বুধবার, এপ্রিল ২১, ২০২১
ধণীর সন্তান সুকান্ত গরিবেরটি ক্যবলাক্যান্ত
ধণীর সন্তান সুকান্ত গরিবেরটি ক্যবলাক্যান্ত টোকাই ও বলা যায়। তেমনি গরিবের বউ সকলের ভাবি, ধণীর বউ ম্যাডাম। হায়রে বিধি কেমন তোমার বিধান মানুষে মানুষে হেথা আজ কত ব্যবধান। আসলে এখানে ছোটর নেই কোন স্থান, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,তের চৌদ্দ বছরের ছেলেরা বলাই আমিতো বলি ভালই, কেন তা পরে বলবো। কবি গুরু বলেন,তাদের কাচামাখা কথা ন্যাকামি আর আধাপাখা কথা জ্যাটামি সব দোষ যেন তাদের। আহারে বাঙ্গালী আসলে আমরা যেন সবাই কাঙ্গালী তাই দিন বন্ধু মিত্রনিল দর্পন নাটকে বলেছেন কাঙ্গালির কথা বাসি হলে ফলে। কত বাসী? পুরান চালের ভাত বাড় পুরান কথা তর্কে সার, অত টাইম কারো নাই। তবে সব্জি দুয়েক বেলায় বাসী হলে মজে ভালো তাই মজাও হয় ভালো। এখন আবার প্রেশার কুকারের যুগ চাপ দিয়ে তরকারি মজিয়ে ফেলে তাই বাসী হওয়ার আর দরকার হয় না। তাই তো যুক যার মুল্লুক তার- আর কথাটি সার্থক দেখুন না,বস ভুল করলে হয় অভিঞ্জতা আর কর্মি করলে অঞ্জতা। বসের কথা বানী কর্মির কথা পানি। আসলে ছোট যেন সব জায়গায় অবহেলিত। এটি ঠিক না, আমরা দেখি ইশফের গল্পে ক্ষুদ্র ইদুর বিশাল সিংহকে বাচিঁয়েছে,পিপড়ে ঘুঘুকে বাঁচিয়েছে। আবার ভিখারির ছেলেকে রাজা হতে দেখেছি এবং রাজার ছেলেকে দেখেছি ভিখারি হতে। তাই ছোট বলে কখনো অবহেলা করতে নেই। যেহেতু গরিবের বউ একাধটু ঠাট্টা-মশকারা তো সবাই করবে। তাই বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মোটেই উচিত না। সকলকে আবশ্যক জ্ঞান করা ভালো। এক সময় আমাদের দেশে একটি গান বড় চাউর হয়েছিল, রিক্সাওয়ালা বলে কাকে তুমি আজ ঘৃণা কর। এর পর হতে দেখলাম মানুষের রুচিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অনেক খানদানি লোক দেখলাম বিউটি পার্লারের নাম দিয়ে নাপিতের কাজ করছে, পল্ট্রি নাম দিয়ে মুরগী দোকান, ডেইরি নাম দিয়ে গোয়ালার কাম,এমনকি মিট শপ নাম দিয়ে কসাই কাজ পর্যন্ত করছেন। অথচ এক সময় ছিলো খানদানি লোকেরা ডাক্তারি করতেন না আর আজ ডাক্তারি হলো এক নম্বর পেশা!যুগে যুগে অবশ্য নেশা পরিবর্তন আসে পেশার পরিবর্তন আসে, তেমনি রুচির ও পরিবর্তন আসে কিন্তু ছোটকে অবহেলা-এটি এখনো তেমন পরিবর্তন হয়নি। কথায় বলে ছোটর জায়গা যেখানে সেখানে,বড়র জায়গা নেই কোনখানে। কথাটি কত টুকু ঠিক জানি না। তবে আমরা দেখি সব খানে বড়রাই আগে জায়গা করে নেই। আরো বলে, বড় হবি তো আগে ছোট হ! এখন কত ছোট হবো, ইজ্জত-সম্মান সব ফেলে দিয়ে? একটি কৌতুক মনে পড়ে গেল ঃ মালিক ভৃত্যকে বলেছেন, বুঝলি গেঁদা; বড় হতে গেলে নিজেকে আগে ছোট হতে হয়। গেঁদা; কত ছোট? মালিক; যত ছোট হলে নিজেকে তোর আর মানুষ বলে মনে হবে না। গেঁদা; তাহলে কী বলে মনে হবে? মালিক; মনে হবে তুই আস্থ একটা পশু! গেঁদা; তা কেমনে? মালিক; তাতো তুই ঠিক করবি। গেঁদা; পড়লো মহাভাবনায়। তার পর একদিন পুরো দিগম্বর হয়ে মালিকের সামনে হাজির! মালিক বিষ্মিত হয়ে, এটি কি? গেঁদা; কেন, আপনি বলেছেন পশু হতে তাই পশু হয়েছি, একমাত্র পশুরাই তো কাপড় পড়ে না! তেমন বড় অবশ্য আমরা হতে চাই না, কারণ এতে সম্মান নেই। পৃথিবিতে অর্থ আয়ের অনেক উপায় আছে তাই বলে বউ বেটি ভাড়া দিয়ে অর্থ আয় কারো কাম্য নয় বড় হওয়ার ও তেমন অনেক উপায় আছে তবে তা সম্মানের সহিত হতে হবে। তাই বড় হওয়ার জন্যে ছোট অবশ্যই হবো তবে তা সম্মানের সাথে।
২০১৭ সালে যাদেরকে হারিয়েছি
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যারা রাজনৈতিক মাঠ জমজমাট রাখতেন। হামলা-মামলা দিয়ে যাদেরকে ধমিয়ে রাখা যায়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত রাজনীতি করেছেন। দল ও দেশের কল্যাণে আত্মপ্রত্যয়ী সেসব রাজনৈতিক নেতাদের হারিয়েছি ২০১৭ সালে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীন নেতার মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক অন্যতম। প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক: শনিবার (১৬ ডিসেম্বর) সকাল ৮টা ৩৯ মিনিটে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মুহাম্মদ ছায়েদুল হক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান প্রবীণ এই নেতা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: গত ৫ ফেব্রুয়ারি দেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মারা গেছেন। যিনি জাতীয় সংসদে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাতবার। ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সুরঞ্জিত রক্তে হিমোগ্লোবিন স্বল্পতাজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। রাজনীতিতে রয়েছে তার বর্নাঢ্য ক্যারিয়ার। মন্ত্রী পরিষদের সদস্যও ছিলেন তিনি। মেয়র আনিসুল হক: গত (৩০ নভেম্বর) বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২৩ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। এই অল্প সময়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ঢাকাবাসীর মন জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস শনাক্ত করেন চিকিৎসকেরা। এরপর তাঁকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তাঁর কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে মেয়রের পরিবারের একজন সদস্য বলেন, রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাঁকে আবার আইসিইউতে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাতে মেয়রকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী: আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতা ও চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী মারা গেছেন। চট্টগ্রাম নগরীর ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মুত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭৪ বছর। হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত মহিউদ্দিনকে গতমাসে সিঙ্গাপুরে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। অবস্থার একটু উন্নতি হলে ঢাকা থেকে দুদিন আগে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল চট্টগ্রামে। কিন্তু সেই উন্নতি স্থায়ী হয়নি। সাবেক এই মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামবাসীর প্রিয় মানুষ ছিলেন। গোলাম মোস্তফা আহমেদ এমপি: গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা আহমেদ সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল পৌনে নয়টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ। গত ১৮ নভেম্বর (শনিবার) টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন এমপি গোলাম মোস্তফা। এরপর তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। উল্লেখ্য, ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার নাটিয়াপাড়ায় বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে আহত হন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফাসহ চারজন। নুরুল ইসলাম খলিফা: গত বুধবার (১১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬ টার সময় শহরের কাপুড়িয়া পট্টি নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঝালকাঠি জেলা শাখার উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য, প্রবীণ রাজনীতিক ও ঝালকাঠি চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোঃ নুরুল ইসলাম খলিফা (৮০। আছর বাদ জানাযা নামাজ শেষে পশ্চিম ঝালকাঠির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে। ইসহাক মিয়া: গত (২৪ জুলাই) সোমবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সাবেক গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইসহাক মিয়া (৮৮) ইন্তেকাল করেছেন। আবদুর রশিদ জব্বার: গত মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টায় তার নিজ বাড়িতে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আবদুর রশিদ জব্বার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। এছাড়াও জেলা, উপজেলা পর্যায়সহ আওয়ামী লীগ ২০১৭ সালে প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে হারিয়েছেন। দলের জন্য তাদের অবদান কখনো ভুলবার নয়। তারা আজীবন বেঁচে থাকবেন আওয়ামী লীগের ও দেশের মানুষের মধ্যে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বিজয়ের বাংলাদেশ
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ইতিহাস থেকে এ নাম কখনো মুছে যাবে না। কর্মের মাঝে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অমর হয়ে থাকবেন বাঙালির ইতিহাসে হাজার-লক্ষ-কোটি বছর। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এই নামে সমগ্র বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সম্প্রতি ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটিকে ইউনেসকো কর্তৃক স্বীকৃতি প্রদান করায় বিশ্বব্যাপী আবারও আলোচিত হলো বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মহান স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বিজয়ের বাংলাদেশ প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি সম্মান ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত হিসেবে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম করে বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে আজো তিনি মিশে আছেন। স্বাধীন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি। তাই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। যতদিন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালির ইতিহাস থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন অমর অবিনশ্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিরূপে বঙ্গবন্ধু থাকবেন চিরজাগ্রত। রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইউএসবির (টঝই) ভাষায় বঙ্গবন্ধু । সভ্যতার শুরু থেকেই বারবার মানবতা হয়েছে ভূ-লুণ্ঠিত। শোষক ও শোষিতের ব্যবধান বেড়েছে। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে শোষণের মাত্রা। হোক তা প্রাচ্য কি তার বিপরীত গোলার্ধ। তাই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের উপর অমানুষিক নির্যাতন বন্ধে, মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন পড়েছিল একজন মার্টিন লুথার কিং বা ম্যালকম ম্যাক্সের। ঠিক তেমনি বাঙালিদের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সীমাহীন বৈষম্য রোধ করতে দরকার হয়েছিল একজন শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহানায়কের। পাকিস্তান কেবল অর্থনৈতিকভাবে আমাদের শোষণ করতে চায়নি, বরং তাদের আগ্রামী হাত দিয়েছিল আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ, শিক্ষা ইত্যাদির উপর। সামরিক স্বৈরশাসনের শাসনের মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ, অনিশ্চয়তা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে যখন বাঙালিদের এরা হাতে ধরা সুতোয় পুতুলের মতো নাচাতে চেয়েছিল, ঠিক তখনই স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন নিষ্ঠা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, একাগ্রতা, সাহসিকতায় এবং সর্বোপরি দৃঢ়তায় এই বজ্রকণ্ঠস্বরধারী মানুষটি। বাঙালির স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সেই ঐকান্তিক প্রয়োজনের সময়। বঙ্গবন্ধু বরাবরই অটল থেকেছেন তাঁর নীতিতে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন অহিংস পন্থায় বাঙালির অধিকার অর্জনের এ আন্দোলনে সফল হতে। তাই দেখা যায়, ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ক্ষমতা তাদের না দেওয়ার পরও তিনি সহিংসতায় না গিয়ে তিনি ভুট্টোর ক্ষমতাভাগের দাবির তীব্র সমালোচনা করেন। যুক্তিসঙ্গত দাবি না মানার পর পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়াতেই ৭ মার্চ তাঁকে রচনা করতে হয় বাঙালির জীবনের এক অনন্য সাধারণ মানব মুক্তির কবিতা। ১৯৬৩ এর ২৮ আগস্ট বর্ণবাদী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং এর সেই আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম মহাকাব্যের পর আরো একটি মহাকাব্য রচিত হয় ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য তাঁর ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য রচনার মাহেন্দ্রক্ষণ যা দিয়েছে আমাদের লাল সবুজের পতাকার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনব্যাপী একটিই সাধনা করে গেছেন, তা হলো বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা। তাঁর এই সাধনার শুরু ১৯৪৮ থেকে। তাই ১৯৪৮-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে গঠন করেছিলেন ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯-এর জুনের ২৩ তারিখে আওয়ামী লীগ। সেই থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের প্রতিটি আন্দোলনকে সুপরিকল্পিতভাবে নেতৃত্ব প্রদান করে ধাপে ধাপে এগিয়ৈ নিয়ে গেছেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিরেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান্ বাল্যকাল ও কৈশোর থেকেই যে সংগ্রামের শুরু, তা থেমে থাকেনি। বরং কালক্রমে তা বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়ে সমগ্র বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের এক মহৎ প্রচ্ছদপট এঁকে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহামানব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। তিনি তো সবসময় বলতেন, এমনকি দু-দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি বলেছেন, ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলল, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। বিশাল হৃদয়ের মহৎ মনের মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের সবকিছুই জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। সরল সাদামাটা জীবন ছিল তাঁর। রাষ্ট্র ক্ষমতার আসীন হয়েও ছিমছাম আর আটপৌরে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন। একবার এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, একজন মানুষ আর কী চাইতে পারে, আমি যখন ভাবি দূরে এক জনশূন্য পথের ধারে আধো আলো-ছায়ায় এক লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমাকে এক নজর দেখবে বলে, তখন মনে হয়, একজন মানুষের পক্ষে আর কী চাওয়া-পাওয়ার থাকতে পারে। নিরন্ন, হতদরিদ্র, মেহনতী মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল প্রগাঢ় ভালোবাসা। তা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর প্রতিটি কর্মে ও চিন্তায়। ১৯৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর, আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত, শোষক ও শোষিত। আমি শোষিত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল সারাংশ ছিল শোষণ-নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি অর্থাৎ শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। সেই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ১৯ মিনিটের ভাষণে বঙ্গবন্ধু সেই স্বপ্নই দেখিয়েছিরেন ৭ কোটি বাঙালিকে। তিনি দেখিয়েছিলেন এদেশের নিপীড়িত শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নেই বাঙালির মনে জাগ্রত করেছিল অদম্য স্পৃহা। আর সেই ভিত্তিতেই দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালির রক্ত আর অগণিত মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় সেই কাক্সিক্ষত মুক্তি মহান স্বাধীনতা। শুরু হয় বাংলাদেশ নামের দেশের নতুন যাত্রা। বাংলাদেশের মহান রাষ্ট্রপতিরূপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যাত্রা। সোনার বাংলার সোনার মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের রাষ্ট্রপতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি সমগ্র বাংলাদেশে কাজ করে চলেছিলেন। বেকার যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিকের হাতকে শক্তিশালী করে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য এগিয়ে চলছিলেন। তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী ঘাতক সেনাসদস্যদের গুলিতে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির এগিয়ে চলাকে যবনিকা ঘটার চেষ্টা চালায়। কিন্তু না, যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে দেখিয়েছিলেন সেই স্বপ্ন কি স্বপ্নই থেকে যাবে? না, বাঙালি জাতি আবারও এগিয়ে চলল। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিরূপে দেশে প্রত্যাবর্তন করে জনগণের হাতকে শক্তিশালীরূপে ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়ে নেত্রীকে বিজয়ের মালা পরিয়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী করেছেন জনগণ। সে শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য জীবন-মরণ বাজি রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শতবাধা ডিঙিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপে প্রতিষ্ঠা করে বর্তমানে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর স্বপ্ন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া। এই যাত্রা শুভ ও সফল হোক। লেখক:লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই, বিশিষ্ট মরমী গবেষক ও প্রাবন্ধিক।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প তেজস্ক্রিয় বর্জ্যরে যত ভয় দক্ষ জনবলে কাটবে সংশয়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল পর্বের কাজ বাস্তবায়নে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে রাশিয়া ৪ শতাংশ হার সুদে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে। ১০ বছরের রেয়াতকালসহ ২০ বছর মেয়াদে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে বাকি ২২ হাজার কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গৃহীত প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পটি আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সর্ম্পক বিভাগের মধ্যে একটি ষ্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল পর্যায় শীর্ষক প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। পরমাণু প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসাবে কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি বিভাগ খোলা হয়েছে। বিভাগটি থেকে সম্মান ও মাষ্টার্স দুটোই সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ । পারমাণবিক চুল্লিতে এই জ্বালানি শতভাগ ব্যবহৃত হয় না। যেটুকু অবশিষ্ট থাকে, সেটাকেই বলে তেজস্ত্রিয় জ্বালানি বর্জ্য। এটি উচ্চমাত্রায় তেজস্ত্রিয়তা ছড়ায়। তাই পারমাণবিক চুল্লি থেকে তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য অপসারণ করার পর তা বিশেষ ব্যবস্থায় ৩০০ দিন সংরক্ষণ করতে হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য (স্পেন্ট ফুয়েল) রাশিয়ার ফেরত নেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিষয়টিতে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য খুবই বিপজ্জনক। এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা একটি উচ্চমাত্রার বিশেষায়িত বিষয়। এটা করার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। যদিও ২০১১ সালে রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য ফেরত নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তবে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর সই হওয়া চূড়ান্ত চুক্তিতে (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) বিষয়টি সেভাবে উল্লেখ করা হয়নি বলে নানারকম কথাবার্তা হচ্ছে। তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বর্জ্য অত্যন্ত সুরক্ষিত ব্যবস্থায় সরংক্ষণ করতে হয়। এ জন্য এমন একটি বিচ্ছিন্ন স্থান প্রয়োজন হয়, যেখানো কখনো কোনোভাবে পানি যাবে না। সাধারণত মাটির অনেক নিচে জলাধার তৈরি করে সেখানে শক্তিশালী কংক্রিট দিয়ে ঘিরে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হয়। অনেক বছর ধরে তার ধারে কাছে কোনো মানুষের আনাগোনা চলে না। যদিও একসময় এই জ্বালানি পুনরায় ব্যবহার করা যায়, কিন্তু এর সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা আলাদা একটি বিশেষায়িত স্থাপনা নির্মাণ ও সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে যেমন ব্যয় আছে, তেমনি আছে ঝুঁকি। আমাদের পরিকল্পনার চুল্লিটি কার্যকর হবে ২০২৩ সাল নাগাদ। এ মাপের একটি স্থাপনা চালাতে হলে দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। চুক্তি মোতাবেক প্রথম দিকে রুশ বিশেষজ্ঞরা সহযোগিতা করবেন। পারমাণবিক বর্জ্য উচ্চমাত্রায় রেডিও-অ্যাক্টিভ। এ বর্জ্যরে সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ একটি উচ্চস্তরের প্রযুক্তিনির্ভর কাজ। বাংলাদেশ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিকল্পনা গ্রহণের সাথে সাথে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ সড়ক, রেল, বিমান, নৌ, ভবন ধস দুর্ঘটনার সঙ্গে নতুন করে পারমাণবিক দুর্ঘটনাভীতি সংযোগ ঘটলো। ভূপাল, চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো একটি দুর্ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটে, তাহলে কী হবে? রূপপুরের অবস্থান, বাংলাদেশের আয়তন এবং ঘনবসতির কথা বিবেচনা করলে বলতে হয় অকল্পনীয় ক্ষয়ক্ষতির ভেতর আমরা পতিত হব। পারমাণবিক দুর্ঘটনার জের সহজে কাটে না। দশকের পর দশক ধরে এর প্রভাব থেকে যায়। মানবিক বিপর্যয়ের সাথে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও বেশ ব্যাপক। ফোর্বসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী জাপানের ফুকুশিমার সরাসরি ক্ষতি কাটাতে এখন পর্যন্ত ব্যয় করেছে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয় মিলে সামনের বছরগুলোয় জাপানকে আরো খরচ করে যেতে হবে। মোট খরচ গিয়ে দাঁড়াতে পারে ২৫০ বিলিয়ন ডলারে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ছে, কিন্তু ২৫০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা পাচঁটি বাংলাদেশেরও নেই। পরমাণু সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জাপান ও জার্মানি নিঃসন্দেহে একেবারে প্রথম দিকে। ফুকুশিমা দুর্ঘটনা জাপানকে প্রবল নাড়া দিয়েছে। বাকীদেরও শংকা আশংকার দোলাচলে সময় কাটে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিকল্পনার শুরুতে ২০০৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এতোবড় একটি দেশসেরা প্রকল্প দক্ষ প্রশিক্ষিত পরিকল্পিত জনবল আর প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছাড়াই কর্মযজ্ঞশুরু হয়েছে। সংশয় আরো বেড়ে যায় যখন সম্ভাব্য দুর্ঘটনার কোনো দায়দায়িত্ব রাশিয়া নেবে না বলে প্রচার হয়। নিউক্লিয়ার প্রযুক্তিতে বাংলাদেশে দক্ষ জনবল নেই, বরং রিসার্চ রি-এ্যাক্টর পরিচালনার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরির এক মহাযজ্ঞ শুরুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই সম্ভাবনার যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার রি-এ্যাক্টর পরিচালনার দক্ষ জনবল বিদেশে প্রেরণও করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (ILO) সূত্র হলো প্রযুক্তির সকল কর্মকাণ্ড বিশেষ করে জনশক্তি পিরামিড ফর্মুলা ১:৫:১৫ আকারে সাজাতে হয়। অর্থাৎ একজন গ্রেজুয়েট নিয়োগ দিলে ৫ জন ডিপ্লোমা, ১৫ জন ভোকেশনাল প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ দিতে হয়। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সহযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার শিক্ষায় অনার্স, মার্স্টাস এবং ডক্টেরেট ডিগ্রি কোর্স চালু করেছে। অথচ ডিপ্লোমা আর ভোকেশনাল শিক্ষা ইনস্টিটিউট নির্মাণের ধারে কাছেও নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক বিভাগকেন্দ্রীক ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাণ্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগে গ্রহণ না করলে জাতিকে একদিন চরম মূল্য দিতে হবে। আমরা কী আরো কিছুকাল পরনির্ভরশীল জাতির কালিমায় আচ্ছন্ন থাকবে? শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাজীবীদের এ ব্যাপারে বিবেক তাড়নার স্বরূপ উন্মেষ আকাক্সক্ষা করি। খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ khanaranjanroy@gmail.com

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর