বুধবার, এপ্রিল ২১, ২০২১
ভাষাসৈনিক ডঃ মাহাফুজুল হক চট্রলা তথা বাংলাদেশের অমুল্য সম্পদ ছিলেন
১১,এপ্রিল,রবিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: বীর পটিয়া তথা চট্রলা নয় বাংলাদেশের আদর্শিক ও মেধাবী সংগঠক ছিলেন ভাষাবিদ ডঃ মাহাফুজুল হক। বাল্যকাল থেকে অত্যন্ত মেধাবী ও দক্ষ সংগঠক হিসাবে স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার কর্মকাণ্ডে পরিচয় বহন করে।১৯৩১সালের ১লা এপ্রিল চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা জিরি ইউনিয়নে কৈয়গ্রাম গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এলাকায় শিক্ষাবিদ ও পোষ্টমাষ্টার নামে খ্যাত ছিলেন এস আহমদ হোসেন ও মাতা মোছাম্মৎ চেমন খাতুন। পিতার আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে শিক্ষার মশাল জ্বালানোর জন্য স্কুল জীবন থেকে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ডঃ মাহাফুজুল হক। শৈশব,কৈশোর ও জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেন চট্রগ্রাম ফিরীঙ্গাবাজার এলাকায়।আলকরণ স্কুল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে চট্রগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলে থেকে এসএসসি ও চট্রগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএতে ভর্তি হয়ে ডিষ্টিংশন নিয়ে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ও একই সাথে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।১৯৬১ সালে ৯ সেপ্টেম্বর এডওয়ার্ড ডব্লিউ হাজেন বৃত্তি নিয়ে আমেরিকা যান এবং নিউইয়র্কে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষার সাথে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে তার অবাধ বিচরন ছিল অসাধারণ। বীর চট্রলার ছিলেন বিপ্লবের সূতিকাগার,স্বাধীনতা জন্মভূমি,মাষ্টার দা সূর্য সেন,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী,বার আউলিয়ার পুন্যভুমি নামে খ্যাত।এই চট্রগ্রামে বহু প্রতিভা ও সুর্য সন্তান জন্মগ্রহণ করেন তার মধ্যে অন্যতম প্রতিভার অধিকারী ছিলেন ভাষাবিদ ডঃ মাহাফুজুল হক। ইতিহাসে তার নাম আজীবন স্মরণ হয়ে থাকবে ভাষাসৈনিক হিসাবে।যা বিরল ঘটনা ও ইতিহাসের অংশ। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে তার অগ্রনী ভুমিকা অতুলনীয়। মা,মাতৃভুমি ও মাতৃভাষা হল আমাদের প্রাণ। আর মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে এমনকি বাংলা ভাষার প্রচলন সমিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ছাত্র অবস্থায় ছাত্র রাজনীতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে বিধায় তিনি নিখিল বঙ্গ ছাত্রলীগের চট্রগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাকিস্তানের বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে নেতত্বে দিয়েছেন। ডঃ মাহাফুজুল হক ঐতিহাসিক তমুদ্দন মজলিশের চট্রগ্রামের অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন বলে পাকিস্তান তমুদ্দিন মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এসময় তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মুকুল ফৌজ নামক সংগঠনের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন যা যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে চট্রগ্রাম যুক্তফ্রন্টের কর্মী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। তার অসম্ভব দুরদর্শিতা,সুষ্ঠু পরিকল্পনা,দক্ষতা ও পরিশ্রমের কারণে যুক্তফ্রন্ট নিরংকুশ জয়লাভ করেন এবং মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়েছে। অসম্ভব মেধাবী,সুবক্তা,সাংগঠনিক দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার জন্য অল্প বয়সে চট্রগ্রামে রাজনৈতিক অঙ্গনে জনপ্রিয়,মানুষের ভালবাসা ও কারিসম্যাটিক নেতা হিসেবে সুপরিচিত লাভ করেন।চট্রগ্রামে তার কথা সব জায়গায় আলোচনা করেন পরবর্তীতে তিনি সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। যা বীর চট্রলার মানুষ তাকে আপন হিসেবে খুব ভালবাসত। ১৯৫১ সালে ১৯ ফ্রেব্রুয়ারীতে মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীদের এমবিবিএস পড়ার সুযোগ দানের জন্য সারা বাংলাদেশে যে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছিল তার চট্রগ্রাম কমিটির প্রধান ছিলেন ডঃ মাহাফুজুল হক। তার নেতত্বে চট্রগ্রামে আন্দোলন,ধর্মঘট ও সংগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়।এর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে পাই যা ইতিহাসের মাইলফলক। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকালে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।বিভিন্ন সময় আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বহুবার পাকিস্তানের জান্তা বাহিনী পুলিশ কতৃর্ক হয় এমনকি পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচার হয় যা পরবর্তীতে ভুল ছিল বলে প্রমাণ হয়।সেসময় চট্রগ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমণ্ডলের বাইরে সাহিত্য সাধনায় তার অবাধ বিচরন ছিল অসাধারণ।তার সাহিত্যে সাধনার বহু ফসল ততকালের পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমাদের সাহিত্যে ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এবং ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ,বাঙালী জাতির সংস্কৃতির সত্যিকারের রুপায়ন ও সর্বোপরি মাতভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠাই ছিল এ মহান সাধকের অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল। ১৯৫৬ সালে তার লেখা সাংস্কৃতিক পুর্নগঠন শীর্ষক এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।যা বাঙালী জাতির জন্য এক অমুল্য সম্পদ।তার প্রবন্ধে বলেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা জাতীয় জীবনে মূল্যহীন হয়ে পড়ে যদি তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক আজাদী ও অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব না হয়।কারণ শিল্পী ও সাহিত্যিকরা শুধু সমাজে নিরপেক্ষ ব্যক্তি নন বরঞ্চ তারাই সমাজের সচেতন প্রতিনিধি। ১৯৬৫ সালে পুর্ব পাকিস্তান বাংলা প্রচলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এসব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে তিনি পত্রিকার সম্পাদক কাজেও জড়িত ছিলেন। তার সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হচ্ছেউ সাপ্তাহিক ইঙ্গিত, দ্যুতি ও সাপ্তাহিক সৈনিক। এগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের তথা বাংলা ভাষার প্রচলন করে দেশের জন্য কাজ করেছেন।যা আমাদের অমুল্য সম্পদ বললে চলে।তার কর্মদক্ষতা ছিল বলে তিনি জ্ঞান গরিমার মাধ্যমে আলোকিত মানুষ হিসাবে বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগী ছিলেন বলে আজ আমরা গর্বিত। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলার বাঘ খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক,গণতন্ত্রের মানস পুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহধন্য উত্তরসুরী হিসাবে কাজ করেছেন।তাদের আদর্শ বাস্তবায়নে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলার পথ প্রান্তরে প্রতিটি এলাকায় কাজ করেছেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি চট্রগ্রামের দক্ষ সংগঠক হিসাবে স্কুল, কলেজ ছাত্র রাজনীতির করেছেন যা তার কর্মে পরিচয় বহন করে। তিনি আজীবন মৃত্যুঞ্জয়ী অকুতোভয় দুঃসাহসীক ছাত্রনেতা ছিলেন।নেতার আদর্শ বাস্তবায়নে করতে জীবনের মুল্যবান সময় ব্যয় করে কাজ করেছেন। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন বিধায় আজীবন মানুষের মণিকোঠায় তার নাম স্থান করে নিয়েছে। তার কর্ম গুনে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।তন্মধ্যে ডঃ মাহাফুজুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সদস্য,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিল সদস্য,পাকিস্তান লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক,পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ট ও কিশোর মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা সহ বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব দায়িত্ব পালনে তার চতুর্মুখী প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে এমনকি তিনি মেধা মনন ও কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আজীবন বাংলা আর বাঙালী জাতির জন্য তিনি নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসীন করে চট্রলা তথা বাংলাদেশকে মর্যাদার আসীন করেছে। তার তীক্ষ্ণ লেখনীতে সব কিছু ফুটিয়ে তুলে বাংলার মর্যাদা বীরোচিত ও পাঠকপ্রিয় হিসাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য একথাটি মনে রেখে বাংলা ভাষার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে সর্বশক্তি দিয়ে মিছিল মিটিংয়ের অগ্রভাগে থেকে প্রতিটি লড়াই সংগ্রাম করে যাওয়া নাম পটিয়ার সূর্য সন্তান ডঃ মাহাফুজুল হক। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আহত হয় যা মায়ের ভাষা আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন বলে তা সম্ভব হয়।আজীবন মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করে যাওয়া হল আসল কাজ সেটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন।রাজনৈতিক জীবনে চট্রগ্রাম থেকে উঠে আসা যোদ্ধা সর্বশেষ ঢাকায় এসে নেতৃত্ব দেয়।তারুণ্যের বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাস নিয়ে ছাত্র জীবনে ছিল তার জন্য উপযুক্ত সময় বলে দেশপ্রেমের কারণে সব জায়গায় কাজ করেছে। কোন কিছুর ভয় তাকে আটকাতে পারিনি। সব জায়গায় সফল মানুষ হিসাবে দেশপ্রেমিক লোক হিসাবে আজ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তিনি মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।আর সাহিত্য সংস্কৃতির যবনিকাপাত হয় অল্প সময়ে। তিনি যদি আরও বেচে থাকত তাহলে আরও উপরে আসনে অধিষ্ঠিত হত আর বাঙালী জাতী লাভবান হত।পরিবার পেত সন্তান আর আমরা পেতাম একজন মেধাবী সাহিত্য সংস্কৃতির লোক।১৯৬৬ সালে ২ ফ্রেব্রুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কনফারেন্স অংশগ্রহণ করতে গিয়ে ফরিদপুরে হেলিকপ্টার বিধ্বংস হয়ে অকালে ঝরে গেল পটিয়া,চট্রলা তথা বাংলাদেশের অমুল্য সম্পদ সাহিত্যিক,ভাষাবিদ ডঃ মাহাফুজুল হক। তার অকাল মৃত্যুতে দেশ হারাল অমুল্য সম্পদ আর পরিবার হারাল মেধাবী সন্তান। অকাল মৃত্যুতে দেশে কালো ছায়া নেমে আসে।চট্রগ্রামের শোকের মাতম হয় যা বর্ননাতীত।আজীবন চট্রলার মানুষ আপনাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে রাখবে।আপনার কর্ম গুনে আপনি মানুষের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছ।আপনার হারানোর শোক আজও আমাদেরকে আন্দোলিত করে। আপনি ভুলবার নয় তবুও আল্লাহর ডাকে সবাইকে চলে যেতে হবে তেমনি আপনিও।আপনি সম্পক্তি নয় দেশ জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ ছিলেন। বাঙালী তথা বীর চট্রলাবাসী শ্রদ্ধায় অবনত করে আপনাকে শ্রদ্ধা করে। স্যালুট বীর চট্রলার বীর সন্তান ডঃ মাহাফুজুল হক,স্যালুট বীর পটিয়ার গর্বিত সন্তান ডঃ মাহাফুজুল হক।- লেখক - তসলিম উদ্দিন রানা,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক নেতা।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশের হয়ে লড়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী
৩১,মার্চ,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল ভারত। মূলত শোষণমুক্তির জন্য পাকিস্তানি সেনাদের বন্দুকের নলের মুখে নিরস্ত্র বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ, অমিত বিক্রম, জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম, এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও মুগ্ধতার কারণে শুরু থেকে নৈতিক সমর্থন দিয়ে গেছেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরের দিনই, ২৭ মার্চ, লোকসভার ভাষণে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ শুধু একটি আন্দোলন দমনের জন্যই নয় বরং সেখানে নিরস্ত্র জনতার ওপর ট্যাংক নামানো হয়েছে। সেখানে কী ঘটেছে এবং আমাদের কী করণীয় এ সম্পর্কে আমরা সক্রিয় আছি। এখানে একটি ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয়, ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একচেটিয়া জয় হয় আওয়ামী লীগের। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে যে জাতিকে জাতীয়তাবোধে উদ্ধুদ্ধ করেছেন বঙ্গবন্ধু, তারই ফলাফল পূর্ববাংলার মোট ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে বিজয়। কিন্তু দুই পাকিস্তানের মধ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ার পরেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয়নি পাকিস্তানি সামরিক সরকার। আলোচনার ছদ্মবেশে সময়ক্ষেপণ করে তারা। এরমধ্যে ধীরে ধীরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সেনাবাহিনী নিয়ে আসা হয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে সার্বিক নির্দেশনা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরমধ্যেই, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অতর্কিত ঘুমন্ত বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তাৎক্ষণিকভাবে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। এরপরেই গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। পরবর্তীতে তার নামেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়। সেসময় আমাদের প্রবাসী সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে তৎপরতা চালিয়েছেন। তবে তখনও বাংলাদেশ কোনো স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্র না হওয়ায়, বিশ্বনেতাদের কাছে সেসব প্রচেষ্টা কোনো গুরুত্ব পায়নি। এক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন এ বিষয়ে কথা বলেছেন, বিশ্বনেতাদের কাছে সেটির অর্থ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দিল্লিতে আলোচনা হয় আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দিন আহমেদের। সেসময় তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে উত্থাপন করে তার পক্ষ থেকে সহযোগিতা চান। এরপর এই যুদ্ধে সহযোগিতার আশ্বাস দেন শ্রীমতি গান্ধী। ১৩ এপ্রিল লাখনৌতে তিনি বলেন, পূর্ব বাংলায় যা হচ্ছে, তাতে ভারত সরকার নীরব হয়ে থাকবে না।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ভারত-বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত। অবশ্যই এই দুটি দেশে তাদের পারস্পরিক বিষয় সৌহার্দ্যপূর্ণ হবে। ৭ মে সম্মিলিত বিরোধী দলের বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী যখন বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, তখন অনেকে বলেছিলেন যে- ভারতের অভ্যন্তরের বিষয়ে অন্য কেউ নাক গলালে কেমন হবে, এক্ষেত্রে কাশ্মীরের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন- কাশ্মীরে কিছু স্বার্থবাদী হাঙ্গামা রাখতে চায় কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়টি তেমন নয়, সেখানে জনসমর্থন আছে। মূলত বঙ্গবন্ধুর একচেটিয়া জনসমর্থনের ওপর আস্থা রেখেই বাংলাদেশের ব্যাপারে আস্থাশীল ছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে তিনি আলাদাভাবে কল্পনাও করেননি কখনো। এই আস্থা থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি একাধিকবার ছুটে গেছেন বিশ্বনেতাদের কাছে। ১৯৭১ সালের ১৩ মে বিশ্বশান্তি সংঘের সম্মেলনে বাংলাদেশের বিষয়ে বার্তা পাঠান তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সেই বার্তা ৮০টি দেশের প্রায় সাতশ প্রতিনিধির সামনে পড়ে শোনানো হয়। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের জনসাধারণের ন্যায্য দাবি, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের দেশ শাসন করবেন। আশা করি, বিশ্বের মানুষ এই দাবি সমর্থন করবেন এবং তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য সচেষ্ট হবেন। একদিকে যেমন যুদ্ধ চলছিল, অন্যদিকে জেলের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল পাকিস্তানি জান্তারা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ভোটে বিজয়ী নেতাকে প্রহসনের এক বিচারের মুখে ঠেলে দিয়ে ফাঁসিতে ঝোলানোর বন্দোবস্ত করেছিল পাকিস্তানিরা। এই খবর জানতে পেরে ষড়যন্ত্র থেকে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার জন্য উদ্যোগ নেন শ্রীমতি ইন্দিরা। ৮ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সরকারের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বার্তায় বিশ্বের সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের প্রতি শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা ও মুক্তির দাবি জানিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে যে, বিচারের নামে প্রহসনের আড়ালে শেখ মুজিবকে হত্যার চক্রান্ত হয়েছে। এই হত্যা সংগঠিত হলে পূর্ববাংলার অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। দুদিন পরই, ১১ আগস্ট, শ্রীমতি গান্ধী বিশ্বের ২৪টি দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে মুজিবের প্রাণ রক্ষার জন্য তাদের প্রভাব খাটানোর আবেদন জানান। ইন্দিরা গান্ধীর তৎপরতার কারণেই ১৭ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভার আন্তর্জাতিক আইন সমিতির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিকট তার-বার্তায় শেখ মুজিবের মুক্তির দাবি করা হয়। এরপর ২০ আগস্ট ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি থেকে বিশ্ব শক্তি পরিষদ শেখ মুজিবের মুক্তির দাবি করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে। ২১ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধী ও যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসেফ টিটোর এক যুক্ত বিবৃতিতে পাকিস্তানকে সাবধান করে দিয়ে বলা হয়, বিগত নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থহীন রায় উপেক্ষা করা হলে সমস্যা জটিলতর হতে বাধ্য। সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি প্রদান অবশ্য প্রয়োজন। এদিকে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকেই বাংলাদেশের অনেক স্থান মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে যায়। এসময় ভারতের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সেনাকমান্ড ঢাকা সেনানিবাস থেকে ব্যাপক সংখ্যক সৈন্য সীমান্ত এলাকায় পাঠায়। তা দেখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভাবলেন, এই পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে জানানোর সময় এসেছে। তাই ২৪ অক্টোবর তিনি ১৯ দিনের জন্য বিশ্ব সফরে বের হন। এসময় শ্রীমতি গান্ধী ইউরোপ ও আমেরিকার বহুদেশ সফর করেন। তার এই সফর ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে আলোচনাকালে শ্রীমতি গান্ধী বলেন, ব্রিটেনকে ভারতীয় উপমহাদেশের ব্যাপারে জড়াতে চান না তিনি। তবে বর্তমান সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের উদ্দেশ্যে কারারুদ্ধ নেতা শেখ মুজিব কিংবা তার সহকর্মীদের সঙ্গে অবিলম্বে আলোচনা শুরু করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারকে রাজি করার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন বলে তিনি আশ্বস্ত হতে চান। ব্রিটেনে সফররত অবস্থায় বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেন ইন্দিরা গান্ধী। সেসময় বিবিসির সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন- ভারত যদি বাংলাদেশের গেরিলাদের সবরকম সাহায্য বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেখানকার সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ হয়ে যাবে কিনা? এর উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই না। তারা (বাংলাদেশের জনগণ) কারো মুখাপেক্ষী হয়ে ২৫ মার্চ রাতে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়নি। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচুর সংখ্যক বাঙালি বাস করছে, তারা ইতোমধ্যে সংগঠিত হয়ে তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সব রকম সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসছে। এছাড়াও বাংলাদেশের হাজার হাজার সেনা, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার সদস্য রয়েছেন; যারা যুদ্ধ করতে পারদর্শী এবং তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্রসহ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য বাঙালির স্পৃহা এবং টগবগ করতে থাকা জাতীয়তাবোধ তাকে এতাটাই মুগ্ধ করেছিল যে, রণাঙ্গণের যোদ্ধাদের প্রতি তার মনে অসীম শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়েছিল। আর তিনি এটাও জানতেন যে, বাঙালির এই জাগরণ সম্ভব হয়েছে শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্য। তাই বঙ্গবন্ধুকে যাতে পাকিস্তানিরা হত্যা করতে না পারে, সেজন্য তিনি প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন ঘুরে এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র যান ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সন একে গৃহযুদ্ধ অভিহিত করে পাকিস্তানের পক্ষে সমাধানের প্রস্তাব দিলে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরপর ৬ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, পূর্ববাংলায় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের মূল্য দেওয়া হয়নি। সেই নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েও গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ পায়নি। পক্ষান্তরে পাকিস্তানি সেনা শাসকেরা আলোচনার নামে গোপনে সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে বাংলার সাধারণ মানুষদের হত্যা করার চক্রান্ত করেছে। কাজেই বর্তমানে সেখানে যা ঘটেছে, তাকে গৃহযুদ্ধ বলা যাবে না বরং তা যুক্তিগ্রাহ্য রাজনৈতিক পন্থায় অধিকার আদায়ের যুদ্ধ। শ্রীমতি গান্ধী তার ভাষণে শেখ মুজিব সম্পর্কে বলেন, শেখ মুজিব একজন অসাধারণ নেতা। তার সঙ্গে কারো কোনো তুলনা চলে না। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়লাভ করেছেন, তা এক অসামান্য ঘটনা। তিনি চিন্তা চেতনায় একজন আধুনিক মানুষ। পাকিস্তান সরকার তার সেই সাফল্যকে নস্যাৎ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফলকে অস্বীকার করছে। যার ফলশ্রুতি হিসেবে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ২৫ মার্চ পূর্ববাংলায় এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক হত্যার মধ্য দিয়ে যার শুরু। ঘটনা কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভারতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে চরম অত্যাচারের মাধ্যমে। এসব জনগণের অপরাধ, তারা সামরিক সরকারকে ভোট দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া সেই ভাষণে তিনি আরো বলেন, পূর্ববাংলার মানুষ এখন স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার, তাদের নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে চালান দেওয়া হয়েছে। ঘটনার অনিবার্যতা তাদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনে বাধ্য করছে। ৭ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী চার দিনের সরকারি সফরে ফ্রান্সের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এর মধ্যেই পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান তার সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। তবে ফ্রান্স ছাড়ার পূর্বেই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আমার আলোচনার কিছু নেই। শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনাই বর্তমান সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে। কারণ তিনিই বাঙালি জনগণের নির্বাচিত নেতা। তাছাড়া বাংলাদেশের জনগণের অনুমোদনক্রমে যে কোনো সমাধানই সম্ভব হতে পারে। সফর শেষে ভারতে ফেরার পর ১৫ নভেম্বর পাকিস্তানের যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে নিউজ উইক পত্রিকাকে শ্রীমতি গান্ধী বলেন, ভারতে যারা স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে, পরবর্তীতে তারাই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করেছে। কিন্তু পাকিস্তানে যারা সংগ্রাম করে স্বাধীনতা এনেছে, তার বেশিরভাগই জেল খেটেছে, নির্যাতিত হয়েছে। আর যারা বিদেশি প্রভুদের সহযোগিতা করেছে- যেমন সামরিক, বেসামরিক আমলা; তারাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারত পাকিস্তান দুটি দেশের মধ্যে এটাই পার্থক্য। আর এজন্যই দুদেশের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। যতোই সময় গড়াচ্ছিলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারে ততোই কথা বলছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই নেত্রী। ২৭ নভেম্বর দিল্লিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিষয়ে এখন একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর সময় রয়েছে। পাকিস্তান ইচ্ছা করলে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধানে আসতে পারে। কিন্তু ৩ ডিসেম্বর ভারতকে আক্রমণ করে বসে পাকিস্তান। এরপর পাল্টা আঘাতে যায় ভারত। ডিসেম্বরের ৬ তারিখে ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এসময় ইন্দিরা গান্ধী বলেন, অনেক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রামরত বাংলাদেশের জনগণ এবং পশ্চিম পাকিস্তানি হামলা প্রতিহত করার জন্য জীবনপণ সংগ্রামরত ভারতের জনগণ আজ একই লক্ষ্যে ও একই পথের পথিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পাশাপাশি শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারেও সমানভাবে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাই ১০ ডিসেম্বর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রীমতি গান্ধী বলেছেন, ভারত তখনই পুরোপুরি বিজয়ী হবে, যখন বাংলাদেশ ও তার নেতারা মুক্ত হবে। মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে সরকার গঠন করবে। এককোটি শরণার্থী ভারত থেকে স্বাধীন সার্বভৌম স্বদেশে ফিরে যাবে। সেই দিনটি খুব দ্রুতই অর্জিত হয়। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের সামনে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি পাকিস্তানি জান্তারা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকালে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পর বেলা সাড়ে ৫টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিজয়ের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশে শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। ঢাকা এখন একটি স্বাধীন দেশের মুক্ত রাজধানী। এই সংসদ ও সমগ্র জাতি এই ঐতিহাসিক ঘটনায় আনন্দিত। আমরা বাংলাদেশের জনগণকে তাদের এই বিজয়লগ্নে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জন্যে আমরা মুক্তিবাহিনীর সাহসী তরুণদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমাদের স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। আমরা তাদের জন্য গর্বিত। যারা জীবন দিয়েছেন ভারত তাদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। আমরা আশা করি ও বিশ্বাস করি যে, এই নতুন দেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণের মধ্যে যথাযোগ্য স্থান গ্রহণ করে বাংলাদেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবেন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে ছাড়া পান বঙ্গবন্ধু। এরপর লন্ডনে যাত্রাবিরতি শেষে ১০ ডিসেম্বর ভারত হয়ে বাংলাদেশের ফেরেন। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীসহ তার সরকার অভ্যর্থনা জানায় তাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশে থাকার জন্য ভারতের জনগণ ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু। সেই সঙ্গে একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নেন। এরপর নতুন করে দেশ গড়ার প্রত্যয় বুকে নিয়ে জাতির জনক পা রাখেন বাংলাদেশের মাটিতে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই তার কথা মতো মাত্র দুই মাসের মধ্যে সব ভারতীয় সেনাকে ফিরিয়ে নেন ইন্দিরা গান্ধী। যুদ্ধে জয়ের কোনো অংশীদার বিশ্বের ইতিহাসে কখনোই এত দ্রুত জয় করা ভূমি ছেড়ে চলে যায়নি। এটি সম্ভব হয়েছে শুধু বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর আস্থা ও মুগ্ধতার কারণেই।- সংগৃহীত
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ: কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা
১৬,মার্চ,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ১৯৭১-এর মার্চের মতো বিপুল ঘটনাবহুল, চরম উত্তেজনাপূর্ণ, আকাশসমান স্বপ্ন ও সংঘাতময় পরিস্থিতি, যার ধারাবাহিকতায় নজিরবিহীন গণহত্যা এবং স্বাধীনতার শাশ্বত ঘোষণা- বাঙালির ৫ হাজার বছরের লিখিত-অলিখিত ইতিহাসে কখনো দেখা যায়নি, ভবিষ্যতে ঘটারও কোনো কারণ নেই। আমাদের প্রজন্ম সৌভাগ্য- বাঙালির সেই সুবর্ণ ইতিহাস আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, ঘটনার কেন্দ্রে বিচরণ করেছি এবং বাঙালির সর্বোচ্চ আনন্দ-বেদনার অভিজ্ঞান আজও বহন করছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে। বাঙালি জাতির দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন ও অহঙ্কার ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং এই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছে স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিহাস সৃষ্টিকারী অনন্যসাধারণ ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন বটে, তবে ৭ মার্চের ভাষণেই তিনি স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার পাশাপাশি কীভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধ করতে হবে তার রণকৌশলও ঘোষণা করেছিলেন। সেদিন ঢাকার রমনার বিশাল মাঠে (যা এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে দশ লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছিল তাদের অধিকাংশ কালের পরিক্রমায় ৭১-এর পরবর্তী ৫০ বছরে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। আমরা বিরল সংখ্যক ৭ মার্চ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী প্রত্যক্ষ করার জন্য বেঁচে আছি, যে সৌভাগ্য আজকের বাংলাদেশে অল্প কিছু মানুষই দাবি করতে পারে। ৭১-এ আমরা সদ্য যৌবনে পদার্পণ করেছি। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা স্নাতক সম্মানের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। খণ্ডকালীন কাজ করি কাজী আনোয়ার হোসেনের রহস্য পত্রিকায় সহযোগী সম্পাদক হিসেবে। সে বছর ফেব্রুয়ারি আমাদের এক বছরের সিনিয়র বেবী মওদুদের সম্পাদনায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বের করেছিলাম রানার নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, যার লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার দাবিকে জনপ্রিয় করা। বেবী মওদুদ ছিলেন শেখ হাসিনার সহপাঠী, পরে সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ৭০-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস বিজয়ের পরই এটা অবধারিত হয়ে গিয়েছিল- পাকিস্তানে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা এবং তাদের দোসর পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো কখনও বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। ৭১-এর জানুয়ারি থেকেই শুরু হলো ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা। বঙ্গবন্ধু অবশ্য জানতেন নির্বাচনে তিনি যত বেশি ভোট পান না কেন পাকিস্তানিরা কখনও তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার গোপন পরিকল্পনা নির্বাচনের আগেই তিনি চূড়ান্ত করেছিলেন, যা তার দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও বিস্তারিত জানতেন না, জানতেন ছাত্র লীগের ভেতর যে নিউক্লিয়াস তিনি তৈরি করেছিলেন, যেটি পরিচিত ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা বিএলএফ নামে- তার নেতারা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছিল। পাকিস্তান এগিয়ে যাচ্ছিল অনিবার্য ভাঙনের দিকে আর বাঙালি অপেক্ষা করছিল- বঙ্গবন্ধু কবে স্বাধীনতার ডাক দেবেন। ৭০-এর নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বাংলাদেশ সহ সমগ্র বিশ্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বাঙালি জাতির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মার্চের ১ তারিখ দুপুরে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান যখন এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করলেন তখন পূর্বাণী হোটেলে বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের পরিষদ দলের সভা চলছিল। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসে জড়ো হয়েছিল কলাভবনের বটতলায়। ডাকসুর নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করলেন বেলা ৩টায় তারা পল্টন ময়দানে সমাবেশ করবেন, যার পাশে পূর্বাণী হোটেলে অবস্থান করছিলেন বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। কয়েক ঘণ্টার ভেতর ঢাকার স্বাভাবিক চেহারা পাল্টে গেল। অফিস, আদালত, কল-কারখানা, সরকারি দফতর সব ফেলে বিক্ষুব্ধ মানুষ মিছিলের পর মিছিল নিয়ে পূর্বাণী হোটেল আর পল্টন ময়দানে জড়ো হলো। পূর্বাণী হোটেলের চারপাশের রাস্তায়ও মিছিলকারীরা অবস্থান গ্রহণ করল। বঙ্গবন্ধু পূর্বাণী হোটেল থেকেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২ মার্চ ঢাকা শহরে এবং ৩ মার্চ সারা দেশে ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়ে বললেন, ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় তিনি আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ঘোষণা করবেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন আরম্ভ হয়ে গেল যা অব্যাহত ছিল ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অপারেশন সার্চলাইট-এর নামে নজিরবিহীন গণহত্যাযজ্ঞ আরম্ভের আগে পর্যন্ত। এই দিনই বঙ্গবন্ধু ছাত্র নেতৃবৃন্দকে তার ৩২ নম্বরের বাড়িতে ডেকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার নির্দেশ দেন। ৭ মার্চ রেসকোর্সের বিশাল ময়দানে সকাল ১০টা থেকেই জনসমাগম আরম্ভ হয়েছিল। দুপুর ২টা নাগাদ গোটা ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত করেছিল। আমি আর আমার বন্ধু শফী চৌধুরী হারুণ (যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, সদ্যপ্রয়াত) একসঙ্গে টিএসসির কাছে মাঠের এক প্রান্তে বসে সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ শুনেছি। রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা তখন প্রায় ষোল লাখ। শুধু ঢাকার ছাত্র-জনতা নয়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল থেকে শ্রমিকরা এসেছিল ডামি হাতুড়ি শাবল নিয়ে, কৃষকরা এসেছিল লাঙ্গল কাঁধে নিয়ে, নৌকার মাঝিরা এসেছিল বৈঠা ও লগি নিয়ে। অনেকে এসেছিল তীর ধনুক আর কাঠের বন্দুক নিয়ে। রমনার ময়দানের চতুর্দিকের রাস্তায় মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। সবার কণ্ঠে একই শ্লোগান জয় বাংলা। এ ছাড়া শ্লোগান ছিল- তোমার দেশ আমার দেশ- বাংলাদেশ বাংলাদেশ, তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি। সব মিছিলে বাংলাদেশের পতাকা- গাঢ় সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মাঝখানে বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্র। এই মানচিত্র খচিত পতাকা মার্চের ২ তারিখেই ছাত্রনেতারা উত্তোলন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে, যা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সর্বত্র দৃশ্যমান ছিল। বঙ্গবন্ধু সেদিন বেশ কিছুটা দেরিতে মঞ্চে উঠেছিলেন। তার আগে আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা মঞ্চ থেকে মুহুর্মুহু শ্লোগান দিচ্ছিলেন, যার জবাব দিচ্ছিল উপস্থিত জনতা। শ্লোগানে শ্লোগানে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল রমনার বিশাল ময়দান। সেই সময়ে মনে হয়েছে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলের এই বিশাল মুক্ত প্রান্তরে চির দুঃখিনী বাংলার হৃদস্পন্দন ধ্বনিত হচ্ছে। মঞ্চে বঙ্গবন্ধু নয়, বাংলাদেশের বঞ্চিত, বেদনাহত বিক্ষুব্ধ হৃদয় কথা বলছে। বাগ্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভূয়সী প্রশংসা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিসম্পন্ন বিদেশী সাংবাদিকরা সব সময় করেছেন। বৃটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং সহ শত শত বিদেশী সাংবাদিক সেদিন বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী ভাষণ শোনার জন্য রমনার রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। আমার প্রামাণ্যচিত্র ক্রাই ফর জাস্টিস-এ এক সাক্ষাৎকারে সাইমন বলেছেন, তিনি তখন বাংলা কিছুই বুঝতেন না। ভিয়েতনাম থেকে ঢাকা এসেছেন, কারণ বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম জেনে গিয়েছে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটি শব্দ বুঝতে না পারলেও তাঁর যাদুকরী বাচনভঙ্গী এবং উপস্থিত দর্শকদের উপর তার সম্মোহনী প্রভাব লক্ষ্য করে সাইমন বার বার রোমাঞ্চিত হচ্ছিলেন। একই কথা পরে ইস্তাম্বুলে আমাকে বলেছেন তুরস্কের মানবাধিকার নেত্রী ভাসফিয়ে জামান। প্রবীণ বাঙালি কূটনীতিক আরশাদুজ্জামানের সহধর্মিণী মাদাম ভাসফিয়ে মঞ্চের ঠিক সামনে বসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনেছেন। একটা ভাষণ কীভাবে গোটা দেশের মানুষকে জীবনবাজি রেখে মুক্তিসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে পারে সেই ভাষণ সমাবেশে উপস্থিত থেকে শোনার সৌভাগ্য তার হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে কামাল আতাতুর্কের ভক্ত মাদাম ভাসফিয়ে এই ভাষণ শোনার পর থেকে বঙ্গবন্ধুর ভক্ত হয়ে গিয়েছেন। আমার প্রামাণ্যচিত্রে তিনি বলেছেন, তুরস্কের জাতির পিতা মোস্তফা কামালের চেয়ে বঙ্গবন্ধুকে তিনি বড় নেতা মনে করেন। কারণ কামাল আতাতুর্ক আধুনিক তুরস্কের জনক, রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ক আগে থেকেই ছিল। কামাল আতাতুর্ক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে ইতিহাসের পাশাপাশি ভূগোলও সৃষ্টি করেছেন। এ হচ্ছে তুরস্কের এক মানবাধিকার নেত্রীর বক্তব্য, যে তুরস্ক মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে আবছা দেখা যাচ্ছিল। ছবিতেও দেখা যাবে দূর থেকে ধারণ করা দৃশ্যে গোটা মাঠ ধুলি ধুসরিত ছিল। কাছে থেকে ক্লোজ আপে যখন বঙ্গবন্ধুর মুখের অভিব্যক্তি, দীর্ঘ অবয়ব, উত্তোলিত হাত ধারণা করা হয়েছে- সেখানে শরীরের ভাষায়ও দেখা যাবে বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য তাঁর নিদারুণ মর্মবেদনা, পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রকারী ও নির্যাতনকারী শাসকচক্রের প্রতি তাঁর বিশাল ক্রোধ এবং আসন্ন মহাসংগ্রামের প্রস্তুতি ও দিক নির্দেশনা প্রকাশ ও প্রদানের সময় কী গভীর আবেগ তিনি ধারণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুধু নয়, স্বাধীনতার পাশাপাশি জাতির সার্বিক মুক্তির বিষয়টি শেষের বাক্যে যেভাবে মূর্ত হয়েছে সেটি সমগ্র ভাষণেরই নির্যাস- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জনগণের সার্বিক মুক্তির প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ও সার্বিক মুক্তির বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল বলেই ৭১-এর যুদ্ধকে আমরা নিছক স্বাধীনতার যুদ্ধ না বলে মুক্তিযুদ্ধ বলি। বাংলার সংক্ষুব্ধ মানুষের হৃদয়ে ধারণ করা প্রতিটি প্রত্যয় ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শন করেছিলেন সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা না করে, যা করেছিলেন ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অপারেশন সার্চলাইট-এর নামে নৃশংসতম গণহত্যা আরম্ভের অব্যবহিত পরে, ইংরেজি দিনপঞ্জী অনুযায়ী তখন ২৬ মার্চ আরম্ভ হয়েছে। সে সময়ে আমাদের বয়সী তরুণদের ভেতর অনেকেরই ক্ষোভ ছিল, হতাশাও ছিল- বঙ্গবন্ধু কেন সরাসরি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বা নিউক্লিয়াসের কোনো কোনো নেতাও চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু যেন ৭ মার্চেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর ওপর এ ধরনের চাপের কথা বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। ইতিহাস প্রমাণ করেছে- ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু কী গভীর দুরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি যদি সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন পাকিস্তান এটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রতীয়মান করতে পারত এবং যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ৭১-এ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে সমর্থন ও সহানুভূতি অর্জন করেছিল তা দুরূহ হতো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শেষে আগত মানুষদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আন্তবাহিনী জন সংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালেক তার উইটনেস টু সারেণ্ডার গ্রন্থে লিখেছেন: বক্তৃতার শেষ দিকে তিনি জনতাকে শান্ত এবং অহিংস থাকার উপদেশ দিলেন। যে জনতা সাগরের ঢেউয়ের মতো প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে রেসকোর্সে ভেঙে পড়েছিল- ভাটার টান ধরা জোয়ারের মতো তারা ঘরে ফিরে চলল। তাদেরকে ধর্মীয় কোনো জনসমাবেশ তথা মসজিদ কিংবা গির্জা থেকে ফিরে আসা জনতার ঢলের মতোই দেখাচ্ছিল এবং ফিরে আসছে তারা সন্তুষ্টচিত্তে ঐশীবাণী বুকে ধরে। ভাষণ শোনার পরই রেসকোর্স ময়দান থেকে আমি আর হারুণ সেগুন বাগিচায় কাজী আনোয়ার হোসেনের রহস্য পত্রিকার অফিসে গিয়েছিলাম। আগে থেকেই সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী, শিল্পী হাশেম খান, লেখক শেখ আবদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন- তুমুল আলোচনা চলছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে। কাজী আনোয়ার হোসেন পত্রিকাটির প্রকাশক সম্পাদক হলেও সম্পাদনার যাবতীয় কাজ আমাকেই করতে হতো। মার্চ সংখ্যা বেরোবার কথা ১০ তারিখে। রহস্য পত্রিকায় সেবার নির্ধারিত প্রচ্ছদ কাহিনী ছিল শিল্পে রহস্যময়তা পরাবাস্তববাদ। লিখেছিলেন শিল্পী, সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী। প্রচ্ছদের ছবি নির্বাচন করা হয়েছে ফরাসী শিল্পী সালভাদর দালির একটি পরাবাস্তববাদী পেইন্টিং। আমি বললাম, পত্রিকার প্রচ্ছদ কাহিনী পরিবর্তন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আজকের ভাষণের ওপর প্রচ্ছদ হবে। আনোয়ার ভাই বললেন, তা কি করে সম্ভব? প্রচ্ছদ ছাপা হয়ে গিয়েছে। ওটা বাতিল করতে হলে অনেক টাকা গচ্চা দিতে হবে। তাছাড়া এত অল্প সময়ে নতুন প্রচ্ছদ ছাপা সম্ভবও নয়। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। শিল্পী হাশেম খান রহস্য পত্রিকার প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করতেন। তিনি আমাদের দুজনকে নিরস্ত করে বঙ্গবন্ধুর মতো আপাতদৃষ্টিতে মধ্যপন্থা গ্রহণ করলেন। বললেন, প্রচ্ছদ আগেরটা থাক। আমি বঙ্গবন্ধুর একটা স্কেচ করে এবারের সংগ্রাম.... লিখে দেব। ওটা আলাদা ছাপা হয়ে প্রচ্ছদের ঠিক পরের পাতায় পেস্ট করে দেব, যাতে প্রচ্ছদ উল্টালেই ওটা চোখে পড়ে। শাহরিয়ার ওটার ওপর সম্পাদকীয় লিখতে পারে। সেবার রহস্য পত্রিকার মতো রাজনীতিবর্জিত পত্রিকাও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে এভাবে ধারণ করেছিল। এরপর আমাদের সাপ্তাহিক রানার-এ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের প্রতিকৃতি কীভাবে স্থান করে নিয়েছিল সে এক দীর্ঘ কাহিনী। এই ভাষণটির মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি থেকে সকল দলের নেতা এবং কার্যত বাংলাদেশের অঘোষিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সারা দেশে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন। লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
সবচেয়ে অনিশ্চয়তার একটি পেশা সাংবাদিকতা
১৫,মার্চ,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: সাংবাদিকতা নিঃসন্দেহে একটি মহান পেশা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। মূলত, সংবিধানে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করে বলা হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংগঠনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হলো। সংবিধানের ৩৯ (২) (খ) অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দানের কথা বলা হয়েছে। ১৯৯৩ সালে সলিম উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র মামলায় আদালত বলেছেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধানে স্বীকৃত।[সূত্র: ৪৪ ডিএলআর (এডি) (১৯৯২) ৩০৯]।১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কতৃক মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষনা পত্র গৃহীত হয়। সে ঘোষনার ধারা-১৯ এ বলা হয়েছে, প্রত্যেকেরই মতামত পোষণ করা ও প্রকাশ করার অধিকার রয়েছে। কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া মতামত পোষন করা এবং যে কোনো সংবাদ মাধ্যমের ও রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে তথ্য ও মতামত চাওয়া, গ্রহণ করা ও জানাবার স্বাধীনতা এই অধিকারের অন্তর্ভূক্ত। সাংবাদিকতা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।স্বাধীনতা চর্চার দিক থেকে সাংবাদিকতা এখন সারা বিশ্বে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।এখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে দেশে দেশে অত্যন্ত কঠোর আইন বিধান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এটা একটা বৈশ্বিক প্রবণতা। আরও এক দিক থেকে সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেটা ঘটেছে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার ফলে একজন পাঠকের সামনে সংবাদের অনেক পথ উন্মোচিত হয়েছে। সমাজের সবচেয়ে চক্ষুশূল পেশাটির নাম সাংবাদিকতা সম্ভবত। বেশির ভাগ শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছেই সাংবাদিকরা সমাদৃত নয়। অনেক সময় পুলিশের শত্রু সাংবাদিক। কারণ অনেক পুলিশের সব অপকর্ম তুলে ধরে সাংবাদিকরা। রাজনীতিবিদরা সাংবাদিকদের তোষামোদ করলেও মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই ক্ষোভ ঝারেন। কারণ অনেকের বহুমুখী চরিত্র দৃষ্টিকটুভাবে ফুটিয়ে তোলেন সাংবাদিকরা। চিকিৎসকদের অনেক বড় শত্রু সাংবাদিক। কারণ তাদের হঠকারী আচরণ এবং গলাকাটা মুনাফার বিষয়টি সাংবাদিকরাই তুলে ধরেন। সরকারি আমলাদের অনেক দুর্বলতা সাংবাদিকদের জানা। মাঝে মাঝে কিছু তুলেও ধরেন। এজন্য তারাও সুযোগ পেলেই সাংবাদিকদের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়েন। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সাংবাদিকরা শুধুই নেতিবাচক রিপোর্ট করে তাদের ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটায়। সাংবাদিকদের কারণে বিভিন্ন সময় অতিরিক্ত মুনাফা ও মজুদদারি করা যায় না। সমাজের দুর্নীতিবাজ, অসৎ, সন্ত্রাসী ও মাফিয়াদের অভয়ারণ্যে মূল প্রতিবন্ধকতাই সাংবাদিকরা। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তারাও সাংবাদিকদের দুই চোখে দেখতে পারে না। পুলিশ থেকে শুরু কর চোর-ছিনতাইকারী কেউ সাংবাদিকদের শত্রু ভাবে। তবে সাংবাদিকরা যে একদম ধোয়া তুলসি পাতা সেটা বলছি না। তবে তাদের প্রতি যে হারে সবার ক্ষোভ ও নিন্দা বর্ষিত হয় তা দেখে মাঝে মাঝে ভাবি সাংবাদিকতা কি সত্যিই অপরাধী!একবার কি ভেবে দেখেছেন, সাংবাদিকরা কত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন? সবচেয়ে অনিশ্চয়তার একটি পেশা সাংবাদিকতা। এটি এমন একটি পেশা যাদের শত্রু তৈরি হয় পাইকারি হারে। কারও পক্ষে ১০টি রিপোর্ট করার পর একটি রিপোর্টে হয়ত কোনো সমালোচনা বা নেতিবাচক কিছু এসেছে। এতেই ওই ব্যক্তি ক্ষেপে গেলেন সাংবাদিকের ওপর। সেই ব্যক্তিটি যদি হন সমাজের প্রতিষ্ঠিত কেউ কিংবা ক্ষমতাধর তাহলে তো ওই সাংবাদিকের জীবনের হুমকিও রয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতি বছর অসংখ্য সংবাদকর্মী প্রাণ হারান। যেখানেই সংঘাত-সংঘর্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যায়-অবিচার, অসততা-দুর্নীতি সেখানেই ছুটে যান সাংবাদিকরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তুলে আনেন সত্যটা। আপনাকে প্রকৃত তত্যটা দিতে, আরও বেশি খবরে সমৃদ্ধ করতে নিরলস শ্রম দিয়ে যান প্রতিটি সংবাদকর্মী।সরকারি দলের কাছে (যে দলই ক্ষমতায় থাকুক) সাংবাদিক বা গণমাধ্যম কখনোই সমাদৃত নয়। কারণ তাদের সরকারের ভালো ভালো ৯০টি দিক না দেখে ১০টি খারাপ দিকই জাতির সামনে তুলে ধরেন। এজন্য সব সরকারের আমলেই সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সরকার এবং সরকারি দলের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আবার বিরোধী দলও সাংবাদিকদের পছন্দ করে না; ভাবে সাংবাদিকরা সরকারের দালাল। আমাদের প্রচারটা সেভাবে দিচ্ছে না। এভাবে সমাজের বেশির ভাগ শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সাংবাদিকরা নিন্দার পাত্র। সাংবাদিকরা যে একদম ধোয়া তুলসি পাতা সেটা বলছি না। তবে তাদের প্রতি যে হারে সবার ক্ষোভ ও নিন্দা বর্ষিত হয় তা দেখে মাঝে মাঝে ভাবি সত্যিই কি তারা এতোটা অপরাধী! তবে মজার ব্যাপার হলো, সাংবাদিকরা যতই নিন্দার পাত্র হোক মোটামুটি সবাই কোনো না কোনোভাবে সাংবাদিকদের কাছে ধরা খাওয়া। পদোন্নতির জন্য ভালো কাজের প্রচার লাগবে, পুলিশ অফিসার বা সরকারি আমলারা দ্বারস্থ হন সেই সাংবাদিকের। রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে চান, সাংবাদিকদের সাপোর্ট লাগবেই। কোনো ভালো কাজের প্রচার কিংবা সমাজের কোনো অনাচারের বিরোধিতা করতে চান আশ্রয় এই সাংবাদিকেরাই। মিডিয়া ছাড়া সরকার যেন অচল। অসদাচরণের কারণে একটি মাত্র সংস্থা বা বিভাগের খবর বয়কটের হুমকি দিলে সংশ্লিষ্টদের গলার পানি শুকিয়ে যায়। আর বিরোধী দল, তাদের মূল পুঁজিই মিডিয়া। কোনো কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দলকে মিডিয়া জিইয়ে রেখেছে বলেও প্রচার আছে। মিডিয়া কাভারেজের প্রতি লালায়িত না এমন কোনো দল বা সংগঠন পাওয়া মুশকিল। কিন্তু তাদের সবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু মিডিয়া, সবার ক্ষোভের মূল টার্গেট সাংবাদিকরা। নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে এখনকার সাংবাদিকতা পূর্বের ঐতিহ্য অনেকটা হারিয়েছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা শুধু সাংবাদিকতায় নয়, প্রতিটি শ্রেণি-পেশায় এই অধঃপতন এসেছে। তা সত্ত্বেও সবখানেই ভালো-মন্দ উভয়টিই আছে। ঢালাওভাবে কোনো শ্রেণি-পেশা বা গোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করা কখনও সমীচীন নয়। পুলিশ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, আইনজীবী কোন পেশাটি এমন আছে যেখানে শতভাগ স্বচ্ছতা রয়েছে। সবখানেই অধঃপতন এসেছে, সবখানেই নৈতিকতায় ধস নেমেছে। তারপরও প্রতিটি পেশাতেই এখনও ভালো মানুষের উপস্থিতি আছে। যদিও সেই সংখ্যাটা অনেক কম। সাংবাদিকতার নামেও হয়ত অনেক অনৈতিক কর্মকাণ্ড হয়ে থাকে। কিন্তু তাই বলে সব সাংবাদিক অনৈতিক? সব সাংবাদিক দালাল? সব সাংবাদিক টাকা খায়? সমাজের যে কেউ সাংবাদিকদের প্রতি কোনো কারণে ক্ষুব্ধ হলেই তাদের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়ে। পুরো সাংবাদিক সমাজ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করে বসে। এটা নিঃসন্দেহে অন্যায়। সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু থাকে না। আরাম-আয়েশ তাদের জীবনে খুব কমই জায়গা পায়। পেশাগত কারণে তাদের ছুটে চলতে হয় অবিরাম। রাস্তায় চলছে সংঘাত-সংঘর্ষ, আপনি হয়ত ওইদিন ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে বাসা থেকে বেরই হবেন না। চোখ রাখবেন টিভির স্ক্রিনে, অনলাইন পত্রিকার পাতায়; কান পাতবেন এফএম রেডিওতে। কিন্তু সাংবাদিকও যদি আপনার মতো ঘরে বসে থাকেন, তাহলে কী হবে? আপনি কি ঘরে বসে সেই তথ্যগুলো পাবেন? কোথাও বড়ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা গেল, আপনি হয়ত ভয়ে এর আশপাশেও গেলেন না। কিন্তু সাংবাদিকের সব ভয়কে জয় করে সেখানে ছুটে যেতে হবে। তুলে আনতে হবে প্রকৃত সত্যটা। একজন সাংবাদিক জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে যে সত্যটা তুলে ধরেন, যে চিত্রটা আপনার সামনে উপস্থাপন করেন সেটা দ্বারা আপনি সমৃদ্ধ হন, উপকৃত হন; আবার সুযোগ পেলেই সেই সাংবাদিকের প্রতি গালি ছুড়েন-এটা কত বড় অবিচার! সাংবাদিকতার মান, নৈতিকতার দণ্ড নিম্নমুখী সেটা অনস্বীকার্য। কিন্তু এখনও সমাজে আশার যে প্রদীপটি দূরআকাশে মিটিমিটি করে জলছে সেটার পেছনে মূল অবদান সাংবাদিকদের। প্রতিদিন শত শত মিডিয়া সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরছে। সমাজের প্রতিটি সদস্যকে সচেতন করার জন্য প্রতিদিনই মিডিয়া কিছু না কিছু দিচ্ছে। আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত, দেশপ্রেমিক, নৈতিকতাসম্পন্ন করে তুলতে মিডিয়া তাদের অবস্থান থেকে কাজ করে যাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক ধারা, মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে গণমাধ্যম। দুর্নীতি, অসততা, লুটপাট, দেশবিরোধী নানা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াইয়ে নিয়োজিত গণমাধ্যম। শত প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে মালিকপক্ষ গণমাধ্যমগুলো টিকিয়ে রেখেছে। যদিও প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থে গণমাধ্যম করেন, কিন্তু তবুও শুধুই কি গণমাধ্যমের দ্বারা মালিকপক্ষেরই স্বার্থ! আপনার আমার কোনোই স্বার্থ এখানে নেই? গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করা; জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করা; গণমাধ্যমের বিকাশ আরও শাণিত করার নিরন্তন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিক সমাজ। সেই সাংবাদিকরাই যখন আপনার গালি খায়, আপনার ক্ষোভের বস্তুতে পরিণত হয়; আপনার নিন্দার ঝড় তাদের ওপর এসে পড়ে তখন সাংবাদিকদের কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়ার আশা করতে পারেন না।সম্প্রতি নসরাত হত্যার পর সারা দেশে আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠে দেশ। এই আন্দোলনের কাভারেজ দিতে কোনো কমতি ছিল না গণমাধ্যমগুলোর। এটাকে বিশেষ ইভেন্ট হিসেবে নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাংবাদিকরা যথাসম্ভব কাভারেজ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এমন অনেক উদাহারণ দেওয়া যেতে পারে(নাইবা দিলাম) এতোকিছুর পরও কি সাংবাদিকরা কোনো বাহবা পেয়েছেন? কোনো পক্ষ কি সাংবাদিকদের প্রশংসা করেছে? মার খাওয়া সাংবাদিকদের পাশে কি কেউ এসে দাঁড়িয়েছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক খুললে শুধু সাংবাদিকদের প্রতিই বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ক্ষোভ দেখা যায়। কেউ বলছে এমন উস্কানিমূলক সংবাদ কেন দিলো, কারও অভিযোগ এই ছবিটি দিয়ে উস্কানি দেয়া হয়েছে; কারও অভিযোগ অনেক কিছু হয়েছে কিন্তু দালাল সাংবাদিকরা কিছুই তো প্রকাশ করলো না। তার সাথে রয়েছে আইনী জামেলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সহ বিভিন্ন আইন। পরিশেষে সকলকে অনুরোধ করবো সব দোষ সাংবাদিকের কাধে দেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখবেন। সাংবাদিকরা দেশ ও জনগণের কল্যানে কাজ করে। লেখক: মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
আওয়ামী রাজনীতির কঠিন দুঃসময়ে আদর্শিক ও পরিক্ষীত যোদ্ধার নাম গিয়াস উদ্দিন হিরু
২৪,ফেব্রুয়ারী,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: মৃত্যুঞ্জয়ী ছাত্রনেতা।অকুতোভয় সাহসী বীর।চট্রলার আলোচিত ১২ ছাত্রনেতার অন্যতম।চট্রগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের ৮৬ - ৯০ এর দিকে দাপুটে নেতা ছিলেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরচ্চার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের হিরুর ভুমিকা অতুলনীয়।দলের জন্য তার জীবনের মুল্যবান সময় এমনকি ২০ টির উপর মামলা হুলিয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে যায়। জেল জুলুমের শিকার আর হুলিয়া নিয়ে মাঠের পরিক্ষীত সাবেক মেধাবী ছাত্রনেতা প্রিয় হিরু।যার ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতার মুখ দেখে। রাত দিন লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে ও তাদেরকে বিতাড়িত করতে গিয়ে এরশাদ সরকার মার্শাল আইনে বিচার করে হিরুর উপর ষ্টিম রোলার চালায় যা ইতিহাসের অংশ।সেই ৮০ /৯০ এর দুঃসময়ে রাজনীতি করতে গিয়ে তার জীবনে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়। সেই দুঃসময়ের কাল অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হিরুর ত্যাগ আর তিতিক্ষার কথা বর্ননাতীত।আওয়ামী পরিবারের সন্তান হিসাবে সাতকানিয়া ধর্মপুরে পিতার আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত দল আওয়ামী লীগের ঘরনার ছেলে হিসাবে হিরু ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮০সালের দিকে স্কুল ছাত্রলীগের সভাপতি থেকে ৮৬ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মহসিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি, এক সময়ে ১৯৯৪ সালের দিকে জাতীয় পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য,২০০২ সালের দিকে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের স্টিয়ারিং ১ম সদস্য নির্বাচিত হন।চট্রগ্রাম কেন্দিক সিটি কলেজ গ্রুপের অন্যতম হলেন হিরু।তার বন্ধু শহীদ কামাল উদ্দিনের মৃত্যুতে কিছুটা নমনীয় থাকলে আবারও মাঠের রাজনীতির পুরোধা ছিলেন। ১৯৯৪ সালে বিখ্যাত রাজাকার গোলাম আজমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ততকালীন জোট সরকারের রোষানলে পড়েন।৯৬ সালের দিকে বিএনপির বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে জীবনের নেমে আসে এক ভয়াবহ অবস্থা যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ২০০১,১/১১ বিএনপি -জামাত ও অগনতান্তিক আন্দোলন করতে গিয়ে প্রায় ৩০টির উপর মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তবু্ও দমে থাকেনি। জীবনের মুল্যবান সময়, মেধা, টাকা, শ্রম ও ত্যাগ করে সব কিছু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দেশরত্ন শেখ হাসিনার ভোটের অধিকার বাস্তবায়নে বীর চট্রলার নায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন যা ইতিহাসের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আজীবন মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করে যাওয়া একটা নাম হিরু। ২০১২ সালের দিকে নিজ এলাকায় পিতার চেয়ারম্যান আসনে বসতে নিজ গ্রাম সাতকানিয়া ধর্মপুরে যায় কিন্তু জেলা, উপজেলা আওয়ামী লীগ এই পরিক্ষীত ও আদর্শিক যোদ্ধার নাম নাদিয়ে দলচ্যুত ব্যক্তির নাম দেয়।হিরু নাম না দেওয়া তিনি সোজা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতার দুয়ারে দুয়ারে যাই সেই সামান্য একজন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হতে।কিন্তু সেই মনোনয়ন তার কপালে জুটল না যা ইতিহাসের অংশ হিসেবে আজ গন্য হল কিন্তু সেই দলচ্যুত পরাজিত লোক আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে চেয়ারম্যান হয় আর হিরুর মত আদর্শিক ও পরিক্ষীত সাবেক ছাত্রনেতা সামান্য একটা দলীয় চেয়ারম্যান মনোনয়ন পায়না। দীর্ঘদিন,সাংস্কৃতিক জোট, খেলাঘর আসর, কামাল স্মৃতি সংসদের সংগঠনে মাধ্যমে হাজারো নেতার কারিগর ছিলেন হিরু। সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে আলকরন, ফিরঙ্গীবাজার, মাদারবাড়ী, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা, জামালখান ওয়ার্ড সহ বিভিন্ন জায়গায় গড়ে তুলছে হাজার হাজার নেতা কর্মী যা নতুন প্রজন্মের জন্য আর্শীবাদ।আর দুঃসময়ে সিটি কলেজ ছাত্রলীগের ঘাটি হিসেবে গড়ে তুলছে।১/১১,২০০১ এর কঠিন সময়ে চট্রগ্রাম মহানগর ছাড়া পার্শ্ববর্তী পটিয়া, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাশখালী, লোহাগড়া, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, সন্দ্বীপ, ফেনি সহ বিভিন্ন জায়গায়র নির্যাতিত লোকের আশ্রয়স্থল হিসাবে হিরুর অবদান ভুলবার নয়। দীর্ঘদিন পদ বঞ্চিত হওয়ার পর ২০০৬ সালের চট্রগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কোনো দায়িত্ব পায়নি।২০১২ সালে সম্মেলনে চট্রগ্রাম মহানগর সম্মেলনে তাকে কোনো পদে রাখেনি।কারণ হিরুর জনপ্রিয় তুঙ্গে।দমে থাকার লোক নয় বলে আদর্শিক ও পরিক্ষীত যোদ্ধা হিরু আবারও গতির সঞ্চার করে রাজনীতি করে যাচ্ছে। এলাকার মানুষের ভালবাসা আর কর্মীদের নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ৮০,৯০ দশকের জিয়া, এরশাদ স্বৈরচ্চার বিরোধী আন্দোলন, ৯৬ খালেদা বিরোধী আন্দোলন ও ২০০১, ১/১১ আন্দোলন সংগ্রামে চট্রগ্রাম মহানগর নিউমার্কেট চত্ত্বরে হরতাল সহ আন্দোলন সংগ্রামে হিরুর অবদান কিংবদন্তি। স্বৈরচ্ছার ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। অনেক সংগ্রাম আর আন্দোলন করে দলকে ক্ষমতায় আনলে তাদের কপালে জুটল না কোন ভালো পদবী বা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। আদর্শিক ও পরিক্ষীত সাবেক মেধাবী ছাত্রনেতার পাশাপাশি এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও উন্নয়নমুলক কাজের মাধ্যমে নিজ গুণে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও আর কখনো ক্ষমতা আর টাকার নিকট পরাজিত হয়ে হিরুর নিকট কোন ভালো পদবী জুটেনি। চট্রগ্রাম মহানগর এলাকায় সিটি কলেজ গ্রুপ শক্তিশালী। আর সাতকানিয়া ধর্মপুর ইউনিয়নে তার জনপ্রিয় তুঙ্গে যা বলার উপেক্ষা রাখেনা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন লাভের আশায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা স্থানীয় সরকার কমিটির প্রতিটি সদস্যদের কাছে আকুতি মিনতি এমনকি কান্নায় জর্জরিত হয়ে তার রাজনীতির ত্যাগের কথা তুলে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে দুঃসময়ের রাজনীতির নায়ক হিরু।নমিনেশন বোর্ড তাকে নমিনেশন না দিয়ে স্থানীয় জেলা ও উপজেলার সুপারিশে টাকার বিনিময়ে দলচ্যুত ব্যক্তিকে দলীয় মনোনয়ন দিল যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ঘটনা।দলের দুঃসময়ের কর্মী তথা আন্দোলন সংগ্রামের পুরোধা হিরুর মত আদর্শিক নেতার মুল্যায়ন হল না যা আমাদের রাজনীতির জন্য অশুভ সংকেত। আজ অবহেলিত ও আদর্শিক যোদ্ধা হিরুর মুল্যায়ন করাতো দুরের কথা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নক্সা করে গেছে এক শ্রেণীর ধান্ধাবাজ ও বর্ণচোরা লোক।এলাকায় তার সুনাম আছে। সব জায়গায় হাইব্রিড, চামচা, ব্যবসায়ী আর দলচ্যুত ব্যক্তির নিকট বন্দী মনোনয়ন আর রাজনীতির পদবি।হিরুর ত্যাগ তিতিক্ষা আর লড়াই সংগ্রামের কথা বিবেচনা করে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে মনোকষ্ট পেয়ে শেষ অবধি হার্ট অ্যাটাক আক্রান্ত হয়ে আর ফিরে এলোনা প্রিয় হিরু। রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। বর্তমানে রাজনৈতিক পরিক্ষীত ও আদর্শিক যোদ্ধারা বড়ই অসহায়।তারা দুঃসময়ে রাজনীতি করেছেন বলে আজ দলের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। আর দলের আদর্শিক যোদ্ধারা মনোনয়ন না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে বলে দলের তেরেটা বাজাচ্ছে সবক্ষেত্রে। কেন্দ্রীয় নেতা ও বোর্ডের সদস্যদের নিকট গিয়েছে সামান্য একটা ওয়ার্ড চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য কিন্তু সেই তার ত্যাগের মূল্যায়ন পাবে বলে আশায় বুক বেধে আছে।অধির আগ্রহের সাথে কাজ করে যাচ্ছে সামান্য একজন প্রতিনিধি হওয়ার জন্য আর যেখানে তার ছাত্র প্রছাত্ররা বিভিন্ন জায়গায় এমপি, মন্ত্রী, কেন্দ্রীয় নেতা, সচীব, আমলা, মেয়র, উপজেলার চেয়ারম্যান এমনকি সব জায়গায় তার লোক ভালো পদে অধিষ্ঠিত।সব জায়গায় তার ছাত্ররা ভালো আছে সেখানে আদর্শিক ও পরিক্ষীত আওয়ামী লীগ নেতা হিরুর অবস্থান তেমন ভালো নেই,খুবই অসহায়।সবাই ক্ষমতা আর টাকার নিকট জিম্মি।হিরুর মত বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সাবেক ছাত্রনেতা চেয়ারম্যান হলে সুবিধা অনেক । কেননা হিরুর বন্ধুরা সচিব,অতিরিক্ত সচিব বা ভালো পদে আছে। কর্মকর্তাগন তার নিকট কোন বিষয় নয়।শিক্ষিত হিরু ত্যাগী ও আদর্শিক নেতা হিসাবে নিজ গুণে কাজ করতে পারবে। কোন এমপি,মন্ত্রীর দরকার হবে না বিধায় সবাই তাকে সমীহ করে যাবে। এক শ্রেণির নেতারা চামচা আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে আজ রাজনীতির তেরেটা বাজাচ্ছে। হিরু ক্ষমতার বাইরে থেকে কিছু পায়নি দলের শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়ে গেছে যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিজ স্ত্রী ও অসুস্থ হয়ে মৃত্যু বরন করেন।ক্ষমতার আওয়ামী লীগ তাকে কিছুই দেয়নি শুধু পেয়েছে বিষাদ আর জ্বালা। কোন তদবির ও ব্যবসা করতে পারেনি বলে হিরুরা শুধু আদর্শ নিয়ে বেচে ছিল।জীবনের সুখ নামক তার কাছ থেকে অনেক দুরে।দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও হিরুরা ক্ষমতার বাইরে ছিল। জীবন সংগ্রাম করতে করতে এক সময়ে জীবন্ত কিংবদন্তি বীর হিরু পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বিদায় নিয়েছে। আজীবন মানুষেরা হিরুদেরকে হিরু হিসাবে মনে রাখবে।কারণ আদর্শ কাকে বলে তা হিরুর কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া যাবে। ছাত্র জীবনে তার বক্তব্য,মেধা আর কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে ছিল আমার রাজনীতির অনুপ্রেরণা। ঢাকায় আসলে সর্ব প্রথমে আমাকে ফোন দিবে। ক্ষমতার রাজনীতির দৈন্যদশার কথা গুলো বলবে আর সাহসীকতার আদর্শিক রাজনীতির করার জন্য বারংবার উপদেশ দিত।আজ কষ্ট লাগে কারণ চট্রলার ছাত্র রাজনীতির এক আদর্শিক লিজেন্ড বিদায়।বিদায় বীর ছাত্র জনতার অভিভাবক। বিদায় প্রিয় নেতা হিরু।এমন এক কঠিন দুঃসময়ে ছিল তবুও কখনো আপোষ করেননি।নিজের পরিবার কখনো চিন্তা করতনা শুধু দল আর জননেত্রী শেখ হাসিনার চিন্তায় মগ্ন থাকত।অবহেলিত হিরুরা আসলেই হিরু। তার আদর্শ বাস্তবায়নে আমরা মত হাজার হাজার কর্মী এগিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন আমিন।তার আত্ত্বার মাগফেরাত কামনা করছি ও বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।- লেখক: তসলিম উদ্দিন রানা,কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ
কৃষি পণ্য কমিশন গঠন জরুরী
২৩,ফেব্রুয়ারী,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: কৃষি বিশেষজ্ঞ ও সর্বজন গ্রহনযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কৃষি পণ্য কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবী। যা কৃষি মন্ত্রণালয় বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিদ্বন্ধী হবে না বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। সংসদে নীতি নির্ধারণ ও আইন প্রনয়ণের ক্ষেত্রে আজ কৃষকের কোন প্রতিনিধি নেই। তাই কৃষককের সংগঠন আজ জরুরী হয়ে পড়েছে। যে সংগঠন কৃষকের সুখ, দুঃখ ও অভাব অভিযোগ নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকদের সাথে কথা বলবে। করোনাকালে কৃষিখাতে সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের প্রণোদনা সঠিক হলেও পর্যাপ্ত ছিলো না বলা যায়। কিন্তু ঋণ প্রণোদনা প্রদানের চেয়ে নগদ আর্থিক প্রণোদনা বেশি কার্যকর। কেননা প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে বিভিন্ন দাপ্তরিক জটিলতা অতিক্রম করে ঋণ গ্রহন করা দুরূহ। যে কারণে করোনার আপতকালে কৃষককে নগদ ২৫০০ টাকা প্রদান বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। সোমবার (২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১) রাজধানীর তেজগাঁওস্থ এফডিসিতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে কৃষিখাতে করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগ নিয়ে ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরো বলেন, কৃষি বান্ধব আর কৃষক বান্ধব কথাটি যে এক নয় করোনাকালে তা আরো সুস্পষ্ট হয়েছে। সরকার কৃষি বান্ধব হলেই কৃষকের যে উপকার হবে তা বলা যায় না। কৃষি উৎপাদন, সরবরাহ, বিপনন ইত্যাদি ক্ষেত্রে কৃষক যেন মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দ্বারা প্রতারিত না হয় তার জন্য সরকারকে কৃষক বান্ধব হতে হবে। প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল না হয়ে স্থানীয় সরকার, এনজিও ও ব্যক্তিখাতকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। করোনার অভিঘাতে বিভিন্ন খাতে যে বিপর্যয় ঘটেছে তার খাতওয়ারি মূল্যায়ণ এখনো সম্ভব হয়নি। তবে করোনা বিপর্যয়ে সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট না হলেও তা সঠিক সময়ে নেয়া হয়েছে। এ সময়ে সরকারি উদ্যোগের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় দুভাবে সেটি গ্রহন করা হয়েছে। একটি ছিল চলমান উদ্যোগ আরেকটি করোনা বিপর্যয় কালীন বিশেষ উদ্যোগ। সভাপতির বক্তব্যে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষিখাত ব্যাপক ভূমিকা রাখলেও পোশাক সহ অন্যান্য শিল্পখাতের মতো এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা তাদের দু:খ-দুর্দশায় ততোটা গুরুত্ব পায় না। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, এফবিসিসিআই ইত্যাদি সংগঠনের মতো কৃষকদের কোন শক্ত সংগঠন নেই। ফলে কৃষকদের সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পুরোপুরি চাপ তৈরি করা যায় না। করোনাকালে পোশাক শিল্প, শিল্প-কলকারখানা, আমদানি-রপ্তানী বাণিজ্য সহ অন্যান্য খাতে সরকারের প্রণোদনা প্রবাহ যেভাবে লক্ষ্য করা গেছে, সেভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষক ও কৃষিখাত সংশ্লিষ্টদের জন্য প্রণোদনা প্রবাহ তেমন জোরদার ছিল না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সরকার ঘোষিত প্রণোদনা পৌছায়নি। তবে কৃষি বান্ধব এই সরকার করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় তাদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। করোনা প্রতিরোধে যখন সারা দেশে লকডাউন চলছিলো তখনও আমাদের কৃষক-কৃষানি ভাই ও বোনেরা ঘরে বসে থাকেনি। আমাদের জন্য ফলন উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। তাই করোনার অভিঘাতে আবারো প্রমাণিত হয়েছে কৃষি আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে মজবুত জায়গা। ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে কৃষিখাতে করোনার অভিঘাত মোকাবিলায় জনাব কিরণ ১০ দফা সুপারিশ প্রদান করেন। সুপারিশগুলি হচ্ছে- অতি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের ঋণের সুদ মওকুফ করা, কৃষকদের ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ আরো বাড়ানো, অতি ক্ষতিগ্রস্থদের কৃষকদের এককালীন সাহায্য দেওয়ার জন্য তহবিল গঠন করা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী কৃষি কমিশন গঠন করা, কৃষি প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষি শ্রমিকদের অন্তর্ভূক্ত করা, নারী কৃষকরা যেন প্রণোদনা থেকে বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করা, প্রণোদনা প্রদানের উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রকৃত কৃষকদের জন্য স্বল্পমূল্যে ও সহজ কিস্থিতে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, প্রকৃত কৃষকদের কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করা ও এর আওতা বাড়ানো। প্রতিযোগিতায় বিরোধী দল আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিকে পরাজিত করে সরকারি দল ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া বিজয়ী হয়। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, সাংবাদিক মঈনুল আলম, সাংবাদিক অনিমেষ কর, সাংবাদিক দৌলত আক্তার মালা এবং সাংবাদিক কাবেরী মৈত্রেয়। প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলের মাঝে ক্রেস্ট, ট্রফি ও সনদপত্র প্রদান করা হয়।
শেষ পর্যন্ত ভ্যাকসিনেই আস্থা
৬,ফেব্রুয়ারী,শনিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: একুশ শতকের শুরুতেই মানবজাতির ইতিহাসে নেমে আসে ভয়াবহ এক দুর্যোগ। একটি ভাইরাস সারা বিশ্বের মানুষকে থামিয়ে দেয়। থামিয়ে দেয় কর্মচঞ্চল প্রতিটি রাষ্ট্রের চলমান গতি। প্রায় গত এক বছর বিশ্ব থমকে গিয়েছিল। এখনও বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কমেনি সবটা। তাই পৃথিবী তার ছন্দে ফেরেনি। গত দশ মাসে সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২২ লাখ মানুষের। এর মাঝেই উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এই ভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিস্কারের জন্য বা প্রতিষেধকের জন্য বিস্তর গবেষণা চালিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে শিল্পোন্নত দেশগুলিতে। এর মাঝে অক্সফোর্ডের গবেষক দল অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে তাদের ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষের জন্য উৎপাদন শুর করে। আরও কয়েকটি দেশ এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোও করোনা ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বাজারজাত করে। এই ভ্যাকসিন নিয়ে সাধারণ মানুষ নানা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ছিল। সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। পাশপাশি গুজবের কারণেও বিভ্রান্ত ছিল। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানা যায়: করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের প্রতি আস্থা বেড়েছে বিশ্ববাসীর। আগে যেসব মানুষ টিকা নেয়ার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন তারাও এখন টিকা নিতে চাইছেন। স্বেচ্ছায় টিকা নেয়ার আগ্রহ বাড়ায় মহামারি অবসানের আশা তৈরি হয়েছে। এক জরিপের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার এমন তথ্য জানানো হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অর্ধেকই বলেছেন, আগামী সপ্তাহে ভ্যাকসিন দেওয়া হলে তারা তা গ্রহণ করবেন। ভ্যাকসিনের প্রতি আস্থার কথা বলেছেন আরও বেশি মানুষ। রয়টার্স আরও জানায়: অক্সফোর্ড এর ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ইউনিট এবং যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ভ্যাকসিন ডোজ দেয়া হয়েছে। রয়টার্সের গ্লোবাল ট্র্যাকারে এখন মোট টিকা দেয়ার সংখ্যা প্রায় প্রায় সাড়ে নয় কোটি। করোনা এখনও বিশ্বের ৪৪টি দেশে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জানান: মহামারি অবসানের জন্য বিশ্বব্যাপী নিদিষ্ট পর্যায়ে ভ্যাকসিন প্রয়োজন। এর জন্য বড় দেশগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। অবশেষে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে করোনা ভ্যাকসিন নতুন আশার আলো দেখাতে শুরু করেছে। মানুষের আস্থায় ফিরে এসেছে বিজ্ঞান। আবারও ঘুরে দাঁড়াবে পৃথিবী। আবারও বিশ্ব ফিরবে তার চিরাচয়িত কর্মযজ্ঞে। শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা মনে করি।- সম্পাদকীয় মতামত
ড্রাইভিং একটি স্মার্ট পেশা
২,ফেব্রুয়ারী,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: বলা চলে একজন গাড়ি চালক যখন গাড়িতে উঠে তখন পৃথীবির সবচেয়ে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে মনে করে। তার নিজের এবং পাবলিক নিরাপত্তা হয় প্রধান লক্ষ্য। তার পর আয় রোজগার। একজন গাড়ি চালকের যাত্রী হিসেবে- বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষদের তারা সেবা প্রদান করে থাকে। যার মধ্যে- ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবি, সাংবাদিক,লেখক, নায়ক, গায়ক, খেলোয়াড়, সেলিব্রেটি ও বিভিন্ন পেশাজীবী রয়েছেন। ড্রাইভিং একটি স্মার্ট পেশা। পৃথিীবির সকল ড্রাইভারদের সুখ-দুখ নাম-বদনামে অনুভূতির ভাগ থাকা সমুচিন। প্রয়োজনে তাদের সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াটা ও প্রয়োজন। ড্রাইভিং একটি স্মার্ট পেশা।বলা যায় ড্রাইভিং একটি মানসিক উৎকর্ষ সাধনের ব্যায়াম। মন এবং মগজ একত্রে কাজ করে গাড়ি চালানোর সময়।দায়িত্বশীলতা ও ধ্যান বৃদ্ধি করে,যা মেডিটেশনের মত কাজ করে।পৃথিবীতে সকল গাড়ির অপারেশনাল সিস্টেম এক। তাই সকল চালকের অবস্থা ও অবস্থান এবং কর্মপদ্ধতি এক।এটা ব্যাপার না উন্নত না অনুন্নত দেশের চালক।এটি একটি সম্মানীয় কাজ। He is a proud to be A professional Driver।- লেখক: মো.ইরফান চৌধুরী।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়াটা জরুরী নাকি ছাত্রছাত্রীদের সুস্থতা জরুরী?
১,ফেব্রুয়ারী,সৃজন দত্ত,চট্টগ্রাম,নিউজ একাত্তর ডট কম: মহামারী করোনা ভাইরাসের কবলে পতিত ১১ মাস সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এর মধ্যে ৩০শে জানুয়ারী সকালে গণভবন থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে এইচ এস সি পরীক্ষার ফল প্রকাশ কালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেনে ফেব্রুয়ারীতে পর্যবেক্ষণের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিবেন। তিনি আরো বলেছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত সকলের করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিৎ করতে হবে। বিশে^র গুটি কয়েক দেশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে আবার বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে তাদের সংক্রমনের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মহামারীর করালগ্রাসে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী ডাঃ দিপু মনি চলতি বছরের এস এস সি, এইচ এস সি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ার তারিখ ঘোষনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া সহ অটো পাশের দাবীতে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকদিন ধরে মানব বন্ধন কর্মসূচী পালন করে আসছে, তাছাড়া তাদের দাবী ফিরিয়ে দিন ১১ মাস, নয়তো দিন অটো পাস। তাছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা মন্তব্য করেছেন, দীর্ঘ সময় ছাত্র ছাত্রীদের সংগে বইয়ের দুরত্ব বজায় থাকার কারণে বিপুল শিক্ষার্থীদেরকে বই মুখী করা এখন চ্যালেঞ্জ। কারণ দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পড়াশুনায় বিচ্যুতি ঘটেছে, নিত্য নৈমত্তিক পড়াশুনা করার প্রবণতা হ্রাস পেয়ে পড়াশুনা না করার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একবার অটোপাশ দেওয়ায় ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে অটো পাশ চাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। তা ভবিষ্যতে ভোগান্তি বাড়াবে, কারণ অটোপাশ সুফলের চেয়ে কুফল বয়ে আনবে। এতে করে মেধার সঠিক বিকাশ উন্মোচিত হবে না, সাথে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরীর পথ চলার গতির বাধার সম্মুখীন হবে। অনতিবিলম্বে ছাত্র ছাত্রীদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুখী করে পড়াশুনার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন জন ও গণমাধ্যম সহ শিক্ষক, অভিভাবক, সমাজের সচেতন নাগরিকদেরকে দূর্যোগের করাল গ্রাস থেকে উত্তোরণে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। সবকিছু সঠিক বটে, তা স্বত্তেও বাস্তবতাকে অস্বীকার করা কারো উচিৎ নয়। কারণ শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের আদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলল বটে, তাতে আমাদের সকল শ্রেনীর জন সাধারণের মনে রাখতে হবে- আমাদের সন্তানদের স্স্থু থাকার নৈতিক ও কর্তব্য শুধু সরকারের একা নয়, সকলের উপর দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তায়। তাছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩০/০১/২০২১ ইং তারিখে তাহার মহা মূল্যবান বক্তব্যে অনেকে সেন্টিমেন্টাল হচ্ছেন, বক্তব্য দিচ্ছেন, পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করছেন কিন্তু এগুলো করতে গিয়ে যদি এর সাথে জড়িত কেউ সংক্রমিত হয় তবে তার দায়িত্ব কে নেবে? যারা সমালোচনা করছেন এ পদ্ধতিতে ফলাফল দেওয়ার কারণে তারা কি দায়িত্ব নেবেন? নিশ্চয় তারা কেউ নেবেন না। বাস্তব বড়ই কঠিন। বাস্তবতার আলোকে সবকিছু মেনে নিয়ে সম্মুখে এগিয়ে যেতে হবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর