পাকিস্তানে যা হচ্ছে তা যেন বাংলাদেশে না হয়
তসলিমা নাসরিন :পাকিস্তানের দরিদ্র এবং দুর্ভাগা মানুষটির নাম আসিয়া নুরিন। আসিয়াকে আমি দুর্ভাগা বলছি কারণ কী অপরাধ তিনি করেছেন, তা বোঝার আগেই তাঁকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। লাহোর হাই কোর্ট সেই মৃত্যুদন্ডাদেশ যদিও স্থগিত করেছিল, চার বছর জেলের ভিতর বন্দীজীবন কাটিয়েছেন আসিয়া। চার বছর পর সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মৃত্যুদন্ড বাতিল করেছে। তাঁকে মুক্তি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট, কিন্তু জেলের বাইরে বেরোনোর সব পথ তাঁর বন্ধ। পাকিস্তানের বাইরে বেরোনোর দরজাও বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। বন্ধ করেছে, কট্টরপন্থিরা চেয়েছে বলে। আসিয়ার মুক্তির দাবিতে সরব সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠন। পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট এবং পোপ ফ্রান্সিস, পরপর দুই খ্রিস্টান ধর্মগুরু আসিয়ার মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। তাতে কোনও লাভ হয়নি। কারণ পাকিস্তানের ধর্মান্ধ জনগণ এবং জঙ্গি সংগঠনগুলো মৃত্যুদন্ড চায় আসিয়ার। পাকিস্তানের কোনও সরকারেরই এদের উপেক্ষা করার শক্তি নেই। ঘটনার শুরু ২০০৯ সালে। পাঞ্জাবের শিকরপুরা গ্রামে ফল তুলতে গিয়ে দুই প্রতিবেশী মহিলার সঙ্গে ঝগড়া বাধে আসিয়ার। ঝগড়াটা এক বালতি পানি নিয়ে। আসিয়া ওই বালতি থেকে এক কাপ পানি নিয়ে পান করেছিলেন। আসিয়া পান করেছেন বলে প্রতিবেশী মহিলারা পানি পান করবেন না। কারণ আসিয়া মুসলমান নয়, আসিয়া খ্রিস্টান। খ্রিস্টান যে পাত্র থেকে পানি পান করে, সেই পাত্র নোংরা হয়ে গেছে, সেই পানিও দূষিত হয়ে গেছে। সুতরাং সেই পাত্র থেকে সেই পানি আর যার পক্ষেই পান করা সম্ভব, মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়। মুসলমান প্রতিবেশীরা এ কথা সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন। আসিয়াকে তাঁরা ধর্মান্তরিত হতে বলেন। খ্রিস্টান থেকে মুসলমান হওয়ার জন্য রীতিমতো চাপ দেন। কিন্তু মুসলমান তো আসিয়া হনইনি, বরং ইসলামের নবী সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। আসিয়া বলেননি এ কথা, বলেছেন প্রতিবেশী মুসলমান মহিলারা। আসিয়া স্বীকার করেননি যে তিনি নবী সম্পর্কে আদৌ কিছু বলেছেন। বাদী দাবি করেছেন প্রতিবেশী মহিলারা আসিয়ার বাড়ি গিয়ে আসিয়াকে প্রচুর মারধর করার পর নাকি আসিয়া স্বীকার করেছেন তিনি নবীকে নিয়ে বলেছেন। গ্রামের একটি অশিক্ষিত মহিলা আসিয়া। খ্রিস্টান এই মহিলা নবী সম্পর্কে জানেনই বা কী, বলবেনই বা কী। অনুমান করা সহজ যে আহমদিয়া আর খ্রিস্টানদের যেমন আহমদিয়া আর খ্রিস্টান হওয়ার শাস্তি দেওয়া হয়, তেমনই আসিয়াকে দেওয়া হয়েছে। মূলত সুন্নি মুসলমান না হওয়ার শাস্তি। পাকিস্তানের শিয়াদের ওপরও সুন্নিদের নির্যাতনের কোনও শেষ নেই। ইসলাম অবমাননা করেছে এই দাবি করে বিধর্মীদের ফাঁসানো পাকিস্তানে নতুন ঘটনা নয়। কেউ কেউ এ কারণে পাকিস্তানে জীবন দিয়েছেন, কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আসিয়াকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন বলে বা ব্লাসফেমি আইনের বিরুদ্ধে কিছু বলেছিলেন বলে খুন করা হয়েছিল সংখ্যালঘু মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিকে। পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকেও একই কারণে খুন করেছিলেন তাঁরই দেহরক্ষী মুমতাজ কাদরি। মুমতাজ কাদরির পক্ষে ছিল লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানি। এমনকী হাই কোর্টের উকিলরাও গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে মুমতাজ কাদরির প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়েছিলেন। কাদরির পরে ফাঁসি হয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানের ধর্মান্ধরা ফাঁসিকে ভয় পায় না। আসিয়াকে নাগালে পেলে তারা খুন করতে দ্বিধা করবে না। খুন করে ফাঁসিতে ঝুলতেও তাদের আপত্তি নেই। অল্প বয়স থেকেই ধর্মগুরুরা তাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে যে ধর্মের সমালোচনা যে করবে, তাকে মেরে ফেলাই সাচ্চা মুসলমানের কাজ। শুধু তাই নয় মুসলমানের দেশে অমুসলিমদের কোনও ঠাঁই নেই, হয় তারা কলেমা পড়ে মুসলমান হবে, নয় তারা মরবে। আসিয়ার সে কারণে মুক্তি হলেও সত্যিকারের মুক্তি হয় না। সর্বোচ্চ আদালতের যে বিচারপতিরা আসিয়ার মৃত্যুদন্ড বাতিল করেছিলেন, তাঁদের জীবনের ওপর হুমকি এসেছে। আসিয়ার আইনজীবীও প্রাণ বাঁচানোর জন্য পাকিস্তান থেকে পালিয়েছেন। আসিয়াকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ইউরোপের দেশগুলো চাইছে, কিন্তু আসিয়া কী করে পাকিস্তান ছাড়বেন! ছুরিতে শান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মন্সটার। ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মতো মন্সটার তৈরি করেছিল পাকিস্তান। মন্সটার এখন পাকিস্তানকে ছাড়ছে না। আসিয়ার মৃত্যুদ- বাতিল হয়ে যাওয়ার পর সারা পাকিস্তানকে অচল করে দিয়েছিল সেইসব মন্সটার। সে কারণে পাকিস্তান-সরকার ৫ দফা চুক্তি করেছে মন্সটার কট্টরপন্থিদের সঙ্গে। এই চুক্তিই পাকিস্তানকে আরও শত বছর পিছিয়ে দিল। আসিয়ার মৃত্যুদন্ড বাতিল হওয়ার পর পাকিস্তানের পাশে ছিল সভ্য দেশগুলো, ছিল মানবাধিকারে বিশ্বাস করা সভ্য মানুষ। অপশক্তির সঙ্গে আপসের কোনও প্রয়োজন পাকিস্তান সরকারের ছিল না। সর্বনাশকে সম্ভবত এভাবেই ডেকে নিয়ে আসা হয়। একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঙালি স্বাধীনতাসংগ্রামীরা বাংলাদেশ নামে নতুন একটি দেশ জম্ম দিয়েছেন বটে, কিন্তু বাংলাদেশ নামে কোনও দেশ যারা চাননি, তাঁরা যেভাবে শুরু থেকে কট্টরপন্থিদের প্রশ্রয় দিয়েছেন, এক সময় স্বাধীনতাসংগ্রামীরাও সেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন কট্টরপন্থিদের। পাকিস্তানের অনুকরণ করতে গিয়ে দেশের সংবিধান বদলে দিয়েছেন এক দল, রাষ্ট্রধর্ম নামে কোনও কিছুর অস্তিত্ব ছিল না, সেটিকে, বলা নেই কওয়া নেই, কোত্থেকে এনে, একেবারে ঢুকিয়ে দিয়েছেন সংবিধানে। আরেক দল সেই সংবিধান বদলাবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েও বদলাননি। সেক্যুলার বাংলাদেশ তাই দেখতে শুনতে অনেকটা এখন পাকিস্তানের মতোই। পাকিস্তানে আছে ব্লাসফেমির জন্য মৃত্যুদন্ডের আইন, বাংলাদেশে সেটি আমদানির জন্য মৌলবাদীরা প্রায়ই রাস্তায় নেমে উম্মাাদের মতো আচরণ করে। কে জানে কখন আবার মৌলবাদীদের ভোট পাওয়ার আশায় কোন সরকার ব্লাসফেমির জন্য মৃত্যুদন্ড বৈধ করে দেয়। কে ভেবেছিল শেখ হাসিনার মতো প্রগতিশীল প্রধানমন্ত্রী একদিন হেফাজতে ইসলামের মতো ধর্মীয় কট্টরপন্থিদের ‘কওমি মাতা’ হয়ে যাবেন! হেফাজতে ইসলামের লোকেরা নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। আজ নিজেদের স্বার্থে তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পথে নামছে না বটে, কিন্তু এক তুড়িতে সক্কলে নারী নেতৃত্বের পক্ষে চলে গেছে, এ ভাবাটা হাস্যকর। ভোটের জন্য এমন বিশাল এক জনসংখ্যাকে বাগে আনা চমৎকার এক রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, কিন্তু আল্টিমেটলি এটি পাকিস্তানের পদাঙ্কই অনুসরণ করা। পাকিস্তানে যুগের পর যুগ সরকার আপস করেছে কট্টরপন্থি দলের সঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোও জোট বেঁধেছে ওদের সঙ্গে। এই করে করে কট্টরপন্থিরা ফুলে ফেঁপে বড় হয়েছে, কট্টরপন্থিদের জঠর থেকে জম্ম নিয়েছে সন্ত্রাসী। ধর্মের নামে সন্ত্রাস করার লোক, মানুষ কোপানোর লোক পাকিস্তানে যেমন আছে, বাংলাদেশেও আছে। এভাবে চললে পাকিস্তানের চেয়ে মোটেও পিছিয়ে থাকবে না বাংলাদেশ। এভাবে আপস করে চললে একাত্তরে পাকিস্তানের সঙ্গে এক দেশ হয়ে না থাকার যে প্রখর যুক্তি ছিল, সেগুলো ক্রমেই হাস্যকর মনে হবে। পাকিস্তান পারতো কট্টরপন্থিদের সঙ্গে ৫ দফা আপসে না গিয়ে আসিয়াকে জেল থেকে বের করা, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে রাখা, রাখা সম্ভব না হলে দেশের বাইরে যেতে দেওয়া। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সেটা হতে পারত বড় একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ইমরান খান সেটা করলেন না। না করে যে ভুলটা করেছেন, সেই ভুল কওমি ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রির সমতুল্য করে দিয়ে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা করেছেন। কট্টরপন্থি দলের সংবর্ধনা গ্রহণ করে একই ভুল করেছেন। দেশের ভালো চাইলে কট্টরপন্থা নির্মূল করতে হয়, কট্টরপন্থার সঙ্গে হাত মেলাতে হয় না। আশা করি ইমরান খান এবং শেখ হাসিনা দুজনই নিজেদের ভুলত্রুটি শোধরাবেন, যেন সেই অপশক্তি যারা গণতন্ত্রে, নারী স্বাধীনতায়, মানবাধিকারে, মতপ্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করে না, তাদের হাতে দেশ চলে না যায়।লেখক : নির্বাসিত লেখিকা , সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাংলাদেশকে কল্পনা করা যায় না
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনটির কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আসার কথা। অনার্স পরীক্ষায় যারা ফার্স্ট এবং সেকেন্ড হয়েছে তারা বঙ্গবন্ধুর সেই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েছে, সেই হিসেবে আমিও আমন্ত্রিত। আমি যথেষ্ট উত্তেজিত এবং ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য শার্ট ইস্ত্রি করছি তখন পাশের বাসা থেকে আমাদের প্রতিবেশী আর্তনাদ করে উঠে আমাদের জানালেন গতরাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ফেলেছে। তখন সেটি বিশ্বাসযোগ্য কোনো কথা ছিল না, আমরা তাই দৌড়ে পাশের বাসায় গিয়েছি। আমাদের বাসায় রেডিও-টেলিভিশন নেই, খবরের জন্য প্রতিবেশীর ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের বাসায় গিয়ে রেডিওতে শুনতে পেলাম, একজন মানুষ নিজেকে মেজর ডালিম হিসেবে পরিচয় দিয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবরটি বেশ নির্বিকারভাবে পরিবেশন করছে। খবরটি তখনো অবিশ্বাস্য ছিল, এতদিন পরেও সেটি অবিশ্বাস্য। বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাংলাদেশকে কল্পনা করা যায় না, আমরা স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। আমার বয়স তখন কম, অভিজ্ঞতা আরও কম। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি শুধুমাত্র জেনেছি, এই হত্যাকাণ্ডের ফলাফল কী হবে অনুমান করার ক্ষমতা ছিল না। তিন মাসের মাথায় যখন জেলখানায় আওয়ামী লীগের আরও চার নেতাকে হত্যা করা হলো তখন হঠাৎ করে আমরা বুঝতে শুরু করেছি দেশটিতে ভয়াবহ একটা ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে। সেই ভয়াবহ ঘটনার ধাক্কা আমাদের পরিবারও বুঝতে শুরু করেছে। আমার বোনের বিয়ে হয়েছে একজন রাজনৈতিক নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খানের সঙ্গে, তাকে অ্যারেস্ট করে বরিশাল জেলে রাখা হয়েছে। বোনের ছোট একটা বাচ্চা মেয়ে হয়েছে, সেই অবস্থায় সারা রাত লঞ্চে করে বোনকে নিয়ে জেলখানায় আটক তার স্বামীর সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যাই! কত আশা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তিন বছরের মধ্যে সেই স্বাধীন দেশের সব কিছু কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেছে। এরপর কত বছর পার হয়ে গেছে। এখনো আমরা সেই ৪৩ বছর আগের পঁচাত্তরের দিকে ফিরে ফিরে তাকাই। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে কারা হত্যা করেছে সেটি জানতে চাইলে আমাদের বলা হয় তারা ছিল কিছু উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক। মনে হয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক বুঝি বেপরোয়া হয়ে ঝোঁকের মাথায় এ সর্বনাশা কাজটি করেছে। আমার একজন তরুণ সহকর্মী মনে করে বিষয়টি আরও অনেক গভীর, সেটি আসলে মূলত আন্তর্জাতিক একটি ষড়যন্ত্র। প্রমাণ হিসেবে সেই সময়কার অনেকগুলো সরকার পরিবর্তন এবং হত্যাকাণ্ডের কথা সে মনে করিয়ে দেয়। কঙ্গোর স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলের প্যাট্রিস লুমুম্বা। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের ভিতর সিআইএ এবং বেলজিয়ামের শাসকরা মিলে তাকে হত্যা করেছে। চিলির সালভাদর আলেন্দে ছিলেন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তিন বছরের মাথায় সিআইএর সাহায্য নিয়ে চিলির সেনাবাহিনীর জেনারেল পিনোশে তাকে হত্যা করে। তিনি নিজে যুদ্ধ করতে করতে মারা যান। ব্রাজিলের জোয়াও গোলার্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে দেশের অর্থনীতির সংস্কারে হাত দেওয়া মাত্র সিআইএর সাহায্য নিয়ে সেই দেশের সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেশছাড়া করে। ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতায় গিয়ে যখন তাদের তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ করে নিজ দেশের উন্নতি করার জন্য দেশের সম্পদ ব্যবহার করতে শুরু করেন সঙ্গে সঙ্গে তাকে সরিয়ে দিয়ে জেলখানায় নিক্ষেপ করে আমেরিকার সিআইএ এবং ব্রিটেন। গুয়াতেমালার জ্যাকাবো আরবেঞ্জ যখন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয়ে মার্কিন কোম্পানির হাত থেকে নিজ দেশের ভূমিকে মুক্ত করার কাজ শুরু করেছেন আবার তখন সেই দেশের সেনাবাহিনী সিআইএর সাহায্য নিয়ে তাকে দেশ ছাড়া করেছে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে শরণার্থীর মতো ঘুরতে ঘুরতে এক সময় মারা গেছেন। কোয়ামে নক্রুমা ঘানার স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নিজ দেশে যখন সংস্কারের কর্মসূচি শুরু করেছেন সিআইএর সাহায্য নিয়ে সেই দেশের সেনাবাহিনী তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। এই সময়কালে শত ষড়যন্ত্র করেও সিআইএ কিউবার ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যা করতে পারেনি। ফিদেল কাস্ত্রো ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আপনজন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখছি। একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করার পর দেশটি কেমন করে পরিচালনা করতে হয় সে ব্যাপারে তিনি বঙ্গবন্ধুকে উপদেশ দিয়েছিলেন কিন্তু তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, চিলির সালভাদর আলেন্দে, ব্রাজিলের জোয়াও গোলার্ট, ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, গুয়াতেমালার জ্যাকাবো আরবেঞ্জ কিংবা ঘানার কোয়ামে নক্রুমার মতোই বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করে সপরিবারে হত্যা করেছে এই দেশের সেনাবাহিনীর একটা অংশ। পৃথিবীর এই ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি বিষয়ে মিল ছিল। তিনিও তাদের মতো জাতীয়তাবাদ এবং সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। আমাদের প্রথম সংবিধানে স্পষ্ট করে দেশ শাসনের মূলমন্ত্র হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার কথা লেখা ছিল। তিনিও অন্য সবার মতো নিজ দেশের সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাত থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বাপেক্সকে শক্তিশালী করেছেন বলে এখন আমরা আমাদের তেল গ্যাস কোম্পানির মালিক। তবে একটি বিষয়ে পৃথিবীর অন্যান্য ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবনের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। তাকে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যে অবিশ্বাস্য নৃশংসতায় হত্যা করা হয়েছিল সেরকম আর কাউকে করা হয়নি। আমরা এ ঘটনা প্রবাহের ভিতর দিয়ে বড় হয়েছি কাজেই তথ্যটি আমরা বহুকাল থেকে জানি। কিন্তু যারা প্রথমবার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারে তাদের পক্ষে সেটি গ্রহণ করা দূরে থাকুক বিশ্বাস করাও কঠিন। সেই হত্যাকাণ্ডে নারী, পুরুষ, শিশু ছিল, সদ্য বিবাহিত তরুণ-তরুণী ছিল, অন্তঃসত্ত্বা নারী ছিল এবং একটি দেশের স্থপতি সেই দেশের জাতির পিতা ছিল। এটি কি বিশ্বাস করার মতো কোনো ঘটনা? কোনো মানুষের পক্ষে কি এরকম নৃশংস হওয়া সম্ভব? নাকি আমাদের বলতে হবে শুধুমাত্র মানুষের পক্ষেই এরকম নৃশংস হওয়া সম্ভব বনের পশু তো কখনো কাউকে এত নৃশংসতায় হত্যা করে না। এরপরের ঘটনা কি আরও বেশি অবিশ্বাস্য নয়? যে মানুষগুলো বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেছে তাদের যেন বিচার করা না যায় সে জন্য সংসদে ইনডেমনিটি বিল পাস করে সেটি সংবিধানে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের পর হত্যাকারীদের কেন স্পর্শ করা যাবে না সেটি সংবিধান দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে এরকম ঘটনা কি পৃথিবীর কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব? শুধু কি তাই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামটি বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া শুরু হলো। আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করে বুঝতে পারি না, কোনটি বড় অপরাধ, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা নাকি হত্যাকারীদের নিরাপত্তা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নামটি এই দেশের মানুষের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া? দেশের এই অন্ধকার সময়ে আমি বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে। একবার দেশে এসেছি, রিকশা করে এক জায়গায় গিয়ে রিকশাওয়ালাকে রিকশা ভাড়া হিসেবে ১০ টাকার একটি নোট দিয়েছি। ছিয়াত্তরে দেশের বাইরে যাওয়ার সময় এই নোটটি পকেটে ছিল। রিকশাওয়ালা নোটটি নিয়ে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে সেটির দিকে তাকিয়ে রইল তারপর বলল, আমাকে এটি কী নোট দিয়েছেন? এই নোট এখানে চলে না। নোটের ওপর এটি কার ছবি? নোটের ওপর বঙ্গবন্ধুর ছবি ছিল। আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম এই দেশে এখন এমন মানুষ আছে যারা বঙ্গবন্ধুকে চেনে না। যে মানুষটি এই দেশটির স্থপতি, এই দেশের মানুষ তাকে চিনবে না এটি কেমন করে হয়? আমি ১৯৯৪ সালে দেশে ফিরে এসেছি। এসে অবাক হয়ে দেখছি এই দেশের রেডিও-টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয় না। ছোট ছোট ছেলেমেয়ের সঙ্গে দেখা হলে মাঝে মাঝেই তারা জিজ্ঞেস করে, স্বাধীনতার ঘোষক কে? জিয়াউর রহমান নাকি শেখ মুজিবুর রহমান? আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি, এই দেশে প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্ম হয়েছে যারা বাংলাদেশের ইতিহাস জানে না। তারা মুক্তিযুদ্ধের কথা জানে না। তারা বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা জানে না। তাদের ধারণা একজন মানুষ একটা ঘোষণা দিলেই একটা দেশের জন্ম হয়ে যায়। তারপর ৯৬ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। আমি তখন আমার স্ত্রীকে বলেছি চলো, আমরা একটা টেলিভিশন কিনে আনি। এখন নিশ্চয়ই টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুকে দেখাবে। আমি আর আমার স্ত্রী পরিচিত এক বন্ধুকে নিয়ে বাজার থেকে টেলিভিশন কিনে এনেছি। সেই টেলিভিশনে বহুকাল পরে প্রথমবার বঙ্গবন্ধুকে দেখে আমাদের চোখ ভিজে এসেছিল। খুব ধীরে ধীরে এই দেশের নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা শেখানো হয়েছে। আমি লক্ষ্য করি পথেঘাটে আজকাল কোনো শিশু বা কোনো কিশোর-কিশোরী আমার কাছে জানতে চায় না, স্বাধীনতার ঘোষক কে? সংবিধান থেকে কুখ্যাত ইনডেমনিটি বিল সরিয়ে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করা হয়েছে। এতদিন যারা এদেশে সদর্পে ঘুরে বেড়িয়েছে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। দেশের বাইরে যারা রয়ে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের ভিতরে আর বীরত্বের অহংকার নেই। তারা এখন পালিয়ে থাকা খুনি, লুকিয়ে থাকা খুনি, আকণ্ঠ ঘৃণায় ডুবে থাকা খুনি। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজে পাইনি। যারা সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে তারা কি বড় অপরাধী নাকি যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রক্ষা করে এদেশের মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে তারা বড় অপরাধী? কে উত্তর দেবে? ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক। তাই যারা বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে তারা বাংলাদেশকেই অস্বীকার করে। এই দেশের মাটিতে থেকে এই দেশকে যারা অস্বীকার করে বাংলাদেশে তাদের কোনো স্থান নেই। আমি বিশ্বাস করি এই দেশের মাটিতে থেকে রাজনীতি করার প্রথম শর্ত হচ্ছে তাকে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে নিতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধকে বুকের ভিতর ধারণ করতে হবে। এর বাইরে থেকে যতদিন কেউ রাজনীতি করার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ ততদিন গ্লানিমুক্ত হতে পারবে না। আমি বহুদিন থেকে সেই গ্লানিমুক্ত বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করে আছি। লেখক : মুহম্মদ জাফর ইকবাল ,অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
সরকারকে শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে হবে
কয়েক দিন ধরে যেটি ঘটছে, সেটি খুব দুর্ভাগ্যজনক। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, যেটি খুব স্বাভাবিক, সেটিই ঘটানোর চেষ্টা করছে সন্তানরা। একটি অসম্ভব-অস্বাভাবিক ঘটনাকে স্বাভাবিক করার সংগ্রামে নেমেছে তারা। আমাদের গণপরিবহন অস্বাভাবিক গণপরিবহন। যেখানে সরকারের প্রধান ভূমিকা পালনের কথা ছিল, সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানায় পুরো বিষয়টি তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা শুধু লাভের আশায় নিম্নমানের গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছে, যার ফিটনেস নেই। রুট পারমিটও নেই অনেক গাড়ির। আমি শুনলাম, যে গাড়িটি শিক্ষার্থীদের চাপা দিয়েছে, সেটির কোনো রুট পারমিট ছিল না। কম বয়সী এবং অত্যন্ত অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়িগুলো চালানো হয়। একটি অকারণ প্রতিযোগিতা চালু করা হয়েছে, যত বেশি ট্রিপ দেওয়া যাবে, তত বেশি লাভ হবে। এতে করে এদের হাতে মানুষকে খুন করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। পৃথিবীর কোনো দেশে এটি আমি দেখিনি। যে গতিতে, যে বেপরোয়াভাবে বাসগুলো চলে, এটি অস্বাভাবিক। যেভাবে এই চালকরা ধরা পড়ে, তখন তাদের পাশে যেভাবে ইউনিয়নগুলো দাঁড়িয়ে যায়; আমাদের নৌপরিবহনমন্ত্রী দাঁড়িয়ে যান, এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কোনো রাষ্ট্রে আমি এমনটি ঘটতে দেখিনি। এটি করলে একজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে, বাধ্যতামূলকভাবে। কারণ, তিনি সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী। তিনি সাংসদ, আইনপ্রণেতাও বটে। তিনি যখন আইন লঙ্ঘনকারীকে সমর্থনের জন্য দাঁড়িয়ে যান, তখন তিনি আইন চরমভাবে লঙ্ঘন করেন। আইনপ্রণেতারা কখনও আইন লঙ্ঘনকারী হতে পারেন না। এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা আমাদের দেশে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় নেমে আমি নিরাপদে পথ চলব, এটিই স্বাভাবিক। এখন এটিই অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবখানে গণপরিবহনের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের জন্য থাকে। সেটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে নয়, অনুন্নত দেশেও দেখেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য হলুদ রঙের পৃথক বাস থাকে, সেটি স্বাভাবিক। আমাদের দেশে এটি কোনোদিনও হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বাস নেই। তাদের গণপরিবহনে মারামারি করে, অসম বয়সী অনেক যাত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উঠতে হয়; এটি চূড়ান্তভাবে অস্বাভাবিক। দুটি শিশু মারা গেল, কী নিদারুণ হত্যাকাণ্ড! এটি মেনে নেওয়া এত কষ্টকর যে এই খবরটি পড়তে গিয়ে সবার চোখ জলে ভিজেছে। আমাদের মন্ত্রী এটি শুনে হাসলেন, এটি চূড়ান্তভাবে অস্বাভাবিক। এই মন্ত্রীরা, সাংসদরা, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গাড়ির মালিক হয়ে যাচ্ছেন; এদের না পারা যায় ছোঁয়া, না পারা যায় ধরা। এমনকি এদেরকে কোনোদিন যদি আদালতে নেওয়া হয়, তখন পক্ষে সমস্ত দেশের পরিবহন শ্রমিকরা দাঁড়িয়ে যায়। আমি একটার পর একটা অস্বাভাবিক কথা বলে যাচ্ছি। ভিআইপিদের গাড়িগুলো যখন উল্টো পথে চলে যায়, এমন অস্বাভাবিক ঘটনা পৃথিবীর কোথাও ঘটে না। ফুটপাত দখল হয়ে যায়। ধানমণ্ডির ইউল্যাব থেকে বাসা পর্যন্ত আমি গতকাল হেঁটে এলাম। দেখলাম, একটি বড় আবাসন প্রতিষ্ঠান ফুটপাত দখল করে তাদের কর্মকর্তাদের গাড়ি পার্ক করে রেখে দিয়েছে। ফুটপাতে গাড়ি, সেই গাড়ি পুলিশ ধরতে পারে না। ফুটপাতে মোটরসাইকেল উঠে যায়, সেগুলো পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফুটপাতে নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকে, সেখানে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখন এই শিশু-কিশোররা রাজপথে নেমেছে অস্বাভাবিক অবস্থাকে স্বাভাবিক করতে। এটি আমার ভাবতে অবাক লাগে, যে বিষয়টি নিয়ে তাদের আন্দোলনে নামারই কথা নয়; সেই বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করছে তারা। কারণ, তারা একটি স্বাভাবিক অবস্থার গ্যারান্টি চাইছে। সেই তাদের ওপর কালকে দেখলাম পুলিশ লাঠিচার্জ করছে। আবারও সেই অস্বাভাবিক। স্বাভাবিক হওয়া কী উচিত ছিল? এদের সঙ্গে বসে আলাপ করা, এদের কাঁধে-মাথায় হাত রেখে বোঝানো, তাদের স্নেহ দিয়ে, ধৈর্য ধরে কথা শুনে একটি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা। এটিই হতো স্বাভাবিক। সেটি না হয়ে তাদের ওপর লাঠিচার্জ হয়েছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। মানছি কেন? কারণ, আমাদের প্রজন্মের আর কোনো শক্তি নেই এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার। আমরা সবাই নানা স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের হাত-পা-মুখ বাঁধা। আমরা লোভের কাছে বলি হয়ে গেছি। ক্ষমতা চাই। ফলে আমরা কোনোদিন কোনো প্রতিবাদ করব না। প্রতিবাদ করলে যেভাবে নিয়ন্ত্রণের খÿ নেমে আসে, তাতে অনেকেই প্রতিবাদ করার সাহসটা হারিয়ে ফেলেছে। অথচ প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল যারা সরকার চালাচ্ছে, তাদের ভেতর থেকে। তাদের বলা উচিত, নির্বাচন করার সময় ভোটারদের যে প্রতিশ্রুতি তারা দেন, তার বিপরীতে যাওয়ার প্রতিবাদ করা উচিত। এর আগে যখন কোটা সংস্কারের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তাভাবনায় নেমেছিল; তাদের দেশদ্রোহী, সরকারদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারলাম। কিন্তু এই শিশু-কিশোরদের কি সেই আখ্যায় আখ্যায়িত করব? এরা তো সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামেনি। তারা স্বাভাবিক অবস্থার গ্যারান্টির জন্য নেমেছে। এটি আসলে সরকারের পক্ষেই যাচ্ছে। তারা চাইছে স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত হোক। এটি হলে সরকারেরই লাভ। আমি মনে করি, যারা রাস্তায় নেমেছে, এদের কোনো লোভ নেই, অন্য কোনো চিন্তা নেই। তারা শুধু সহপাঠীর মৃত্যুর বেদনায় আহত হয়ে মাঠে নেমেছে। তারা এর পুনরাবৃত্তি চায় না। বয়স্ক প্রজন্ম এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়েছি। কিন্তু ওরা এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে মানতে পারছে না। আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ কথা বলছে। যে প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছে, তারা ভবিষ্যতের কর্ণধার। এরা যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে যাবে, তখন আমি হয়তো বেঁচে থাকব না। কিন্তু ভবিষ্যৎ এরাই। এরা কথা বলছে, এদের কথা শুনতে হবে। এদের কথা শুনলে সরকার, রাষ্ট্র ও সমাজ লাভবান হবে। এদের চাহিদা সামান্য। এরা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন করছে। তারা লাইসেন্স চেক করছে, এটি তো তাদের কাজ না, এটা পুলিশের কাজ। এটা অস্বাভাবিক। যে কাজটি পুলিশের করার কথা, রাষ্ট্রের করা কথা; সেই কাজটি এই শিক্ষার্থীরা করছে। এতে প্রমাণ হয়, আমরা রাষ্ট্র হিসেবে কতখানি পিছিয়ে পড়েছি। এই ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে একটি চিত্র উঠে এসেছে। এখন পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছি এই ভেবে, তাদের আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি কিংবা তাদের ওপর সরকারি বা অন্য কোনো ছাত্রসংগঠন আক্রমণ করেনি বলে। তবে আজকে (গতকাল) ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে পরিবহন শ্রমিকরা বাচ্চাদের গায়ে হাত তুলেছে। এই ভবিষ্যতের কথা সরকারকে শুনতেই হবে; কারণ এরাই ভবিষ্যতে ভোট দিয়ে সরকারকে নির্বাচিত করবে। সেইসঙ্গে গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে। আর শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। লেখক: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ
অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জই বিএনপির জন্য ভোটযুদ্ধ
পীর হাবিবুর রহমান :আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল সংবর্ধনা দিয়েছে। গোছানো, সুশৃঙ্খল, আড়ম্বরপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য এ সংবর্ধনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তিনি সংবর্ধনা চান না, জনগণের সেবক হয়ে থাকতে চান। মৃত্যুর আগে মরে যেতে রাজি নন, আমৃত্যু মানুষের সেবা করে যেতে চান।’ তার বক্তব্যে পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিয়োগান্ত ঘটনা, আন্দোলন-সংগ্রাম, উত্থান-পতনের চিত্রপট তুলে ধরে তার টানা প্রায় ১০ বছরের শাসনামলে যে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ করেছেন, তার চিত্রপটও তুলে ধরেছেন। তিনি আগামী জাতীয় নির্বাচনে মানুষের মুক্তির জন্য আবারও নৌকা মার্কায় দেশবাসীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এ সংবর্ধনা সভায় বর্ণিল সাজে কর্মীরা এসেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগ এ সংবর্ধনা দিলেও পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে বলা যায়, এটি ছিল কার্যত এক ধরনের প্রাক-নির্বাচনী শোডাউন। ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বলা যায়, রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া আওয়ামী লীগের সংবর্ধনার আগের দিন বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে তাদের কারাবন্দী চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে সমাবেশ করেছে। সেই সমাবেশে গ্রেফতার আতঙ্কসহ নানা ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দলের নেতা-কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নেমেছিল। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিষ্কার বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়াও ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও নাগরিক ঐক্যের যুক্তফ্রন্টও রাজনীতিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দুই দলের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন। কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। রাজনীতি কার্যত এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসরমান। ভোটযুদ্ধের দিকে বল গড়িয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত ১০ বছর ধরে যে সুসময় বইছে তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে ওয়ান-ইলেভেনের মধ্য দিয়ে যে বিপর্যয় এসেছিল, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের দমন-পীড়নের মুখে এবং নিজেদের হঠকারী, উগ্রপন্থা, অতীত আন্দোলন ও নির্বাচন বর্জনের কারণে কঠিন দুঃসময়ই নয়, করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। বলা যায় বিএনপির মহাদুর্দিন দুঃসময় রজনী যেন কাটছেই না। কবে কাটবে তা কেউ জানে না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দী। তার মুক্তি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সময় যত যাচ্ছে, সংশয় তত বাড়ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে এক যুগ ধরে নির্বাসিতই নন, আইনের চোখে তিনি একজন দণ্ডিত ফেরারি আসামি; যার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। পাকিস্তানে যেখানে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে উচ্চ আদালত দ্বারা দণ্ডিত ও ক্ষমতা থেকে বরখাস্ত নওয়াজ শরিফ লন্ডনে তার স্ত্রীকে হাসপাতালের শয্যায় কোমায় রেখে কন্যাকে নিয়ে দেশে ফিরে কারাবরণের চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, সেখানে একজন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে উঠে আসা গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে দলীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করলেও নেতা-কর্মীদের দুঃসময়ে দেশে ফিরে তারেক রহমান সেই রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সাহস দেখাতে পারবেন, এমনটি কেউ মনে করছেন না। বিএনপি কার্যত এখন নেতৃত্বহীন অবস্থায় কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ অসংখ্য নেতা বিএনপিতে থাকলেও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবতা বিবেচনায় তারা যে বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এগিয়ে যাবেন এমন সুযোগ আছে বলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন না। কারণ বিএনপি নেতা-কর্মীরা সরকারের অগ্নিরোষের মুখে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কারাবন্দী খালেদা জিয়া নতুবা লন্ডন নির্বাসিত তারেক রহমানের কাছ থেকেই আসবে— এমনটাই সবাই মনে করেন। দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ও বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীরা যদিও মনে করেন, বিএনপি যেভাবেই হোক এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জরুরি। অনেকে যেমন মনে করেন বিএনপিকে এবার নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না। তারা অংশগ্রহণ করবে। তবু বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের কারণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকেই যায়, কিছু প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। বিএনপি আসলে কী চায়? সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণা না করলেও তারা বলে আসছেন, সহায়ক সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে যাবেন, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। এ দাবির সঙ্গে এখন বড় আকারে তারা বলছেন, তাদের কারাবন্দী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। এমনকি বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়েও তাদের প্রশ্ন রয়েছে। দুটি দাবির সামনে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের মনোভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের আগে মুক্তি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার মতো উদার মনোভাব সরকারি দল রাখছে না। বিএনপি সংলাপের জন্য সরকারকে নিরন্তর তাগিদ দিয়ে এলেও সর্বশেষ আরেক দফা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নাকচ করে দিয়েছেন। বলেছেন, নির্বাচনের আগে সংলাপের সুযোগ নেই। এমনকি নির্বাচনের সময় নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে বিএনপির কট্টর সমর্থক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়ার যে প্রস্তাব করেছেন ওবায়দুল কাদের তাও নাকচ করে সংবিধানের দোহাই দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা খোলাসা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংসদের প্রতিনিধিত্বশীল দলগুলোই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে থাকবে। তার মানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতারাই ঠাঁই পাচ্ছেন না; এক নেতার দল জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জেপি প্রধানরাও থাকছেন। কিন্তু দেশের জনপ্রিয় সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এখন আর সরকার সেই সুযোগ দিচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে গণভবনে আলোচনার দাওয়াত করেছিলেন। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দিতে চেয়েছিলেন। কোন অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনে, পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে বিএনপি সে প্রস্তাব নাকচই করেনি, সহিংস হরতাল-অবরোধের পথ নিয়ে নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল। এই লেখা যখন লিখছি, তখন দিল্লি সরকারের আমন্ত্রণে বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সুনীল শুভরায় ও মেজর (অব.) খালেদকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। দিল্লিতে এখন এরশাদের জাতীয় পার্টিরও কদর বেড়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বড় প্রতিনিধি দল নিয়ে দিল্লি সরকারের আতিথেয়তা নিয়ে এসেছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম তো দিল্লি বসে বলেই দিলেন বিএনপির প্রতি তাদের মনোভাব কী! এদিকে বিএনপি নেতারা কিছুদিন আগে দিল্লি সফর করে নানা মহলের সঙ্গে বৈঠক করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সহায়তা চেয়েছেন। এমনকি তাদের ক্ষমতার সময় ভারতের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে এ দেশের মাটিকে সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেভাবে ব্যবহার করেছিল তার জন্য অনেকটা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমতায় এলে ভারতের স্বার্থরক্ষায় বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর আকুতিও জানিয়েছেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গত্যাগের পরামর্শ সেখানে দেওয়া হলেও বিএনপির জন্য দিল্লি এখনো বহু দূরস্থ। অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি এতই অন্ধ অহমিকায় ছিল যে, ছাত্রশিবিরের হরতালের জন্য ঢাকা সফররত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত খালেদা জিয়ার বৈঠকটিও বাতিল করে দেয়। শত ভুলের চড়া মাশুল গুনছে এখন বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে রাজনীতিতে বিএনপি সরকারবিরোধী গণজোয়ার তৈরি করেছিল। দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থীদের বিএনপির আনকোরা প্রার্থীরা পরাজিত করেছিলেন। সেই নির্বাচন বর্জন ও ওয়াকওভার পেয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সংবিধানের দোহাই দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সব প্রশ্নকে উড়িয়ে দিয়ে শাসন ক্ষমতায় একচ্ছত্র দাপটই তৈরি করেনি, সব ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারই করেনি, সমাজের দোদুল্যমান অংশকেও পক্ষে টেনেছে। হরতাল-অবরোধমুক্ত শাসনব্যবস্থা উপহার দিয়ে ব্যবসায়ীদের সমর্থনও আদায় করেছে। অন্যদিকে হাজার হাজার মামলায় বিএনপি নেতা-কর্মীরা এতই নাজেহাল হয়েছেন যে, সাংগঠনিকভাবে বিএনপি কার্যত আর মাঠেই নামতে পারেনি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গণরায়ে দুবার এবং সাংবিধানিকভাবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হলেও তার কারাবন্দী জীবনের সামনে বিএনপি অসহায়ের মতো চোখের জল ফেলেছে। রাজনীতিতে কৌশলের পথ যেমন নিতে পারেনি, তেমন ব্যাপক গণআন্দোলনে সরকারের মসনদ নাড়িয়েও দিতে পারেনি। প্রতি বছর লাখো কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়, ব্যাংকিং খাতে অবাধ লুণ্ঠন ঘটে যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায়, এমনকি সর্বশেষ দিনাজপুরে ২০০ কোটি টাকার কয়লা তামাদি হয়ে যায়। এসব নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ থাকলেও মামলার জালে আটকে থাকা বিএনপি নেতা-কর্মীরা যেমন জনগণকে নিয়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়তে পারেননি, তেমন একের পর এক সিটি করপোরেশনে লড়াই করে জিততে পারেননি। সামনে রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানেও ভোটযুদ্ধে নেমে অভিযোগের পাহাড় গড়ছে। প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলতে পারছে না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে মাঝখানে শাসক দল শেখ হাসিনার উন্নয়নের ইমেজ গণমানুষের কাছে জোরেশোরে প্রচার করার সুযোগ পাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গোটা ময়দানে আওয়ামী লীগ বিএনপির অস্তিত্বকে ধূসর করে দিয়ে একাই খেলছে। বিভিন্ন জায়গায় শাসক দলের কিছু সিন্ডিকেট বা উন্নাসিক নেতা-কর্মীর আচরণে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অসন্তোষ ব্যক্ত করলেও বিএনপি স্থানীয়ভাবে সেই অপকর্মগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা দূরে থাক, উল্টো স্থানীয় ক্ষমতাবানদের সঙ্গে মিলেমিশে পথ চলছে। পরিস্থিতি এমন যে, বিএনপি নির্বাচনে আসুক বা না আসুক তাতে সরকারের কিছু যায় আসে না— এ মনোভাব শাসক দলের নেতাদের বক্তব্যে প্রকট হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ২০টির বেশি আসন পাবে না। এটা রাজনৈতিক বক্তৃতা। ২০১৪ সালের প্রেক্ষাপট আর আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিএনপি ড. কামাল হোসেনের মুখে তোলা জাতীয় ঐক্যের স্লোগান যতই দিক, নির্বাচন সামনে রেখে এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ১৪ দল ও মহাজোট নিয়ে সেক্যুলার রাজনীতির তুরুপের তাস ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবজনক ধারাকে নিয়ে নিজেদের শাসন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। একসময় সেই জানুয়ারির আগে মানুষ বলত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসবে বিএনপি। আর এখন ২০১৮ সালের ভোটযুদ্ধ সামনে রেখে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীও বিশ্বাস করছেন শেখ হাসিনাই আরেকবার ক্ষমতায় আসবেন। আওয়ামী লীগ ’৭৫-পরবর্তী সেনাশাসন জমানায় করুণ অবস্থার মুখে পড়েছিল। ১৯৭৯ সালের সেনাশাসক জিয়ার সংসদ নির্বাচনে প্রথমে বর্জন করে শেষ মুহূর্তে অংশ নিলেও ৩৯টি আসন নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের জায়গা থেকে সরব ছিল। সেই নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা ছিলেন কারাগারে। সামরিক আদালতের দণ্ডে দণ্ডিত হয়ে আবদুস সামাদ আজাদের মতো নেতারা নির্বাচন করতে পারেননি। আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল মালেক উকিলকে জয়ী হতে দেওয়া হয়নি। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক নির্বাচনে প্রার্থী হননি। ভোলার জনপ্রিয় নেতা ও দলের সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদকে জোর করে হারানো হয়েছিল। মিডিয়া ক্যুর সেই নির্বাচনও আওয়ামী লীগ হজম করেছিল রাজনৈতিক কৌশলে ঘুড়ে দাঁড়াতে। রাজনীতিতে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশের জনপ্রিয় দলটি ক্ষমতায় আসতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে সভাপতি করে দীর্ঘ ২১ বছর সংগ্রামের পথ হেঁটেছে। সেনাশাসক এরশাদের ’৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও আওয়ামী লীগ ৭৫টির মতো আসন লাভ করেছিল। সেই ভোট ডাকাতির নির্বাচনের চিত্র এখনো মানুষের চোখের সামনে। এটা সত্য, দেশের মানুষ সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা ইয়াজ উদ্দিন ইস্যুতে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে মুুছে নিলেও এখন অবস্থা সেই জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে জনমত আর সেই সরকারের দাবিতে নেই। জনমত সংগঠিত করে তীব্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে সাফল্য কুড়াতে যে কারণেই হোক বিএনপি ব্যর্থই হয়নি, এখন কার্যত ক্ষমতায় আসার চেয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপি সংসদে ২৯টি আসন নিয়ে বিরোধী দলে বসেছিল। এতে সংসদ শক্তি নিয়েই মানুষের সামনে দৃশ্যমান ছিল। বিএনপিরও রাজনীতিতে নিজেদের এত করুণ পরিণতি দেখতে হয়নি। গণমাধ্যম প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতার খবরকেও গুরুত্বসহকারে ঠাঁই দিয়েছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারির পর পাঁচ বছর যে সংসদ সেটি ওয়াকআউট বর্জনের সরগরমে না হলেও মানুষের কাছে সরকারি দলের একচ্ছত্র সংসদ হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে। বিরোধী দল সংসদীয় রাজনীতির বিরোধী দলের চেহারা দেখাতে পারেনি। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজনৈতিক দল কংগ্রেস টানা ১০ বছর দেশ শাসনের পর বিগত নির্বাচনে এমন ভরাডুবির মুখে পড়েছিল যে সাংবিধানিকভাবে বিরোধী দলের মর্যাদাই পাচ্ছিল না। তবু নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী বিজেপি সরকারকে লোকসভায় ঘাম ঝরিয়ে ছাড়েন গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের এমপিরা। কয়েকদিন আগে লোকসভায় রাহুল গান্ধী তুমুল বিতর্কে বিজেপি সরকার ও নরেন্দ্র মোদিকে তুলাধোনা করে দিয়েছেন। বক্তব্যের শেষে তিনি মোদির কাছে গিয়ে যখন জড়িয়ে ধরেন তখন ক্যারিশমাটিক নরেন্দ্র মোদি হতবিহ্বল হয়ে যান। রাহুল ফিরে আসার সময় ফের ডেকে তার পিঠ চাপড়ে দেন। রাহুলের পর নরেন্দ্র মোদিরও দীর্ঘ বক্তৃতায় পাই পাই জবাব দিতে হয়েছে। তুমুল বিতর্ক, হট্টগোল ও আনন্দধ্বনিতে ভারতের পার্লামেন্ট সেদিন প্রাণবন্ত ছিল। গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা ১৯৯১ সালের প্রাণবন্ত সংসদ ও মধ্যরজনীতে দুই নেত্রীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখেছি। সংসদ কাভার করতে গিয়ে একেক ইস্যুতে পার্লামেন্টারিয়ানরা তুমুল বিতর্ক করেছেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে আবদুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন স্পিকার। প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হাউস থেকে বের করে দিতে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মসকে তলব করেছিলেন। মাগরিবের বিরতির পর নামাজ শেষে অধিবেশনকক্ষে বিরোধী দলের নেত্রী প্রবেশ করেই এ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। বিরোধী দলের উপনেতা মরহুম আবদুস সামাদ আজাদ নাজমুল হুদাকে বেহুদা বলে সংসদ মাতিয়েছিলেন। সরকারে বিএনপি বিরোধী দলে আওয়ামী লীগ কারাগারে থেকে পাঁচ আসনে বিজয়ী এরশাদের জাতীয় পার্টিও ৩৫টি আসন নিয়ে দুই পক্ষের স্বৈরাচার গালি খেয়ে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিল। ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসিতে দণ্ডিত এনডিএফের সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও সরব ছিলেন। বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাগ্মিতা ছিল ভারসাম্য রক্ষার কৌশলমুখী। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনে সেই পার্লামেন্ট যেমন ছিল স্মরণীয়, তেমন স্পিকার হিসেবে শেখ রাজ্জাক আলীর ভূমিকা ইতিহাসে সোনার হরফে লেখার মতো। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে পাইকগাছার উকিলও বলেছিলেন। অধিবেশন থাক বা না থাক সংসদের বিরোধী দলের উপনেতা আবদুস সামাদ আজাদের অফিসে বিরোধী দলের সবাই মিলিত হতেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকার রেকর্ড অনন্য, অসাধারণ। সেই সংসদ কাভার করতে গিয়ে আমাদেরও হাতের নাগালে সংবিধান যেমন থাকত, তেমন সংসদের কার্যপ্রণালিবিধি প্রায় মুখস্থ ছিল। পার্লামেন্ট রিপোর্টিংয়ে পার্লামেন্টারিয়ানরা আমাদের সহযোগিতাও করেছেন। স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সংসদে সুপরিসর মিডিয়া সেন্টার দেন। আর প্রখর হিউমার সেন্সে সংসদ জমিয়ে তুলতে স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের তুলনা তিনি নিজেই। চলমান সংসদ রাজনীতিতে আকর্ষণ ও গৌরবের নয়। আগামী জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দল ও নবীন-প্রবীণের বাগ্মিতায় ও হিউমার সেন্সে একটি কার্যকর প্রাণবন্ত সংসদ দেখতে চাই। সেই সংসদে সব দলের জাতীয়ভাবে আলোচিত নেতাদের ঠাঁই হোক। অলঙ্কারসমৃদ্ধ হোক সংসদ। বিএনপি বিরোধী দলে বসার জন্য হলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী জনসমর্থনপুষ্ট বিরোধী দলের অস্তিত্ব সংসদে থাকলে সেই সংসদ হবে সব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সব আলোচনা, বিতর্ক সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও আত্মোপলব্ধির পথে শুভচিন্তার উদয় ঘটিয়ে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়া রাজনীতিবিদদের অনিবার্য দায়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে তা আরও সরগরম হয়ে উঠুক। সব দল ও প্রার্থী বিনা বাধায় নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য নির্দ্বিধায় সভা-সমাবেশ ও জনসংযোগের অধিকার ভোগ করুক। নির্বাচন কমিশনের জন্য জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগামী তিন সিটির নির্বাচন যে অ্যাসিড টেস্ট এটি মাথায় নিয়েই সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাদের ফরজ। কমরেড ফরহাদ সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যের মিছিল থেকে আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব— এ স্লোগান তুলেছিলেন। আর সেই স্লোগান সারা বাংলায় জনপ্রিয় করেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মানুষ যাকে খুশি বিনা বাধায় তাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাক। আর আমরা হরতাল-অবরোধ, গুম-খুন, দমন-পীড়নমুক্ত উদার গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ঐতিহ্যের রাজনীতিতে ফিরি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, যেতে দিই। লুটেরাদের জিব টেনে ধরুক রাষ্ট্র। আইনের খড়্গ নামুক দুর্নীতিবাজদের গলায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সবার ভাগ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে ব্যালটেই জানা যায় জনমতে কার পাল্লা ভারী। এসব হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখেই বিএনপিকে রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ে, সংসদীয় রাজনীতির স্বার্থেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ জরুরি। কোনো চ্যালেঞ্জই বৃথা যায় না। ফলাফল দেরিতে হলেও জোটে। সমাজে, রাষ্ট্রে রাজনীতিতে কত অসংগতি দেখি। আপস করেই বাঁচি। নিদারুণ অন্তহীন দহনে দগ্ধ হই। বলাও যায় না, লেখাও যায় না। মানুষের বুকের আওয়াজ তবু শুনতে পাওয়া যায়। যাই হোক, রাজনৈতিক অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জেই বিএনপি নির্বাচনে আসুক। আমরা কার্যকর প্রাণবন্ত বিতর্কের ঝড় তোলা সংসদ উপভোগ করি। লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক
তসলিমা নাসরিন :নিউইয়র্কের অল্প যে কজন বাঙালিকে চিনি, তাঁরা কেউ পশ্চিমবঙ্গের, কেউ বাংলাদেশের। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সম্পর্কে একটু খোঁজ নিলেই তথ্য বেরিয়ে আসে, বাপ ঠাকুর্দার বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গে, দেশ ভাগের সময় বা ষাট-সত্তরের দশকে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। কিন্তু পূর্ববঙ্গে ফেলে আসা ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি, আম কাঁঠালের বাগান, পুকুর ভরা মাছ আর গোলা ভরা ধানের কথা মনে করে তাঁরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেও ওখানকার মানুষের সঙ্গে ওঠা বসা করতে মোটেও রাজি নন। যথাসম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই চলাফেরা করেন। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা বাংলাদেশের মুসলমানদের শুধু এড়িয়ে চলেন না, বাংলাদেশের হিন্দুদেরও এড়িয়ে চলেন। দুই বাংলার হিন্দুদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না কেন, এ নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। আমার মনে হয় শ্রেণীর তফাতের কারণেই পুব আর পশ্চিমের বাঙালির মধ্যে, ওপারের হিন্দু আর এপারের মুসলমানের মধ্যে, এমনকী ওপারের হিন্দু আর এপারের হিন্দুর মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে না। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা তুলনায় অবস্থাপন্ন, পেশায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর বিজ্ঞানী। বাংলাদেশের হিন্দুরা অধিকাংশই শ্রমিক। বাংলাদেশের হিন্দুরা মিশতে চাইলেও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা তাঁদের সঙ্গে মিশতে চান না। অগত্যা বাংলাদেশের হিন্দু বাংলাদেশের মুসলমানের সঙ্গেই মেশেন। দুই বাংলার হিন্দুর মধ্যে ভাষা আর সংস্কৃতির যত মিল, তার চেয়ে আমার মনে হয়, বেশি মিল বাংলাদেশের হিন্দু আর বাংলাদেশের মুসলমানের মধ্যে। ধর্মচর্চাটুকু বাদ দিলে বাকি সব—লুঙ্গি গেঞ্জি, শুঁটকি ভর্তা, শেষ পাতের ডাল, দুপুরের ঘুম, অতিথিপরায়ণতা সবই মেলে বাংলাদেশের হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের। ধর্মচর্চারও বিবর্তন হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের পুজোর উৎসব বাংলাদেশের পুজোর উৎসবের চেয়ে ভিন্ন হচ্ছে দিন দিন। আজ যা বলার জন্য আমি এসেছি, তা হলো, গত সপ্তাহে ‘হাবেলি’ নামে কুইন্সের একটি ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁয় আমাকে নিমন্ত্রণ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের এক বাঙালি। আরও একজনকেও নেমন্তন্ন করা হয়েছে। তিনি তথাগত রায়। সাবেক বিজেপি নেতা, এখন ত্রিপুরার গভর্নর। রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখি তিরিশ চল্লিশ জন লোক। ওঁরা বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ—মূলত দুই বাংলার হিন্দু। পরস্পরকে ভালোবেসে তাঁরা একজোট হয়েছিলেন, তা কিন্তু নয়। যদিও ভারতীয় জনতা পার্টির আদর্শকে দুই বাংলার হিন্দুই সমর্থন করেন। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিও দুই অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে সখ্য গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখতে পারেনি। হাবেলিতে দুই অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যেও ছিল স্পষ্ট এক বিভাজন। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের হিন্দুদের পাশে দাঁড়ালেও, সামাজিকভাবে দূরে সরিয়েই রেখেছে। বাংলাদেশের হিন্দুরা তাঁদের দুঃখ দুর্দশার কথা সবাইকে জানাবেন, সম্ভবত এই উদ্দেশেই রেস্তোরাঁটিতে গিয়েছেন। তথাগত রায়ের পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক। তথাগত রায়, আমার মনে হয়, ভারতীয়দের মধ্যে, বাংলাদেশী হিন্দুদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সরব। তাঁকেই যদি বাংলাদেশী হিন্দুরা নিজেদের দুর্ভোগের কথা জানাতে পারেন, হয়তো তিনিই বর্তমান সরকারকে বলে কয়ে দুর্ভোগ দূর করার চেষ্টা করবেন! তথাগত বাবু রেস্তোরাঁয় ঢোকার আগেই বাংলাদেশের কয়েকজন হিন্দু উপস্থিত সকলের উদ্দেশে বর্ণনা করলেন মুসলমানরা তাঁদের কী করে অত্যাচার করছে বাংলাদেশে, কী করে তাঁদের বাড়ি ঘর পোড়াচ্ছে, জমি জমা কেড়ে নিচ্ছে, দোকানপাট লুট করছে, মঠ মন্দির ভেঙে ফেলছে। বর্ণনা করলেন, কী করে হিন্দুরা বাধ্য হচ্ছে দেশ ত্যাগ করতে। ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, এ নিয়ে হিন্দু-প্রধান দেশ ভারতের কোনও প্রতিক্রিয়া নেই কেন, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদেরও কেন কোনও হেলদোল নেই, কেন কেউ রা শব্দ করে না। কেন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা পূর্ব বাংলায় ফেলে আসা তাঁদের চমৎকার জমিদারির স্মৃতি চারণ করেন, কেন উল্লেখ করেন না, মুসলমানের মার খেয়ে পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে! দু’একজন হিন্দুর কণ্ঠ থেকে স্পষ্টতই মুসলিম-বিদ্বেষ ঝরে পড়ে। তথাগত রায় ভালো বক্তা। যা বলতে চান, তা বেশ গুছিয়ে বলতে পারেন। সেদিন তিনি যা বললেন, তা হলো, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের লড়াই করতে হবে বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুদের জন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের হিন্দুদের দুর্দশা ঘোচানোর আর কোনও পথ নেই। মারাঠী হিন্দু, তেলুগু হিন্দু, রাজস্থানী হিন্দু, বিহারি হিন্দু, পাঞ্জাবী হিন্দু, কন্নড় হিন্দু, —কেউ বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের দুঃখ ততটা অনুভব করবেন না, যতটা অনুভব করবেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু। কারণ তাঁরাই তাঁদের আত্মীয়, তাঁরাই স্বজন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করলে ভারত সরকার চাপ সৃষ্টি করবেন বাংলাদেশের সরকারের ওপর। এতেই যদি বাংলাদেশ সরকার সমস্যার সমাধান করেন। তথাগত রায় বারবারই বললেন, হিন্দুদের দাঁড়াতে হবে হিন্দুদের পাশে, এ ছাড়া হিন্দুদের বাঁচার কোনও পথ নেই। হিন্দু জনসংখ্যা যে হারে কমছে, এ ভাবে কমতে থাকলে শূন্য হতে আর বেশি দেরি নেই। আমি একমত হইনি তথাগত রায়ের সঙ্গে। বলেছি, বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হয়, এ মোটেও অজানা নয়, এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানই সংখ্যালঘু হিন্দুদের আত্মীয়, স্বজন। সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশের নাগরিক। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের। অথচ হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিলেও ধর্মান্ধ জিহাদিদের বিরুদ্ধে কোনও সরকারই কোনও ব্যবস্থা নেননি। মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল লেখক প্রকাশক ব্লগারদের এক এক করে খুন করে ফেললেও ধর্মান্ধ জিহাদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সরকার সমর্থকরা বরং ধর্মান্ধদের নিয়ে ওলামা লীগ নামে একটি দল তৈরি করেছেন। হিন্দুদের ঘৃণা করার জন্য, মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলার জন্য, দিন রাত মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করছেন কোনো কোনো পীর হুজুর। নিরীহ কিশোর-তরুণদের বেহেস্তের লোভ দেখিয়ে মগজধোলাই করছেন। সবকিছু জানার পরও এঁদের ওয়াজ বন্ধ করার কোনও ব্যবস্থা সরকার আজও নেননি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে খুব পছন্দ ভারতের। দু’চারজন যুদ্ধাপরাধী রাজাকারকে ফাঁসিতে চড়িয়েছেন বলে হাসিনাকে মৌলবাদবিরোধী শক্তি বলে ভাবার কোনও কারণ নেই। হিন্দুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা বাংলাদেশের কোনও সরকার করেননি। কিন্তু করতে হবে। দেশের মানুষ— যাঁরা গণতন্ত্রে, মানবাধিকারে, ধর্মনিরপেক্ষতায়, অসাম্প্রদায়িকতায়, বাক স্বাধীনতায়, মানবতায় বিশ্বাস করেন, তাঁদেরই উদ্যোগ নিতে হবে সমাজ বদলাবার, রাষ্ট্রধর্মকে বিদেয় করার, সংবিধানকে সেক্যুলার করার। প্রগতিশীল মানুষের সংখ্যা বাড়লেই হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তথাগত রায়ের মূল বক্তব্য, হিন্দুদের দাঁড়াতে হবে হিন্দুদের পাশে। শুনে মনে হলো, বাংলাদেশের মুসলমান ছ’ মিটার দূরে পাশের বাড়ির হিন্দুর ওপর অত্যাচার হলে মোটেও ফিরে তাকায় না, কিন্তু ছ’ হাজার কিলোমিটার দূরে গাজার মুসলমানের ওপর অত্যাচার হলে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় বেরোয়। জিহাদিরা যেমন মুসলমানদের বলে মুসলমানের পাশে দাঁড়াতে, তেমনি তিনি হিন্দুদের বলছেন হিন্দুদের পাশে দাঁড়াতে। হিন্দু মৌলবাদিদের দেখেছি মুসলিম মৌলবাদিদের অনুসরণ করতে। মুসলিম মৌলবাদিদের তাঁরা ঘৃণা করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের আদর্শ মেনে চলতে মোটেও দ্বিধা করেন না। মুসলিম ভ্রাতৃত্ব যেমন সংকীর্ণ মনের পরিচয় দেয়, হিন্দু ভ্রাতৃত্বও তেমন সংকীর্ণ মনের পরিচয় দেয়। তথাগত রায়ের বক্তব্য খণ্ডন করে আমি বলেছি, হিন্দুকে হিন্দুর পাশে, মুসলমানকে মুসলমানের পাশে, ইহুদিকে ইহুদির পাশে, খ্রিস্টানকে খ্রিস্টানের পাশে দাঁড়াতে হবে—এ বড় ক্ষুদ্র, উগ্র, ধর্মসর্বস্ব ভাবনা। আমি হিন্দু নই, হিন্দু ধর্মে আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু নির্যাতিত হিন্দুদের পাশে আমি দাঁড়াই। নির্যাতিত মুসলমান, নির্যাতিত ইহুদি খ্রিস্টান, নির্যাতিত বৌদ্ধর পাশে দাঁড়াই। মানবতা এরই নাম। এরই নাম মনুষ্যত্ব। আসলে, মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে; সে মানুষ যে ধর্মের, যে বর্ণেরই হোক না কেন, যে জাতি, যে ভাষা, যে সংস্কৃতিই তার হোক না কেন। মানুষ যেন মানুষের পাশে দাঁড়ায়—এমন সমাজই আমাদের তৈরি করতে হবে। হিংস্রতা, ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা ভুলে আমরা যেন গণতন্ত্রে, মানবাধিকারে, পরোপকারে বিশ্বাস করি। শুধু নিজের গোষ্ঠীর লোক নির্যাতিত হলেই প্রতিবাদ করবো, অন্য কারও দুঃখ দুর্দশা ঘোচাতে চাইবো না—এই ক্ষুদ্রতা কোনও সম্প্রদায়কে মহান করে না। বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুর পাশে শুধু ভারতের হিন্দু কেন, সারা পৃথিবীর মানুষকে দাঁড়াতে হবে, হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রিস্টান ইহুদি নাস্তিক সবাইকে দাঁড়াতে হবে, মানবতার জন্য দাঁড়াতে হবে। শুধু ধর্ম বিশ্বাস ভিন্ন বলে কারও ওপর অন্যায় করার অধিকার কারও নেই বলে দাঁড়াতে হবে। ভারত সরকারকে দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে কেন? বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের। বাংলাদেশের মানুষই নিরাপত্তা হবে বাংলাদেশের মানুষের। মানুষ যদি অমানুষ হয়ে ওঠে, তাহলে দেশের সরকারের পক্ষে দুরূহ হয়ে ওঠে অমানুষকে মানুষ করা। যারা নিজেরা শুদ্ধ হতে, নিজেরা সৎ হতে, সহিষ্ণু হতে, সমমর্মী হতে, সমব্যথী হতে, মোদ্দা কথা মানুষ হতে অসমর্থ, বাইরের কোনও শক্তির চাপে তারা মানুষ হবে, এ অসম্ভব। বাংলাদেশের হিন্দুরা বাইরের হস্তক্ষেপ চাইছেন। বাইরের হস্তক্ষেপের চাইতে ঘরের ভেতর সামাজিক আন্দোলন অনেক বেশি জরুরি।বাংলাদেশ প্রতিদিন লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।
ধর্মের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে বাঁচাতে হবে
তসলিমা নাসরিন :কিছুদিন আগে কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস প্রাঙ্গণে একটি গাছতলায় দুটো পাথর বসিয়ে গেছে কারা যেন, কারা যেন তারপর ওই পাথর দুটোয় সিঁদুর লেপেছে, মালা পরিয়েছে, ফুল পাতা ছড়িয়েছে, পূজার্চনা শুরু করেছে। এসবের মানে, পাথর দুটো পাথর নয়, পাথর দুটো ভগবান। মুশকিল হলো, সিঁদুর লেপা পাথরকে যে কেউ সরিয়ে দিতে পারছিল না, ভয় ছিল, সরিয়ে দিলে ধার্মিকেরা ছুটে এসে মারধর করবে। কেউ নাকি ওই পাথর দুটোকে লাথি মেরে সরাতে চেয়েছিল, তাতেই একদল তেড়ে এসেছে, শিব ঠাকুরকে লাথি মেরেছে, এত বড় স্পর্ধা! অনেকে বলছেন, প্রগতিশীলদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, মুক্তচিন্তকদের মতবিনিময়ের জায়গায় মন্দির গড়ার ষড়যন্ত্র চলছে। মন্দির গড়ে উঠলে, মুশকিল হলো, এলাকাটিতে সংস্কৃতি চর্চার বদলে ধর্ম চর্চাই প্রাধান্য পাবে। ধর্মবাদীরা ধর্মকে সংস্কৃতি করতে চায়, সংস্কৃতিকে ধর্ম করতে চায় না। এই প্রশ্ন তো আসেই, মন্দির গড়ার জন্য একাডেমি চত্বরের দরকার হয় কেন? মন্দিরের কি অভাব কলকাতায়? শত শত মন্দির তো আছেই পুজোর জন্য! ধার্মিকদের নিয়ে মুশকিল, তারা পৃথিবীর সব জায়গা দখল করে নিতে চায়। সব সরকারকে তাদের প্রচারক বানাতে চায়, সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের সমর্থক করতে চায়, সব মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সেই রূপকথায়, যে রূপকথায় তারা নিজেরা বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার মসজিদ মাদ্রাসা বানানো হয়েছে। রাতে রাতে মোল্লারা ওয়াজ শোনায় রোহিঙ্গাদের, বুদ্ধি দেয়, বার্মা তাদের ফেরত নিতে চাইলেও যেন তারা ফেরত না যায়। রোহিঙ্গা শিশুদের মগজ ধোলাই চলছে। এদের জিহাদি বানানোর দুষ্ট চিন্তা কারও কারও মাথায়, আমরা অনেকেই সে কথা জানি। ধর্মের রাজনীতি থেকে শুধু নিজেদের বাঁচালেই চলবে না, রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হবে, সমাজকেও বাঁচাতে হবে। কলকাতার একাডেমি চত্বরে মন্দির গড়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে প্রগতিশীল মানুষ। প্রতিবাদের ফলে কাজ হয়েছে। পাথর দুটোকে গাছতলা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে পুলিশ। সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। চত্বরটিতে একটি মন্দির হতে যাচ্ছিল, অথচ মন্দির হতে দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে কোনও দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়নি। পূজার্চনা যখন হয়েছিল, তখন কেউ কেউ ওটিকে ছোটখাটো একটি মন্দির বললেও বলতে পারে। চত্বর থেকে মন্দির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক। জনগণের স্বার্থ ধর্মের চেয়ে বড়। ফাইন আর্টস একাডেমির চত্বরে মন্দির গড়ে তোলা কোনও অর্থেই সঠিক নয়। চত্বরটি ফাইন আর্টসের জন্য বরাদ্দ, মন্দিরের জন্য নয়। কোনও মন্দির চত্বরে কেউ একাডেমি গড়ে তুলতে যায় না, একাডেমি চত্বরেও মন্দির গড়ে তোলা উচিত নয়। দুটো প্রতিষ্ঠান একই চত্বরে থাকার জন্য যে ন্যূনতম সম্পর্ক থাকতে হয়, সেটি নেই। মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে হাসপাতাল গড়ে উঠতে পারে, নাটকের মঞ্চের পাশে নাট্য একাডেমি গড়ে উঠতে পারে, মন্দিরের আঙিনায় টোল থাকতে পারে। ঠিক যেমন মসজিদের আঙিনায় থাকতে পারে মাদ্রাসা। যে স্থানে যেটিকে মানায়, সে স্থানেই সেটিকে স্থাপন করা উচিত। রানওয়ের ওপর কি দালান তোলা বা হাইওয়ের ওপর হাট বসানো উচিত? যে কেউ বলবে উচিত নয়। কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের সামনে কিন্তু আস্ত একটি মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে। এই মসজিদটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে অনেক কাল। সরিয়ে ফেলে দেওয়া নয়, সরিয়ে অন্য জায়গায় নেওয়া। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। আদৌ সম্ভব হবে কিনা, এ ব্যাপারেও কোনও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এটি যদি একটি বাড়ি হতো, দোকান হতো, তাহলে সরিয়ে ফেলায় সমস্যা হতো না। মসজিদ বলেই সমস্যা। মসজিদটি সরানোর জন্য ক’জন রাজনৈতিক নেতা মুসলিম সংগঠন দার-উল-উলুমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। মসজিদ কমিটি, রাজ্য সরকার, আর কেন্দ্র-সরকারের মধ্যেও বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। জানিনা হয়েছিল কিনা, হলেও লাভ হয়নি। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে মসজিদটি যে রানওয়ের সামনে থেকে সরানো উচিত, তা সকলে জানে। সরানো সম্ভব না হওয়ার কারণ, মুসলমানরা মসজিদ সরানোর পক্ষে নন। অথবা রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই মসজিদটি সরানোর জন্য জোরেশোরে উদ্যোগ নেন না, কারণ তাঁরা মনে করেন, মসজিদ সরাতে চাইলে মুসলিমদের ভোট পাওয়া যাবে না। ভোটের কারণে মুসলিম তোষণ চলে ভারতবর্ষে। মুসলিমদের মঙ্গল চান বলে মসজিদটি কোথাও সরে যাক তা চান না, এ কথা যারা বলে, তারা মিথ্যে বলে। মুসলমানদের মঙ্গল তাঁরাই চান, যাঁরা মুসলমানদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেন, তাঁদের শিক্ষিত সচেতন স্বনির্ভর দেখতে চান, প্রগতিশীলতায়, ধর্মনিরপেক্ষতায়, মুক্তচিন্তায়, উদারনৈতিকতায়, বাক স্বাধীনতায় তাঁদের বিশ্বাসী দেখতে চান। বিমানবন্দরের জন্ম থেকেই মসজিদটি রানওয়ের সামনে রয়েছে। আট নম্বর গেট দিয়ে প্রতিদিন তিরিশ-চল্লিশজন লোক ঢোকেন মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য। শুক্রবারে একশো’রও বেশি যান জুমা পড়তে। মসজিদটি আছে বলে বিমানবন্দরের সুরক্ষিত এলাকায় বাইরের লোক কী অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারেন! এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আট নম্বর গেট থেকে মসজিদ পর্যন্ত যাতায়াতের পথটি কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হলেই তো রানওয়ের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মসজিদের জন্য বিমান ওঠানামার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কলকাতায় দু’টি সমান্তরাল রানওয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রধান রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৬২৭ মিটার। কিন্তু, দ্বিতীয় রানওয়ের উত্তর প্রান্তে মসজিদ থাকায় সেটি ২ হাজার ৮৩৯ মিটারের বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। সেদিক থেকে বিমান যখন নামে, তখন দুর্ঘটনার ভয়ে রানওয়ের অনেকটা অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। প্রধান রানওয়ে প্রায়ই বন্ধ থাকায় দ্বিতীয় রানওয়ে দিয়ে বিমান ওঠানামা করে। কিন্তু তার দৈর্ঘ্য কম থাকায় এয়ারবাস ৩৩০, বোয়িং ৭৪৭-এর মতো বড় বিমান সেই রানওয়ে দিয়ে ওঠানামা করতে পারে না। মসজিদ সরিয়ে দ্বিতীয় রানওয়ের দৈর্ঘ্য বাড়ালে সমস্যা আর থাকবে না। দু’টি রানওয়ের দৈর্ঘ্য সমান হলে একসঙ্গে দু’টি রানওয়ে থেকে বড় বিমান ওঠানামা করতে পারবে। বিমানবন্দরের অফিসারদের মতে, মসজিদ যদি সরিয়ে ফেলা যায় তা হলে দ্বিতীয় রানওয়ে উত্তর প্রান্তে বাড়ানো যাবে, তাছাড়াও ট্যাক্সিওয়ে, রানওয়েতে পৌঁছোনর যে রাস্তা, সেটির দৈর্ঘ্যও বাড়িয়ে দেওয়া যাবে। দুটো রানওয়েকেই তখন এখনকার তুলনায় বেশি বিমান ওঠানামা করার জন্য ব্যবহার করা যাবে। আগামী কয়েক বছরে কলকাতা বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা বাড়বে, উড়ান সংখ্যাও বাড়বে। তাই নতুন একটি টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে। টার্মিনাল বাড়বে, কিন্তু রানওয়ে আগের মতোই রয়ে গেলে বিশেষ কোনও লাভ হবে না। এসব জানেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কী করবেন। মসজিদটি তো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ওটিকে টোকা দেয়, এমন সাধ্য কারও নেই। দাঙ্গা বাধার ভয়ে বা মুসলিম মোল্লারা রাগ করবে এই ভয়ে যদি কর্তৃপক্ষ মসজিদটি সরাতে না চান, আমার মনে হয়, মুসলিম নেতাদেরই এগিয়ে আসা উচিত এটিকে স্থানান্তরিত করার কাজে। এই কাজটি করলে মুসলিমদের ওপর সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা বাড়বে। তারা ভাববে, কে বলেছে মুসলিমরা সাধারণ মানুষের সুবিধের কথা ভাবে না? কে বলেছে শুধু নিজের ধর্ম আর স্বার্থ নিয়ে তারা বুঁদ হয়ে থাকে? মুসলিমরাও উন্নয়নের কাজে, দশ ও দেশের সেবায় ত্যাগ করতে পারে। মুসলিমদের ওপর অমুসলিমদের শ্রদ্ধা বাড়লে মুসলিমদেরই ভালো। আর নিজের সম্প্রদায় নিয়ে গৌরব করতে হলে কিছু গৌরবগাথাও তো চাই। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন) লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।
সৌদি আরবে মেয়েদের কোনও নিরাপত্তা নেই
তসলিমা নাসরিন :ছোটবেলায় মা আমাকে তার স্বপ্নগুলো বলতো। মা’র স্বপ্নের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল একবার স্বচক্ষে সৌদি আরব দেখা। পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র দেশ, মা মনে করতো সৌদি আরব। ওই দেশে জন্মেছেন আল্লাহর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। ওই দেশে ইসলাম ধর্মের জন্ম। ওই দেশের ভাষা কোরআনের ভাষা। ওই দেশে কাবা শরিফ, রওজা শরিফ। মা মক্কা-মদিনার কথা বলতে বলতে আবেগে কাঁদতো। ওই পবিত্র দেশটির, ছোটবেলায় আমার মনে হতো, সব নিখুঁত; কোনও ভুল নেই, কোনও ত্রুটি নেই। যত বড় হচ্ছিলাম, যত চারদিক দেখছিলাম, পৃথিবীটাকে জানছিলাম, মা’র স্বপ্নের ওই দেশটি সম্পর্কে আমার মধুর মধুর ধারণাগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল। সৌদি আরবে গণতন্ত্র নেই, আছে রাজতন্ত্র। রাজপরিবার দেশটিকে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করবে, কারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই। দেশটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, নারীর অধিকার বলতে প্রায় কিছুই নেই। পাবলিক প্লেসে টেনে নিয়ে গিয়ে পাবলিককে দেখিয়ে তরবারির এক কোপে অভিযুক্তদের মুণ্ডু কেটে ফেলে সরকারি জল্লাদেরা। মুণ্ডুটা রাস্তার এক পাশ থেকে আরেক পাশে ফুটবলের মতো গড়িয়ে চলে যায়। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে পাবলিক। এই বীভৎসতা দেখা যায় না। সৌদি আরবে বাকস্বাধীনতা নেই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা তো নেই-ই। সৌদি মুক্তচিন্তক রাউফ বাদাবিকে আজও জেলে ভরে রাখা হয়েছে। পুরুষগুলোর যত খুশি উপপত্নী। মেয়েদের কপালে দুটো চুল এসে পড়লে ধর্ম পুলিশ দোররা মারবে। মেয়েরা গাড়ি চালাতে পারবে না। মেয়েরা প্রতিবাদ করতে পারবে না। মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হলে মেয়েদেরই শাস্তি দেওয়া হবে। কোনও অমুসলমানের মক্কা আর মদিনায় যাওয়ার অধিকার নেই। অধিকার নেই সৌদি নাগরিকত্ব পাওয়ার, অধিকার নেই গির্জা মন্দির গড়ার। এই সৌদি আরবের তেলের খনিতে পঞ্চাশ-ষাট দশকে একসময় সৌদি শ্রমিকরা কাজ করতো। তারপর এলো প্রতিবেশী আরব দেশ থেকে শ্রমিক, তাও এক সময় বন্ধ হলো। আশির দশকের শুরু থেকে শুরু হলো এশিয়া থেকে শ্রমিক নেওয়া। এই শ্রমিকরা শ্রমিক হিসেবে তো নয়ই, মানুষ হিসেবেও সামান্য মর্যাদা পায় না সৌদি আরবে। নারী শ্রমিকরা যৌন হেনস্থা, শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার, আরও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শ্রমিকের অধিকার আর নিরাপত্তার তো প্রশ্ন ওঠে না। কী করে সৌদি পুরুষেরা গৃহকর্মীদের পেটায়, কী করে যৌন নির্যাতন করে— সেসবের চিত্র গুগল আর ইউটিউব ঘাঁটলেই মেলে। বাংলাদেশের মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার এত বেশি হয়েছে যে আর আরবমুখো হতে চায় না। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কার মেয়েদের আর সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে পাঠানো হচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েদের নেওয়ার জন্য সমন পাঠিয়েছে সৌদি আরব। তারা মেয়ে-শ্রমিক চাইছে। মেয়ে-শ্রমিক না বলে আসলে ওদের ক্রীতদাসী বলা উচিত। সৌদি পুরুষেরা অত্যাচারী প্রভুর মতোই আচরণ করে গৃহশ্রমিকদের সঙ্গে। সেদিনও একটি ভিডিওতে দেখলাম এক বাঙালি মেয়েকে জনসমক্ষে পিটিয়ে চ্যাংদোলা করে এক দশাসই সৌদি পুরুষ তার গাড়িতে ওঠালো। মেয়েটি দুজন বাঙালি পুরুষের কাছে কাঁদছিল যেন তাকে বাঁচায়। না, কেউ তাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেনি। বরং সৌদি পুরুষটিকেই সাহায্য করেছে মেয়েটিকে গায়ের জোরে গাড়িতে ওঠানোর জন্য। পুরুষ- শ্রমিকেরাও মেয়ে-শ্রমিকের পক্ষ না নিয়ে পুরুষ-মালিকের পক্ষ নেয়। শ্রেণির চেয়েও হয়তো বড় হয়ে ওঠে লিঙ্গ! অদ্ভুত একটা দেশ বটে। শ্রমিকদের কাজ করিয়ে টাকা পয়সা না দিলেও সৌদি নাগরিকদের কোনও শাস্তি হয় না। ধর্ষণ করলেও হয় না, নির্যাতন করলেও না। মালিকদের কোনও আন্তর্জাতিক শ্রমিক আইন মানতে হয় না, যত খুশি বর্বর হওয়ার অধিকার তাদের আছে। শ্রমিকেরা বন্দী জীবন থেকে বেরিয়ে নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, কিন্তু অনেক সময় খাঁচা থেকে বেরোনোর বা শেকল ছেঁড়ার কোনও ক্ষমতা তাদের থাকে না। সৌদি আইন শ্রমিকের পক্ষে যায় না, অত্যাচারিতা, ধর্ষিতদের পক্ষে যায় না। সৌদি আইন থাকে পুরুষের পক্ষে, ধনীর, শাসকের, মালিকের পক্ষে। সৌদি আরব দুই লাখ শ্রমিক চেয়েছে বাংলাদেশের কাছে। বাংলাদেশ থেকে মাসে দশ হাজার মেয়ে-শ্রমিক সৌদি আরবে পাঠানোর আয়োজন চলছে। সৌদি আরবে কোনও নিরাপত্তা মেয়েদের নেই। সৌদি মেয়েরাই নিরাপত্তা পায় না, শ্রমিক মেয়েরা কী করে পাবে! মেয়ে-শ্রমিকেরা কয়েক মাস পর পর দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে, কেউ কেউ গর্ভবতী হয়ে ফিরে আসছে। সামান্য টাকা পয়সার জন্য জলজ্যান্ত নরকে মেয়েদের আর পাঠানোর চেষ্টা না করাই ভালো। সৌদি পুরুষেরা যখন গৃহশ্রমিকদের মারে, মারে পা দিয়ে, পায়ের জুতো দিয়ে, চাবুক দিয়ে। ভেবে অবাক হই, মুসলমানেরা মুসলমানের দেশে পরাধীন, অথচ খ্রিস্টান-নাস্তিকদের দেশে তারা তুলনায় বেশি স্বাধীন, তাদের মানবাধিকার বেশি সম্মানিত, তাদের নিরাপত্তা বেশি জোটে। মুসলমানরা মুসলমানের ভাই, এ কথা বারবার ভুল প্রমাণিত হয়। অধিকাংশ ধনী-মুসলমানদের কোনও আগ্রহ নেই দরিদ্র-মুসলমানের দারিদ্র্য ঘোচানোর। সৌদি আরব গরিব মুসলিম দেশের শুভাকাঙ্ক্ষী কখনো ছিল না, এখনো নয়। শ্রমিক তারা নেয় বটে, শ্রমিকের স্বার্থে নয়, নেয় নিজেদের স্বার্থে। নিজেরা নোংরা কাজ, ছোট কাজ, করতে চায় না বলে নেয়। সৌদি আরবের নারী বিদ্বেষী পুরুষেরা নিজেদের নারীকেও অসম্মান করে, বহিরাগত নারীকেও অসম্মান করে। নারীরা সৌদি আরবে ততদিন নিরাপদ নয় যতদিন সৌদি পুরুষের মধ্যে নারী বিদ্বেষ থাকবে, যতদিন নারীকে তারা যৌনবস্তু বলে ভাববে। অদূর ভবিষ্যতে সৌদি পুরুষদের মানসিকতা আমূল বদলে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। যে নারীরা সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে যায়, তারা শ্রমিক, তারা পতিতা নয়। অথচ তাদের পতিতার মতো ব্যবহার করতে চায় পুরুষেরা। স্ত্রী ঘুমিয়ে গেলে পরিচারিকার ঘরে শুতে আসে গৃহকর্তা। পরিচারিকা রাজি না হলে তার ওপর চলে শারীরিক অত্যাচার। কোথায় বাংলাদেশের সরকার সৌদি সরকারকে বলে দেবে আমরা মেয়ে পাঠাবো না, তা নয়, বলছে মেয়েরা বাংলাদেশে আরও বেশি নির্যাতিত। তার মানে, মেয়েরা যেহেতু বাংলাদেশেও নির্যাতিত, সুতরাং সৌদি আরবে নির্যাতিত হলে কোনও অসুবিধে নেই। পুরুষেরা সাধারণত তাদের নারী বিদ্বেষ জনসমক্ষে আড়াল করে, কিন্তু বাংলাদেশের পুরুষদের এসব প্রকাশ করতে এতটুকু লজ্জা হয় না। সৌদি আরবের নারীবিদ্বেষী পুরুষেরা বাইরের লোক, বাংলাদেশের নারী বিদ্বেষী পুরুষেরা ঘরের লোক। ঘরে যারা মেয়েদের নির্যাতন করে, বাইরেও মেয়েরা নির্যাতিত হলে তাদের কিছু যায় আসে না। আমি ঘরের অত্যাচার মেনে নিয়ে বাইরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি না। আমি ঘর এবং বাইরের দু’রকম অত্যাচারের বিরুদ্ধেই লড়তে চাইছি। লেখক : নির্বাসিত লেখিকা
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ও বর্তমান বিশ্ব ফুটবল
বাজতে শুরু করেছে বিশ্বকাপের বাঁশি। রাশিয়া বিশ্বকাপ মাতাতে প্রস্তুত ফুটবলের বড় বড় সব তারকারা। নিজের দেশের হয়ে মনে রাখার মতো কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই রাশিয়া যাচ্ছেন তারা। বিশ্বকাপের উত্তাপের আঁচটা গায়ে লাগতে শুরু করেছে। সেই আঁচ পেতে রাশিয়া বা জার্মানি বা ল্যাতিন আমেরিকায় যেতে হবে না। বাংলাদেশে বসেই পাওয়া যাচ্ছে সেই উত্তেজনা; বাংলাদেশে বসে নয় শুধু, ঘরে বসেই টের পাচ্ছি বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চেয়ে বাংলাদেশ কম নয়। বিশ্বের অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষও ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে গেছে। মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-ভালবাসা, আবেগ অনুভূতি সব এখন ভার্চুয়াল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষ ফেইসবুকে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। এখন চলছে ওয়ার্মআপ। কে কোন পক্ষ তা জানান দেওয়া, নিজেদের দল ভারী করা, ট্রল করা চলছে সমানতালে। ফেইসবুকের নিউজফিডে বিশ্বকাপের হরেক রকমের তথ্যের ছড়াছড়ি। নিজের পছন্দের দলের সাফল্য উদযাপনের চেয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই মানুষের আগ্রহ বেশি। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কথা বললে মনে হবে বিশ্বকাপে দুটি দল খেলে- ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের দিগন্ত ছেয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায়। বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে ফুটবল। একাত্তর সালের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা আমরা সবাই জানি। এই দলটি শুধু একাত্তর সালে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন করেছে। ব্যয়বহুল যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছে। অনেকেই হয়ত জানি না স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্ম ইতিহাস। ক্ষেত্র বিশেষে প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করে সুবিধাভোগীরা বনে যান এর ইতিহাসের নায়ক। তবে সত্য কখনও চাপা থাকে না। যেমনটি চাপা থাকেনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সত্যিকার ইতিহাসের ক্ষেত্রে। এখন বেরিয়ে আসছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন আর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল এই দল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল থেকেই ফুটবলে আমাদের যাত্রা শুরু। ১৯৭১ সালে ভারতে ১৩টি ম্যাচ খেলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল এই দলটি। ভারত এবং ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন মুজিবনগর সরকারের সহযোগিতায় কলকাতায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি। সামছুল হককে সভাপতি ও লুৎফর রহমানকে সম্পাদক করে গঠিত কমিটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ১. স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গড়া, ২. তহবিল সংগ্রহ ও ৩. পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে পাকিস্তান সরকার ঢাকায় কোনো টুর্নামেন্ট যেন আয়োজন না করতে পারে। প্রথম সভাপতি ছিলেন মন্ত্রী শামসুল হক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সভাপতি হলেন এমএনএ আশরাফ আলী চৌধুরী ও এন এ চৌধুরী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন লুৎফর রহমান। কোষাধ্যক্ষ হলো মোহাম্মদ মহসীন। সদস্য ছিলেন এমএ হাকিম, এমএম মতিন, গাজি গোলাম মোস্তফা, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নজিবুর রহমান ভূঁইয়া। ফুটবল দলের প্রস্তাবক ও সংগঠক ছিলেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনে পর্যায়ক্রমে ভারত সরকারেরও অনুমোদন ছিল। খেলোয়াড়দের অনুশীলনের জন্য সার্কাস মাঠ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে ক্রীড়া সমিতি ৩৫ সদস্যের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করে। দলের খেলোয়াড়রা হলেন- জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), আইনুল হক (সহ-অধিনায়ক), প্রতাপ শঙ্কর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), শাহজাহান আলম, কায়কোবাদ, তসলিম উদ্দিন আহমেদ, আলী ইমাম, সাইদুর রহমান প্যাটেল, আশরাফ নুরুন্নবী, নওশের এনায়েত, সালাহউদ্দিন (তুর্জ হাজরা), লালু, অমলেশ সেন, বিমল, হাকিম, খোকন, সুভাষ, লুৎফর, মজিবুর, শিরু, সাঈদ, পেয়ারা, নিহার, গোবিন্দ, অনিরুদ্ধ, সাত্তার, বিরু, মোমেন, সুরুজ, মাহমুদ, সঞ্জীব, খালেক ও মোজাম্মেল। কোচ হলেন- ননী বশাক ও ম্যানেজার তানভীর মাজহার তান্না। এ দল গঠনে যারা সহযোগিতা করেছেন তারা হলেন- নাজির হোসেন, খসরু, ক্রিকেটার রকিবুল, হেমায়েত সিদ্দিকী, মঈন সিনহা, আবুল কাশেম, অরুণ নন্দী (সাতারু) ও আতাউল হক মল্লিক। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ জুলাই নদীয়ায়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল যে ইতিহাস গড়েছে, তা নিয়ে অবশ্যই গর্ব করা যায়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে ইউনেসকো যে কারণে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, একইভাবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অবদানের কথা ফিফাকে যথাযথভাবে অবহিত করা হলে এ দলটিও স্বীকৃতি পেতে পারে। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি অংশ। অথচ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক এবং খেলোয়াড়রাও মুক্তিযুদ্ধের ‘ফুটবল সৈনিক’। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের দীপ্তিমান গৌরব। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ অর্জন করে মহান স্বাধীনতা। এই নয় মাসের যুদ্ধে প্রাণ দেন প্রায় ত্রিশ লক্ষ শহীদ। ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা অগণিত। সেইসাথে আছে অবকাঠামোগত আর আর্থিক সংকট। পৃথিবীর বুকে নতুন জন্ম নেয়া শিশুদেশ বাংলাদেশের পথ চলা। রাজনৈতিক আর আর্থসামাজিক সঙ্কটের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের প্রথম দিন থেকেই চেষ্টা করেছে ঘুরে দাঁড়াতে। অন্যান্য খাতের মতো খেলাধুলার ক্ষেত্রেও যার ব্যতিক্রম ছিল না। সেই সূত্রধরেই ফের চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয় দেশের ফুটবলকে। স্বাধীনতা লাভের পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই গঠন করা হয় বাংলাদেশ ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। দেখতে দেখতে বাংলাদেশের বয়স যেমন বাড়ছে ফুটবলের ঐতিহসিক অর্জনও ম্লান হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিকমানের একটি ফুটবল দল গঠন হয়নি। বিশ্বকাপের আসর তো কল্পনা বিলাসী। দেশের ফুটবলের আজকের যে দৈন্যদশা, তা কিন্তু একদিনের তৈরি হয়নি। মুলতঃ ভুটান বিপর্যয়ের পরেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই দুদর্শার চিত্রটা। ভুটান লজ্জার আগে মালদ্বীপের বিপক্ষে ৫ গোল হজমেও বুঝা গিয়েছে কোথায় অবস্থান করছে বাংলাদেশের ফুটবল। এছাড়া টানা তিনটি সাফ ফুটবলের গ্রুপ পর্ব থেকে বাংলাদেশের বিদায়ের করুণ গল্পতো আছেই। শেষ ২০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশ গোল হজম করেছে ৫৫টি। যেখানে গোল দিয়েছে মাত্র ১১টি। ৪ জয়ের বিপরীতে ৩ ড্র, ১৩ হার। বাংলাদেশের ফুটবল যে একেবারেই লক্ষ্যহীন একথা এখন চায়ের দোকানেও হরহামেশাই আলোচনা হয়। একটি সুন্দর সম্ভাবনাময় ফুটবল দল হতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সংগঠকদের আন্তরিকতা। তাদের দায়িত্বশীল আচরণ। বিপন্ন ফুটবলের হারানো গৌরব ফেরাতে হবে। ফুটবল এমন একটি খেলা, যা দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও টিম স্পিরিটের সঙ্গে খানিকটা ক্লাব্য, কিছুটা উচ্ছৃঙ্খলতা ও এক খামচা পাগলামোর এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকেএসপি শিক্ষা কোর্স কারিকুলামে ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় টেক্সট বুক পাঠ্যসূচি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডকে অনুসরণ করে। শিক্ষার্থীদেরকে খেলাধুলার উপর সংক্ষিপ্ত খ-কালীন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিকেএসপিতে যেসব শিক্ষক কর্মরত তাদের কারোর ফুটবলের উপর প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা এমনকি ডিপ্লোমা কোর্সের প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেননি। বিকেএসপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকমানের ফুটবলার যেমন তৈরি করতে পারছেনা তেমনি যোগ্য কোন ক্রীড়া সংগঠক ও তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্ব স্বীকৃত ৪ বছর মেয়াদি ফুটবল খেলার শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স সংকট মোচনে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে। লেখক:খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।[email protected]
মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দেশে দেশে
কলম্বিয়াঃ কোকেন উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ কলম্বিয়া। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশটিতে মাদক সংশ্লিষ্ট হত্যাকান্ডের সংখ্যা সাড়ে চার লাখ ছাড়িয়েছে। শুধু নিহতের সংখ্যা দিয়ে দেশটির মাদকযুদ্ধের ব্যাপ্তি অনুধাবন করা যায় না। ১৯৮০-র দশক থেকে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তচ্যুত হয়েছে আড়াই থেকে চার মিলিয়ন মানুষ। নিরাপত্তার জন্য এসব মানুষ নিজেদের বাড়িঘর রেখে ছুটেছেন অন্যত্র। একই সময়ে কয়েক হাজার হেক্টর বন কেটে ফেলা হয়েছে। এসব বনে কোকা উৎপাদন ও কোকেন তৈরির কারখানা ছিল। প্রতি হেক্টর কোকা ক্ষেতের জন্য তিন হেক্টর বন ধ্বংস করা হয়েছে। দেশটির মাদক সম্রাটদের হাতে ৫ মিলিয়ন হেক্টর ভূমি রয়েছে। যার কারণে কোকেন উৎপাদন কোনোভাবেই কমানো সম্ভব হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র : ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক ভাষণের মধ্য দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। দুই বছরের মাথায় নিক্সন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেন। রিগ্যানের ঘোষণার পরই মাদকবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ও লোকবল নিয়োগ বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবছর ৫১ বিলিয়ন ডলার। ১৯৮০ থেকে সালে গ্রেফতারকৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখের বেশি। ১৯৮৪ সালে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে শুধু না বলুন প্রচারণায় রূপ দেন নিক্সনের স্ত্রী ন্যান্সি। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে মেক্সিকো, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অভিযান চালায় ও সহযোগিতা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৯ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শব্দবন্ধ ব্যবহার না করার ইঙ্গিত দেয়। সর্বশেষ গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন পুনরায় মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। মেক্সিকো : ১৯৬০ সালে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করা মাদক মেক্সিকোতে। ২০০৬ সালে দেশটিতে মাদকবিরোধী যুদ্ধে নামানো হয় সেনাবাহিনীকে। মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত মেক্সিকো। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফেলিপ চালডেরন ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাড়ে ছয় হাজার সেনা সদস্যকে মিচোয়াচান রাজ্যে মোতায়েন করেন। সরকারি তথ্য অনুসারে, ওই বছর ১১ হাজার ৮০৬টি হত্যাকান্ড ঘটে, ২০১৬ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৩৪০টি। অপরাধীচক্র, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। মেক্সিকোর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের জীবিত বা মৃত খুঁজে পাওয়ার ছিল তখন মাত্র ২৫ শতাংশ। ব্রাজিল : মাদকের করালগ্রাস থেকে রেহাই পায়নি ব্রাজিলও। ব্রাজিলে ১৯৭০-এর দশকে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৪ সালে দেশটিতে প্রায় ৬০ হাজার হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কতটি হত্যাকা- মাদকসংশ্লিষ্ট তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে রিও ডি জেনিরো শহরের ৪৮০টি হত্যাকান্ডের মধ্যে ৪০০টিই ছিল মাদক সংশ্লিষ্ট।মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ব্রাজিলে মাদকবিরোধী যুদ্ধের পুলিশের অভিযান মানেই মৃত্যু। সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালেই ব্রাজিল পুলিশ ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। যদিও পুলিশ বরাবরই দাবি করে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জের ধরে। ফিলিপাইন : নিহতের গলায় কার্ডবোর্ডে লেখা থাকে, আমি একজন মাতাল। আমাকে পছন্দ করবেন না। সন্দেহভাজন মাদকসেবী ও বিক্রেতার লাশ অন্ধকারে, ব্রিজের নিচে ও ময়লার স্তুপে পড়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুয়াতে প্রায় দুই বছর আগে ফিলিপাইনের ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তার এই যুদ্ধ ছিল অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের নিহতের সঠিক সংখ্যা এমনকি পুলিশও জানে না। অনেক সময় লাশের সংখ্যা বাড়ছে কালুকান, মালাবন, নাভোটাস ও ভালেনজুয়েলা জেলায়। রাজধানী ম্যানিলা থেকে দূরে ঘনবসতিপূর্ণ এসব জেলা আবাসিক ও শিল্প এলাকা হলেও হত্যাক্ষেত্র হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। ফিলিপাইনে মাদকবিরোধী যুদ্ধে এ পর্যন্ত কতজন নিহত হয়েছেন তা নিয়ে গ্রহণযোগ্য কোনও তথ্য নেই। মানবাধিকার সংগঠন ও নিহতের পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। মানবাধিকার গোষ্ঠী, সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের নিহতের সংখ্যা নিয়ে পৃথক পরিসংখ্যান রয়েছে। সরকার নিজেই জানিয়েছে, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে মাদক সংশ্লিষ্ট হত্যাকান্ডের সংখ্যা ছিল ২০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৩৫৫টি হত্যাকান্ডের তদন্ত চলছে এবং ৩ হাজার ৯৬৭টি হত্যাকান্ড ঘটেছে পুলিশি অভিযানে। বাংলাদেশ : চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। এ বছরের ১৪ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানোর জন্য র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দেন। বাংলাদেশে এ ঘোষণার পর র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে অনেক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। আইন শৃখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি এরা সবাই মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত এবং পুলিশ বা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার কারণে পাল্টা হামলায় নিহত হয়েছে। থাইল্যান্ড : তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা মাদক বা ইয়াবা বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী ২০০৩ সালে ইয়াবা পাচার ও ব্যবহার বন্ধের উদ্দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম তিন মাসেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয় ২ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ। ইয়াবাকে থাইল্যান্ডে বলা হয় ক্রেজি ড্রাগস। ৩ লাখ ২০ হাজার মাদকসেবী চিকিৎসার জন্য আত্মসমর্পণ করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের করা কালো তালিকা অনুযায়ী গ্রেফতার ও হত্যাকান্ড চালানো হতো। আফগানিস্তান : ড্রোন দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয় আফগানিস্তানে। দক্ষিণ আফগানিস্তানের বিমান ঘাঁটিগুলোতে স্কোয়াড্রন এ-১০সি ওয়ারথগ থান্ডাররোল্ট জঙ্গি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন ও আফগান বাহিনীর যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে এগুলো দিয়ে তালেবানদের মাদক কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।সংগৃহিত।