মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৯, ২০২১
পতাকায় রক্তের ছিটেঁ
১৪আগষ্ট ২০২১, নিউজ একাত্তর : শোষণ-বঞ্চনা,দাবী,সংগ্রাম,জেল-জুলুম পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। নিরস্ত্র বাংগালী প্রাণ গুলো একান্ত তাদের দাবীর সমর্থনে এককাতারে দাঁড়িয়ে জানকে হাতের মুঠোয় নিয়ে শহর থেকে গ্রাম,পাড়া থেকে ঘর,ঘর থেকে প্রতিটি জন একটি শপথে ইস্পাত দৃঢ় মরন কামড় হানে পাকিস্তানি অবিবেচক শাসক গোষ্ঠীর ক্ষমতায় এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম সেই সময় পৃথিবী ভাগ ছিল শোষক আর শোষিত শ্রেণিতে। মানুষের বেচেঁ থাকার অধিকার,দেশের সার্বভৌমত্ব, মানুষের কৃষ্ঠি সংস্কৃতি, ধর্ম সবই শাসক শ্রেণী তাদের মর্জি মাফিক চলতে মানুষের উপর তাদের প্রভুত্ব কায়েম করে ছিল।মানুষ যখন মুক্তির জন্য এদিক ওদিক ছুটাছুটি আর হাহাকার করছিল।ঠিক তখনই মানুষের প্রাণের মানুষ তাদের অতিআপন,বন্ধুরূপে হাজির হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাংগালী দাবী আদায়ে অটল,যাকে জুলুম-নির্যাতনে রক্তচক্ষু টলাতে পারে না। বাংলার মানুষকে একটি সোনার দেশ উপহার দিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ইতিহাসের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পৃথিবী যখন দু'ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু শানিত কন্ঠে শোষিতের পক্ষে উচ্চারণ করেছিলেন মানুষের বেচেঁ থাকার কালজয়ী বাসনা স্বাধীনতা। মানুষ যখন তার ন্যায্য অধিকার,বেচেঁ থাকার নূন্যতম চাহিদা মানুষরূপী হায়নারা কেড়ে নিতে ছিলো,গণ মানুষের নেতা বাংলার পরম ভালবাসার স্ফুলিঙ্গ শহীদ শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলার মানুষকে তার চাহিদা, বেঁচে থাকার স্বাদ ঘরে ঘরে পৌছেঁ দিতে জীবনের সুবর্ণ সময় সংগ্রাম মুখর ছিলেন। বাংলার মানুষ যখন একপেশে শোষন আর বঞ্চনার স্বীকার হন।মানুষ যখন নিজ মাতৃভূমিতে অধিকারহীন,মত প্রকাশে যখন বাধার প্রাচীর, কর্ম সংস্থান,ব্যবসা-বাণিজ্য যখন বাংলার ন্যায্যতা তলানি গিয়ে টেকে।মানুষ যখন দিশেহারা পংকপালের মত দ্বিগবিদ্বিক ছুটে চলছে ঠিক তখনই মানুষে-মানুষে বিবেদ ভুলে ঐক্য করে একই সুতায় গেথেঁ ঘরে ঘরে দূর্গ করে দীর্ঘ সংগ্রামের শপথ নিয়ে ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৫ ই আগস্ট ১৯৭৫।বাংগালী জাতির ইতিহাসে রক্তাক্ত স্মৃতিময় একটি দিন।মর্মান্তিক শোকে মুহ্যমান একটি দিন।যারঁ দূরদর্শী নেতৃত্ব ও উদাত্ত আহ্বানে ১৯৭১ সালে সমস্ত বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল।একটি কন্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তে মানুষ পাগলের মতো নিজের জীবন উৎসর্গ করছিলেন।সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃংখল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল। বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।বাঙালি সেই প্রানের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এইদিন স্বপরিবারে শহীদ করে,সূচনা হয়েছিল ইতিহাস বিকৃতির। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট একটি তারিখ নয়। বঙ্গবন্ধুকে শহীদ করে যে নির্মমতা ও বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে তা দুনিয়ার ইতিহাসে নজিরবিহীন।সেদিন সেই ক্ষনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল পুরো দেশ ও জাতি এমনকি প্রাণিকুল পর্যন্ত। একই সাথে হতবাক হয়ে গিয়েছিল বিশ্ব বিবেক।সেদিন কেদেঁছিলো বাংগালী, কেদেঁছিলো সারাবিশ্বের সভ্য মানুষ। বিশ্ব মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন একজন রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধু। যে মহান নেতা বাংগালী জাতির স্বাধিকার ও অধিকার আদায়ের দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামে,তাঁর ৫৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১৪ বছর কেটেছে জেলখানার অন্ধকার সেলে এবং তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈর শাসক গোষ্ঠীর অপরাজনীতি আর অত্যাচার নিপীড়নে কেটেছে বছরের পর বছর।কখনও এ ক্ষন জন্মা সর্বকালে সর্বশ্রেষ্ঠ বাংগালীর অহং কে গণ মানুষের কাতার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন এদেশের প্রতিটি মানুষের অতি আপনজন।জাতি,ধর্ম-বর্ণ,শ্রেণী, সম্প্রদায় নির্বিশেষে প্রত্যেক বাংগালীর জন্যই ছিল তারঁ অকৃত্রিম দরদ। অর্থনীতিবিদ ও মানবতাবাদী দার্শনিক অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছেন, বঙ্গবনধু থেকে পৃথিবীর সব মানুষের অনেক কিছু শেখার আছে এবং তিনি পূর্বে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিলেন,আজও তেমনই আছেন,ভবিষ্যতেও তা-ই থাকতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শহীদ করার মাধ্যমে এমন এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বকে বাংলাদেশের মানুষ হারালো যারঁ চিন্তা ও চেতনা জগৎ জুড়ে ছিলো এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, শৃংখল থেকে মুক্ত করে মানুষকে মানুষের আসনে বসানো দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতির আর হীনমন্যতার বিষবাষ্প থেকে দেশের ভূ-খন্ডকে অন্যন্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা। বঙ্গবন্ধু জাতির উত্থান পতনের সুখ-দুঃখের নিজের জীবন একাকার করেছিলেন। তারঁ শহীদের রক্তে আমাদের লাল সবুজ পতাকার ছিটেঁ পড়েছে। আজকের দিনে আমরা বলতে পারি বঙ্গবন্ধু তখনও কোটি প্রাণের মণিকোঠায় জাগ্রত। তাঁর আদর্শ, রাজনৈতিক পরিকল্পনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে না পারি! তারঁ আত্মা আমাদের অভিশাপের চাদরে ঢেকে দিবে। লেখক - রাশেদুল আজীজ, সাংবাদিক, চট্টগ্রাম।
স্বাধীনতা,বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একসুত্রে গাথা - তসলিম উদ্দিন রানা
১৩আগষ্ট ২০২১, নিউজ একাত্তর : বঙ্গবন্ধু একটি নাম নয় স্বাধীনতার অপর নাম। স্বাধীনতা মানে বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা,বাংলাদেশ এক সুত্রে গাথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নামক দেশটির স্বাধীন করতে অনেক ত্যাগ তিতীক্ষার আর কষ্টের ফসল।তিনি তার জীবনের মুল্যবান সময়,মেধা,সোনালী সময় ৪৬৮২ দিন জেলের মধ্যে,জুলুম নির্যাতনের শিকার করে এদেশটি প্রতিষ্ঠাতা করেন।তিনি হলন জাতির পিতা ও হাজারো বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী।পৃথিবীর ইতিহাসে তার নাম স্বর্নাক্ষরে লিখে থাকবে।বাংলাদেশ নামক দেশটি যতদিন মানচিত্রে থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটি থাকবে।এদেশটির সাথে বঙ্গবন্ধু ওতপ্রোতভাবে জড়িত।তিনি বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ ছোট্ট একটা গ্রাম কোটলীপাড়ায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অজপাড়ার সেই ছেলেটা মাত্র ৫৫ বছরের জীবন,নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু বাঙালী জাতির নয় সারা বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত,নিষ্পেষিত ও দুঃখী মানুষের জন্য যে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন তা পৃথিবীতে বিরল।তার কর্মে,গুনে একজন সাধারণ কর্মী থেকে নেতৃত্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়া ও একটি জাতির সৃষ্টি করার ইতিহাস বিরল ঘটনা।অল্প সময়ে ভঙ্গুর স্বাধীন বাঙালী জাতির দায়িত্ব কাধে নিয়ে কিভাবে সোনার বাংলায় রুপান্তর করা যায় তা নজিরবিহীন ছিল যা আমাদের বর্তমানের জন্য শিক্ষণীয়। ছাত্র জীবন থেকে স্বাধীন চেতা ভাবনা নিয়ে বড় হয়েছে।দেখেছে ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব আর বিভিন্ন নির্যাতনের চিত্র।তার পুর্বপুরুষের উপর ব্রিটিশের নির্যাতন।ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অনেক বীর জীবনের আত্বাহুতি দিয়েছে অনেকে জাদরেল নেতারা লড়াই সংগ্রাম করে কোন সুফল পায়নি তা তিনি স্বচক্ষে দেখে আস্তে আস্তে স্বাধীনতা আন্দোলন জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দীনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ছাত্র আন্দোলন জড়িয়ে পড়েন।এক সময় কলকাতা প্রেসিডেন্সিয়াল কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হয়ে পুরোধমে কাজ শুরু করেন।অসম্ভব সাহসী,সীমাহিন ত্যাগ স্বাধীনচেতা,বিপ্লবী,প্রখর বুদ্ধিমান,দেশপ্রেমিক,দৃঢ় মনোবল,মানবপ্রেমী মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু।বাঙালী জাতির সোনালী অর্জনের নিপুণ কারিগর শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী,মাওলানা আব্দুল খান ভাসানীর উত্তরসুরী হিসাবে বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব হলেও তিনি আস্তে আস্তে স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়ক তথা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসাবে প্রতিষ্ঠাতা লাভ করেন নিজ দক্ষতায়, কর্ম ও গুণে। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর পর তিনি যে বৈষম্য দেখতে পায় তার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করতে তিনি প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।এমনকি ১৯৪৮ সালে ৪ ঠা জানুয়ারী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন।তার মাধ্যমে তিনি তার প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু করেন।তিনি বুজেছিলেন ছাত্র আন্দোলন ছাড়া দেশের স্বাধীনতা সম্ভবপর নয়।সেজন্য মুল সংগঠনের আগে ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।তার জ্ঞান,গরিমা এত প্রখর যা বিশ্লেষণ করা যাবেনা।তারপর ১৯৪৯ সালে ২৩ শে জুন বাংলাদেশ আওয়ামী মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠাতা করেন কয়েকজন জাতীয় নেতাদের নিয়ে তরুণ শেখ মুজিব। ছাত্র রাজনীতির থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতা হিসাবে সমগ্র বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়েছে খেয়ে না খেয়ে। সেই সময় তিনি গরীব অসহায় ও দুঃখী মানুষের কথা হৃদয়ে ধারণ ও অনুভব করেছেন।তাইতো বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন - বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত আমি শোষিতের পক্ষে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এবাক্যটি ধারণ করে প্রতিটি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন।বাঙালীর মাটি ও মানুষের সাথে তার আত্বার সম্পর্ক ছিল বলে তিনি জেগে উঠে প্রতিবাদী হয়েছে,পাকিস্তানি জান্তার বন্দুকের নলকে তুচ্ছ করে ৩০ লক্ষ লোকের তাজা প্রাণ ও ৩ লক্ষ মাবোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বীর বাঙালীর স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে যা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।স্বাধীনতা নামক জিনিসটা মাত্র নয় মাসে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পেয়েছি। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পরে অর্থনৈতিক শোষণ ছাড়াও তারা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানে।প্রেসিডেন্ট জিন্নাহ বলেন উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। ততকালীন ছাত্র জনতা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাই। পাকিস্তানি এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রুখে দাঁড়ান। বাঙালীদের উপর নেমে আসে অত্যাচার আর নির্যাতন। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়,৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন,৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান ও ৭০ এর নির্বাচনে বিজয়ের পথে বাঙালীর মুক্তির সংগ্রাম এক যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধাবিত হয়। বাঙালীর মুক্তির সনদ ৬ দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে যায়।তার অপরাধে পাকিস্তানি সরকার তাকে গ্রেফতার করেন।আগরতলা মামলা দিয়ে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ও পরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বন্দী করে রাখে।ষড়যন্ত্র আগরতলা মামলার কার্যক্রম শুরু করে দেন কিন্তু বাঙালীদের দমিয়ে রাখতে পারিনি। তারা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনেন।সামরিক জান্তা আইয়ুব খান সরকারের পতন হয়।আরেক সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।তিনি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেন।নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করেন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্টি গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্থান্তর করতে টালবাহানা শুরু করে।তারা বঙ্গবন্ধুর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে ক্ষমতা না দিয়ে উল্টো বাঙালীদের উপর অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে।ততসময়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভার ডাক দেন।সেদিনের জনসমুদ্রে তিনি ব্রজকন্ঠে ঘোষণা দেন এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,জয় বাংলা। এই ভাষণ ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। তার ভাষণের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকগোষ্টির হত্যা,নির্যাতন, নিপিড়নের চিত্র ফুটে উঠে। স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের কথা সেদিন বুঝা যায়।শত্রুর মোকাবিলায় তিনি বাঙালী জাতিকে নির্দেশ দেন- তোমাদের যা কিছু আছে তা দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।স্বাধীনতা সংগ্রামে এই ভাষণ জাতীকে ঐক্যবদ্ধ করে ও সংগঠিত করতে সাহায্যে করে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষন হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করতে এই ভাষণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।জাতির পিতার এই ভাষণের মাধ্যমে বাঙালী জাতী এক হয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে প্রস্তুতি নেন। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ২৬ শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা হয় ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ঘোষণার পরপর বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।কারাগারে তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।সামরিক আদালতে তাকে ফাসির আদেশ দেওয়া হয়। বাঙালী জাতী এক হয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন।জাতির পিতার আদর্শের উত্তরসুরী হিসাবে পাড়ায় পাড়ায় বিপ্লবের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার নির্দেশ মেনেই বাঙালী জাতি তাদের সর্বস্ব দিয়ে যুদ্ধে করে।মাত্র ৯ মাসে দেশ স্বাধীন হয় যা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদন্যতলা আম্রকাননে বর্তমানে মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি,সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি,তাজউদ্দীন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়।প্রবাসী সরকারের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়।তার আগে ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফায়সালাবাদ জেলে বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার করে তাকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করে ফাসি দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মুক্তিকামী মানুষ বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরপত্তা দাবী জানাই। ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি প্রদানের জানান। ভারত ও রাশিয়া সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চেয়ে পাকিস্তানি সরকারের নিকট আহবান জানাই।অবশেষে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানি সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেন।১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে আসলে বাঙালী জাতী তাকে রেসকোর্স ময়দানে বিরাট সংবর্ধনা দেন।১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক ভাবে তিনি বাংলাদেশের সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের দায়িত্ব নিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুর্নগঠন,সংবিধান প্রণয়ন,১ কোটি মানুষের পুর্ণবাসন,যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামুল্যে ও মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত নামমাত্র পাঠ্যপুস্তকসরবরাহ,মদ,জুয়া,ঘোড়াদৌড়সহ সমস্থ ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ, ইসলামীক ফাউন্ডেশনপ্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুর্নগঠন,১১০০০ প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ ৪০০০০ প্রাথমিক স্কুল সরকারিকরণ, মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর হাতে ধর্ষিতা মেয়েদের পুর্ণবাসনের মাধ্যমে নারী পুর্ণবাসন সংস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট গঠন, ২৫ বিঘার খাজনা মাফ,বিনামূল্যে কৃষকদের কৃষি উপকরণ বিতরণ,পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক,বীমা ও ৫৮০ টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও চালু করার মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মচারীদের কর্মসংস্থান, ঘোড়াশাল সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন, বন্ধ শিল্প কারখানা চালুকরণ সহ অন্যান্য সমস্যার সমাধানে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি করে দেশকে একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস নিয়ে সোনার বাংলা গঠনে কাজ যান।অতি অল্প সময়ে বাঙালী জাতির উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান অনস্বীকার্য।অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করা ছিল বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিরাট সাফল্য। বঙ্গবন্ধু,বাংলাদেশ ও স্বাধীনতা এক সুত্রে গাথা।নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের দাবী আদায়ের জন্য লড়াই সংগ্রাম করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেন।তিমি বলেছিলেন - আমি আমার দেশের মানুষকে বেশী ভালবাসি।তাদের জন্য আমি নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত। এই স্বাধীনতা একমাত্র তাদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য।স্বাধীন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি দেশ গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেন।আজীবন সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য সংগ্রাম করেছেন।তিনি পুরো জাতিকে একত্রিত করে স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত করে স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণটি বাস্তবায়ন করেন।জাতির পিতার কল্যাণে আমরা আজ স্বাধীন জাতি। তিনি হলেন বাঙালী জাতির মুক্তির দিশারি, অবিসংবাদিত নেতা তথা জাতির পিতা। শুধু বাঙালী নয় সারা বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের শ্রেষ্ঠ মহান নেতা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন,আবার তা বাস্তবায়ন করতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা তিনি প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।তিনি ক্ষুধা ও দ্রারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে কিছু কাজ করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরে ছিলেন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে সোনার মানুষ চাই। সেজন্য তিনি প্রতিটি সেক্টরে নিজের মত সাজাতে হাত দেন। সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ হাতে নিয়ে অগ্রসর হতে চাইলে তিনি দেখতে পান দুর্নীতি হল তার বাধা।দেশের উন্নয়ন করতে হলে দক্ষ জনশক্তি ও পরিকল্পনা প্রয়োজনতা রয়েছে। সেজন্য দুর্নীতিকে টার্গেট করেন।সেই সময় তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ভুমিকা রাখেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি বলেন - একটা কথা মনে রাখতে হবে, আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে।ওই চোর,ব্লাক মার্কেটিয়ান,ওই ঘুষখোর। আরেক জায়গায় তিনি বলেন -ভয় নাই,কেনো ভয় নাই। আমি আছি।দুর্নীতিবাজদের খতম করো,বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচন করো। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন নেতা।অসহায় ও দুঃখী মানুষের ভাগ্যে উন্নয়নের জন্য তিনি আপোষহীন ভাবে লড়াই সংগ্রাম করে যান।তিনি জানতেন বাংলাদেশকে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ও উদ্ভাবনের বিকল্প নাই।তার লেখা - আমরা দেখা নয়া চীন বইয়ের মধ্যে রাজনীতি, অর্থনীতি, বৈষম্য, সামাজিক নানা অনুসঙ্গ,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মানবিক যোগাযোগ, বিশ্ব বাস্তবতা, শান্তিবাদ এবং নয়া চীনের রহস্য উদঘাটন করার পাশাপাশি বাংলাদেশের অবস্থা ও তুলনা করেছেন। তিনি লিখেছিলেন -চীন সংস্কার উন্নতি করেছে মাথাভারী ব্যবস্থার ভিতর দিয়া নয়,সাধারণ কর্মীদের দিয়া,শ্রমিকদের জন্য আলাদা হাসপাতাল আছে,অসুস্থতার সময় বেতনসহ ছুটি দেওয়া হয়।বছরে তারা এক বার ছুটি পায়,যারা বাড়িতে যেতে চাই তাদের বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়,আর যারা স্বাস্থ্য নিবাসে যেতে চায় তাদেরও ব্যবস্থা করা হয়।বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন আমাদের দেশে যখন পাট চাষির ঘরে থাকে, তখন দাম অল্প হয়।যখন মহাজনদের ঘরে থাকে দাম বাড়তে থাকে। চাষি ও উৎপাদন খরচও পায় না।- কিন্তু নয়াচীন একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান করেছে,কৃষক বিক্রি করে তার দাম দিয়ে ভালোভাবে অল্প দামে তেল,নুন ও কাপড় কিনতে পারে। বাংলাদেশকে সত্যিকারের প্রকৃত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। কিন্তু তার স্বপ্ন শেষ করে দেয় কিছু স্বার্থন্বেষী লোক।তারা দেশী-বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঘৃণ্য পথে গিয়ে বাঙালী জাতির হাজারো বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান,শেষ ঠিকানা, স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট রাতের অন্ধকারে হত্যা করে। এমনকি তার সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব,ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, অবুঝ শিশু ছোট্ট রাসেলকে সহ পুরো পরিবারের সবাইকে হত্যা করে যা ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ।পৃথিবীর কোথাও এমন নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।বঙ্গবন্ধুর হত্যা মানে বাঙালী জাতির স্বপ্নকে হত্যা করে।পুরো জাতির উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে।বাংলাদেশের সবকিছু শেষ করে দেয় যা বলাবাহুল্য। সেদিন পুরো জাতি স্তব্ধ হয়ে যায়।আকাশ বাতাস নিশঃস্বব্দ ছিল।সোনার বাংলা স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল।জাতি হারাল বিশ্বের নেতার নেতা,উন্নয়নের রোল মডেল,দুর্নীতি বিরোধী বলিষ্ঠ নেতৃত্ব,পথ প্রদর্শক,সমাজ সংস্কারক,দেশপ্রেমিক,গরীব দুঃখী মানুষের বন্ধু,আত্ত্বার আত্ত্বীয়,পরোপকারী,বাঙালীর মুক্তির মহানায়ক, হাজারো বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী, দার্শনিক,তাত্ত্বিক মহাপুরুষ। লেখক - তসলিম উদ্দিন রানা, সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
মৃত্যুঞ্জয়ী মৌলভী সৈয়দ শুধু বীরের নাম নয় ইতিহাস- তসলিম উদ্দিন রানা
১২আগষ্ট ২০২১, নিউজ একাত্তর : মৃত্যুঞ্জয়ী মৌলভী সৈয়দ একটি নাম নয় ইতিহাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের উত্তরসুরীর হিসাবে স্বাধীন যুদ্ধে করেন।মা,মাতৃভুমি জন্য জীবন দিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন।মৌলভী সৈয়দ একটি বীরের নাম।বর্তমানে রাজনীতিতে ইতিহাসের নায়ককে চিনে কিনা সন্দেহ আছে।তার কেউ জানে,তিনি কে,কি তার পরিচয়,কেন যুদ্ধ করেন,কিজন্য বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে শহীদ হন?এসব প্রশ্ন আজ ঘুরপাক খাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকে তার নাম জানে কিনা সন্দেহ আছে।তবুও ইতিহাসের রাখাল রাজা এই মহান মানুষটির নাম চট্রগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল বাশখালী শেখেরখীল গ্রামের সুর্য সন্তান বীর মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। বাল্যকালে মাদ্রাসায় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরে চট্রগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। চট্রগ্রামের রাজনীতির তীর্থ স্থান সরকারি সিটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। আদর্শিক,তাত্ত্বিক,অসম্ভব দুরদর্শিতার, সাহসী,মেধাবী, ও দেশপ্রেমিক বীর ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পুরো পরিবারকে নির্মম হত্যার পর যখন কেউ মুখ খোলার সাহস করেননি এমনকি সবাই পালিয়ে যায় ঠিক সেই কঠিন দুঃসময়ে যে লোকটা তখন প্রকাশ্যে চট্টগ্রামের রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন তার নাম বীর মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। জাতির পিতার হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে অনেক লোকজনকে সংগঠিত করে অবস্থান নেন। খুনিদের প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। মৌলভী সৈয়দ চট্টগ্রামে তাঁর কর্মীদের নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের চেষ্টা করেন।মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়ে নিজের জীবন দিতে কার্পণ্য করেনি। প্রতিরোধ সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ায় তিনি বিয়ের কথা চূড়ান্ত হলেও বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন।কারণ তাকে সশস্ত্র বিপ্লবে অংশগ্রহণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে ১৯৭৫ সালে ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানকে বন্দী করা হয়।এই অভ্যুত্থানের পক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মিছিলে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মৌলভী সৈয়দ।৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থানে খালেদ মোশারফ নিহত হলে মৌলভী সৈয়দ বেশ কয়েকজন সঙ্গীসহ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।ভারত থেকে আসা-যাওয়া করে দেশের অভ্যন্তরে সহকর্মীদের নিয়ে তিনি স্বশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন।এ সময় তারা কিছু জায়গায় টার্গেট করে আক্রমণ করতেন।চট্রগ্রাম নিউ মার্কেট সংলগ্ন সড়কে, দামপাড়াস্থ পুলিশ লাইনসহ কয়েক স্থানে গ্রেনেড হামলায় তিনি নেতৃত্ব দেন।প্রতিটি সংগ্রামে পটিয়ার এস. এম ইউসুফ ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী জড়িত ছিলেন।মূলত সামরিক সরকারকে অস্থিতিশীল করতে তিনি ভিন্নমাত্রায় এসব কর্মকান্ড চালাতেন।১৯৭৩ সালের সংসদের এমপিদের নিয়ে তিনি প্রবাসীসরকার গঠনের চেষ্টা করেন।এতে তিনি ব্যর্থ হন। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের এক পর্যায়ে ১৯৭৬ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন সামরিক সরকার মৌলভী সৈয়দ ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা-১, মামলা-২, মামলা-৩ নামেতিনটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় মৌলভী সৈয়দকে প্রধান আসামি করে এস এম ইউছুফ ও এ.বি.এম মহিউদ্দিন,কেশব সেন সহ অনেকে আসামি ছিলেন।তিনি আন্দোলন সংগ্রামের পুরোধা ছিলেন বলে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে বিভিন্ন জায়গায় সংগঠিত করতে ছদ্মবেশ ধারণ করে বিভিন্ন জায়গায় যান।এমনকি চোরাগুপ্ত হামলা পরিচালনা করেন। চট্রগ্রাম, ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় তার অবস্থান ছিল ছদ্মবেশ।কাউকে তিনি বুঝতে দিতেন না।কিভাবে, কোথায় অপারেশন হবে তার জানা ছিল।একসাথে তিনি অনেক জায়গা টার্গেট করে কাজ করতেন। নিজে ছিলেন অসম সাহসী বীর। নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে কখনো আপোষ কিংবা পিছপা হয়নি।মৃত্যু আলিঙ্গন করে জাতির পিতার আদর্শের উজ্জীবিত হয়ে প্রতিশোধ নেওয়া ছিল তার প্রধান কাজ।দেশ ও বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনি ছিলেন অকুতোভয় দুঃসাহসী যোদ্ধা। ভারতে নির্বাচনেইন্দিরা গান্ধীর সরকার পরাজিত হলে মোরারজি দেশাই এর সরকার ক্ষমতায় আসে।বাংলাদেশের জিয়া সরকারের সাথেমোরারজি দেশাই এর সরকারের এক চুক্তিবলেময়মনসিংহ বর্ডার দিয়ে ভারত থেকে মৌলভী সৈয়দ ও তার সহকর্মীদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়।বর্ডার থেকে মৌলভী সৈয়দ ও বগুড়ার খসরুসহ অনেককেই গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে যাওয়ার পর জি.জি.এফ আইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়।জয়েন্টইন্টারোগেশন সেলে অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে বিনা বিচারে ১৯৭৭ সালের১১ আগস্ট বগুড়ার খসরু ও চট্টগ্রামের বীর মৌলভী সৈয়দকে হত্যা করা হয়। মৌলভী সৈয়দকে হত্যার পর তার পিতাকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে লাশ শনাক্ত করান।আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তত্ত্বাবধানে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার যোগে চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম থেকে লঞ্চ যোগে মৌলভী সৈয়দের লাশ বাঁশখালীতে নেওয়া হয়।পুলিশ,বিডিআর ও আর্মির উপস্থিতি সত্ত্বেও বাঁশখালীতে মৌলভী সৈয়দের জানাজায় মানুষের বিশাল সমাবেশ হয়।মৌলভী সৈয়দকে দাফন করা হয়।প্রায় ১ মাসের বেশী তার লাশের আশেপাশের এলাকায় পুলিশের পাহাড়া দেওয়া হয় যাতে তার অনুসারীরা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে না পারে।সরকারের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে না পারে।চট্রগ্রাম বাশখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চল শেখেরখিল গ্রামে আজও সমাহিত আছে দেশপ্রেমিক,বঙ্গবন্ধুর জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর মৌলভী সৈয়দ আহমেদ। যুগে যুগে তিনি তার কর্ম দিয়ে দেশ ও জাতির নিকট বিপ্লবী প্রেরণা,আদর্শিক, দুঃসাহসিক, বঙ্গবন্ধু প্রেমিক হিসাবে মানুষের মণিকোঠায় বেচে থাকবে। ইতিহাসের নায়ক,বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতমপ্রতিবাদকারী,মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা কমান্ডার,বেইজ গ্রুপ কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।দেশের জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঝাপিয়ে পড়েন।রাজনীতির আদর্শিক ও পরিক্ষীত যোদ্ধা বীর মৌলভী সৈয়দ মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত অসম্প্রাদায়িক আন্দোলন সংগ্রামের অংশগ্রহণ করতেন। চট্টগ্রাম সিটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ও মহানগর ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,চট্রগ্রাম জেলা যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বাকশালের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক বিপ্লবী,সাহসী, আদর্শিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মৌলভী সৈয়দ আহমদ। খুনী জিয়ার নির্মম নির্যাতন-হত্যাকাণ্ডের শিকার সেসব ভয়াবহ দিনের স্মৃতি আজ কল্পনাতীত। ১৯৭৭ সালে সামরিক স্বৈরশাসক খুনী জিয়ার নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারে শহীদ হন বীর মৌলভী সৈয়দ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে গেরিলা বাহিনীর প্রধান (মুক্তিযুদ্ধকালীন) শহীদ মৌলভী সৈয়দ আহমদ দারুণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি সে দিন চট্টগ্রাম শহরের উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে শেখ মুজিব রোডস ভাণ্ডার মার্কেট সংলগ্ন সৈয়দ মাহমুদুল হকের বাড়িতে গোপন আস্তানা শুরু করেন। আন্দোলন সংগ্রামের জন্য তিনি প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে তুলেন।বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোস্তাক সরকারের বিরুদ্ধে বেশকটি সফল অপারেশন করতে সমর্থ হন। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন ভারতের সরকার প্রধান মোরারাজি দেশাই স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের যোগসাজশে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর মৌলভী সৈয়দ ও তাঁর সাথে থাকা কজন সহযোগীকে ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করান। সে সময় মৌলভী সৈয়দকে ঢাকা ক্যান্টেনম্যান্টে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতারের পর অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েও মৌলভী সৈয়দ নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। এক পর্যায়ে খুনিরা তার গ্রামের বাড়ি বাঁশখালীর শেখেরখীল ইউনিয়নের লাল জীবন গ্রাম থেকে তাঁর বৃদ্ধ পিতাকে ধরে এনে সুকৌশলে তাঁকে সনাক্ত করে। এর পর ১১ আগস্ট প্রত্যূষে কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী সৈয়দ আহমদকে। বিচারের নামে সেই দিন প্রহসন হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের এই গেরিলা সংগঠক ১৯৩৮ সালের ৪ মার্চ বাঁশখালী উপজেলা শেখেরখীল ইউনিয়নের লাল জীবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম একরাম সিকদার ও মাতা উম্মে উমেদা খাতুন। পরিবারের পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিটি কলেজে (বর্তমান সরকারি সিটি কলেজ) শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। ১৯৬৭-৬৮ সালে প্রথমে ছাত্র সংসদের জি.এস ও পরবর্তীতে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।১৯৬৮ সালে রাজনৈতিক সংগ্রাম আন্দোলনে প্রথম কারারুদ্ধ হন। জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় কৃতিত্বের সাথে ডিগ্রি পাশ করেন। ৬৯ এর গণ-আন্দোলনে তিনি চট্টগ্রামের ছাত্র ও যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ৭১ এ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ছিলেন মৌলভী সৈয়দ। এ সময় জয় বাংলা বাহিনী গঠন করেন তিনি।চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র ছাত্র ও যুবকদের নিয়ে গড়ে তুললেন গেরিলা বাহিনী। রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের অবস্থান জেনে সেখানে তিনি আক্রমন করতেন। এটাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের বিচক্ষণতা। সে সময় তাঁর প্রতিষ্ঠিত গেরিলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান ছিল উত্তর আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, মনছুরাবাদ, রামপুরা, গোসাইলডাঙ্গা ও হালিশহরসহ গ্রামীণ জনপদে। তিনি স্থাপন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অনেক আশ্রয়স্থল।যা ছিল তার কৌশল ও ছদ্মবেশ। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে তাকে দলীয় মনোনয়ন দিয়ে আবার তা তুলে নেন।সেই সময় বঙ্গবন্ধু কথা শুনে দলীয় প্রার্থী শাহা জাহান চৌধুরীকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশের পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে বসে তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দেন। সেদিন প্রতিরোধ সংগ্রামে চট্টগ্রামের যুবনেতা সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ আবদুল গণি, মোহাম্মদ জাকারিয়া, এ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দীন, দিপেশ চৌধুরী, মুহাম্মদ ইউনুছ, বাঁশখালীর সুভাষ আচার্য ও শফিকুল ইসলাম সহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা শিরোনামে একটি মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন শহীদ মৌলভী সৈয়দ,এস এম ইউছুফ ও আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী। এ মামলার বেশিরভাগ আসামি হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এই মামলায়।এটা ছিল জাতির জন্য অত্যন্তদুঃখজনক, বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক ঘটনা।এভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা, চট্টগ্রাম শহর গেরিলা বাহিনীর প্রধান মৌলভী সৈয়দ। নিজের রক্ত দিয়ে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার স্বাক্ষর রেখে গেছেন যা নতুন প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।আজীবন জাতীর নিকট জাতীয় বীর হিসাবে মনের কোঠায় স্মরণ থাকবে। পুর্ণভুমি বীর চট্রলার সুর্য সন্তান মৌলভী সৈয়দ জীবন উৎসর্গ করেন বঙ্গবন্ধুর জন্য।তিনি দেখিয়েছেন জীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর নামটা অনেক বড়।তার সমসাময়িক কেউ তার মত এত বিপ্লবী কাজ করতে গিয়ে ত্যাগের মহিমান্বিত উদ্ভাসিত হতে পারিনি। শুধু একটি নাম বিপ্লবী বীর মৌলভী সৈয়দ।তিনিই ইতিহাস,তিনিই আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ইতিহাসের নায়ক মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক,বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদকারী,বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী,দেশপ্রেমিক, জীবন উৎসর্গকারী বীর মৌলভী সৈয়দ আহমেদের নাম স্মরণ করে রাখবে।পৃথিবীতে যতদিন বাংলাদেশ নামক দেশটি থাকবে ততদিন কেউই ইতিহাস থেকে মৌলভী সৈয়দের নাম মুছে ফেলতে পারবে না।আজীবন জাতি তাকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে যাবে।আগামী প্রজন্মের জন্য মৌলভী সৈয়দ আহমেদেরা হলো আমাদের আদর্শের প্রতিক ও হাতিয়ার। যতবেশি তাকে নিয়ে চর্চা হবে ততবেশী বাঙালীর ইতিহাস উজ্জ্বল হবে।এই উজ্জ্বল আদর্শিক ও ত্যাগী নক্ষত্রের জন্য আজ আমরা গর্বিত।তার আদর্শ ধারণ করে নতুন প্রজন্মেকে এগিয়ে যেতে হবে তাহলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হবে। লেখক - তসলিম উদ্দিন রানা ,সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, অর্থ ও পরিকল্পনা উপ-কমিটি,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
বাংলার ভাগ্যাকাশে এক শোকাবহ ক্ষণ আগস্ট
০ ৩ আগষ্ট ২০২১, চট্টগ্রাম, নিউজ একাত্তর ঃবাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রসৃষ্টি ও বেড়ে ওঠা, সংগ্রাম, অধিকার রক্ষা, মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সবই যাঁর জীবন উৎসর্গে হয়েছে,তিনি বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু।বাংলাদেশের ধূলোমাটিতে গড়াগড়ি করে বড় হওয়া দেশের একান্ত আপনজন শহীদ শেখ মুজিবুর রহমান। ১৫ আগষ্ট একটি কালো দিবস। বাংলার ভাগ্যাকাশে এক শোকাবহ ক্ষণ।যে শোক মানুষ কখনও সইতে পারবেনা।এরপরও মানুষের উপর দিয়ে এ ঝড় বয়ে গেলো। পৃথিবীজোড়া কিংবদন্তিপ্রতিম নেতার এই শহীদ হওয়া,দুনিয়া জুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গন কেঁপে উঠেছিলো।বিশ্বাস আর বিশ্বাসঘাতকতার এক বিস্তর ফাড়াক মানবসমাজকে নতুন রুপে দাড়ঁ করিয়েছে। জেল জুলুম, নির্যাতন এবং সারাজীবন ধরে রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজেপুড়ে সাধারণ মানুষের ঘাম ও শ্রমের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন।মানুষের সুখে দুঃখে জীবন বিলিয়ে দিতে তার জুড়ি নেই।মানুষ এবং মানুষ, অধিকার আর সংগ্রাম এতে তার জীবন ও স্বপ্ন ছিলো।নিজ বলতে তাঁর কিছুই ছিলো না।এমনকি পরিবারবর্গের প্রতি তাঁর সময় দেয়া ছিলো দুরুহ। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেই পরিবারবর্গকে সাথে নিয়ে শহীদ হলেন বাংলার দিকপাল,গণমানুষের সিপাহসালার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসের মহানায়ক,সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মানুষ এবং মানুষের অধিকার আদায়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, আপোষহীন বজ্রকন্ঠ,বাঙালীর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ অভিন্ন ও অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস। স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দানকারী কালজয়ী এই মহান নেতার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। বাঙালি জাতির ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ পযার্য়ে তাঁর গতিশীল ও সুযোগ্য নেতৃত্বে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভূ্্যদয় ঘটেছিল। জাতীয় পরিচয় নির্মাণে এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গঠনে তাঁর কালজয়ী নেতৃত্ব গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ।বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের মনকে জয় করেছেন,জয় করেছেন নির্যাতিত নিপীড়িত এবং শোষিত বিশ্ববাসীর হৃদয়ও।বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালীর প্রাণের মানুষ। বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধু আজীবন বাঙালীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করেছেন।বাংলাদেশের গণমানুষের জন্য তিনি জেল জুলুম, অত্যাচার,নির্যাতন সহ্য করেছেন। বাঙ্গালীকে ঐক্যই শক্তি এই মন্ত্রে উজ্জীবিত করেন। পাকিস্তান সরকার ষাটের দশক থেকে বাঙ্গালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের জন্য প্রধান বাধা বিবেচনা করে।ছয় দফা ঘোষনার পর বার বার গ্রেফতার নির্যাতনের পাশাপাশি ১৯৬৮ সালে আগরতলা মামলা দিয়ে তাকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। বাংগালী জাতির পিতা বঙ্গবনধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের অস্তিত্বের অংশ। আমাদের প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।তাঁর চিন্তা চেতনা,আদর্শ বাস্তবায়ন ও ধারণ করার মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানাতে হবে। তিনি আমাদের একটি স্বাধীন ভূখন্ড দিয়েছেন এবং বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।ক্ষণজন্মা এই মানুষটির মহাজীবন শতবর্ষেও অবিনশ্বর, অম্লান। আমাদের নেতা। আমাদের আদর্শ।আমাদের চেতনা। শতবর্ষে বাংগালী জাতির অনুপ্রেরণা। তিনি বাংলার মানুষের হৃদয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী মৃত্যুহীন,চির ভাস্বর। তিনিই আমাদের মুক্তির মহানায়ক। ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫। বিশ্ব ইতিহাস ও বাঙ্গালী জাতির জন্য অমোচনীয় এক কলংকের দিন। রাতের অন্ধকারে জঘন্য এ নৃশংসতা স্বাধীনচেতা বাঙালি জাতির বীরত্বের অহমিকাকে বিশ্ব দরবারে ভূলুণ্ঠিত করেছে আরেকবার এ হত্যা কেবল একজন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা নয়, এ হত্যাকান্ড স্বাধীনতা যুদ্ধে পাওয়া রক্তস্নাত লালসবুজের মানচিত্রকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ১৫ আগষ্টে শপথ হোক,আমরা জেগে রইবো, তোমার আদর্শ বুকে নিয়ে। লেখক-রাশেদুল আজীজ, সাংবাদিক, চট্টগ্রাম। নিউজ একাত্তর / ভুঁইয়া
অনুভূতির সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ - তসলিম উদ্দিন রানা
২৩,জুন,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন কেএম দাস লেন রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা লাভ করেন যা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এবার ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন হবে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত আদর্শের রাজনীতিক দল আওয়ামী লীগ দুর্বার গতিতে আধুনিক বাংলা গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় স্বাধীনতা আন্দোলন সংগ্রামের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। উপ-মহাদেশের রাজনীতিতে প্রায় ৬ দশকেরও বেশি সময় ধরে আভিজাত্যে ও অবিচ্ছেদ্য স্বত্ব হিসেবে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে গণতান্ত্রিকভাবে জন্ম নেওয়া এই দলটি।এদেশের প্রতিটি লড়াই,আন্দোলন-সংগ্রামে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের ভূমিকা উজ্জ্বল।আওয়ামী লীগ মানেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলধারা।আওয়ামী লীগ মানে বঙ্গবন্ধু,আওয়ামী লীগ মানে স্বাধীনতা। ৪৭এর দেশ বিভাগ,৫২র ভাষা আন্দোলন, ৬২র ছাত্র আন্দোলন,৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০এর নির্বাচন আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন,৭৫ এর পর নিঃশেষ হয়ে পুনরায় উজ্জীবিত,৯০ এর স্বৈরচ্চার বিরোধী আন্দোলন,৯৬ খালেদা বিরোধী আন্দোলন,২০০১ এর বিএনপি জামাতের বিরুদ্ধে আন্দোলন,২০০৭সালে ১/১১ এর ফখরুদ্দীন -মঈনুদ্দীন তত্ত্ববধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সহ সব লড়াই সংগ্রাম,গনতান্ত্রিক, অসম্প্রাদায়িক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে আওয়ামী লীগ।সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে আজও মানুষের নিকট জনপ্রিয় ও আদর্শিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আর এসবের প্রতিটি আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে আওয়ামী লীগের উপর বর্তায়।এদলটির উপর সব ঝড়জঞ্জা গেছে যা বলার উপেক্ষা রাখেনা তবুও সব কিছু উত্তরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু করেন।১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার কেএম দাসলেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে ততকালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।যা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে রুপান্তরিত লাভ করেন। প্রথম কাউন্সিলে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শামসুল হককে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তখন টগবগে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে বন্দী। বন্দী অবস্থায় তাকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে দলের তৃতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত হয়। মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।পরে কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বহাল থাকেন। ৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে দলের আন্তর্জাতিক নীতির প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীর মতপার্থক্যের কারণে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ ভেঙে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। আর মূল দল আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বহাল থাকেন।১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়।১৯৬৪ সালে দলটির কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মাওলানা তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান অপরিবর্তিত থাকেন। ১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান,তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ।এর পরে ১৯৬৮ ও ১৯৭০ সালের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এই কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।দেশ স্বাধীনতা লাভ করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে সভাপতি হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান।১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় সভাপতির পদ ছেড়ে দিলে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় পঁচাত্তরে কারাগারে ঘাতকদের হাতে নিহত জাতীয় নেতাদের অন্যতম এএইচএম কামরুজ্জামানকে ও সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন মো. জিল্লুর রহমান।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আসে আওয়ামী লীগের ওপর মরণাঘাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবারও স্থগিত করা হয়।১৯৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে আওয়ামী লীগকেও পুনরুজ্জীবিত করা হয়।এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় যথাক্রমে মহিউদ্দিন আহমেদ ও বর্তমান সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে।১৯৭৭ সালে এই কমিটি ভেঙ্গে করা হয় আহ্বায়ক কমিটি। এতে দলের আহ্বায়ক করা হয় সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে। ১৯৭৮ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি করা হয় আবদুল মালেক উকিল এবং সাধারণ সম্পাদক হন জননেতা আব্দুর রাজ্জাক। এরপরই শুরু হয় আওয়ামী লীগের উত্থানপর্ব, উপমহাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলার মূল প্রক্রিয়া। সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দলের মধ্যে সমস্যা দেখা দিলে নির্বাসনে থাকা বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফেরার আগেই ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন আবদুর রাজ্জাক। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী নির্বাচিত হয়।এরপরে ১৯৯২ সালে শেখ হাসিনা সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়।এরপরে ২০০২ সালে শেখ হাসিনা সভাপতি ও আব্দুল জলিল সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। এরপরে ২০০৯ ও ১২ সালে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়।এরপরে২০১৬ ও ১৮ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি ও ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক, সাধারণ মানুষের ভাত, ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, স্বৈরচ্চার ও স্বৈরচ্চারীনী নেতৃত্বদানের সুমহান গৌরব অর্জন করেছে।আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর এ ভূখণ্ডে যা কিছু বিশাল অর্জন তা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই হয়েছে। আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সঙ্গে এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।বাঙালি জাতির প্রতিটি মহত এবং শুভ অর্জনে আওয়ামী লীগের সংগ্রামী ও ত্যাগী ভূমিকা রয়েছে অতুলনীয়।ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগ এদেশের জনগণের পাশে থাকবে। প্রতিটি লড়াই সংগ্রাম ও আন্দোলনে নেতৃত্ব ভুমিকা অতুলনীয়।৭৫ এর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে দিয়ে যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল তার বিরুদ্ধে অনেক অকুতোভয় দুঃসাহসী লোক মৃত্যুবরন করেন ও অনেকে সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়,অনেকে জেল জুলুম শিকার করে দলকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করেছে যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাদের ত্যাগ তিতিক্ষা আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে আজ এদল ঠিকে আছে।সেই সময় খন্দকার মোস্তাক,জিয়া, এরশাদ,খালেদা গংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করতে গিয়ে অনেকের জীবন চলে যায় আর অনেকে নির্যাতিত হয়ে যায়।লক্ষ লক্ষ নেতা কর্মী মামলা,হামলা শিকার হয়ে অনেকে কারাগারে ছিলেন। দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করবে আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় দল আওয়ামী লীগ। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আধুনিক বাংলা গঠনে সুগম উন্নয়ন করে যাচ্ছে এমনকি দেশের বড় প্রজেক্ট তথা পদ্ম সেতু নিজ অর্থায়নে করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল দেশরত্ন শেখ হাসিনা।দেশকে নিন্ম মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বে দাড় করিয়ে দিয়েছে যা ইতিহাসের মাইলফলক।২০২১ -২২সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হবে।বিশ্ব আজ বাংলাদেশের উন্নয়নের ভুয়সী প্রশংসা করেন।যা আমাদের জন্য শুভ ও গর্বের বিষয়। এসব কিছুর মুলে আছেন ক্যারিশমাটিক নেতা জননেত্রী শেখ হাসিনা। গনতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদকে হটিয়ে ১৯৯১ সালে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে আবারো ভোট ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করলে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ভোট ও ভাতের অধিকার বাস্তবায়ন হয়।এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসেন।আবারো বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের নক্সা করে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে ও ২১ শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলা করে জননেত্রী শেখ হাসিনা সহ অনেক নেতা নিহত ও আহত তার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে যায়।এরপরে ১/১১ এর বিরুদ্ধে আবারো আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদেরকে লড়াই সংগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে দেশকে অসম্প্রাদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও ভোটের অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে যা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসে ও আধুনিক বাংলা গঠনে কাজ করে যাচ্ছে সেখানেও দলটির বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্রের নক্সা করে যাচ্ছে সব ছিন্নজাল ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় আওয়ামী লীগ।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ উন্নয়ন শিখরে আরোহন করছে যা বিশ্বের নিকট অনুকরণীয় হয়ে যাচ্ছে। এদেশে যত মেঘা প্রকল্প ও মধ্যম আয়ের দেশ উন্নীত হচ্ছে তা একমাত্র আওয়ামী লীগের মাধ্যমে হচ্ছে।আজ বিশ্বের মডেল দেশ রুপান্তর হওয়ার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে প্রিয় আওয়ামী লীগ। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নিরলস প্রচেষ্টায় উন্নয়নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সব নেতা কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছে।বিশ্বের রোল মডেল হল বাংলাদেশ যার মুলে কাজ করেছে জননেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে আধুনিক বাংলা গঠনে মেধা সম্পন্ন লোক দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে যা আমরা জাতি হিসাবে গর্ববোধ করি।উন্নয়নমুলক কাজ গুলো করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বাধার সৃষ্টি হচ্ছে আর এক শ্রেণীর ধর্মান্ধতা লোক বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির পায়তারা করছে যা আমাদের জন্য অশুভ সংকেত।ভালো কাজের বাধা আসবে এটা জননেত্রী শেখ হাসিনা জানে সেজন্য তিনি সব কিছু সজাগ দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করে নিজ হস্তে দমন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।বিশ্বের সব দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অদুরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে শেখ হাসিনা।আজ বাংলাদেশ বিশ্বের মডেল তার একমাত্র দাবীদার জননেত্রী শেখ হাসিনা। আগামী দিনে উন্নত বিশ্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে প্রিয় আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।যা আমাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসার দাবীদার। আওয়ামী লীগ পারে পারবে সোনার বাংলা ও আধুনিক বাংলা গঠনে এগিয়ে নিতে বদ্ধ পরিকর।স্বাধীনতার দল নিয়ে আজীবন বাঙালীরা গর্ব করে যা প্রতিটি বাঙালীর জন্য গৌরব। এগিয়ে যাক এগিয়ে যেতে হবে বহুদূর প্রিয় আওয়ামী লীগের। জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু।।- লেখক - তসলিম উদ্দিন রানা, সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য,অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
সাংবাদিক হেনস্থার পেছনে কারা; তাদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
১৮,মে,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: শুধু প্রেস রিলিজ সংগ্রহ আর প্রেস কনফারেন্স কাভার করা নিশ্চয়ই একজন সাংবাদিকের একমাত্র কাজ না। রোজিনা ইসলামের কলমের খোঁচায় অনেকের অনেক জারিজুরি ফাঁস হয়েছে। রোজিনা ইসলামকে ছয় ঘণ্টা যাবত আটকে রাখা হয়েছিলো স্বাস্থ্য সচিবের পাশের রুমে। রোজিনা ইসলামের মতন একজন প্রমিনেন্ট সাংবাদিকের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে অন্যদের বেলায় কি হবে! রোজিনা ইসলাম পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য আজ সোমবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। তাকে সেখানে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় এবং তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছয় ঘণ্টা সচিবালয়ে আটকে রেখে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ এই প্রতিবেদককে। রোজিনা ইসলামের অপরাধটা আসলে কি? কেন তাকে ছয় ঘণ্টা যাবত আটকে রেখেছিলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়? সাম্প্রতিক সময়ে রোজিনা ইসলাম নিয়োগে দুর্নীতিসহ স্বাস্থ্যখাতের নানা অনিয়ম নিয়ে সিরিজ রিপোর্ট করেছেন। এসব কারণেই কি ক্ষুব্ধ মন্ত্রণালয়? আজকের এই হেনস্থা কি তারই জের? দেশে এই মুহূর্তে রোজিনা ইসলামের মত সাহসী, মেধাবী এবং প্রতিশ্রুতিশীল রিপোর্টার খুব কমই আছে। একটি ভালো রিপোর্টের জন্য রিপোর্টারকে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়। দিনের পর দিন লেগে থাকতে হয়। একটি ভালো রিপোর্টের পেছনের গল্প আরেকটি মহাকাব্য। সেখানে পরতে পরতে থাকে ঝুঁকি, ডেডিকেশন আর ভয়কে জয় করার গল্প। সাংবাদিকতার সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এবং নিজে এই পেশায় আছি বলেই জানি তথ্য পাওয়ার কাজটি কতটা কঠিন। আমাদের আমলাতন্ত্রের কাজই যেখানে তথ্য লুকানো সেখানে একজন রিপোর্টারকে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পেতে অনেক কৌশলই নিতে হয়। আর এটা নিশ্চয়ই গর্হিত কোন অপরাধ নয়? বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। মাননীয় মন্ত্রী, সচিব এবং নীতিনির্ধারকরা দয়া করে এটি নিয়ে একটু ভাবুন। পারলে গোপনীয়তার সংস্কৃতি ভাঙুন। আইনের ধারাগুলো এমন করা হোক যেন একজন পেশাদার সাংবাদিক চাওয়ামাত্র দুর্নীতি-অনিয়মের সব তথ্য পায়। স্বাধীন গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। বাংলাদেশের হাইকোর্ট গতবছরের ১৬ মার্চ একটি মামলা চলাকালে এই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এই চতুর্থ স্তম্ভ মানে সাংবাদিকরা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে রাষ্ট্রের বাকি তিন স্তম্ভ (আইন সভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ) সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে। কাজেই সাংবাদিকদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি প্রশ্ন-নিয়োগে যে কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে সেই নথি কি এমনি এমনি আপনারা দেবেন? আপনারা কোটি টাকার দুর্নীতি করবেন সমস্যা নেই, সেটা প্রকাশ করার চেষ্টা করলেই সব সমস্যা! হয়রানি না করে সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা করতে সহায়তা করুন। করোনাকে পুঁজি করে যারা কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়ম করছে- পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। সাহসী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ । ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে মানসিক নির্যাতন করায় দুই দফা তিনি সংজ্ঞাহীন হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়! কোভিডের সময় সরকারের টাকা নয়-ছয় করে যে সব কর্মকর্তা আর ঠিকাদারেরা যোগসাজশে সরকারকে জনগণের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন তাদের শাস্তি সময়ের দাবি। আওয়ামী লীগ বা তার সহযোগী কোন সংগঠনের কেউ দুর্নীতি করেনি। দুর্নীতি করেছে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের চুরির রিপোর্ট করা যাবে না; সংবিধানের কোথাও এটা লেখা নেই। সরকারকে বিব্রত করতে সূক্ষ্মভাবে কারা এত আয়োজন করছে? সাংবাদিক হেনস্থার পেছনে কারা; তাদের মুখোশ উন্মোচিত হোক। লেখক : বাণী ইয়াসমিন হাসি, সম্পাদক- বিবার্তা২৪ডটনেট।
ভাষাসৈনিক ডঃ মাহাফুজুল হক চট্রলা তথা বাংলাদেশের অমুল্য সম্পদ ছিলেন
১১,এপ্রিল,রবিবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: বীর পটিয়া তথা চট্রলা নয় বাংলাদেশের আদর্শিক ও মেধাবী সংগঠক ছিলেন ভাষাবিদ ডঃ মাহাফুজুল হক। বাল্যকাল থেকে অত্যন্ত মেধাবী ও দক্ষ সংগঠক হিসাবে স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার কর্মকাণ্ডে পরিচয় বহন করে।১৯৩১সালের ১লা এপ্রিল চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা জিরি ইউনিয়নে কৈয়গ্রাম গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এলাকায় শিক্ষাবিদ ও পোষ্টমাষ্টার নামে খ্যাত ছিলেন এস আহমদ হোসেন ও মাতা মোছাম্মৎ চেমন খাতুন। পিতার আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে শিক্ষার মশাল জ্বালানোর জন্য স্কুল জীবন থেকে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ডঃ মাহাফুজুল হক। শৈশব,কৈশোর ও জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেন চট্রগ্রাম ফিরীঙ্গাবাজার এলাকায়।আলকরণ স্কুল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে চট্রগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলে থেকে এসএসসি ও চট্রগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএতে ভর্তি হয়ে ডিষ্টিংশন নিয়ে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ও একই সাথে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।১৯৬১ সালে ৯ সেপ্টেম্বর এডওয়ার্ড ডব্লিউ হাজেন বৃত্তি নিয়ে আমেরিকা যান এবং নিউইয়র্কে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষার সাথে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে তার অবাধ বিচরন ছিল অসাধারণ। বীর চট্রলার ছিলেন বিপ্লবের সূতিকাগার,স্বাধীনতা জন্মভূমি,মাষ্টার দা সূর্য সেন,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও মনিরুজ্জামান ইসলামবাদী,বার আউলিয়ার পুন্যভুমি নামে খ্যাত।এই চট্রগ্রামে বহু প্রতিভা ও সুর্য সন্তান জন্মগ্রহণ করেন তার মধ্যে অন্যতম প্রতিভার অধিকারী ছিলেন ভাষাবিদ ডঃ মাহাফুজুল হক। ইতিহাসে তার নাম আজীবন স্মরণ হয়ে থাকবে ভাষাসৈনিক হিসাবে।যা বিরল ঘটনা ও ইতিহাসের অংশ। রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে তার অগ্রনী ভুমিকা অতুলনীয়। মা,মাতৃভুমি ও মাতৃভাষা হল আমাদের প্রাণ। আর মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে এমনকি বাংলা ভাষার প্রচলন সমিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ছাত্র অবস্থায় ছাত্র রাজনীতির সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে বিধায় তিনি নিখিল বঙ্গ ছাত্রলীগের চট্রগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাকিস্তানের বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে নেতত্বে দিয়েছেন। ডঃ মাহাফুজুল হক ঐতিহাসিক তমুদ্দন মজলিশের চট্রগ্রামের অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন বলে পাকিস্তান তমুদ্দিন মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এসময় তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মুকুল ফৌজ নামক সংগঠনের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন যা যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে চট্রগ্রাম যুক্তফ্রন্টের কর্মী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। তার অসম্ভব দুরদর্শিতা,সুষ্ঠু পরিকল্পনা,দক্ষতা ও পরিশ্রমের কারণে যুক্তফ্রন্ট নিরংকুশ জয়লাভ করেন এবং মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়েছে। অসম্ভব মেধাবী,সুবক্তা,সাংগঠনিক দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার জন্য অল্প বয়সে চট্রগ্রামে রাজনৈতিক অঙ্গনে জনপ্রিয়,মানুষের ভালবাসা ও কারিসম্যাটিক নেতা হিসেবে সুপরিচিত লাভ করেন।চট্রগ্রামে তার কথা সব জায়গায় আলোচনা করেন পরবর্তীতে তিনি সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। যা বীর চট্রলার মানুষ তাকে আপন হিসেবে খুব ভালবাসত। ১৯৫১ সালে ১৯ ফ্রেব্রুয়ারীতে মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীদের এমবিবিএস পড়ার সুযোগ দানের জন্য সারা বাংলাদেশে যে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছিল তার চট্রগ্রাম কমিটির প্রধান ছিলেন ডঃ মাহাফুজুল হক। তার নেতত্বে চট্রগ্রামে আন্দোলন,ধর্মঘট ও সংগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়।এর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে পাই যা ইতিহাসের মাইলফলক। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকালে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।বিভিন্ন সময় আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বহুবার পাকিস্তানের জান্তা বাহিনী পুলিশ কতৃর্ক হয় এমনকি পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যুর সংবাদ প্রচার হয় যা পরবর্তীতে ভুল ছিল বলে প্রমাণ হয়।সেসময় চট্রগ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমণ্ডলের বাইরে সাহিত্য সাধনায় তার অবাধ বিচরন ছিল অসাধারণ।তার সাহিত্যে সাধনার বহু ফসল ততকালের পত্র-পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমাদের সাহিত্যে ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এবং ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ,বাঙালী জাতির সংস্কৃতির সত্যিকারের রুপায়ন ও সর্বোপরি মাতভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠাই ছিল এ মহান সাধকের অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল। ১৯৫৬ সালে তার লেখা সাংস্কৃতিক পুর্নগঠন শীর্ষক এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।যা বাঙালী জাতির জন্য এক অমুল্য সম্পদ।তার প্রবন্ধে বলেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা জাতীয় জীবনে মূল্যহীন হয়ে পড়ে যদি তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক আজাদী ও অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব না হয়।কারণ শিল্পী ও সাহিত্যিকরা শুধু সমাজে নিরপেক্ষ ব্যক্তি নন বরঞ্চ তারাই সমাজের সচেতন প্রতিনিধি। ১৯৬৫ সালে পুর্ব পাকিস্তান বাংলা প্রচলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এসব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে তিনি পত্রিকার সম্পাদক কাজেও জড়িত ছিলেন। তার সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হচ্ছেউ সাপ্তাহিক ইঙ্গিত, দ্যুতি ও সাপ্তাহিক সৈনিক। এগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের তথা বাংলা ভাষার প্রচলন করে দেশের জন্য কাজ করেছেন।যা আমাদের অমুল্য সম্পদ বললে চলে।তার কর্মদক্ষতা ছিল বলে তিনি জ্ঞান গরিমার মাধ্যমে আলোকিত মানুষ হিসাবে বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগী ছিলেন বলে আজ আমরা গর্বিত। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বাংলার বাঘ খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক,গণতন্ত্রের মানস পুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহধন্য উত্তরসুরী হিসাবে কাজ করেছেন।তাদের আদর্শ বাস্তবায়নে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলার পথ প্রান্তরে প্রতিটি এলাকায় কাজ করেছেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি চট্রগ্রামের দক্ষ সংগঠক হিসাবে স্কুল, কলেজ ছাত্র রাজনীতির করেছেন যা তার কর্মে পরিচয় বহন করে। তিনি আজীবন মৃত্যুঞ্জয়ী অকুতোভয় দুঃসাহসীক ছাত্রনেতা ছিলেন।নেতার আদর্শ বাস্তবায়নে করতে জীবনের মুল্যবান সময় ব্যয় করে কাজ করেছেন। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণে রাজনীতি করেছেন বিধায় আজীবন মানুষের মণিকোঠায় তার নাম স্থান করে নিয়েছে। তার কর্ম গুনে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।তন্মধ্যে ডঃ মাহাফুজুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সদস্য,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিল সদস্য,পাকিস্তান লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক,পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ট ও কিশোর মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা সহ বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব দায়িত্ব পালনে তার চতুর্মুখী প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে এমনকি তিনি মেধা মনন ও কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আজীবন বাংলা আর বাঙালী জাতির জন্য তিনি নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসীন করে চট্রলা তথা বাংলাদেশকে মর্যাদার আসীন করেছে। তার তীক্ষ্ণ লেখনীতে সব কিছু ফুটিয়ে তুলে বাংলার মর্যাদা বীরোচিত ও পাঠকপ্রিয় হিসাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য একথাটি মনে রেখে বাংলা ভাষার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে সর্বশক্তি দিয়ে মিছিল মিটিংয়ের অগ্রভাগে থেকে প্রতিটি লড়াই সংগ্রাম করে যাওয়া নাম পটিয়ার সূর্য সন্তান ডঃ মাহাফুজুল হক। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আহত হয় যা মায়ের ভাষা আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন বলে তা সম্ভব হয়।আজীবন মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করে যাওয়া হল আসল কাজ সেটি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন।রাজনৈতিক জীবনে চট্রগ্রাম থেকে উঠে আসা যোদ্ধা সর্বশেষ ঢাকায় এসে নেতৃত্ব দেয়।তারুণ্যের বাধ ভাঙা উচ্ছ্বাস নিয়ে ছাত্র জীবনে ছিল তার জন্য উপযুক্ত সময় বলে দেশপ্রেমের কারণে সব জায়গায় কাজ করেছে। কোন কিছুর ভয় তাকে আটকাতে পারিনি। সব জায়গায় সফল মানুষ হিসাবে দেশপ্রেমিক লোক হিসাবে আজ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তিনি মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।আর সাহিত্য সংস্কৃতির যবনিকাপাত হয় অল্প সময়ে। তিনি যদি আরও বেচে থাকত তাহলে আরও উপরে আসনে অধিষ্ঠিত হত আর বাঙালী জাতী লাভবান হত।পরিবার পেত সন্তান আর আমরা পেতাম একজন মেধাবী সাহিত্য সংস্কৃতির লোক।১৯৬৬ সালে ২ ফ্রেব্রুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কনফারেন্স অংশগ্রহণ করতে গিয়ে ফরিদপুরে হেলিকপ্টার বিধ্বংস হয়ে অকালে ঝরে গেল পটিয়া,চট্রলা তথা বাংলাদেশের অমুল্য সম্পদ সাহিত্যিক,ভাষাবিদ ডঃ মাহাফুজুল হক। তার অকাল মৃত্যুতে দেশ হারাল অমুল্য সম্পদ আর পরিবার হারাল মেধাবী সন্তান। অকাল মৃত্যুতে দেশে কালো ছায়া নেমে আসে।চট্রগ্রামের শোকের মাতম হয় যা বর্ননাতীত।আজীবন চট্রলার মানুষ আপনাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে রাখবে।আপনার কর্ম গুনে আপনি মানুষের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছ।আপনার হারানোর শোক আজও আমাদেরকে আন্দোলিত করে। আপনি ভুলবার নয় তবুও আল্লাহর ডাকে সবাইকে চলে যেতে হবে তেমনি আপনিও।আপনি সম্পক্তি নয় দেশ জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ ছিলেন। বাঙালী তথা বীর চট্রলাবাসী শ্রদ্ধায় অবনত করে আপনাকে শ্রদ্ধা করে। স্যালুট বীর চট্রলার বীর সন্তান ডঃ মাহাফুজুল হক,স্যালুট বীর পটিয়ার গর্বিত সন্তান ডঃ মাহাফুজুল হক।- লেখক - তসলিম উদ্দিন রানা,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক নেতা।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশের হয়ে লড়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী
৩১,মার্চ,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল ভারত। মূলত শোষণমুক্তির জন্য পাকিস্তানি সেনাদের বন্দুকের নলের মুখে নিরস্ত্র বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ, অমিত বিক্রম, জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম, এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও মুগ্ধতার কারণে শুরু থেকে নৈতিক সমর্থন দিয়ে গেছেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরের দিনই, ২৭ মার্চ, লোকসভার ভাষণে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ শুধু একটি আন্দোলন দমনের জন্যই নয় বরং সেখানে নিরস্ত্র জনতার ওপর ট্যাংক নামানো হয়েছে। সেখানে কী ঘটেছে এবং আমাদের কী করণীয় এ সম্পর্কে আমরা সক্রিয় আছি। এখানে একটি ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয়, ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একচেটিয়া জয় হয় আওয়ামী লীগের। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে যে জাতিকে জাতীয়তাবোধে উদ্ধুদ্ধ করেছেন বঙ্গবন্ধু, তারই ফলাফল পূর্ববাংলার মোট ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে বিজয়। কিন্তু দুই পাকিস্তানের মধ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়ার পরেও আওয়ামী লীগকে সরকার গঠন করতে দেয়নি পাকিস্তানি সামরিক সরকার। আলোচনার ছদ্মবেশে সময়ক্ষেপণ করে তারা। এরমধ্যে ধীরে ধীরে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সেনাবাহিনী নিয়ে আসা হয়। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে সার্বিক নির্দেশনা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরমধ্যেই, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অতর্কিত ঘুমন্ত বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তাৎক্ষণিকভাবে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। এরপরেই গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। পরবর্তীতে তার নামেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়। সেসময় আমাদের প্রবাসী সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে তৎপরতা চালিয়েছেন। তবে তখনও বাংলাদেশ কোনো স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্র না হওয়ায়, বিশ্বনেতাদের কাছে সেসব প্রচেষ্টা কোনো গুরুত্ব পায়নি। এক্ষেত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন এ বিষয়ে কথা বলেছেন, বিশ্বনেতাদের কাছে সেটির অর্থ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দিল্লিতে আলোচনা হয় আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দিন আহমেদের। সেসময় তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে উত্থাপন করে তার পক্ষ থেকে সহযোগিতা চান। এরপর এই যুদ্ধে সহযোগিতার আশ্বাস দেন শ্রীমতি গান্ধী। ১৩ এপ্রিল লাখনৌতে তিনি বলেন, পূর্ব বাংলায় যা হচ্ছে, তাতে ভারত সরকার নীরব হয়ে থাকবে না।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ভারত-বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত। অবশ্যই এই দুটি দেশে তাদের পারস্পরিক বিষয় সৌহার্দ্যপূর্ণ হবে। ৭ মে সম্মিলিত বিরোধী দলের বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী যখন বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, তখন অনেকে বলেছিলেন যে- ভারতের অভ্যন্তরের বিষয়ে অন্য কেউ নাক গলালে কেমন হবে, এক্ষেত্রে কাশ্মীরের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন- কাশ্মীরে কিছু স্বার্থবাদী হাঙ্গামা রাখতে চায় কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়টি তেমন নয়, সেখানে জনসমর্থন আছে। মূলত বঙ্গবন্ধুর একচেটিয়া জনসমর্থনের ওপর আস্থা রেখেই বাংলাদেশের ব্যাপারে আস্থাশীল ছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে তিনি আলাদাভাবে কল্পনাও করেননি কখনো। এই আস্থা থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি একাধিকবার ছুটে গেছেন বিশ্বনেতাদের কাছে। ১৯৭১ সালের ১৩ মে বিশ্বশান্তি সংঘের সম্মেলনে বাংলাদেশের বিষয়ে বার্তা পাঠান তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সেই বার্তা ৮০টি দেশের প্রায় সাতশ প্রতিনিধির সামনে পড়ে শোনানো হয়। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের জনসাধারণের ন্যায্য দাবি, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের দেশ শাসন করবেন। আশা করি, বিশ্বের মানুষ এই দাবি সমর্থন করবেন এবং তাদের অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য সচেষ্ট হবেন। একদিকে যেমন যুদ্ধ চলছিল, অন্যদিকে জেলের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল পাকিস্তানি জান্তারা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ভোটে বিজয়ী নেতাকে প্রহসনের এক বিচারের মুখে ঠেলে দিয়ে ফাঁসিতে ঝোলানোর বন্দোবস্ত করেছিল পাকিস্তানিরা। এই খবর জানতে পেরে ষড়যন্ত্র থেকে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার জন্য উদ্যোগ নেন শ্রীমতি ইন্দিরা। ৮ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সরকারের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বার্তায় বিশ্বের সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের প্রতি শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা ও মুক্তির দাবি জানিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে যে, বিচারের নামে প্রহসনের আড়ালে শেখ মুজিবকে হত্যার চক্রান্ত হয়েছে। এই হত্যা সংগঠিত হলে পূর্ববাংলার অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। দুদিন পরই, ১১ আগস্ট, শ্রীমতি গান্ধী বিশ্বের ২৪টি দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের কাছে মুজিবের প্রাণ রক্ষার জন্য তাদের প্রভাব খাটানোর আবেদন জানান। ইন্দিরা গান্ধীর তৎপরতার কারণেই ১৭ আগস্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভার আন্তর্জাতিক আইন সমিতির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিকট তার-বার্তায় শেখ মুজিবের মুক্তির দাবি করা হয়। এরপর ২০ আগস্ট ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি থেকে বিশ্ব শক্তি পরিষদ শেখ মুজিবের মুক্তির দাবি করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে। ২১ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধী ও যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসেফ টিটোর এক যুক্ত বিবৃতিতে পাকিস্তানকে সাবধান করে দিয়ে বলা হয়, বিগত নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থহীন রায় উপেক্ষা করা হলে সমস্যা জটিলতর হতে বাধ্য। সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি প্রদান অবশ্য প্রয়োজন। এদিকে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকেই বাংলাদেশের অনেক স্থান মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে যায়। এসময় ভারতের সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সেনাকমান্ড ঢাকা সেনানিবাস থেকে ব্যাপক সংখ্যক সৈন্য সীমান্ত এলাকায় পাঠায়। তা দেখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভাবলেন, এই পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে জানানোর সময় এসেছে। তাই ২৪ অক্টোবর তিনি ১৯ দিনের জন্য বিশ্ব সফরে বের হন। এসময় শ্রীমতি গান্ধী ইউরোপ ও আমেরিকার বহুদেশ সফর করেন। তার এই সফর ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে আলোচনাকালে শ্রীমতি গান্ধী বলেন, ব্রিটেনকে ভারতীয় উপমহাদেশের ব্যাপারে জড়াতে চান না তিনি। তবে বর্তমান সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের উদ্দেশ্যে কারারুদ্ধ নেতা শেখ মুজিব কিংবা তার সহকর্মীদের সঙ্গে অবিলম্বে আলোচনা শুরু করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারকে রাজি করার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন বলে তিনি আশ্বস্ত হতে চান। ব্রিটেনে সফররত অবস্থায় বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেন ইন্দিরা গান্ধী। সেসময় বিবিসির সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন- ভারত যদি বাংলাদেশের গেরিলাদের সবরকম সাহায্য বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেখানকার সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ হয়ে যাবে কিনা? এর উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই না। তারা (বাংলাদেশের জনগণ) কারো মুখাপেক্ষী হয়ে ২৫ মার্চ রাতে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়নি। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচুর সংখ্যক বাঙালি বাস করছে, তারা ইতোমধ্যে সংগঠিত হয়ে তাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সব রকম সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসছে। এছাড়াও বাংলাদেশের হাজার হাজার সেনা, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার সদস্য রয়েছেন; যারা যুদ্ধ করতে পারদর্শী এবং তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্রসহ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য বাঙালির স্পৃহা এবং টগবগ করতে থাকা জাতীয়তাবোধ তাকে এতাটাই মুগ্ধ করেছিল যে, রণাঙ্গণের যোদ্ধাদের প্রতি তার মনে অসীম শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়েছিল। আর তিনি এটাও জানতেন যে, বাঙালির এই জাগরণ সম্ভব হয়েছে শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্য। তাই বঙ্গবন্ধুকে যাতে পাকিস্তানিরা হত্যা করতে না পারে, সেজন্য তিনি প্রতিনিয়ত বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন ঘুরে এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র যান ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিক্সন একে গৃহযুদ্ধ অভিহিত করে পাকিস্তানের পক্ষে সমাধানের প্রস্তাব দিলে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরপর ৬ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, পূর্ববাংলায় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের মূল্য দেওয়া হয়নি। সেই নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েও গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ পায়নি। পক্ষান্তরে পাকিস্তানি সেনা শাসকেরা আলোচনার নামে গোপনে সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে বাংলার সাধারণ মানুষদের হত্যা করার চক্রান্ত করেছে। কাজেই বর্তমানে সেখানে যা ঘটেছে, তাকে গৃহযুদ্ধ বলা যাবে না বরং তা যুক্তিগ্রাহ্য রাজনৈতিক পন্থায় অধিকার আদায়ের যুদ্ধ। শ্রীমতি গান্ধী তার ভাষণে শেখ মুজিব সম্পর্কে বলেন, শেখ মুজিব একজন অসাধারণ নেতা। তার সঙ্গে কারো কোনো তুলনা চলে না। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়লাভ করেছেন, তা এক অসামান্য ঘটনা। তিনি চিন্তা চেতনায় একজন আধুনিক মানুষ। পাকিস্তান সরকার তার সেই সাফল্যকে নস্যাৎ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফলকে অস্বীকার করছে। যার ফলশ্রুতি হিসেবে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ২৫ মার্চ পূর্ববাংলায় এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক হত্যার মধ্য দিয়ে যার শুরু। ঘটনা কেবল সেখানেই থেমে থাকেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভারতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে চরম অত্যাচারের মাধ্যমে। এসব জনগণের অপরাধ, তারা সামরিক সরকারকে ভোট দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া সেই ভাষণে তিনি আরো বলেন, পূর্ববাংলার মানুষ এখন স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার, তাদের নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে চালান দেওয়া হয়েছে। ঘটনার অনিবার্যতা তাদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনে বাধ্য করছে। ৭ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী চার দিনের সরকারি সফরে ফ্রান্সের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এর মধ্যেই পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান তার সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। তবে ফ্রান্স ছাড়ার পূর্বেই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে আমার আলোচনার কিছু নেই। শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনাই বর্তমান সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে। কারণ তিনিই বাঙালি জনগণের নির্বাচিত নেতা। তাছাড়া বাংলাদেশের জনগণের অনুমোদনক্রমে যে কোনো সমাধানই সম্ভব হতে পারে। সফর শেষে ভারতে ফেরার পর ১৫ নভেম্বর পাকিস্তানের যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে নিউজ উইক পত্রিকাকে শ্রীমতি গান্ধী বলেন, ভারতে যারা স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে, পরবর্তীতে তারাই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করেছে। কিন্তু পাকিস্তানে যারা সংগ্রাম করে স্বাধীনতা এনেছে, তার বেশিরভাগই জেল খেটেছে, নির্যাতিত হয়েছে। আর যারা বিদেশি প্রভুদের সহযোগিতা করেছে- যেমন সামরিক, বেসামরিক আমলা; তারাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারত পাকিস্তান দুটি দেশের মধ্যে এটাই পার্থক্য। আর এজন্যই দুদেশের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। যতোই সময় গড়াচ্ছিলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারে ততোই কথা বলছিলেন গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই নেত্রী। ২৭ নভেম্বর দিল্লিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিষয়ে এখন একটি রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর সময় রয়েছে। পাকিস্তান ইচ্ছা করলে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধানে আসতে পারে। কিন্তু ৩ ডিসেম্বর ভারতকে আক্রমণ করে বসে পাকিস্তান। এরপর পাল্টা আঘাতে যায় ভারত। ডিসেম্বরের ৬ তারিখে ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এসময় ইন্দিরা গান্ধী বলেন, অনেক বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রামরত বাংলাদেশের জনগণ এবং পশ্চিম পাকিস্তানি হামলা প্রতিহত করার জন্য জীবনপণ সংগ্রামরত ভারতের জনগণ আজ একই লক্ষ্যে ও একই পথের পথিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পাশাপাশি শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারেও সমানভাবে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাই ১০ ডিসেম্বর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রীমতি গান্ধী বলেছেন, ভারত তখনই পুরোপুরি বিজয়ী হবে, যখন বাংলাদেশ ও তার নেতারা মুক্ত হবে। মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে সরকার গঠন করবে। এককোটি শরণার্থী ভারত থেকে স্বাধীন সার্বভৌম স্বদেশে ফিরে যাবে। সেই দিনটি খুব দ্রুতই অর্জিত হয়। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের সামনে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি পাকিস্তানি জান্তারা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকালে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের পর বেলা সাড়ে ৫টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিজয়ের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশে শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করেছে। ঢাকা এখন একটি স্বাধীন দেশের মুক্ত রাজধানী। এই সংসদ ও সমগ্র জাতি এই ঐতিহাসিক ঘটনায় আনন্দিত। আমরা বাংলাদেশের জনগণকে তাদের এই বিজয়লগ্নে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। বীরত্ব ও আত্মত্যাগের জন্যে আমরা মুক্তিবাহিনীর সাহসী তরুণদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমাদের স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। আমরা তাদের জন্য গর্বিত। যারা জীবন দিয়েছেন ভারত তাদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। আমরা আশা করি ও বিশ্বাস করি যে, এই নতুন দেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণের মধ্যে যথাযোগ্য স্থান গ্রহণ করে বাংলাদেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবেন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে ছাড়া পান বঙ্গবন্ধু। এরপর লন্ডনে যাত্রাবিরতি শেষে ১০ ডিসেম্বর ভারত হয়ে বাংলাদেশের ফেরেন। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীসহ তার সরকার অভ্যর্থনা জানায় তাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশে থাকার জন্য ভারতের জনগণ ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধু। সেই সঙ্গে একজন জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নেন। এরপর নতুন করে দেশ গড়ার প্রত্যয় বুকে নিয়ে জাতির জনক পা রাখেন বাংলাদেশের মাটিতে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই তার কথা মতো মাত্র দুই মাসের মধ্যে সব ভারতীয় সেনাকে ফিরিয়ে নেন ইন্দিরা গান্ধী। যুদ্ধে জয়ের কোনো অংশীদার বিশ্বের ইতিহাসে কখনোই এত দ্রুত জয় করা ভূমি ছেড়ে চলে যায়নি। এটি সম্ভব হয়েছে শুধু বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর আস্থা ও মুগ্ধতার কারণেই।- সংগৃহীত
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ: কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা
১৬,মার্চ,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: ১৯৭১-এর মার্চের মতো বিপুল ঘটনাবহুল, চরম উত্তেজনাপূর্ণ, আকাশসমান স্বপ্ন ও সংঘাতময় পরিস্থিতি, যার ধারাবাহিকতায় নজিরবিহীন গণহত্যা এবং স্বাধীনতার শাশ্বত ঘোষণা- বাঙালির ৫ হাজার বছরের লিখিত-অলিখিত ইতিহাসে কখনো দেখা যায়নি, ভবিষ্যতে ঘটারও কোনো কারণ নেই। আমাদের প্রজন্ম সৌভাগ্য- বাঙালির সেই সুবর্ণ ইতিহাস আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, ঘটনার কেন্দ্রে বিচরণ করেছি এবং বাঙালির সর্বোচ্চ আনন্দ-বেদনার অভিজ্ঞান আজও বহন করছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে। বাঙালি জাতির দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন ও অহঙ্কার ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং এই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছে স্বাধীন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিহাস সৃষ্টিকারী অনন্যসাধারণ ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন বটে, তবে ৭ মার্চের ভাষণেই তিনি স্বাধীনতার ডাক দেওয়ার পাশাপাশি কীভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধ করতে হবে তার রণকৌশলও ঘোষণা করেছিলেন। সেদিন ঢাকার রমনার বিশাল মাঠে (যা এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে দশ লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছিল তাদের অধিকাংশ কালের পরিক্রমায় ৭১-এর পরবর্তী ৫০ বছরে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। আমরা বিরল সংখ্যক ৭ মার্চ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী প্রত্যক্ষ করার জন্য বেঁচে আছি, যে সৌভাগ্য আজকের বাংলাদেশে অল্প কিছু মানুষই দাবি করতে পারে। ৭১-এ আমরা সদ্য যৌবনে পদার্পণ করেছি। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা স্নাতক সম্মানের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। খণ্ডকালীন কাজ করি কাজী আনোয়ার হোসেনের রহস্য পত্রিকায় সহযোগী সম্পাদক হিসেবে। সে বছর ফেব্রুয়ারি আমাদের এক বছরের সিনিয়র বেবী মওদুদের সম্পাদনায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বের করেছিলাম রানার নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, যার লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার দাবিকে জনপ্রিয় করা। বেবী মওদুদ ছিলেন শেখ হাসিনার সহপাঠী, পরে সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ৭০-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস বিজয়ের পরই এটা অবধারিত হয়ে গিয়েছিল- পাকিস্তানে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা এবং তাদের দোসর পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো কখনও বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। ৭১-এর জানুয়ারি থেকেই শুরু হলো ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা। বঙ্গবন্ধু অবশ্য জানতেন নির্বাচনে তিনি যত বেশি ভোট পান না কেন পাকিস্তানিরা কখনও তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার গোপন পরিকল্পনা নির্বাচনের আগেই তিনি চূড়ান্ত করেছিলেন, যা তার দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও বিস্তারিত জানতেন না, জানতেন ছাত্র লীগের ভেতর যে নিউক্লিয়াস তিনি তৈরি করেছিলেন, যেটি পরিচিত ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা বিএলএফ নামে- তার নেতারা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছিল। পাকিস্তান এগিয়ে যাচ্ছিল অনিবার্য ভাঙনের দিকে আর বাঙালি অপেক্ষা করছিল- বঙ্গবন্ধু কবে স্বাধীনতার ডাক দেবেন। ৭০-এর নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বাংলাদেশ সহ সমগ্র বিশ্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বাঙালি জাতির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মার্চের ১ তারিখ দুপুরে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান যখন এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতুবি ঘোষণা করলেন তখন পূর্বাণী হোটেলে বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের পরিষদ দলের সভা চলছিল। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসে জড়ো হয়েছিল কলাভবনের বটতলায়। ডাকসুর নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করলেন বেলা ৩টায় তারা পল্টন ময়দানে সমাবেশ করবেন, যার পাশে পূর্বাণী হোটেলে অবস্থান করছিলেন বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। কয়েক ঘণ্টার ভেতর ঢাকার স্বাভাবিক চেহারা পাল্টে গেল। অফিস, আদালত, কল-কারখানা, সরকারি দফতর সব ফেলে বিক্ষুব্ধ মানুষ মিছিলের পর মিছিল নিয়ে পূর্বাণী হোটেল আর পল্টন ময়দানে জড়ো হলো। পূর্বাণী হোটেলের চারপাশের রাস্তায়ও মিছিলকারীরা অবস্থান গ্রহণ করল। বঙ্গবন্ধু পূর্বাণী হোটেল থেকেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ২ মার্চ ঢাকা শহরে এবং ৩ মার্চ সারা দেশে ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়ে বললেন, ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় তিনি আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ঘোষণা করবেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন আরম্ভ হয়ে গেল যা অব্যাহত ছিল ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অপারেশন সার্চলাইট-এর নামে নজিরবিহীন গণহত্যাযজ্ঞ আরম্ভের আগে পর্যন্ত। এই দিনই বঙ্গবন্ধু ছাত্র নেতৃবৃন্দকে তার ৩২ নম্বরের বাড়িতে ডেকে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার নির্দেশ দেন। ৭ মার্চ রেসকোর্সের বিশাল ময়দানে সকাল ১০টা থেকেই জনসমাগম আরম্ভ হয়েছিল। দুপুর ২টা নাগাদ গোটা ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত করেছিল। আমি আর আমার বন্ধু শফী চৌধুরী হারুণ (যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, সদ্যপ্রয়াত) একসঙ্গে টিএসসির কাছে মাঠের এক প্রান্তে বসে সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ শুনেছি। রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা তখন প্রায় ষোল লাখ। শুধু ঢাকার ছাত্র-জনতা নয়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল থেকে শ্রমিকরা এসেছিল ডামি হাতুড়ি শাবল নিয়ে, কৃষকরা এসেছিল লাঙ্গল কাঁধে নিয়ে, নৌকার মাঝিরা এসেছিল বৈঠা ও লগি নিয়ে। অনেকে এসেছিল তীর ধনুক আর কাঠের বন্দুক নিয়ে। রমনার ময়দানের চতুর্দিকের রাস্তায় মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। সবার কণ্ঠে একই শ্লোগান জয় বাংলা। এ ছাড়া শ্লোগান ছিল- তোমার দেশ আমার দেশ- বাংলাদেশ বাংলাদেশ, তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন করো ইত্যাদি। সব মিছিলে বাংলাদেশের পতাকা- গাঢ় সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মাঝখানে বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্র। এই মানচিত্র খচিত পতাকা মার্চের ২ তারিখেই ছাত্রনেতারা উত্তোলন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে, যা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সর্বত্র দৃশ্যমান ছিল। বঙ্গবন্ধু সেদিন বেশ কিছুটা দেরিতে মঞ্চে উঠেছিলেন। তার আগে আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা মঞ্চ থেকে মুহুর্মুহু শ্লোগান দিচ্ছিলেন, যার জবাব দিচ্ছিল উপস্থিত জনতা। শ্লোগানে শ্লোগানে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল রমনার বিশাল ময়দান। সেই সময়ে মনে হয়েছে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলের এই বিশাল মুক্ত প্রান্তরে চির দুঃখিনী বাংলার হৃদস্পন্দন ধ্বনিত হচ্ছে। মঞ্চে বঙ্গবন্ধু নয়, বাংলাদেশের বঞ্চিত, বেদনাহত বিক্ষুব্ধ হৃদয় কথা বলছে। বাগ্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভূয়সী প্রশংসা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিসম্পন্ন বিদেশী সাংবাদিকরা সব সময় করেছেন। বৃটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং সহ শত শত বিদেশী সাংবাদিক সেদিন বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী ভাষণ শোনার জন্য রমনার রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। আমার প্রামাণ্যচিত্র ক্রাই ফর জাস্টিস-এ এক সাক্ষাৎকারে সাইমন বলেছেন, তিনি তখন বাংলা কিছুই বুঝতেন না। ভিয়েতনাম থেকে ঢাকা এসেছেন, কারণ বিশ্বের সকল গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম জেনে গিয়েছে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটি শব্দ বুঝতে না পারলেও তাঁর যাদুকরী বাচনভঙ্গী এবং উপস্থিত দর্শকদের উপর তার সম্মোহনী প্রভাব লক্ষ্য করে সাইমন বার বার রোমাঞ্চিত হচ্ছিলেন। একই কথা পরে ইস্তাম্বুলে আমাকে বলেছেন তুরস্কের মানবাধিকার নেত্রী ভাসফিয়ে জামান। প্রবীণ বাঙালি কূটনীতিক আরশাদুজ্জামানের সহধর্মিণী মাদাম ভাসফিয়ে মঞ্চের ঠিক সামনে বসে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনেছেন। একটা ভাষণ কীভাবে গোটা দেশের মানুষকে জীবনবাজি রেখে মুক্তিসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে পারে সেই ভাষণ সমাবেশে উপস্থিত থেকে শোনার সৌভাগ্য তার হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে কামাল আতাতুর্কের ভক্ত মাদাম ভাসফিয়ে এই ভাষণ শোনার পর থেকে বঙ্গবন্ধুর ভক্ত হয়ে গিয়েছেন। আমার প্রামাণ্যচিত্রে তিনি বলেছেন, তুরস্কের জাতির পিতা মোস্তফা কামালের চেয়ে বঙ্গবন্ধুকে তিনি বড় নেতা মনে করেন। কারণ কামাল আতাতুর্ক আধুনিক তুরস্কের জনক, রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্ক আগে থেকেই ছিল। কামাল আতাতুর্ক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে ইতিহাসের পাশাপাশি ভূগোলও সৃষ্টি করেছেন। এ হচ্ছে তুরস্কের এক মানবাধিকার নেত্রীর বক্তব্য, যে তুরস্ক মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে আবছা দেখা যাচ্ছিল। ছবিতেও দেখা যাবে দূর থেকে ধারণ করা দৃশ্যে গোটা মাঠ ধুলি ধুসরিত ছিল। কাছে থেকে ক্লোজ আপে যখন বঙ্গবন্ধুর মুখের অভিব্যক্তি, দীর্ঘ অবয়ব, উত্তোলিত হাত ধারণা করা হয়েছে- সেখানে শরীরের ভাষায়ও দেখা যাবে বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য তাঁর নিদারুণ মর্মবেদনা, পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রকারী ও নির্যাতনকারী শাসকচক্রের প্রতি তাঁর বিশাল ক্রোধ এবং আসন্ন মহাসংগ্রামের প্রস্তুতি ও দিক নির্দেশনা প্রকাশ ও প্রদানের সময় কী গভীর আবেগ তিনি ধারণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুধু নয়, স্বাধীনতার পাশাপাশি জাতির সার্বিক মুক্তির বিষয়টি শেষের বাক্যে যেভাবে মূর্ত হয়েছে সেটি সমগ্র ভাষণেরই নির্যাস- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জনগণের সার্বিক মুক্তির প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ও সার্বিক মুক্তির বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল বলেই ৭১-এর যুদ্ধকে আমরা নিছক স্বাধীনতার যুদ্ধ না বলে মুক্তিযুদ্ধ বলি। বাংলার সংক্ষুব্ধ মানুষের হৃদয়ে ধারণ করা প্রতিটি প্রত্যয় ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শন করেছিলেন সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা না করে, যা করেছিলেন ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অপারেশন সার্চলাইট-এর নামে নৃশংসতম গণহত্যা আরম্ভের অব্যবহিত পরে, ইংরেজি দিনপঞ্জী অনুযায়ী তখন ২৬ মার্চ আরম্ভ হয়েছে। সে সময়ে আমাদের বয়সী তরুণদের ভেতর অনেকেরই ক্ষোভ ছিল, হতাশাও ছিল- বঙ্গবন্ধু কেন সরাসরি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বা নিউক্লিয়াসের কোনো কোনো নেতাও চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু যেন ৭ মার্চেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর ওপর এ ধরনের চাপের কথা বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। ইতিহাস প্রমাণ করেছে- ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু কী গভীর দুরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি যদি সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন পাকিস্তান এটাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রতীয়মান করতে পারত এবং যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ৭১-এ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে সমর্থন ও সহানুভূতি অর্জন করেছিল তা দুরূহ হতো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শেষে আগত মানুষদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আন্তবাহিনী জন সংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালেক তার উইটনেস টু সারেণ্ডার গ্রন্থে লিখেছেন: বক্তৃতার শেষ দিকে তিনি জনতাকে শান্ত এবং অহিংস থাকার উপদেশ দিলেন। যে জনতা সাগরের ঢেউয়ের মতো প্রচণ্ড আবেগ নিয়ে রেসকোর্সে ভেঙে পড়েছিল- ভাটার টান ধরা জোয়ারের মতো তারা ঘরে ফিরে চলল। তাদেরকে ধর্মীয় কোনো জনসমাবেশ তথা মসজিদ কিংবা গির্জা থেকে ফিরে আসা জনতার ঢলের মতোই দেখাচ্ছিল এবং ফিরে আসছে তারা সন্তুষ্টচিত্তে ঐশীবাণী বুকে ধরে। ভাষণ শোনার পরই রেসকোর্স ময়দান থেকে আমি আর হারুণ সেগুন বাগিচায় কাজী আনোয়ার হোসেনের রহস্য পত্রিকার অফিসে গিয়েছিলাম। আগে থেকেই সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী, শিল্পী হাশেম খান, লেখক শেখ আবদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন- তুমুল আলোচনা চলছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে। কাজী আনোয়ার হোসেন পত্রিকাটির প্রকাশক সম্পাদক হলেও সম্পাদনার যাবতীয় কাজ আমাকেই করতে হতো। মার্চ সংখ্যা বেরোবার কথা ১০ তারিখে। রহস্য পত্রিকায় সেবার নির্ধারিত প্রচ্ছদ কাহিনী ছিল শিল্পে রহস্যময়তা পরাবাস্তববাদ। লিখেছিলেন শিল্পী, সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরী। প্রচ্ছদের ছবি নির্বাচন করা হয়েছে ফরাসী শিল্পী সালভাদর দালির একটি পরাবাস্তববাদী পেইন্টিং। আমি বললাম, পত্রিকার প্রচ্ছদ কাহিনী পরিবর্তন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আজকের ভাষণের ওপর প্রচ্ছদ হবে। আনোয়ার ভাই বললেন, তা কি করে সম্ভব? প্রচ্ছদ ছাপা হয়ে গিয়েছে। ওটা বাতিল করতে হলে অনেক টাকা গচ্চা দিতে হবে। তাছাড়া এত অল্প সময়ে নতুন প্রচ্ছদ ছাপা সম্ভবও নয়। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। শিল্পী হাশেম খান রহস্য পত্রিকার প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করতেন। তিনি আমাদের দুজনকে নিরস্ত করে বঙ্গবন্ধুর মতো আপাতদৃষ্টিতে মধ্যপন্থা গ্রহণ করলেন। বললেন, প্রচ্ছদ আগেরটা থাক। আমি বঙ্গবন্ধুর একটা স্কেচ করে এবারের সংগ্রাম.... লিখে দেব। ওটা আলাদা ছাপা হয়ে প্রচ্ছদের ঠিক পরের পাতায় পেস্ট করে দেব, যাতে প্রচ্ছদ উল্টালেই ওটা চোখে পড়ে। শাহরিয়ার ওটার ওপর সম্পাদকীয় লিখতে পারে। সেবার রহস্য পত্রিকার মতো রাজনীতিবর্জিত পত্রিকাও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে এভাবে ধারণ করেছিল। এরপর আমাদের সাপ্তাহিক রানার-এ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের প্রতিকৃতি কীভাবে স্থান করে নিয়েছিল সে এক দীর্ঘ কাহিনী। এই ভাষণটির মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি থেকে সকল দলের নেতা এবং কার্যত বাংলাদেশের অঘোষিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সারা দেশে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন। লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর