূর্হুত্ব পর্যন্ত তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। দীর্ঘ রাজনীতির জীবনে তিনি ছিলেন মাঠের মানুষ। জননেতা এমএ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, এমএ হান্নান, এমএ মান্নানসহ অনেক ত্যাগি ও দূরদর্শী নেতাদের সান্নিধ্য পেয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন নিজ রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলে। তাঁর সততা, একাগ্রতা, কঠোর মনোবল, পরিশ্রম, স্বপ্ন-সাধনা ও মানুষের প্রতি অকৃতিম ভালোবাসা, আর্দশের প্রতি গভীর আস্থা ও নেতৃত্বের প্রতি অগাধ বিশ্বাসই তাকে একজন রাজনৈতিক নেতা ও কিংবদন্তী পুরুষে পরিণত করেছিল। তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন জনদরদী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর প্রথম স্ত্রী শাহেদা মহিউদ্দিনের মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন ও দুই ছেলে তিন মেয়ে নিয়ে তাঁর পরিবার। তাঁর বড় মেয়ে টুম্পা মারা গেছেন। চট্টগ্রামের উন্নয়ণে ও জনস্বার্থে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর যে অবদান তা চট্টগ্রামবাসীর মাঝে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রামের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। যা কখনো পোষাবার নয়। তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর এ দিনে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বীর চট্টলার বীর মহিউদ্দিনকে। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব দান করুন। আমিন।- লেখকদ্বয় : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান বিশ্বের পুনরুত্থান করা সবচেয়ে আইকনিক বিশ্বনেত্রী
০৮ডিসেম্বর,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সন্তান লালন-পালনের স্বপ্ন থাকলেও তা পূরণের সময় দেয়নি হায়েনারা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সঠিক কাজটি করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা।স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন। দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একে একে কর্মসূচি হাতে নেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা দিয়ে মহাদেশ গড়ে ওঠে। বিন্দু বিন্দু জলের সমষ্টি সৃষ্টি করে মহাসমুদ্র আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তের সমষ্টিতে তৈরি হয় মহাকাল। এগুলো দৃষ্টান্তমাত্র। কিন্তু এগুলোর সাথেই মানবজীবন ও মানবসমাজের প্রতিটি বিষয় তুলনীয়। কারণ বড় কোন কিছু হঠাৎ করেই বড় হয় না। ক্ষুদ্র যখন সামষ্টিক আকার ধারণ করে তখনই কেবল তা বৃহৎ হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনভাবে বিশ্ব রাজনীতির কবি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, ত্যাগ তিতিক্ষার পর দেশের রাজনীতিতে একজন সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।শুধু তাই নয়, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ রোল মডেলের দেশ হিসেবে বিশ্বে নেতৃত্বে দিচ্ছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু দেশের না, তিনি বিশ্বের । তিনি বাঙালি জাতির চেতনার প্রতীক৷ আমাদের অহংকার।বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৩৭টির অধিক পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছেন।আন্তর্জাতিক একাডেমিক কমিউনিটি শেখ হাসিনার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম এবং ভারতের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন, সাহিত্য, লিবারেল আর্টস এবং মানবিক বিষয়ে ৯টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এমডিজি) অর্জনে বিশেষ করে শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসে অবদানের জন্য জাতিসংঘের এওয়ার্ড লাভ করেন।২০১৫ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আইসিটির ব্যবহারে প্রচারণার জন্য শেখ হাসিনাকে- আইসিটি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। দেশের উন্নয়নে তার অব্যাহত অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে এ পদক প্রদান করা হয়। উইমেন ইন পার্লামেন্ট (ডব্লিউআইপি) ও ইউনেস্কো বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীকে- ডব্লিউআইপি গ্লোবাল ফোরাম অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এছাড়া পার্ল এস বাক এওয়ার্ড (১৯৯৯) সিইআরইএস পদক, মাদার তেরেসা পদক, এমকে গান্ধী পদক, ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার (২০০৯), ইন্দিরা গান্ধী স্বর্ণ পদক, হেড অব স্টেট পদক, গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড (২০১১, ২০১২) ও নেতাজী স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৭) পেয়েছেন শেখ হাসিনা।শুধু পুরস্কারপ্রাপ্তিতেই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফলতার কথা এখন বিশ্বনেতারা জানতে চান বিভিন্ন ফোরামে। বহুপক্ষীয় সম্মেলনগুলোয় শেখ হাসিনা উপস্থিত হলেই অন্যান্য রাষ্ট্রনায়ক ও সরকারপ্রধান কাছে এসে অভিনন্দন জানান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমন পরিচিতি বাংলাদেশের আর কোনো নেতা পাননি।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ক্ষমতায় থাকা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নারীনেত্রী। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার, জার্মানির অ্যাঙ্গেলা মের্কেল এবং শ্রীলঙ্কার চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাকেও টপকে গেছেন শেখ হাসিনা। উইকিলিকসের সর্বশেষ গবেষণা মতে, শেখ হাসিনা বর্তমান বিশ্বের পুনরুত্থান করা সবচেয়ে আইকনিক নেত্রী।প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয় ও মোট চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ং-সম্পূর্ণতা অর্জন। তিনি কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং ভূমিহীন, দুস্থ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি চালু করেন। এর মধ্যে দুস্থ মহিলা ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে করে বিচার ব্যবস্থা পূর্ণগঠন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু, রাজনৈতিক হত্যা, বঙ্গবন্ধু ও তার সপরিবার, কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যাসহ সকল হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু করেন।২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিরোধী দলে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন ও নেতৃত্বশূন্য করতে বেশ কয়েকবার মারণাঘাত চালায় ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট। এরপর ২০০৮ সালে ফের আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একুশ শতকে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নেন। তারপর বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩,২৬০ মেগাওয়াটে উন্নতিকরণ, গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন, ৫ কোটি মানুষকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণ, ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক জলসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন,মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড এবং ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, বিনা জামানতে বর্গাচাষীদের ঋণ প্রদান, চিকিৎসাসেবার জন্য সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কমুউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৩৮.৪ থেকে ২০১৩-১৪ বছরে ২৪.৩ শতাংশে হ্রাস করে।তারপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণ, ভারতের পার্লামেন্ট কর্তৃক স্থল সীমানা চুক্তির অনুমোদন এবং দুই দেশ কর্তৃক অনুসমর্থন, (এর ফলে দুই দেশের মধ্যে ৬৮ বছরের সীমানা বিরোধের অবসান হয়েছে), মাথাপিছু আয় ১,৬০২ মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, দারিদ্র্যের হার ২২.৪ শতাংশে হ্রাস, ৩২ বিলিয়ন ডলারের উপর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কাজ করে।সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ৭ জানুয়ারি ২০১৯ শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতা বিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কাজে সফলতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুত্তি, বিদ্যুৎ খাত, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন দেশের ভেতর-বাইরে প্রশংসিত হয়েছে। শিক্ষাখাতে অভাবনীয় উদ্যোগ করেছে সরকার। বিনামূল্যে বই বিতরণ, মেধাবৃত্তি ও উপবৃত্তি প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ যা জোট সরকারের আমলের ১৩ গুণ বেশি, শিক্ষক নিয়োগ ও মর্যাদা বৃদ্ধি, নতুন বিদ্যালয় স্থাপন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা, দারিদ্রপীড়িত এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড, কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ করছে।বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও প্রশংসিত। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশ আজ ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র-চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।এছাড়াও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সহ আরো অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। দেশের আইটি খাতের নতুন সম্ভাবনা যশোরে- শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক করা হয়েছে। শেখ হাসিনা তার চতুর্থ মেয়াদও সফলতার সঙ্গে শেষ করবেন তা হলফ করে বলা যায়। বর্তমান হিসেবে শেখ হাসিনা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকা নারীনেত্রী। শেখ হাসিনা নানা ইস্যুতে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় রাষ্ট্রপ্রধানও।এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দল ও সরকারের নেতৃত্বে থেকে বাংলাদেশের জন্য বড় বড় অর্জনও বয়ে এনেছেন শেখ হাসিনা। আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ তার নেতৃত্বেই এগিয়ে যাচ্ছে। এই ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণা তিনিই দিয়েছেন। মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তার গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, বৈশ্বিক নানা সংকট নিয়ে কথা বলা এবং মতামত দেওয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও শেখ হাসিনার পরিচিতি বেড়েছে।বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার মাতার নাম বেগম ফজিলাতুননেসা। তিনি টুঙ্গিপাড়ায় বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় পরিবারের সাথে মোগলটুলির রজনীবোস লেনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরে মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে ওঠেন। ১৯৫৬ সালে তিনি টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে তিনি আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৭ সালে গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ (বর্তমানে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। বিয়ের কারণে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়ায় তাকে অনার্স পাঠ স্থগিত রাখতে হয়। পরে ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকারি ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রসংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি)ছিলেন। তিনি এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি ছিলেন। শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একজন সদস্য এবং ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই শেখ হাসিনা সকল গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।তার স্বামী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ২০০৯ সালের ৯ মে ইন্তেকাল করেন।শেখ হাসিনার জ্যেষ্ঠ পুত্র সজীব আহমেদ ওয়াজেদ একজন তথ্য প্রযুক্তি বিশারদ। তার একমাত্র কন্যা সায়মা হোসেন ওয়াজেদ একজন মনোবিজ্ঞানী এবং তিনি অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণে কাজ করছেন। শেখ হাসিনার নাতি-নাতনীর সংখ্যা ৭ জন।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সেসময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ৬ বছর ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডে থেকে তিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।১৯৮১ সালে দেশের মাটিতে ফিরে এলে ঢাকায় লাখো জনতা তাকে স্বাগত জানায়। এ সময় শেরেবাংলা নগরে আয়োজিত সমাবেশে লাখো জনতার সংবর্ধনার জবাবে শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি; বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থসামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই। এরপর থেকেই শুরু হয় শেখ হাসিনার নতুন করে আরেক সংগ্রামের পথচলা। তার নেতৃত্বে দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। তাকে বারবার কারান্তরীণ করা হয়। তাঁকে হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা করা হয়।শত বাধা-বিপত্তি এবং হত্যার হুমকিসহ নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা ভাত-ভোট এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য অবিচল থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ অর্জন করেছে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতা। বাংলাদেশ পেয়েছে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা। শেখ হাসিনার অপরিসীম আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।তার নেতৃত্বে চারবার রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যে বর্তমানে টানা তৃতীয়বার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে। আর চারবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি তিনবার বিরোধী দলের নেতাও ছিলেন।করোনাভাইরাস মহামারী থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে দরিদ্র মানুষকে ত্রাণ সহযোগিতার পাশাপাশি জীবিকা ও অর্থনীতি বাঁচাতে নিয়েছেন নানা পদক্ষেপ। করোনা সংকট মোকাবিলায় দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হচ্ছেন শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিনসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়েছে।২৪ এপ্রিল এক আর্টিকেলে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস। একইসঙ্গে প্রশংসা করা হয়েছে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেরও।শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৬১ (১৬ কোটির বেশি) মিলিয়ন মানুষের বাস। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দক্ষতার সঙ্গে সংকট মোকাবিলা করা তার জন্য নতুন কিছু নয়। এরই ধারাবাহিকতায় করোনা মোকাবেলায়ও তিনি নিয়েছেন দ্রুত পদক্ষেপ। যার প্রশংসা করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামও।শেখ হাসিনা নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে পিতার মতোই অবিচল, দৃঢ় ও সাহসী। তিনি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণে যুগান্তকারী অবদান রেখে চলেছেন। রূপকল্প ২০২১-এর মধ্যম আয়ের বাংলাদেশকে রূপকল্প ২০৪১-এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নত, আধুনিক, সমৃদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতীজ্ঞ। করোনা সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রতিমূহুর্তের করণীয় ঠিক করতে দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।- লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
বেগম রোকেয়া : নারীমুক্তি ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পথিকৃৎ- মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা
০৭ডিসেম্বর,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ঊনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক ও বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ছিলেন, একজন নারীমুক্তি, সমাজ সংস্কার ও প্রগতিশীল আন্দোলনের পথিকৃৎ। তিনি কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিধিনিষেধের অন্ধকার যুগে শৃঙ্খলিত বাঙালি মুসলিম নারীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পর্দার অন্তরালে থেকেই নারীশিক্ষা বিস্তারে অগ্রসর হন এবং মুসলিম নারী সমাজকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ সুগমের অগ্রসেনানী ছিলেন। বেগম রোকেয়া সামাজিক নানা বিধিনিষেধ, নিয়ম-নীতির বেড়াজাল উপেক্ষা করে আবির্ভূত হয়েছিলেন, অবরোধবাসিনীদের মুক্তিদূত হিসেবে। নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ১৯৩০ সালের দুই ডিসেম্বর প্রথম মুসলিম মহিলা হিসেবে উড়োজাহাজে চড়ে আকাশভ্রমণের সুযোগও গ্রহণ করেছিলেন রোকেয়া। তাঁর এ-সংক্রান্ত লেখা বায়ুুযানে পঞ্চাশ মাইল এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ৯ ডিসেম্বর বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার ১৪০তম জন্ম ও ৮৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাই দিনটি বেগম রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময়কার সমাজ ব্যবস্থা ছিল নানাবিধ কুসংস্কারে পূর্ণ। তিনি সম্ভ্রান্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ক্রমান্বয়ে নারী জাগরণের অগ্রদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। বেগম রোকেয়ার প্রকৃত নাম ছিল রোকেয়া খাতুন। বৈবাহিকসূত্রে নাম হয় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। কিন্তু বেগম রোকেয়া নামেই তিনি সর্বময় পরিচিত। তাঁর জীবন পর্যালোচনায় জানা যায়, ছোট বেলাতেই তৎকালীন সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটেও রোকেয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে মানুষের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে পরিবেশ অনুকূলে আনা যাচ্ছিলো না। কারণ বাবা জহির উদ্দীন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের সমাজ ব্যবস্থার নীতিতে অটল ছিলেন। তিন ভাই, তিন বোনের মধ্যে রোকেয়া ছিলেন পঞ্চম। তাঁর বড় ভাইদের মধ্যে ইব্রাহিম সাবের প্রথম এবং দ্বিতীয় ভাই খলিলুর রহমান সাবের, তৃতীয় জন ছিলেন ইসরাইল সাবের যিনি অল্প বয়সেই মারা যান। বোনদের মধ্যে বড় ছিলেন করিমুন্নেসা খানম আর ছোট ছিলেন বেগম রোকেয়া এবং তৃতীয় বোন হোমায়রা খানম। তখন তাদের পরিবারে উর্দু ভাষার প্রচলন ছিল। তবে বেগম রোকেয়ার ভাইয়েরা উচ্চ শিক্ষিত ছিল। দুই ভাই কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। অথচ বেগম রোকেয়া ও তার বোনদের বাইরে পড়াশুনা করতে পাঠানো হয়নি, তাদের ঘরে আরবি ও উর্দু শেখানো হয়। তবে রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের আধুনিকমনা ছিলেন। তিনি রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে ঘরেই গোপনে বাংলা ও ইংরেজি শেখান। বেগম রোকেয়া ১৮ বছর বয়সে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তাঁর আধুনিক পড়ালেখা আরও পুরোদমে শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি সাহিত্যাঙ্গনেও পদার্পণের সুযোগ পান। এসময় তিনি বেশ কয়েকটি স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক সকল কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত রাখেন। বেগম রোকেয়ার ভাষায়, আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করে। আর সেই সব গ্রন্থের দোহাই দিয়া নারীদের অন্তঃপুরে আবদ্ধ করিয়া রাখে তারা। এরপর বয়ে গেলো ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের আরো অনেক ইতিহাস। দুই কন্যা সন্তানের জননী ছিলেন, তিনি। কিন্তু নিয়তির কারণে তিনি বেশিদিন কন্যা সন্তানের মা ডাক শোনতে পান নি। মারা যান দুই কন্যা। এরপর স্বামীও মারা যান। স্বামী পূর্ব বিবাহিতা হওয়ায় স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বামীর বাড়ীর কোনো সহযোগীতা পেলেন না তিনি। এক পর্যায়ে তিনি ১৯১৬ সালে মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা , যার অনূদিত রূপ সুলতানার স্বপ্ন। এটিকে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। তার অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলো- পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, মতিচুর। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম অবস্থান ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তখনকার প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা বেগম রোকেয়ার বহুবিধ অবদানের জন্য ঊনবিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান এ বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারককে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করা হয়। বলাবাহুল্য যে মহীয়সী এই নারী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগমূহুত্বেও লেখালেখি করেছেন। মৃত্যুর পর তাঁর টেবিলে পেপারওয়েটের নিচে- নারীর অধিকার শীর্ষক একটি অর্ধসমাপ্ত লেখা পাওয়া গিয়েছিল। বেগম রোকেয়ার প্রতিটি নিশ^াস-বিশ্বাস, কর্ম ও ধ্যানে মৃত্যুর আগমূহুর্ত্ব পর্যন্ত একই চিন্তাধারাকে লালন করে গেছেন। নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, নারীকে মানুষ হিসেবে মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য ১৯১১ সালে মাত্র ৮জন ছাত্রী নিয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরী করে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। এই স্কুলটি ছিল ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদানকারী প্রথম মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়। এই আটজন ছাত্রীর যাতায়াতের জন্য কলকাতার একজন ব্যবসায়ী প্রথম একটি ঘোড়ার গাড়ী উপহার দিয়েছিলেন। কিছু দানশীল ব্যক্তির সাহায্য এবং স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মাসিক চাঁদার ওপর নির্ভর করে স্কুলটি চালিয়ে গেলেন। এরপর ১৯১৫ সালে ছাত্রীসংখ্যা ৪০-এ উন্নীত হলে স্কুলটিতে পঞ্চম শ্রেণি চালু করলেন এবং একে একটি উচ্চবিদ্যালয়ে উন্নীত করলেন। ১৯৩১ সালে ওই স্কুল থেকে তিনজন ছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণও হলো। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে মেয়েরা ধীরে-ধীরে শিক্ষার আলো পেতে শুরু করেছে। তিনি সবসময় মনে করতেন নারী-পুরুষের মধ্যে বিভাজন নয়; বরং সহযোগীতা প্রয়োজন। প্রগতিশীল মনা মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া উন্নত মানসিকতা, দূরদর্শী চিন্তা, যুক্তিপূর্ণ মতামত প্রদান ও বিশ্লেষণ, উদার মানবতাবোধের অবতারণা এবং সর্বোপরি দৃঢ় মনোবল দিয়ে তৎকালীন নারী সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর জীবনাদর্শ ও কর্ম দেশের নারী সমাজের অগ্রযাত্রায় পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। তাই বেগম রোকেয়ার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে নিজেদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে অগ্রগতির পথে দেশের যে যাত্রা তা আরো গতিময় করতে এদেশের নারীসমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে। এটাই হোক বেগম রোকেয়া দিবসের অঙ্গিকার।- লেখকদ্বয় : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বাসস্থান: প্রধানমন্ত্রীর মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ
০৬ডিসেম্বর,রবিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক লাখের বেশী মানুষের বসবাসের জন্য ২৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরী করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ওই চরঞ্চলের ১৩ হাজার একর আয়তনের উপর রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করার জন্য সরকার দ্বীপটিকে অত্যাধুনিক বাসস্থান নির্মাণসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে এক নান্দনিক স্থানে পরিণত করেছে। যা নান্দনিক পরিবেশে বসবাসের জন্য খুবই আকর্ষণীয় একটি স্থান। এখানে গত ৩রা ডিসেম্বর কক্সবাজারের ৩৪টি ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিক আবস্থায় ছয় শতাধিক পরিবারের ২ হাজার ৭০০ জন এবং পরদিন অথ্যাৎ ৪ ডিসেম্বর আরও তিন হাজার জনকে ভাসানচরে নেয়া হয়েছে। সরকারি তরফ থেকে তাদের জন্য এক মাসের খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর আগে কক্সবাজারের শরনার্থী শিবির কুতুপালংসহ ও তার বাইরে অবস্থান নিয়ে থাকা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে নানা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে তাদের একটি অংশকে হাতিয়ার কাছাকাছি মেঘনা মোহনার দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। এরই অংশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এই শুরু হয়। কিন্তু দূঃখজনক সত্য যে, রোহিঙ্গাদের সেখানে স্থানান্তর নিয়ে জাতিসংঘ শরনার্থী সংস্থাসহ বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক সংস্থা সরকারের এ মহতী উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত ২ ডিসেম্বর এক বিবৃতির মাধ্যমে জাতিসংঘ বলেছে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেয়ার যে পরিকল্পনা সরকার করেছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। ভাসানচরে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা যেন সব তথ্য জেনে স্বাধিনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতেও সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয় ওই বিবৃতিতে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট পরবর্তী মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে এদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় ১০ লক্ষাধিক আশ্রয়হীন অসহায় রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গারা তখন কক্সবাজারের উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই থেকে অদ্যবদি জাতিসংঘ ও এসব সংস্থা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে কোনো ভূমিকাই পালন করেন নি এবং এখনো করছেন না। এরপরও বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসনীয় এ কার্যক্রমে তাদের আপত্তির কোনো মানে হয় না। রোহিঙ্গারা যে বাংলাদেশের জন্য অসহনীয় এক বোঝায় পরিণত হয়েছে এবং তাদের ভরণ-পোষণ করতে গিয়ে সরকার যে হিমশিম খাচ্ছে, তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথা নেই। তাই তাদের পক্ষে রোহিঙ্গাদের উন্নত জীবনযাপনের ব্যবস্থা হিসেবে ভাসানচরে স্থানান্তরের বিরোধিতা কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেননা যেখানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র সীমায় বাস করছে, সেখানে এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া যেনতেন ব্যাপার না। নিজভৌম থেকে বিতাড়িত লাখ-লাখ অসহায় রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় এবং ভাসানচরে উন্নত পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে বঙ্গকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গাদের বাসস্থান এবং ভরণ-পোষণের দায়িতও নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ একবেলা কম খেয়ে হলেও অসহায় রোহিঙ্গাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করবে। যার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল হওয়ার পাশাপাশী প্রধানমন্ত্রীর এমন অসাধারণ মানবিকতা সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে একইসাথে মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরালো করতে হবে। এবং তা সফল না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বাসস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে বাংলাদেশকেই ভাবতে হবে। আমরা মনে করি ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের জন্য আপাতত নাগরিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে বিশাল জনগোষ্ঠিকে কাজে লাগানো হলে, সরকারের ব্যয়ভার অনেকাংশে কমে আসার পাশাপাশী দেশের উপর থেকে অর্থনৈতিক চাপও কমবে। বিষয়টি সরকারি মহল ভেবে দেখবেন। এমনটা প্রত্যাশা আমাদের।- লেখকদ্বয় : মো. এনামুল হক লিটন ও সাহেনা আক্তার হেনা, সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বিতর্ক : পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পায়তারা রুখতে হবে- মো. এনামুল হক লিটন
২৮নভেম্বর,শনিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: উগ্রবাদীদের আস্ফালন দেখে হতবাক না হয়ে পারা যায় না। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নিয়ে তারা কিভাবে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আস্ফালন দেখানোর দূঃসাহস দেখায় তা বোধগম্য নয়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে দুই ইসলামপন্থী নেতা। এনিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গণে বিরাজ করছে চাঁপা ক্ষোভ। প্রগতিশীল মানুষের মাঝে উত্তেজনার পাশাপাশী দেশের মানুষের মাঝে এক ধরণের উৎকন্ঠা বিরাজমান। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ায় আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অপরদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা কারীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিসহ আওয়ামী লীগ। সারাদেশে এ নিয়ে তুমুল গুঞ্জন চললেও রা নেই জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি-জাতীয় পাটিসহ সরকার বিরোধি সংগঠনগুলোর। বিষয়টি নিয়ে রাজনীতির মাঠে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হলো, দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে কেউ কি পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছেন? আর যদি তা-ই হয়, তাহলে সরকারকে এটি শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে হবে। কেন না সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণের দাবী জানিয়ে প্রথমে মৌলবাদী দুই নেতা চরমোনাইর পীর ও ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং হেফাজত ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হক সমাবেশ করেছে। তাদের দাবি, মূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তৌহিদি জনতার আন্দোলন চলবে। সরকার যদি ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন থেকে সরে না আসে, তাহলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে তারা। এর পরপরই ২৭ নভেম্বর এক মাহফিলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা এবং হেফাজতের যুগ্ন মহাসচিব মামুনুল হককে প্রধান বক্তা করা হয়। কিন্তু মামুনুল হকের চট্টগ্রামে আসা প্রতিহত করতে মাঠে নামে আওয়ামী লীগসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং স্বাধীনতার পক্ষের সংগঠনগুলো। চট্টগ্রামের সবর্ত্র চলে বিক্ষোভ। সাধারণ মানুষের মাঝে এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা চলে দিনব্যাপী। অবশেষে সেই মাহফিলে মাওলানা মামুনুল হক যোগদান না করলেও যে কোনো দল ভাস্কর্য বসালে তা টেনে হিঁচরে ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমীর জুনায়েদ বাবুনগরী। আল-আমিন সংস্থা আয়োজিত হাটহাজারীর পার্বত্য সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তিন দিনের তাফসীরুল কোরআন মাহফিলের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তার এমন হুমকি আসে। এর প্রেক্ষিতে উত্তেজনা দেখা দেয় আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল মানুষের মাঝে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবাইদুল কাদের সংবাদ সম্মেলন করে বাবুনগরীর ওই বক্তব্যকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। এছাড়া দলটির অঙ্গ-সংগঠনগুলো চট্টগ্রাম নগরীসহ ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবল আলম হানিফও হেফাজত নেতার বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এবং চট্টগ্রামে গত ২৮ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ভাস্কর্যবিরোধি বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। সবমিলিয়ে আবারো উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গন। কেউ-কেউ বলছেন, সরকার পতন আন্দোলনের ইস্যু হিসেবে দাঁড় করাতেই এসব করা হচ্ছে। অথচ যে মহান ব্যক্তির জন্য বাংলাদেশের জন্ম তার ভাস্কর্য নাকি মূর্তি। তাই মসজিদের শহরে মূর্তি স্থাপন করা যাবে না বলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে উস্কে দিয়ে মৌলবাদীরা অন্যকোনো ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত কিনা তা বলা মুশকিল। তারা কখনও মাঠ গরম করে ধর্ম অবমাননার নামে, কখনও কাউকে নাস্তিক আখ্যা দেয়ার নামে, আবার কখনও ভাস্কর্যকে মূর্তি বানিয়ে তা অপসারণের নামে। আসলে তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নস্যাৎ করে জনমনে ভীতির সৃষ্টি করা। তারা যে আসলেই স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি তা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণের দাবী জানিয়ে আবারো স্পষ্ট করেছে। বলাবাহুল্য যে, ২০১৭ সালের ২৬ মার্চ রাতে দেশের সব্বোর্চ বিচার প্রাঙ্গণ সুপ্রীম কোর্ট চত্বর থেকে মৌলবাদীদের দাবী মেনে নিয়ে লেডি জাষ্টিজ ভাস্কর্যটি লোক চক্ষুর অন্তরালে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর রাতে রাজধানীর বলাকা ভবণের সামনের রাস্তায় বলাকা ভাস্কর্যে হামলা চালায় একটি উগ্রবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। একইবছর হযরত শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরের সামনের গোল চত্বরে বাউল ভাস্কর্যে হামলা চালায় মৌলবাদী গোষ্ঠি। ২০১৩ সালের ৫মে ঢাকা অবরোধ করে হেফাজতে ইসলাম দেশ থেকে সব ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার আল্টিমেটাম দিয়েছিল সরকারকে। তারা ওই সমাবেশে সরকারের প্রগতিমূখী নারীনীতি, শিক্ষানীতি বাতিলের দাবীও তুলেছিল। তাদের ঘোষিত কর্মসূচীতে নারীকে পঞ্চম শ্রেণীর বেশী লেখাপড়া না করিয়ে ঘরে বন্দি করে রাখার কথা বলা হয়েছিল এবং নারীর প্রতি অমর্যাদাও দেখানো হয়েছিল। আরো অনেক অগ্রহণযোগ্য দাবী ছিল তাদের। এসব দাবী মেনে না নিলে সরকার পতনেরও হুমকি দিয়েছিল তারা। সরকারের ররফ থেকে ওই সময়ে কিছু দাবী মানাও হয়েছিল। এরপরও তারা থেমে থাকে নি। তখন থেকে প্রশ্রয় পেয়ে আজ তারা মাথায় উঠেছে। আজ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয়ার আস্ফালন দেখাচ্ছে। ভাস্কর্য আর মূর্তি কখনো এক হতে পারে না। তারা তা জেনেও দেশে অরাজকতা সৃষ্টির খেলায় মেতে উঠেছে। ভাস্কর্য শুধুই একটি শিল্প। যা একটি দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সেই দেশের প্রকৃতি, জলবায়ু, ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরই ধারক-বাহক হয়ে থাকে। এটি যেমনি আইন করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি আবার কৃত্রিমভাবে সৃষ্টিও করা যায় না। বাংলাদেশের সামাজিক ও জাতীয় জীবনে যেসব অধ্যায় পার করে জাতি আজ সভ্যতা ও আধুনিক যুগে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এক শ্রেণির ইসলামপন্থী কয়েক সংগঠনের নেতাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা সবারই জানা। ১৯৭১-এর আগে এবং ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ও পরবর্তীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শ্রেণির তথাকথিত আলেম-উলামারা যে ভূমিকা রেখেছিলেন, সে কারণে সমাজে তাদের ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই একটি নেতিবাচক ধারনা বিদ্যমান। আর এসব প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটে থাকে আমাদের শিল্প, সাহিত্য এবং গণমাধ্যমে। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে, অযুক্তিক ইস্যু দ্বাড় করিয়ে এবং জলাও-পোড়াওয়ের মাধ্যমে ধর্মের দোহাই দেয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার। আমরা চাই, সবাই তার নিজ-নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। এক্ষেত্রে যারা নানা অযুক্তিক ইস্যুতে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইবে, তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীও রাখে। দেশের মানুষকে বাচাঁতে বঙ্গকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার অতীতেও অনেক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাই এ ব্যাপারেও সরকারকে এখন থেকেই সজাগ হয়ে আবারো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। আমাদের প্রত্যাশা যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পায়তারা করছে, তা যে কোন মূল্যে রুখতে হবে। তাই তাদের বিরুদ্ধে সরকার কালক্ষেপন না করে তড়িৎ কঠোর পদক্ষেপ নেবেন। এমনটা প্রত্যাশা আমাদের। -লেখক : সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।
স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নই হোক বিজয়ের মাসের অঙ্গিকার: সাহেনা আক্তার হেনা
২৮নভেম্বর,শনিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: স্বাধীনতা অমূল্য সম্পদ। স্বাধীনতা যেকোন মুক্তি পিপাসু মানুষের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। মানুষ ক্রীতদাস হয়ে বাঁচতে চায় না। সে চায় তার স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে স্ব গৌরবে বিরাজ করতে। বায়ু ছাড়া যেমন মানুষ বেঁচে থাকতে পারেনা, তেমনি স্বাধীনতা ছাড়া কোন জাতি আত্নবিকশিত হতে পারেনা। মানুষের আত্মার বিকাশের জন্য চাই স্বাধীনতা। ডিসেম্বর মাস মহান বিজয় দিবসের মাস। এই বিজয় দিবসেই আমরা বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। ১৯৭১ সালের এই মাসেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মাত্যাগ, ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয়ের দিনটিতে আনন্দের পাশাপাশি বেদনাও বাজে বাঙালির বুকে। বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হয়েছিল এই স্বাধীনতার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ২শত ১৪ বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ে মুক্তির সোপান তলে কতো-কতো প্রাণ যে বলিদান হয়েছে, তার হিসেব ইতিহাসের পাতায় অসম্পূর্ণ। দীর্ঘ যুগের দীর্ঘ শতাব্দীর বঞ্চনার ভেতর দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের পূর্ব পুরুষ বার-বার জ্বলে উঠেছে শৃঙ্খল ভাঙ্গার লড়াইয়ে। সে লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ১৯৪৭-এ একটি ভুল স্বাধীনতার নাগাল আমরা পেয়েছিলাম। তা ছিল স্বাধীনতার নামে এক নব্য পরাধীনতার ক্রান্তিকাল। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, ৪৭-এ লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে যদি আমাদের এই বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুক্তি আসতো, তবে হয়তো একাত্তর পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হতোনা। ৪৭-এ দেশ ভাগ হয়েছিল সাম্পদায়িক ভাবনা থেকে। যার ফলে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রের অধীনস্থ হয়েই পরাধীনতার শেকল পরে এই বাঙলার ভূখন্ডের সহজ-সরল মানুষ নতুন করে আটকে যায় শোষণের জালে। তখন দেশ ভাগের বছর না ঘুরতেই প্রথমেই নামে মাতৃভাষার অধিকার হরণের খড়গ। বাঙলার কত বীর সন্তানেরা মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছে এই খড়গের নিচে। অবশেষে দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা পেলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা-চাকরীসহ সব দিকেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও ছিল পশ্চিমা উগ্র বৈষম্যবাদীদের কব্জায়। এমন অবস্থায় স্বাধীনভাবে স্বনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যয়ে বিদ্রোহী বাঙালি সৃষ্টি করেছিল এক ইতিহাস। পশ্চিমা বৈষম্যবাদী শাসক ও শোষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মাতৃভাষার অধিকার, শিক্ষা আন্দোলন, গনঅভ্যুত্থান, ৬দফা আন্দোলনসহ সবশেষে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকন্ঠের ডাকে এই দেশের নিরীহ-নিরস্ত্র-নিপীড়িত-অধিকার বঞ্চিত মানুষগুলো তাদের স্বীয় অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। করেছিল মুক্তির জন্য যুদ্ধ। এনেছিল স্বাধীনতা, এনেছিল বিজয়। এই বিজয়ের মাসের জন্য, স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ সালে বাঙালী সর্বস্ব দিয়ে পাকিস্তানি নারকিয়তা ও পশুশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে চরম ত্যাগ ও পরম বীরত্বে স্বাধীন ভূ-খন্ডই কেবল পায়নি, একইসাথে পেয়েছিল রক্তাক্ত এক উত্তরাধিকার। কিন্তু, যে কথা আজ না বললেই নয়; স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য অনিবার্য এই যুদ্ধের অর্ধ শতাব্দীর পরও আমরা যখন দেখি এই স্বাধিন বাংলার পতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য্যকে টেনে নামিয়ে ফেলার হুংকার আসে তখন মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি পেরেছি জাতির পিতার প্রতি সম্মান দেখাতে? আমরা কি পেয়েছি আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা? যদিও আমরাই আমাদের সব কিছুর নিয়ন্ত্রক। তবুও আমরা নিয়ত অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমরা স্বাধীন সত্ত্বা নিয়ে বেঁচে থাকার স্বাধীনতাটাও যেন হারাতে বসেছি। নিজেরা নিজেদের মধ্যে হানাহানীতে লিপ্ত হচ্ছি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সন্ত্রাস, হানাহানি, রাহজানি, অগ্নিসন্ত্রাস, ধর্ষন, অপহরণ ঘটেই চলছে। এ যেন, এক টুকরো স্বস্তির নিঃশ্বাস পেতে বা নিজেদের মনের অব্যক্ত হাহাকার ব্যক্ত করতে নেই এতটুকু আশ্রয়। অবস্থাদৃষ্টে মনেই হয় না যে আদৌ আমরা কোন সভ্য সমাজে বসবাস করছি। বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। চলমান মুক্তির জন্য যুদ্ধ এবং স্বধীন সার্বভৌম স্বদেশ অর্জনের লক্ষ্যে ছিনিয়ে আনা ১৬ডিসেম্বরের এই বীর বিজয় আমাদের উত্তর প্রজন্মের চির প্রদীপ্ত অক্ষয় এক পটভূমি, অন্তহীন এক অনুপ্রেরণা, অনিঃশেষ এক অহংকার। কিন্তু, স্বাধীন দেশের কি চিত্র রেখে যাচ্ছি আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য? স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। কিন্তু এ স্বাধীনতা অর্জন এবং তা রক্ষাকরণে যা সর্বাধিক প্রয়োজন, তা হচ্ছে স্বার্থহীন সত্যনিষ্ট ও ন্যায়পরায়নতা। এখনি সময় অনেক বিড়ম্বনা সহ্য করে দূর্নিবার আন্দোলন আর প্রতিরোধে যে স্বাধীনতা তা রক্ষা করতে প্রত্যেকের হীন স্বার্থসিদ্ধির লোলুপ মনমানসিকতা থেকে বের হয়ে আসার। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব এবং মানুষ মানুষের জন্যেই। মানুষ স্বাধীন সত্ত নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে। শুধু তাই নয়, মানুষ জন্মগতভাবে সমঅধিকার ও মর্যাদা সম্পন্ন প্রাণী। যদি এটাই সত্যি হয়, তবে আসুন আমরা আমাদের মানবিক ভাবনার শুভ ও কল্যাণকর দিকগুলোকে প্রগতিশীল চিন্তায় স্নাত করে সব অপরাধ, স্বার্থপরতা, হিংস্রতা জলাঞ্জলী দিয়ে অপরাধহীন, কুলসহীন, গনতান্ত্রিক একটি সুন্দর সমাজ ও দেশ গড়ার হৃদয়স্পর্শী প্রত্যয়ে সকলে মিলে একাত্মতা ঘোষণা করে নির্মোহ দৃষ্টিতে নিজেরদের না হয় আরো একবার পরিশুদ্ধ করি। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই আমরা আমাদের স্বাধীন সত্ত্বার কাছে, নতুন প্রজন্মের জন্য একটি অপরাধহীন, সন্ত্রাসহীন সুখী সমৃদ্ধ নির্মল দেশ গড়ে দেবার মানুসিকতায়। আর তাই সব ধরনের স্বার্থপরতা আর অপরাধ, দুর্নীতিসহ বিকৃত মানসিকতা রুখতে শুধু আইনের প্রতি নির্ভরশীলতা বা শুধু আইন প্রয়োগই নয় প্রণীত আইনের সঠিক প্রয়োগ, সচেতনতা, সামাজিক সম্প্রীতি, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করার পাশাপাশি ধর্মীয় ও পারিবারিক সঠিক শিক্ষাদ্বারা তাদের আমূল পরিবর্তন, নারী নির্যাতন ও ধর্ষন প্রতিরোধে প্রতিটি এলাকায় নারী সংগঠেনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক সভা-সমাবেশ সেমিনারসহ নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা এবং আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠে দেশ ও সমাজের আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকারসহ স্বাধীনতার পরিপূর্ণতায় বাস্তবায়িত গনতান্ত্রিক ও একটি সুন্দর, সূখী-সমৃদ্ধশালী এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসি। এটাই হোক এবারের মহান বিজয়ের মাসের অঙ্গিকার। -লেখক : সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল সংবাদপত্র পাঠক লেখক ফোরাম, কেন্দ্রিয় কমিটি।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর