অভিশপ্তদের দিন শেষ, বাতিঘরের আলোয় আলোকিত দেশ
১৬অক্টোবর,বুধবার,মুক্ত কলম,নিউজ একাত্তর ডট কম: আজকাল টেলিভিশন টকশোয় খুব কম যাওয়া হয়। অনেকদিন থেকে না যাওয়ার অভ্যাসটি রপ্ত করেছি। কারণ গেলেই কথা বলতে হয়। কথা বললেই বাড়ে কথা। তবু মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদে কারও কারও ডাক উপেক্ষা করা যায় না বলে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রখ্যাত সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরীর মধ্যরাতের টকশোয় ডাক পড়লে নিয়মিত যাই। এমনিভাবে অনিয়মিতভাবে যাওয়া একটি বেসরকারি টেলিভিশনের আমন্ত্রণে তাদের টকশো রাজকাহনে গিয়েছিলাম। গিয়ে তাদের অতিথি বাছাই দেখে আমি বিস্মিত হই। বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিসহ তিনজন সাবেক সভাপতিকে আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি গোলাম সারওয়ার মিলন ছাড়াও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শামসুজ্জামান দুদু এবং আরেক সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল ছিলেন আমন্ত্রিত অতিথি। মাঝখানে তাদের সঙ্গে কাবাবে হাড্ডির মতো আমাকে কেন ডাকা হলো? এ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তাদের বললাম, এখানে আওয়ামী লীগের অসীম কুমার উকিল, আহমদ হোসেন বা বি এম মোজাম্মেল হোসেনকে আনা হলে মানানসই হতো। শেষ পর্যন্ত টকশোর সূচনা ঘটল ছাত্রদলের সম্মেলন স্থগিত নিয়ে এবং সেটি থেকে আলোচনা জাতীয় রাজনীতির অতীত ও বর্তমান ঘিরে কিছুটা উত্তপ্তও হয়ে উঠল। এর মধ্যে শামসুজ্জামান দুদু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হিটলারের মতো স্বৈরশাসক হিসেবে সমালোচনা করে বলে বসলেন,তার পরিণতি হবে শেখ মুজিবের মতো। পরে এ বক্তব্য বাইরে তুমুল বিতর্কের ঝড় তুললে শামসুজ্জামান দুদু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলেন। কিন্তু ওই টকশোয় আমি শেখ হাসিনার ৩৯ বছরের সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন ঘেরা বর্ণাঢ্য জীবনের কথা উল্লেখ করে বললাম, তিনি গণতন্ত্রের নেত্রী। আর এই জনপদে হিটলারের মতো নিষ্ঠুর খুনি কোনো সেনাশাসক যদি এসে থাকেন তার নাম জিয়াউর রহমান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ মানবসভ্যতার ইতিহাসে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে অবৈধ শাসনযাত্রার পালাবদলে বন্দুকের জোরে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। তার হাতে তথাকথিত সেনাবিদ্রোহের অভিযোগে অসংখ্য সেনাসদস্যই সামরিক আদালতের গোপন বিচারে রাতের আঁধারে ফাঁসিতেই ঝোলেননি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরউত্তম খালেদ মোশাররফের খুনি মোশতাক চক্রকে উৎখাত করা অভ্যুত্থানে গৃহবন্দী জিয়াউর রহমানকে সিপাহি জনতার বিপ্লবের নামে পাল্টা ক্যু ঘটানোর নায়ক ও তার ত্রাণকর্তা হিসেবে মুক্ত করা, বীরউত্তম কর্নেল তাহেরকেও সামরিক আদালতের বিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন।সেনাশাসক জিয়াউর রহমান একদিকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে বছরের পর বছর কারা নির্যাতন, দমন-পীড়ন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের নিপীড়ন ও দল ভাঙার রাজনীতির কূটকৌশল গ্রহণ করেছিলেন; অন্যদিকে বন্দুকের জোরে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় করে তিনি নিজে একদিকে সেনাপ্রধান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো নির্মম রসিকতার অসাংবিধানিক শাসনের ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন মহল বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনলেও আত্মস্বীকৃত খুনিদের ভাষ্যমতে, তাকে অবহিত করা হয়েছিল। বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা বা সেক্টর কমান্ডার হয়েও এমনকি অনেকের সঙ্গে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে আলোচিত হয়েও ক্ষমতায় এসে তার সামরিক শাসন জমানায় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনিক শক্তির সঙ্গে অর্থ ও পেশিশক্তির জোরে বিএনপি নামের যে দলটির জন্ম দিয়েছিলেন, সেখানে একাত্তরের পরাজিত হানাদার বাহিনীর দোসর দক্ষিণপন্থি মুসলিম লীগের রাজাকার, মুজিববিদ্বেষী আওয়ামী ও ভারতবিরোধী কট্টর চীনাপন্থি বামদের মহামিলন ঘটিয়েছিলেন। ঠাঁই দিয়েছিলেন সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী ক্ষমতার উচ্চাভিলাষী কিছু পেশাজীবীকে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দুয়ার খুলে জামায়াতকেও রাজনীতিতে সংসদে পুনর্বাসিত করেছিলেন ধূর্ত খুনি শাসক জিয়া। খুনি মোশতাকের অধ্যাদেশকে তার প্রহসনের ৭৯ সালের সংসদে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইনসহ তার সব অবৈধ কর্মকা- পাস করিয়েছিলেন। যেখানে একজন সাধারণ মানুষ হত্যাকান্ডের ন্যায়বিচার লাভ করে সেখানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ নৃশংসভাবে হত্যা করে তার বিচার করা যাবে না বলে সংবিধান ও সভ্যতাবিরোধী একটি কালো আইন পাস করালেন। এবং সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদের রক্তে লেখা ধর্মনিরপেক্ষতাসহ কিছু মূলনীতিই মুছে দেননি, সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তানের পথে রাষ্ট্রকে ঠেলে দিলেন। দিল্লিতে নির্বাসিত মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা যখন ৮১ সালের ইডেন কাউন্সিলে দলের নেতৃত্বের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নির্বাচিত হন, সেই রজনীতে বঙ্গভবনে বসে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান রাত জেগে ছিলেন। আওয়ামী লীগের ভাঙন আশা করেছিলেন। ভোরবেলায় যখন শুনলেন, নেতা-কর্মীদের আবেগ-উচ্ছ্বাস আর মহানন্দের তুমুল করতালিতে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন তিনি তার সামরিক সচিব সিলেটের জেনারেল সাদেক আহমেদ চৌধুরীর কাছে দেশটা বুঝি ইন্ডিয়া হয়ে গেল আফসোস করে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে ঘুমাতে ছুটলেন। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসুন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান সেটি চাননি। শেখ হাসিনা ফিরে এলেই প্রকৃতি ও মানুষ তার সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল। তার বুকভরা ছিল স্বজন হারানোর বেদনা ও ক্রন্দন। বাঙালি জাতির ইতিহাসের ঠিকানা শেখ হাসিনার স্মৃতিময় ৩২ নম্বর বাড়িতে সেনাশাসক জিয়া তাকে প্রবেশ করতে দেননি। বাইরেই তাকে মিলাদ পড়াতে হয়েছে। সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পর বিচারপতি অথর্ব সাত্তার সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, নৈরাজ্য বিশৃঙ্খলা ও চরম কোন্দলের মুখে বিনা রক্তপাতে সেনাশাসক এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করে দল গঠন করতে গেলে জিয়াউর রহমানের সুবিধাবাদী দলছুট প্রায় সব নেতা তার সঙ্গে যোগ দেন। দলের হাল ধরে সে সময় রাজপথে নামেন অকাল-বৈধব্য নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে যে ছাত্রদল হিজবুল বাহার চড়েও অস্ত্রবাজিতে ছাত্র রাজনীতিতে জায়গা পায়নি, সেনাশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়াকে সামনে রেখে সেই ছাত্রদল হয়ে ওঠে সাহসী তারুণ্যের শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনে। সব দলের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ নয় বছর পর এরশাদের পতন ঘটলে সব মহলের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জামায়াতের সমর্থনে ৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকার গঠন করে চমক সৃষ্টি করে। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রার সূচনা ঘটে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কর্মকা- ও আন্দোলন-সংগ্রামের ভিতর দিয়ে উর্মীমুখর রাজনীতিতে নির্বাচনে সরকার বদলের সুযোগ ঘটে। ৯৬ সালে নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির পরাজয় ঘটে। দীর্ঘ ২১ বছর পর সেই নির্বাচনে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আটক করে ১৫ আগস্টের হত্যাকাে র বিচারকাজ শুরু হয়। সেই বিচারে খুনিদের ফাঁসির রায় হয়। সেসব ইতিহাস সবার জানা। দার্শনিক বার্নাড শ বলেছেন, ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আমাদের রাজনীতিতে তার এ বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে। খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামল ও শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামল সংসদীয় গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও সুশাসন প্রশ্নে উত্তম বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। সেই দিনগুলোয় আমাদের সংসদ ও রাজনীতির মাঠে-ময়দানের পরিশ্রমী সাংবাদিকতাও ছিল সৃষ্টিশীলতার, শেখার এবং আনন্দের। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসে প্রতিহিংসার বিষের আগুনে চারদিক পুড়িয়ে দিতে থাকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আটকে দেয়, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা একের পর এক হত্যাকান্ডের শিকার হন। সংখ্যালঘু ভোটার নারীরা হতে থাকেন ধর্ষিতা। এলাকার পর এলাকা প্রশাসনের প্রহরায় বিএনপির সন্ত্রাসীদের হামলায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা হয় ঘরছাড়া, না হয় আহত পঙ্গু হয়ে হাসপাতালে আশ্রয় নেন। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে শহীদের রক্তেভেজা পতাকাই ওড়েনি, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর হাত এতটাই প্রসারিত হয় যে, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ভয়ঙ্কররূপে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ১০ ট্রাক অস্ত্র এসে ধরা পড়ে। সন্ত্রাসবাদের অভয়ারণ্য হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। একের পর এক ভয়াবহ রাজনৈতিক হত্যাকা- ঘটতে থাকে দিনদুপুরে। বাংলা ভাইদের হাতে বাঘমারা স্বাধীন করে দেওয়া হয়। দলীয় প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্লজ্জ বেহায়াপনার বীভৎস চিত্র দেখে বাংলাদেশ। দেশের ৬৩ জেলার ৫০০ জায়গায় একই সময়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। আদালতপাড়ায় রক্ত ঝরে। একুশের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মধ্য দিয়ে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সন্ত্রাসবিরোধী শান্তিমিছিলের বক্তৃতার মঞ্চ থেকে উড়িয়ে দিতে চালানো হয় বর্বর গ্রেনেড হামলা। আলামত গায়েব, তদন্তের নামে প্রহসন, বিচারের নামে নাটক চলতে থাকে। ক্ষমতার দম্ভে উন্নাসিক বিএনপি-জামায়াত পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার দলীয় নির্বাচন কমিশনসহ, ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন স্তরের প্রশাসন ঢেলে সাজায়। সেই সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরেও রক্তক্ষরণ ঘটানো হয়, হাওয়া ভবন ঘিরে প্যারালাল সরকার গড়ে ওঠে বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে ঘিরে। একতরফা নির্বাচন বানচাল হয়ে যায় সেনাসমর্থিত ওয়ান-ইলেভেনের কারণে। সেই দুই বছরের শাসনামল কারও জন্য সুখকর হয়নি। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ও হাওয়া ভবনের অভিশপ্ত শাসনামলের চড়া মাশুল এখনো বিএনপিকে গুনতে হচ্ছে। ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটকে নিয়ে বিশাল গণরায়ে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ফাঁসিতে ঝুলতে হয় একের পর এক জামায়াত নেতাকে। তারেক রহমান লন্ডনে তার চাটুকারদের নিয়ে ভোগের জীবনে নির্বাসিত থাকলেও এখানে হাজার হাজার নেতা-কর্মী সরকারের অগ্নিরোষে পতিত হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে থাকা নেতা-কর্মীরা নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে রাজনীতি করার বা দলীয় রণকৌশল নির্ধারণের ক্ষমতা ভোগ করতে পারেন না। দল ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে একের পর এক সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন করলেও তারেক রহমানের নির্দেশের কারণে জামায়াতের সঙ্গে সহিংস আন্দোলনে ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধ আন্দোলনে শক্তিক্ষয় ও মামলার জালেই আটকা পড়েনি, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের ওয়াক ওভার দিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে একটি দুর্নীতি মামলায় বিএনপির রাজনীতির জনপ্রিয়তার উৎস ও গণতন্ত্রের নেত্রী হিসেবে জনপ্রিয় বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে পারেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক থাকলেও বিএনপি সেটি নিয়ে আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া দূরে থাক কোনো রাজনৈতিক ফায়দাই তুলতে পারেনি। মাঝখানে মির্জা ফখরুলের মতো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদকে বাদ দিয়ে হাতে গোনা দলের যে কজন জয়ী হয়েছেন, তাদের সংসদে পাঠায়। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ শরীরে পৌনে দুই বছরের মতো জেলে রয়েছেন। দলের নেতা-কর্মীরা বিভ্রান্ত নেতৃত্বের হঠকারী সিদ্ধান্তে বার বার আন্দোলন-সংগ্রামে মামলার জালেই আটকা পড়েনি, রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে গেছে। যে এহছানুল হক মিলন বিএনপির জন্য আদালতে হাজিরা দিতে দিতে জীবন শেষ হয়ে যায়, নির্বাচনে তারেক রহমানের নির্দেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকলেও তার ভাগ্যে মনোনয়ন জোটে না। মোরশেদ খানের মতো ভদ্রলোক বিএনপি করার অপরাধে নানামুখী চাপে নিঃশেষ হয়ে গেলেও তিনি মনোনয়ন পান না। একুশের গ্রেনেড হামলায় তারেক রহমান যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত আসামি। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে হাওয়া ভবন ঘিরে যারা ওঠাবসা করতেন এখন লন্ডন, নিউইয়র্ক ও মালয়েশিয়ায় তারা নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছেন। ইতিহাসের প্রাপ্য প্রতিহিংসার ফল বিএনপি ভোগ করছে এ কথা আমি বলে আসছি বার বার, তেমনি বলে আসছি নব্বইয়ের পর এ দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তার কফিনে পেরেক ঠুকে দিয়েছে একুশের গ্রেনেড হামলা। তাই বলে আওয়ামী লীগের ১০ বছরের শাসনামলে সংঘটিত সব দুর্নীতি, অর্থনৈতিক খাতের লুটপাট, ব্যাংক ও শেয়ার কেলেঙ্কারি, গুম-খুন এমনকি মির্জা ফখরুলদের মতো নেতাদের নামে হয়রানি মামলা, নেতা-কর্মীদের দমন-পীড়নের প্রতিবাদ তো কম করিনি। তবু কেন এত আক্রোশ? এমনকি প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে যেসব সিনিয়র সাংবাদিক প্রশ্ন না করে চাটুকারিতায় তেলের নহর বইয়ে দিতেন তাদের সমালোচনাও করেছি। শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি আমরা শক্তিশালী বিরোধী দল চাই। বিএনপিকে শেষ করে দিয়ে মৌলবাদ উত্থান ঘটার আশঙ্কা থেকে যায় কিনা এ প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসি। সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় সেদিনের টকশোয় আরও বলেছিলাম, তারেক রহমান এখনো বিএনপির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু বিএনপির রাজনৈতিক সম্পদ হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। তারেক রহমান অভিশপ্ত বোঝামাত্র। লন্ডনে তারেক রহমানের বক্তৃতা আষাঢ়ে গল্পের মতোই বোঝায় না, একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা যে ভাষায় কথা বলতে সাহস পায় না, তাদের দোসররা যে ভাষায় কথা বলতে সাহস পায় না, তিনি সে ভাষায় কথা বলেন। দাম্ভিক উন্মাদের প্রলাপ মনে হয়। যার আত্মোপলব্ধি নেই। অনুশোচনা, গ্লানি নেই। বাংলাদেশের আত্মা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের সমালোচনা করুন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সমালোচনা করুন। কিন্তু জাতির পিতাকে নিয়ে কটাক্ষ করা সব শক্তিকে এক মোহনায় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মিলিত করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতি কটাক্ষ কোনো দেশপ্রেমিক মানুষ বরদাশত করতে পারে না। আমি আরও বলেছিলাম, যেখানে লাখ লাখ, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং খাতে লুট হয়েছে, হাজার হাজার কোটি টাকা শেয়ারবাজারের জুয়াড়িরা লুট করে নিয়ে গেছে, সেখানে ২ কোটি টাকার জন্য কারাবন্দী খালেদা জিয়াকে জামিনে হলেও মুক্ত করে রাজনীতির পরিপক্ব কৌশল বিএনপির নির্ধারণ করা উচিত। যেখানে তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ থাকবে না। তারেক রহমান ও তার লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিদেশে থাকা অভিশপ্ত সিন্ডিকেট যত দিন বিএনপিতে খবরদারি করবে তত দিন এ দলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই রাহুমুক্ত হয়ে বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের জায়গায় দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ হয়ে রাজনীতি শুরু করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়। কয়েকদিন আগে জাতিসংঘে দেওয়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভাষণ নিয়ে এ দেশে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এত বাহ্বা দিচ্ছেন যে মনে হচ্ছে, কোনো বিশ্বসেরা রাজনীতিবিদ বিশ্বজয়ী বক্তৃতা করেছেন। এ দেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসরদের যখন বিচার হয়, পাকিস্তানের সংসদে তখন ইমরান খানরা নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় তুলেছেন। একাত্তরে ইমরান খানের চাচা নিয়াজি এবং বেলুচিস্তানের কসাই টিক্কা খান পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে। আমাদের ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা এ স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের আড়াই লাখ মা-বোনের গণধর্ষণের নির্যাতনের আর্তনাদে এ দেশের বাতাস এখনো ভারি। ইমরান খান যদি জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে তার বাবা-চাচা ও ভাইদের যুদ্ধাপরাধের জন্য ক্ষমা চাইতেন আমাদের প্রাপ্য পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করতেন তাহলে না হয় বুঝতাম একপাল পাকিস্তানপ্রেমিক তাকে শাবাশ দিচ্ছেন। আমরা যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি তখন মোনায়েম খানরা পাকিস্তানের দালালি করেছেন। আমরা যখন একাত্তরে যুদ্ধ করেছি তখন আমাদের ভারতের চর বলে, পাকিস্তানের দুশমন বলে গোলাম আযম ও শাহ আজিজরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হয়েছেন। এখনো একদল শিক্ষিত মানুষ বাংলাদেশি হতে পারেনি। চিন্তায় পাকিস্তানি রয়ে গেছে। একাত্তরে ভারত তাদের নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, ট্রেনিং দিয়েছে, বিশ্বজনমত পক্ষে টেনেছে। এমনকি মিত্রবাহিনীর হয়ে যুদ্ধে জীবন দিয়েছে। রক্তে লেখা একাত্তরের বন্ধু ভারত ও তার ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শিক রাষ্ট্রের বর্ণ অনেকটা এখন ধূসর করে ফেলেছে। তিস্তার পানি নিয়ে হোক, সীমান্ত হত্যা নিয়ে হোক, ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক দূতিয়ালি হবে, দেনদরবার হবে, তাদের কর্মকান্ডের নিন্দাও হবে; কিন্তু ভারতবিরোধিতা করতে গিয়ে লাখো শহীদের রক্তে পা দিয়ে, মা-বোনের সম্ভ্রমে পা দিয়ে পাকিস্তানকে বন্ধু বানাতে পারি না। এ কথাগুলো আর একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসর স্বাধীন বাংলাদেশের নিষিদ্ধ বিএনপির মিত্র জামায়াত এ দেশের মানুষের রাজনীতির কল্যাণের শক্তি হতে পারে না। এসব কথা বিভিন্ন টকশোয় বলায় ও বিভিন্ন কলামে লেখায় বিএনপি ও জামায়াতের দেশের বাইরে থাকা সাইবারযোদ্ধারা আর্তনাদ করে উঠেছেন। ভারতের তৃণমূল কংগ্রেসের পেজে দেওয়া বিজেপি নেতা বলে পরিচয় করানো এক মাতালের অশ্লীল নাচের ভিডিও লাল গোলাপের শফিক রেহমানের ডান হাত খ্যাত বিএনপির থিংক ট্যাংকের জি-৯-এর সদস্য বাংলাদেশ বিমান ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ থেকে বরখাস্ত রেজাউর রহমান মানিক তার ফেসবুক পেজে ভাইরাল করলে, তারা লুফে নিয়ে আমার নামে অপপ্রচার চালায়। শেখ হাসিনার চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে গত ১০ বছরে অনুপ্রবেশকারী থেকে দলের ভিতরে থাকা যারা দুর্নীতি করে কাঁচা টাকার দামি গাড়ি, বাড়ি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও দেশ-বিদেশে সম্পদ গড়েছেন তাদের চিহ্নিত করতে গেলে তারাও এটিকে ছড়িয়ে দেন। তাদের লুটের ভাগ না পাওয়া দুর্নীতিবাজ এ কালো শক্তির অন্ধ ভক্তরাও লাফালাফি করে। কিন্তু ওরা জানে না আমার ক্ষমতা নেই। আমার কোনো ক্ষমতাবান নেই। আমার অর্থ নেই, গানম্যান নেই। কিন্তু পেশাদারিত্বের ওপর দাঁড়ানো মানসিক শক্তির প্রাণপ্রাচুর্য এবং শক্তিশালী কলম ও কণ্ঠ রয়েছে। অভিশপ্ত ও দুর্নীতিবাজ দানবের সামনে কলম থামাতে আমি আসিনি। কণ্ঠ স্তব্ধ করতে আসিনি। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি ঘুমিয়ে থাকেন না। সব খবর রাখতে হয়। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হয়। প্রধানমন্ত্রী অনেক খবর রাখলেও সব খবর রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তার সঙ্গে প্রেসবক্সে বসে বিসিবির পরিচালক হিসেবে ক্রিকেট খেলা উপভোগ করে খুনি বজলুল হুদার শ্যালক হানিফ ভূঁঁইয়া। খালেদা জিয়ার মাথায় ছাতা ধরা দেহরক্ষী লোকমান মোহামেডানের ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের অধিপতিই নয়, বিসিবির পরিচালক হয়ে তার বক্সে বসেও খেলা দেখে। বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করে। যুবদল থেকে যুবলীগে আসা বিশাল গানম্যান দল নিয়ে মোটরসাইকেল ও দামি গাড়িতে সাইরেন বাজিয়ে পূর্ত অধিদফতরে সব ঠিকাদারি নেয় জি কে শামীম। ফ্রীডম পার্টির ক্যাডাররা হয়ে যায় যুবলীগ, চাঁদাবাজ ও ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের মালিক। লোকমানকে আটকের সময় হাতকড়া পরানো হয়নি। যেন জামাই আদর দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন না, সুনামগঞ্জের মতো জেলা নেতৃত্বে বাপ আওয়ামী লীগের মরহুম নেতা বলে যে ছেলেটিকে নেতা-কর্মীদের আপত্তির মুখে নেতৃত্বে বসান সেই কালো কুৎসিত দুর্নীতিবাজ দলকেই শেষ করেনি নিজে অঢেল অর্থ বাড়ি, গাড়ি, দামি বিলাসি ফ্ল্যাট ও বিদেশে সম্পদ গড়েছে ১০ বছরে। এমনকি লন্ডনে তারেক রহমানের ডান হাত ও শেখ হাসিনার গাড়িবহর ও হাইকমিশনে হামলাকারী বিএনপি নেতার সঙ্গে কোম্পানি করেছিল জগন্নাথপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পদ লুটপাটের জন্য। এসব বিশ্বাসঘাতক দুর্নীতিবাজদের অন্ধ ভক্তরাও বিএনপি-জামায়াতের সাইবার অপপ্রচারের নোংরা প্রচারণায় আমাদের বিরুদ্ধে শরিক হয়। বিএনপি-জামায়াতের অভিশপ্ত আস্তানায় আওয়ামী লীগের কারা যোগাযোগ রাখে নিয়মিত? এ প্রশ্ন আজ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর! একজন লোকমান, একজন জি কে শামীম আজ ধরা পড়েছে। এমন জি কে শামীম ও লোকমানরা আজ কতজন ক্ষমতার বাণিজ্যের বাজিকর। বিএনপি-জামায়াতের আস্তানায় দেয় টাকা? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদেশ সফরকালে দেশের বড় বড় শিল্পপতিকে দেখা যায় না। যাদের নিয়ে গেলে বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অনেক জানেন কিন্তু সব জানেন না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল, শেখ হাসিনার লড়াইয়ের সতীর্থরা মিথ্যা নোংরা বিএনপি-জামায়াতের সাইবার আক্রমণের শিকার হলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও কেন নীরব থাকে আমি বুঝি না! তবে আমরা আশাবাদী জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও মাদকের মতো দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তিনি বিজয়ী হবেন এবং সুশাসনের সুবাতাস বইয়ে দেবেন দেশের রাজনীতিকে পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া আদর্শিক জায়গায়। সৎ, নির্লোভ নেতা-কর্মীদের হাত ধরে তুলে আনবেন। বাঙালির মহত্তম নেতা বঙ্গবন্ধু ও গৌরবের অর্জন মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারিত্বের একমাত্র বাতিঘর তিনি। শপথ নেওয়ার সময় আজ, অভিশপ্ত কালো শক্তির দিন শেষ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাতিঘর মুজিবকন্যার আলোতেই আলোকিত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ। লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
আগস্টের সব অঘটনের মূলে রয়েছে অভিন্ন ভাবাদর্শগত অদৃশ্য সুতার টান
২১আগস্ট,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম:এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও হত্যাকান্ড নতুন কোনো ঘটনা নয়। আমরা যদি মধ্যযুগের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকাই, তা হলে দেখতে পাবো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ক্ষমতা দখল, হত্যা, লুট, পরদেশ আক্রমণ ও জয় কিংবা পরাজয়- এসব ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসও সুখকর নয়।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত বর্বরোচিত অধ্যায়। আমরা হারিয়েছি বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের মহাকাব্যিক বীর নায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। হারিয়েছি তার দুই কন্যা ব্যতিরেকে পুরো পরিবারকে। যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট খুনিচক্র কেবল ব্যক্তি মুজিবকেই হত্যা করেনি, তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির ওপর আঘাত হানে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে পিছিয়ে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা বেদখল করে এবং সংবিধানের কর্তৃত্ব ধ্বংস করে। দেশব্যাপী হত্যা, সন্ত্রাস, জোর-জবরদস্তি চলে। পরে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের হত্যাকান্ড, বিচার প্রহসনের নামে সশস্ত্র বাহিনীর শত শত মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জোয়ানকে হত্যা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিবেচনায় আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ইত্যাদি এর নজির হয়ে ওঠে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান নীতি।এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনিরাও প্রকাশ্যে পার্টির নামে সংগঠন গড়ে তুলে রাজনীতির অঙ্গ সক্রিয় হতে চেষ্টা করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রধানত সামরিক শাসনের ছায়াতলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্লোগানের আড়ালে চরম দক্ষিণপন্থিসহ প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো সংগঠিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয় শক্ত প্রতিরোধ। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর জোর দিয়ে, এমনকি একপর্যায়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে তারা যেমন নিজেদের প্রভাব দৃঢ়মূল করতে চেয়েছে তেমনি একই ধারায় অন্ধ ভারত বিরোধিতাকে পুঁজি করে নিজেদের রাজনীতি পরিচালনা করতে চেয়েছে সব সময়। বাংলাদেশের রাজনীতি বহুল পরিমাণে উথাল-পাতাল অবস্থার মধ্যদিয়ে কালাতিপাত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ধারায় বাংলাদেশে ফিরে আসাকে অন্যান্য সাম্প্রদায়িক শক্তি মেনে নিতে পারেনি। নানা পোশাকে, নানা নামে একুশ বছর তো তারাই একচেটিয়াভাবে দেশ শাসন করেছে।পাকিস্তানি ভাবধারার অনুসারীরা প্রথম অনুভব করে বাংলাদেশ আবার তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আর এজন্যই যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীসহ সব প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়। দেশি ও বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের ফলে ২০০১ সালের কারচুপির নির্বাচনে এ অপশক্তি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় দেশব্যাপী দমন-পীড়ন, সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার। নানা জায়গায় বোমা ও গ্রেনেড হামলা। বিচারালয়ও এর থেকে রেহাই পায়নি। ক্ষমতার পালাবদলের পর শুরু হয় অভাবিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস তার বীভৎস রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশ পরিণত হয় মৃত্যু উপত্যকায়। ১৯৯৯ সালের মার্চ থেকে ২০০৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই ৬ বছরে জঙ্গিগোষ্ঠী দেশে ১৩টি বোমা ও গ্রেনেড হামলা চালায়। এতে ১০৬ জন নিহত হন। আহত হন ৭ শোর বেশি মানুষ। আওয়ামী লীগ ও সিপিবির সমাবেশে, উদীচী ও ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর এ হামলা হয়। বিচারপতি হত্যা সহ কত নৃশংস ঘটনাই না ঘটে।এর মধ্যে ঘটে মর্মান্তিক ও ভয়াবহ ঘটনা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের হত্যার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে যে এ হামলা চালানো হয় তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কিন্তু গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের নেতাকর্মীরা মানবঢাল রচনা করে গ্রেনেড হামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে যেভাবে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছেন তা ইতিহাসে বিরল। গ্রেনেড হামলায় দলের সিনিয়র নেত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভী রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন শতাধিক। ২০০৪ সালে ওই ন্যক্কারজনক গ্রেনেড হামলার সময় সরকারে ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে বৃষ্টির মতো গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের পুরো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে একবারে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়। প্রধান লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে শেখ হাসিনাকে চার দফা হত্যার চেষ্টা করে হুজি-বি। সর্বশেষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও রক্তক্ষয়ী। উল্লেখ্য, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ বর্বরোচিত ওই মামলার রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং বাকি ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন। মামলার ৫২ আসামির মধ্যে অন্য মামলায় তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় তাদের মামলা থেকে বাদ রাখা হয়। দন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছে। পলাতক আসামীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সম্প্রতি মানববন্ধনও হয়েছে। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশবাসীর অপেক্ষার অবসান ঘটলেও, এখনো মামলার রায় কার্যকর হয়নি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সবচেয়ে শক্তিধর অংশ যে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এতে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সরকার বা রাষ্ট্রের মদদ ছাড়া এবং দেশ বা বিদেশের কোনো না কোনো সামরিক উৎস ছাড়া এত বিপুলসংখ্যক আরজিএস গ্রেনেড অসামরিক জনসমাবেশে নিক্ষিপ্ত হতে পারে না। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইন্ধনে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি) ওই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। আর ওই গ্রেনেড হামলার পর 'জজ মিয়া' নাটক সাজিয়ে ঘটনাটিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দফা তদন্তে বেরিয়ে আসে ঘটনার নেপথ্যের নীলনকশা। ইতিহাসের বর্বরোচিত ওই গ্রেনেড হামলায় নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমান, সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগ কর্মী রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আমিনুল ইসলাম, মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম, মোশতাক আহমেদ সেন্টু, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া। এছাড়াও ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে যে নজির স্থাপন করেছে তাও ভয়াবহ। আগস্টের সব অঘটনের মূলে রয়েছে অভিন্ন ভাবাদর্শগত অদৃশ্য সুতার টান। আগস্ট আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিয়েছে বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু (১৫ আগস্ট, ১৯৭৫) এবং এই আগস্ট মাসেই সাম্প্রদায়িকতার ছুরি দিয়ে দেশ ভাগ করে হিন্দু-মুসলমানের রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে তথাকথিত স্বাধীনতার নামে আমাদের নতুন করে পাকিন্তানের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়েছিল।২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার নতুনভাবে তদন্ত শুরু করে। বেরিয়ে আসে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক বছরের মধ্যে হুজিবির প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি গ্রেপ্তার হন। শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানসহ তিন জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। আশার কথা দীর্ঘদিন এই জঙ্গিগোষ্ঠীর বড় ধরনের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। এটা শেখ হাসিনা সরকারের সফলতা। কারণ জঙ্গি নির্মূলে তার রয়েছে জিরো টলারেন্স নীতি।তবে ২০১৬ সালের পহেলা জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মধ্যদিয়ে নতুন করে ভয়ঙ্কর রূপ দেখা দেয় জঙ্গিরা। সম্প্রতি ঢাকার কয়েকটি পুলিশবক্সের কাছে শক্তিশালী বোমা পেতে রাখা এবং পুলিশের একটি গাড়িতে সময়নিয়ন্ত্রিত বোমা ফাটিয়ে আইএস মতাদর্শী জঙ্গিরা নতুন করে আলোচনায় এলেও সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ রয়েছে। সম্প্রতি হাতিরঝিল এলাকা থেকে নতুন জঙ্গি সংগঠন আল্লাহর দলের ভারপ্রাপ্ত আমির সহ চার জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে। এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়, দেশে জঙ্গি হামলার ঝুঁকি এখনো শেষ হয়ে যায় নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী পাকিস্তানপন্থিদের দখলমুক্ত করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন, কঠোর হস্তে নির্মূল করেন জঙ্গিদের। টানা প্রায় ১১ বছর শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার কারণে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, এগিয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্রের পূর্ণতার পথে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ, তার স্বপ্নকে পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বাংলাদেশকে বলা হয় উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা আশাবাদী। আমাদের এই অর্জনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক,কলামিষ্ট ও সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম।
ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি এই স্বাধীন বাংলাদেশ
১৪ আগস্ট,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম:শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির শোকের দিন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ৪৪ বছর আগে এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল ক্ষমতালোভী নরপিশাচ কুচক্রী মহল। যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যে জাতীয় শোক দিবস ও বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী পালনের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও ১৫ আগস্ট রাতে ধানমণ্ডির বাড়িতে তার সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে তার জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল, এসবির কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান ও সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হককে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনির বাসায় হামলা চালিয়ে তাকে, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে তাকে ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় রেন্টু খানকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার এবং নিকটাত্মীয়সহ ২৬ জনকে ওই রাতে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রাবস্থায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সংগ্রামী নেতা। শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ ৬ দফার প্রণেতাও ছিলেন। সত্তরের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে এ দেশের গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করেন। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়কে পরিণত হন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ ঘোষণায় উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত জাতি পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিনিয়ে আনে দেশের স্বাধীনতা। জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি এই স্বাধীন বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর গোটা বিশ্বে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। হত্যাকারীদের প্রতি ছড়িয়ে পড়েছিল ঘৃণার বিষবাষ্প। পশ্চিম জার্মানির নেতা নোবেল পুরস্কার বিজয়ী উইলি ব্রানডিট বলেছিলেন, বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর স্বাধীনতাবিরোধীরা এ দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পুনর্বাসিত হতে থাকে। তারা এ দেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে নানা উদ্যোগ নেয়। শাসকদের রোষানলে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণও যেন নিষিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ঠেকাতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল মোশতাক সরকার। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করা হয়। বিচার শুরু হয় ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ললাটে যে কলঙ্কতিলক পরিয়ে দেয়া হয়েছিল, ৩৫ বছরেরও বেশি সময় পর ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি সেই কলঙ্ক থেকে জাতির মুক্তি ঘটে। বঙ্গবন্ধু হত্যার চূড়ান্ত বিচারের রায় অনুযায়ী ওই দিন মধ্যরাতের পর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তবে বিভিন্ন দেশে পলাতক থাকায় আরও ছয় খুনির সাজা এখনও কার্যকর করা যায়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে স্বাধীনতার স্থপতিকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনের পথও সুগম হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করা হতে থাকে। দিনটিকে সরকারি ছুটির দিনও ঘোষণা করা হয়। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে এ ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটে। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন বাতিল করে দেয়। পরে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকী পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ফলে জাতীয় শোক দিবস পালনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় শোক দিবস পালন করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। আজ সরকারি ছুটি। সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনগুলোয় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোয়ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া দেশের সব সরকারি হাসপাতালে দিবসটি উপলক্ষে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হবে। চিকিৎসকরা আজ ব্যক্তিগত চেম্বারেও বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেবেন। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সব বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। এ ছাড়া পোস্টার, সচিত্র বাংলাদেশের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ ও বিতরণ এবং বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়োজন করবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলসহ জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, হামদ ও নাত প্রতিযোগিতা এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি : সূর্যোদয়ের সময় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কার্যালয়গুলোতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন (অর্ধনমিত) করা হবে। তোলা হবে কালো পতাকাও। সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে এবং সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টে নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হবে। ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত এবং বাদ জোহর মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। দুপুরে অসচ্ছল, দুস্থ মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ, বাদ আসর মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে দোয়া মাহফিল হবে। কাল বিকাল ৪টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।এ ছাড়া সিপিবি, গণফোরাম, জাসদ, ন্যাপ ও গণতন্ত্রী পার্টি এবং আওয়ামী লীগের সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক,কলামিষ্ট ও সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম।
দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ
১৬জুলাই২০১৯,মঙ্গলবার,নিউজ একাত্তর ডট কম:আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বিধি রাখা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে গ্রেপ্তার করতে হবে। ফলে দুদক-এর কাজে এসেছে চ্যালেঞ্জ।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে, তিনি সহজ-সরল ভাষায় বলেছেন, দুর্নীতি করব না, করতেও দেব না। ১২ জুন (২০১৯) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি দুর্নীতির প্রতি তার সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, দুর্নীতি ও অপরাধ যে করবে এবং যে প্রশ্রয় দেবে- তারা সবাই অপরাধী। ঘুষ নেয়া যেমন অপরাধ, দেয়াটাও সমান অপরাধ। অপরাধী যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অপরাধ করে ছাড় পাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, কেবল আইন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে দুর্নীতি ও অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়; এ জন্য সামাজিক সচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে। টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের কল্যাণ এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে। এ জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতির পরিধি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দুদক এখন শক্তিশালী একটি সংস্থা। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিনিয়ত তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করছে। এতে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির প্রবণতা কমে এসেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দুর্নীতির মাত্রাও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ঘোষিত সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারের ২১টি বিশেষ অঙ্গীকারের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছিল। ইশতেহার ঘোষণাকালে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আমি নিজে এবং দলের পক্ষ থেকে আমাদের যদি কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকে, সেগুলো ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখার জন্য দেশবাসী আপনাদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি কথা দিচ্ছি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আরো সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার অনুসারে টেকসই বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য দরকার স্বচ্ছ প্রশাসন। আর সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও সমৃদ্ধির সব সুযোগ এবং সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে তখনই যখন জবাবদিহিতামূলক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এ জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের প্রয়োগ মুখ্য হলেও তা শুধু সরকারের দায় নয়, জনগণেরও দায় রয়েছে। আমরা মনে করি, দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ ও তদারকি ভবিষ্যতে আরো জোরদার করা হবে।শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের সদিচ্ছার প্রমাণ রয়েছে ৫ জানুয়ারি (২০১৪) জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারেও। আমাদের এবারের অগ্রাধিকার : সুশাসন, গণতন্ত্রায়ন শীর্ষক উপবিভাগের ১.৮ অনুচ্ছেদে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্পর্কে বলা হয়েছিল, দুর্নীতি প্রতিরোধে, আইনি, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরও বাড়ানো হবে। ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিজেদের সম্পদ, আয়-রোজগার সম্পর্কে সর্বস্তরের নাগরিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিগত মহাজোট সরকারের নেতৃত্ব দেয়ার সময় লক্ষ্য করেছেন জনগণের প্রত্যাশা আসলে কী? জনগণ শেখ হাসিনার পাশে দুর্নীতিবাজদের দেখতে পছন্দ করে না। একারণে তার মন্ত্রী পরিষদে পূর্বের অনেকেই ঠাঁই পাননি। উপরন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিগত সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তদন্ত শুরু করলে সরকারপ্রধান হস্তক্ষেপ না করে নীরবে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন। একথা ঠিক যে সরকার প্রধান নির্লোভ হলেও তার নির্ভরযোগ্য বা আশপাশের অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতিতে মেতে উঠতে পারেন; জনগণের প্রত্যাশা ধূলিস্যাৎ করে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেন। অথচ সরকার অতীতের ভুলত্রুটি শুধরে, জনগণের সেবা নিশ্চিত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে আগামী পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এই প্রত্যাশা ফলপ্রসূ করতে হলে জনগণ যে আশা-ভরসা নিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, সেটা রক্ষা করতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায়কে ভবিষ্যতে সরকার প্রশ্রয় দিলে তা হবে আত্মঘাতী। এ জন্য কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার প্রশংসার দাবিদার।মনে রাখা দরকার বিএনপি-জামায়াত আমলে আমরা দুর্নীতিবিরোধী বয়ান শুনে শুনে আতঙ্কিত হয়েছি। এমনকি দুর্নীতি নিয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে অনেক মুখরোচক কথা চালু রয়েছে। কথাবার্তায় আমরা প্রায় সবাই দুর্নীতিবিরোধী হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা দরকার সেই প্রচেষ্টা গ্রহণ করি না। এমনকি দুর্নীতির নীতিগত উৎসাহদাতা অনেক আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রায়শ বলে থাকে দুর্নীতির কারণে এ দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের অবশ্যই দুর্নীতির স্রষ্টাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ প্রতিনিয়ত মুক্তবাজার, বেসরকারিকরণ, বাজার উন্মুক্তকরণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সরকারি সেবাগুলোর ওপর ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাপ প্রয়োগ করছে। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে অকার্যকর করার জন্য এবং দেশের রাজনীতিকে কলঙ্কিত করতে রাজনীতিবিদদের ক্রয়-বিক্রয়ে মেতে উঠছে অনেকেই- এ সম্পর্কেও রাজনৈতিক দলকে সতর্ক থাকতে হবে। অনেক গবেষকই বলে থাকেন মুক্তবাজারের প্রতিযোগিতাকে অবাধ করার অর্থই হলো দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা। মুক্তবাজার নিজেই দুর্নীতির স্রষ্টা, এটাকে বজায় রেখে যারা ব্যক্তি দুর্নীতিবাজ ধরার প্রচেষ্টা চালায়, তারা অনেকটা জল ঘোলা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের পথ খুঁজে ফেরেন। তারা চায় অর্থনৈতিক সক্ষমতায় দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোতে নামমাত্র পুতুল সরকার বজায় রেখে বিশ্বব্যাপী ধনী রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে। ১/১১-এর সময় দেশ থেকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হঠানোর যে হঠকারি আয়োজন হয়েছিল, সে ঘটনাও মনে রাখা দরকার। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে এমনভাবে যেন তারা মনে না করে টাকা থাকলেই সমাজ সম্মান করবে। কারণ লেখাপড়ার উদ্দেশ্য যদি ভালো চাকরি পাওয়া হয় তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি কখনো উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। দলের ইশতেহারে বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে কর্মপরিবেশ ও দক্ষতার দিক থেকে যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন করা হবে। কিন্তু আমরা জানি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বিধি রাখা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে গ্রেপ্তার করতে হবে। ফলে দুদক-এর কাজে এসেছে চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদন্ত, অনুসন্ধান, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী, আমলাসহ যে কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসমুখগুলো বন্ধ করার লক্ষ্যে অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী প্রকোপ কমেছে। মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য অনিয়ম ও দুর্নীতি করলে প্রধানমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন- এ প্রত্যাশা সব প্রতিষ্ঠানের। অতীতের অনিশ্চয়তা, সংকটের চক্রাবর্ত এবং অনুন্নয়নের ধারা থেকে বের করে এনে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের গতিপথে পুনঃস্থাপিত করতে হলে তো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতেই হবে। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি প্রতিরোধে ও রাষ্ট্রপরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানই অনন্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রামের চালিকাশক্তি ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন। কিন্তু রাষ্ট্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে সেই স্বপ্ন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং মুখ থুবড়ে পড়েছে। জাতির পিতার শাহাদাত, সামরিক শাসন এবং স্বৈরাচারী, গণবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ক্ষমতা দখল জনগণের সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নকে বারবার দূরে সরিয়ে দিয়েছে। জনগণের জীবনে এ ধরনের শাসনের কুফল প্রতিফলিত হয়েছিল অনুন্নয়নে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবদমনে, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনায়, দুর্নীতিতে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শুদ্ধাচারের অভাবে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। এই যুদ্ধকে শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তার শাসনামলে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না- চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কি না সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সবাইকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে। শেখ হাসিনাও তার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সব কাজে আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রনিষ্ঠার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না। স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বহুবিধ আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আরো কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা-২০১০-২০২১ শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই আন্দোলনে সবাইকে অংশীদার হতে উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম যেসব আইন গত মহাজোট সরকারের সময় প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: 'সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯', 'তথ্য অধিকার আইন-২০০৯', 'ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন- ২০০৯', 'সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯', 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯', 'চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইন,-২০১০', 'জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন-২০১১', 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২', 'মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২', 'প্রতিযোগিতা আইন-২০১২' ইত্যাদি। এসব আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতিমুক্ত রাখার প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে। 'মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২'-এর আওতাধীন অপরাধও দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু দুর্নীতিকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এ জন্য সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ ও নাগরিকগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। দুর্নীতি নির্মূলের জন্য 'ফৌজদারি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রতিকার ছাড়াও দুর্নীতির ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এই কনভেনশনে। আগামী এক দশকে এ দেশে ক্ষুধা, বেকারত্ব, অশিক্ষা, বঞ্চনা ও দারিদ্র্য থাকবে না। দেশে বিরাজ করবে সুখ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি। সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা হবে, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। এই লক্ষ্য পূরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য এবং সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য পরাকৌশল। ১২ জুন সংসদে বলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বর্ণিত বক্তব্য। সেখানে বলা হয়েছে, কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে একটি আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে নাগরিকরা চরিত্রনিষ্ঠ হয়, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানসমূহে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা পায়। দুর্নীতি প্রতিরোধে মানুষকে নৈতিক জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক,কলামিষ্ট ও সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম।
এ কোন সমাজে আমরা বসবাস করছি?
৩জুলাই২০১৯,বুধবার,নিউজ একাত্তর ডট কম:সমাজ পরিবর্তন মানে সামাজিক কাঠামো ও সমাজের মানুষের কার্যাবলি ও আচরণের পরিবর্তন। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন। মনে রাখতে হবে বিশৃঙ্খল অপরাধপ্রবণ অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে বসবাস করে উন্নত রুচি ও সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া যায় না। এমন সমাজে পুড়িয়ে ও প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা বন্ধ করা সহজ কাজ নয়। আমরা চাই, পরিকল্পিত ও বিন্যস্ত সমাজ। নীতিবোধ ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সমাজ গঠনের প্রধান শক্তি, যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরাজীব, আশরাফুল মাখলুকাত। বর্তমান সমাজের মানুষ মানবিকতা হারিয়ে যেভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে তাদের কী অভিধায় চিহ্নিত করা যেতে পারে। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করতে পারে ভাবতেও অবাক লাগে। এ কোন সমাজে আমরা বসবাস করছি? এমন অপরাধপ্রবণ, অসহিষ্ণু ও অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজ কি আমরা চেয়েছিলাম। নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হলো। বিশ্বজিৎ, রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারা হলো। এ ছাড়াও আবু শাহিন নামের এক ভ্যানচালককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে তার ভ্যান ছিনতাই করে নিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। দেশে প্রকাশ্যে এরকম লোমহর্ষক নৃশংস ঘটনা যদি একের পর এক ঘটতেই থাকে তা হলে সমাজের অস্তিত্বই বিপন্ন হতে বাধ্য।নয়ন বন্ডরা জন্ম থেকে অপরাধী থাকে না।রিফাত হত্যার আগে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগীরা এলাকায় নানা ধরনের অপরাধ করে বেড়াতো। তাদের সেই অপরাধের জন্য যদি কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হতো তাহলে আজকের এই নৃশংস কাজ করার সাহস পেত না। নয়ন বন্ড বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তাকে প্রকাশ্যে শাস্তির আওতায় আনা গেলে অনেক চাঞ্চল্যকর অজানা তথ্য বেরিয়ে আসতো। দেশবাসী জানতে পারতো তার পেছনের মদদদাতা ও শক্তিদাতা কারা। যেমন আমরা জানতে পেরেছি নুসরাত হত্যার ব্যাপারে।এটা সত্য সামাজিক অবক্ষয় দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করছে। হেন কোনো অপরাধ নেই, যা সমাজে সংঘটিত হচ্ছে না। স্ত্রী স্বামীকে, স্বামী স্ত্রীকে, মা-বাবা নিজ সন্তানকে, ভাই ভাইকে অবলীলায় হত্যা করছে। প্রেমের কারণে অর্থ সম্পত্তির লোভে সমাজে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অন্যদিকে হতাশা নিঃসঙ্গতা বঞ্চনা অবিশ্বাস আর অপ্রাপ্তিতে সমাজে আত্মহননের ঘটনাও বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে ছেলে খুন করছে বাবা-মাকে, স্বামী খুন করছে স্ত্রীকে কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে। অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেয়ার নিমিত্তে নিজের সন্তানকে হত্যা পর্যন্ত করছে। পারিবারিক বন্ধন স্নেহ ভালোবাসা মায়া মমতা আত্মার টান সবই যেন আজ স্বার্থ আর লোভের কাছে তুচ্ছ। আসলে আমরা আজ যে সমাজে বাস করছি সে সমাজ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। আমরা নানারকম সামাজিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। পা পিছলে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। সমাজের একজন সুস্থ এবং বিবেকবান মানুষ হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কি সামাজিক ক্ষেত্রে, কি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে- সর্বক্ষেত্রেই অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি; যা একজন শান্তিকামী মানুষ হিসেবে আমরা স্বাধীন ও একটি গণতান্ত্রিক দেশে কল্পনা করতে পারছি না। এ অবক্ষয় ইদানীং আরো প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধ তথা ধৈর্য, উদারতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যাদি নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়ার কারণেই সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেয়। যা বর্তমান সমাজে প্রকট। সামাজিক নিরাপত্তা আজ ভূলুণ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, দেশের সামগ্রিক যে অবক্ষয়ের চিত্র এর থেকে পরিত্রাণের কোনো পথই কি আমাদের খোলা নেই? আমাদের অতীত বিস্মৃতির অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, বর্তমান অনিশ্চিত এবং নিরাপত্তাহীনতার দোলাচলে দুলছে এবং ভবিষ্যৎ মনে হচ্ছে যেন পুরোপুরি অন্ধকার। যারা সমাজকে, রাষ্ট্রকে পদে পদে কলুষিত করছে, সমাজকে ভারসাম্যহীন ও দূষিত করে তুলছে, সমাজের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুর্ণ করছে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। চারদিকে যে সামাজিক অবক্ষয় চলছে, তারুণ্যের অবক্ষয়- এর কি কোনো প্রতিষেধক নেই? আমাদের তরুণরা আজ হতাশ এবং দিশেহারা। লেখাপড়া শিখেও তারা চাকরি পাচ্ছে না। ফলে অনেকেই ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ খুন-ধর্ষণের মতো, ডাকাতির মতো অমানবিক এবং সমাজবিরোধী কাজেও জড়িয়ে পড়ছে। কেউবা হয়ে পড়ছে নানা ধরনের মাদকে আসক্ত। অনেকেই আবার সন্ত্রাসীদের গডফাদারদের লোভনীয় হাতছানিতে সাড়া দিয়ে সন্ত্রাসে লিপ্ত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে তাদের এই অধঃপতনের জন্য দায়ী কে? দায়ী আমরাই। আমরাই তাদের সুপথে পরিচালিত করতে পারছি না। এর পাশাপাশি ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখল ব্যাপারটি তো দেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে কে আমাদের পরিত্রাণ দেবে এবং কে-ইবা আমাদের পথ দেখাবে? নৈতিক শিক্ষার প্রথম ও প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে পরিবার। পরিবারের সদস্যরা যদি নৈতিক হয় তা হলে সন্তানরাও নৈতিক হয়ে উঠবে। সমাজের স্বাভাবিক ও সুস্থ গতিপ্রবাহ রক্ষা করার দায়িত্ব কার, সরকার, সমাজপতি নাকি সমাজের সচেতন মানুষের। সমাজ পুনঃনির্মাণের দায়িত্বই বা কার? আপতদৃষ্টিতে এসব প্রশ্ন সহজ মনে হলেও এর সমাধান বেশ জটিল। সমাজে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করে, বিচিত্র এদের মানসিকতা ও রুচি। এদের কোনো সমান্তরাল ছাউনির মধ্যে আনা কঠিন। তবে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা, সামাজিক অপরাধ কমিয়ে আনাসহ নানা পদক্ষেপ নিতে হবে সম্মিলিতভাবে। সমাজ রক্ষা করা না গেলে পরিবার রক্ষা করা যাবে না, ব্যক্তিকে রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে সমাজ পরিবর্তনের উপাদানসমূহ ব্যাখ্যা করা জরুরি।সমাজ পরিবর্তন মানে সামাজিক কাঠামো ও সমাজের মানুষের কার্যাবলি ও আচরণের পরিবর্তন। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন। মনে রাখতে হবে বিশৃঙ্খল অপরাধপ্রবণ অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে বসবাস করে উন্নত রুচি ও সংস্কৃতির অধিকারী হওয়া যায় না। এমন সমাজে পুড়িয়ে ও প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা বন্ধ করা সহজ কাজ নয়। আমরা চাই, পরিকল্পিত ও বিন্যস্ত সমাজ। নীতিবোধ ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সমাজ গঠনের প্রধান শক্তি, যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।সামাজিক জীবন ব্যক্তির কাছে এক আশীর্বাদ, এর পূর্ণতা লাভ করে সামাজিক বন্ধনের মাধ্যমে। সমাজ ব্যবস্থা এমনই হওয়া উচিত, যাতে ব্যক্তির স্বপ্ন ভঙ্গ না হয়। কিন্তু আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। সমাজে অপরাধ এতটাই বেড়েছে যে একদিকে ব্যক্তি নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ অন্যদিকে সমাজও ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। এটা প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। এই দায়িত্ব নিতে হবে পরিবার ও সমাজকেই। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও যথেষ্ট করণীয় রয়েছে। সমাজের একশ্রেণির বর্বর পাষন্ড মানুষের হাতে অনেকের জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়ছে, অবলীলায় জীবন চলে যাচ্ছে। এমনকি শিশুর জীবনও চলে যাচ্ছে আপনজনের হাতে। এই ধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা রোধ করতে না পারলে একদিকে যেমন সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে অন্যদিকে পরিবারের সদস্যরাও থাকবে নিরাপত্তাহীন। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনবে। সুতরাং সময় থাকতেই সাবধান হওয়া সমীচীন। এই অবক্ষয়ের আরেক চিত্র ইদানীং সমাজে শিশু হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাওয়া। আমাদের কোমলমতি শিশুরা কোনো দিক থেকেই এখন আর নিরাপদ নয়। নানা কারণে তাদের জীবনঝুঁকি বেড়ে গেছে। কখনো তারা দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে অথবা অপহরণ ও হত্যার নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছে, আবার কখনো তারা পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে।এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে সারা দেশে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২ হাজার ১৫৮ শিশু। এর মধ্যে নির্মমতার শিকার হয়ে মারা গেছে ৯৮৮ শিশু। গত বছরের প্রথম ৬ মাসের তুলনায় এ বছরের প্রথম ৬ মাসে শিশু ধর্ষণের হার বেড়েছে ৪১ শতাংশ। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা জাতীয় নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) পরিসংখ্যানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এই পরিসংখ্যান দ্বারা এটাই প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজে আমরা আমাদের কোমলমতি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা।এই ধরনের দুঃখজনক ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। অপার সম্ভাবনা ও স্বপ্ন নিয়ে যে শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠার কথা সেখানে কেন তাদের অকালে মৃত্যু হবে? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের কি কোনো ভূমিকা নেই? অথচ শিশু অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কেবল শিশু অপহরণ ও হত্যাই নয়, নারীর অবমাননা, লাঞ্ছনা, ধর্ষণ ও হত্যাও সমাজে বেড়ে গেছে। বিয়ের পর একজন নারীর সবচেয়ে ভরসাস্থল ও নিরাপদ জায়গা হচ্ছে তার স্বামী। সব ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক বৈরী পরিবেশ থেকে বাঁচিয়ে রাখার কথা যে স্বামীর, যে স্ত্রীর স্বপ্ন, ভালোবাসা একজন স্বামীকে ঘিরে, সেই স্বামীই হয়ে ওঠে লোভী, ভয়ঙ্কর, নির্যাতক।কোনোভাবেই আমাদের সমাজ যেন আলোর দিকে অগ্রসর হতে পারছে না।একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারীরা নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে থাকবে এটা যেখানে সমর্থনযোগ্য নয়। এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং সার্বিক অর্থেই আশঙ্কারও বটে।সামাজিক সুস্থতা আনয়নের পাশাপাশি নতুন সমাজ নির্মাণের জন্য এ ধরনের অবক্ষয়কে প্র্রতিরোধ করতে হবে এবং যে কোনো মূল্যে। এ জন্য ব্যাপকভাবে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন এবং এর কোনো বিকল্প নেই। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম।
আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রত্যুজ্জ্বল
২১জুন২০১৯,শুক্রবার,মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,নিউজ একাত্তর ডট কম:২৩ জুন, উপমহাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আওয়ামী, একটি উর্দু শব্দ। এই শব্দটি এসেছে উর্দু ,আওয়াম, শব্দটি হতে। আওয়াম শব্দের অর্থ জনগন, এর আরো দুইটি প্রতিশব্দ আছে, জনতা ও জাতীয়, আর লীগ অর্থ 'দল'। গণতান্ত্রিকভাবে জন্ম নেওয়া মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দলটি উপমহাদেশের রাজনীতিতে অবিভাজ্য ও অবিচ্ছেদ্য সত্তা হিসেবে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে। এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রত্যুজ্জ্বল। আওয়ামী লীগ মানেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলধারা। আওয়ামী লীগ মানেই সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের কাদা-মাটি গায়ে মাখা খেটে খাওয়া মানুষের কাফেলা। আওয়ামী লীগ মানেই জাতির অর্জন, সমৃদ্ধি আর সম্ভাবনার স্বর্ণালি দিন। অতীতের মতো বাংলাদেশের ভবিষ্যতেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। ৪৭-এর দেশ বিভাগ, ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬২-র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর যুগান্তকারী নির্বাচন আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন সহ সবখানেই সরব উপস্থিতি ছিল আওয়ামী লীগের।১৯৪৯ সালে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু। এই বছরের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে তত্কালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথম কাউন্সিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হককে দলের যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তখন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে বন্দী। বন্দী অবস্থায় তাকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক হন।১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে দলের তৃতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত হয়। মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। পরে কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বহাল থাকেন। ৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে দলের আন্তর্জাতিক নীতির প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীর মতপার্থক্যের কারণে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ ভেঙে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। আর মূল দল আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বহাল থাকেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড স্থগিত করা হয়। ১৯৬৪ সালে দলটির কর্মকান্ড পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান অপরিবর্তিত থাকেন।১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। এর পরে ১৯৬৮ ও ১৯৭০ সালের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এই কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে সভাপতি হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় সভাপতির পদ ছেড়ে দিলে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় পঁচাত্তরে কারাগারে ঘাতকদের হাতে নিহত জাতীয় নেতাদের অন্যতম এএইচএম কামরুজ্জামানকে। সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন মো. জিল্লুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আসে আওয়ামী লীগের ওপর মরণাঘাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবারো স্থগিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে আওয়ামী লীগকেও পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় যথাক্রমে মহিউদ্দিন আহমেদ ও বর্তমান সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে। ১৯৭৭ সালে এই কমিটি ভেঙে করা হয় আহ্বায়ক কমিটি। এতে দলের আহ্বায়ক করা হয় সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে। ১৯৭৮ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি করা হয় আবদুল মালেক উকিলকে এবং সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুর রাজ্জাক। এরপরই শুরু হয় আওয়ামী লীগের উত্থানপর্ব, উপমহাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলার মূল প্রক্রিয়া। সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দলের মধ্যে সমস্যা দেখা দিলে নির্বাসনে থাকা বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফেরার আগেই ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন থেকে সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন তখন থেকেই এরশাদ সরকারসহ বর্তমানে জনগণের দ্বারা নিগৃহীত দল বিএনপি বারবার শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে।১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে তার উপর চালানো হয় নারকীয় হত্যাচেষ্টা। ২০০০ সালে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার জনসভাস্থলে ৭৬ ও ৮৪ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট করা হয় নৃশংস গ্রেনেড হামলা। আল্লাহ্ তা'আলার অশেষ রহমতে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাটকীয়তায় ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাকে কারাবরণ করতে হয় এবং ২০০৮ সালের ১১ জুন তিনি কারামুক্ত হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে টানা ২য় বারের মতো জয়লাভ করে। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ কে পিছনে তাকাতে হয়নি। এরপর থেকে আজ অবধি চলমান বাংলাদেশের জয়রথ।ক্ষমতাগ্রহণের পরেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচার করে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করেন। এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা ও ভাতা প্রদান করেন।দীর্ঘদিন চলমান সমুদ্রসীমার সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেন এবং বিজয় লাভ করেন। ভারত-মায়ানমারের সমুদ্রসীমার দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করেন।দীর্ঘদিনের ছিটমহলবাসীদের আশা আঙ্খংক্ষা পূরণ করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় চুক্তি সম্পন্ন হয়। তাদের নিজস্ব পরিচয় দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।বিশ্বব্যাংক এর দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন না করায় শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংক এর বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং এতে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেন। যা এখন বাস্তব এবং দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার মাঝে যোগাযোগ স্থাপন করেছে।শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্ব দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। বছরের প্রথমদিনে ১ম থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই দিচ্ছেন। প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের টিফিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ছাত্রীদের উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থা সেশনজট মুক্ত করেছেন পুরোপুরিভাবে। তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।হাতের নাগালেই এখন সব পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে শতশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। বর্তমানে স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে । প্রতিটা উপজেলা একটি করে মডেল মসজিদ নির্মাণ করেছেন, ধর্মের প্রতি অনুরাগী করে গড়ে তোলার জন্য কয়েকহাজার মাদ্রাসা নির্মাণ করেছেন।শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছেন। আগের চেয়ে বেকারত্বের হার অনেক কমে গিয়েছে।লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারীদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি করে এগিয়ে এনেছেন। সামরিক বাহিনীসহ সকল ক্ষেত্রে নারীদের যুক্ত করে বৈষম্য দূর করেছেন। নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়িয়ে করেছেন ৬মাস, যা আগে ছিল ২ মাস।কৃষিক্ষেত্রে কৃষকদের জন্য কৃষি ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করেন।কৃষকদের সেবার জন্য অনলাইন সেবা চালু করেছেন।চিকিৎসাব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে ব্যাপক। নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করেছেন। অনলাইনে চিকিৎসা সেবা চালু করেছেন। প্রত্যেক ডাক্তারকে পাশ করার পর ১ম ২ বছর প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা বাধ্যতামূলক করেছেন। শিশুমৃত্যু হার কমে গেছে।শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ এর আওতাধীন আনার কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। রুপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছেন।শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাথাপিছু আয় বেড়েছে।যোগাযোগ ব্যবস্থায় অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। পদ্মা সেতুসহ ঢাকা শহরকে যানজট মুক্ত করতে ঢাকা শহরকে ফ্লাইওভারের মোড়কে সাজানো, বিভিন্ন মহাসড়ককে ৪ লেনে উন্নীতকরণ, ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ, মেট্রোরেল চালু, পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস রেলওয়ে ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে।প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর জন্য আদর্শ। বিগত সময়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় সহ সকল দুর্যোগ মোকাবেলায় এই সরকার শতভাগ সফল। দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সতর্কতা জারি ও দুর্যোগ সংগঠিত হওয়ার পূর্বেই নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া ও দুর্যোগ মোকাবেলাসহ সকল কাজে সফল এই সরকার।পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ ২য় অবস্থানে চলে এসেেেছ। পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। 'বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১' উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ৫৭তম স্যাটেলাইট ক্ষমতাধর দেশে পরিনত হয়েছে । সবুজায়নের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচী, আন্তঃপরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে শেখ হাসিনা 'চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ-২০১৫' নির্বাচিত হয়েছেন।প্রায় ১০লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক আশ্রয় দিয়ে ও লালনপালন করে সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছেন। যার স্বীকৃতিতে তিনি মাদার অব হিউম্যানিটি উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ও উন্নত, সমৃদ্ধশালী ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার বিকল্প একমাত্র শেখ হাসিনা-ই। সম্প্রতি বাজেট অধীবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,আগামী এক দশকে এ দেশে ক্ষুধা, বেকারত্ব, অশিক্ষা, বঞ্চনা ও দারিদ্র্য থাকবে না। দেশে বিরাজ করবে সুখ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি। আমরা আজ বর্তমান সরকারীদল আওয়ামীলিগের প্রতিষ্টা বাষীকিতে আশা করছি ,সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা হবে, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম।
তথ্যপ্রযুক্তির ফলে দক্ষতা প্রর্দশনের সুযোগ পাচ্ছে এ দেশের যুবকরা
১৪ জুন২০১৯,শুক্রবার,অনলাইন ডেক্স,নিউজ একাত্তর ডট কম:সময়টা তথ্যপ্রযুক্তির। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রের দক্ষতা প্রর্দশনরে সুযোগ পাচ্ছে এ দেশের যুবকরা। অনেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্র গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছেন। ফলে সমাজে সম্ভাবনার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। আসলে যুব সমাজই হচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতামুক্ত আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়তে দেশের এই বিশাল শক্তির উপযুক্ত ব্যবহার হওয়া দরকার। এরাই নিজেদের মতো ও মনন শক্তি ব্যবহার করে নির্ধারণ করবে দেশের আগামী দিনের চলার পথ। তাই সমাজের এই সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী অংশকে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। এ জন্য যুব সমাজের দক্ষতা ও র্কমক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মের জোগান দিতে হবে। যুব সমাজের অমিত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তাই প্রবাসে নয়, স্বদেশেই র্কমসংস্থান নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে।অফুরন্ত সম্ভাবনার অপর নাম বাংলাদেশ। এ দেশের রয়েছে অমিত সম্ভাবনাময় ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাত। ষোল কোটি মানুষ বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ নয়, আর্শীবাদ। কেননা, আবহমান কাল থেকেই এ দেশের মানুষরা কর্মনিষ্ঠ, পরিশ্রমী। অচিরেই এ দেশ পরিণত হবে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ পোশাক, জুতা, ওষুধ, সিরামিক ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিকারক দেশে। সৃষ্টির্কতার অপার কৃপায় ধন্য এ দেশে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে র্উবর মাটি আর দূষণমুক্ত পানি। গ্যাস ও কয়লার প্রার্চুযের পাশাপাশি এ দেশে বছের তিনবার ফসল উৎপাদিত হয়। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইতোমধ্যেই খাদ্যে স্বয়ংসর্ম্পূণতা র্অজিত হয়েছে, এ দেশে এখন আর কেউ না খেয়ে মরে না। কৃষিতে বৈপ্লবিক পরির্বতনের পাশাপাশি দেশের দরিদ্র, শ্রমজীবী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নির্ভর প্রবাসী আয়কে পুঁজি করে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ঘামঝরা শ্রমের ফসল পোশাকশিল্প উন্নয়নের ধারাকে করেছে আরও বেগবান। দেশে যেভাবে প্রবৃদ্ধি র্অজিত হয়েছে, র্অথনীতি এগিয়েছে, যেভাবে বিশ্বমন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলা করেছে, তাতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের মানুষ অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী।সত্তর দশকের 'ষড়যন্ত্রমূলক' তলাবিহীন ঝুড়ি, নব্বই দশকের বিশ্ব পরিমন্ডলে তুলনামূলক অচেনা বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী এক বিস্ময়ের নাম। উন্নয়ন নিয়ে ভাবনা-চন্তিা করা মানুষদের কপালে ভাঁজ ফেলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সম্ভাবনার দিগন্তে সাফল্যের পতাকা উড়িয়ে দেশ অব্যাহত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।আন্তজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসাচের মতে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে বিশ্বের র্অথনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি। বিএমআই রিসাচ মনে করছে, ২০২৫ সালের মধ্যে এই ১০টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্ব র্অথনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন র্অথাৎ চার লাখ তিন হাজার কোটি ডলার যোগ করবে, যা বিনিয়োগকারীদের বড় সুযোগ এনে দেবে। সম্প্রতি জাতিসংঘ উন্নয়ন র্কমসূচির (ইউএনডিপি) এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৫টি দেশ সর্ম্পকে প্রকাশিতব্য মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে তরুণদের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বছর কিংবা তার নিচে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ বা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই অবস্থান বাংলাদেশকে র্অথনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সুর্বণ সুযোগ এনে দিয়েছে। ইউএনডিপি বলছে, এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আরও বেশি কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে উৎপাদনশীল খাতে। ইউএনডিপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ। র্অথাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশই র্কমক্ষম। আগামী ১৫ বছরে র্অথাৎ ২০৩০ সাল নাগাদ র্কমক্ষম জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে যা হবে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ। দেশে বয়স্ক বা ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ ৭ শতাংশ। ২০৩০ ও ২০৫০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে যথাক্রমে ১২ ও ২২ শতাংশে।উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং র্অথনীতিবিদদের মতে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া র্অথনৈতিক ক্ষেত্রে র্ঈষণীয় সাফল্য র্অজন করেছে তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে। বাংলাদেশের সামনেও সোনালি ভবিষ্যৎ হাতছানি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হবে কিনা তা নির্ভর করছে সৃষ্ট সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে তার ওপর। বাংলাদেশের জন্য এ মুর্হূতে সমস্যা হলো জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ বেকার। যুব জনগোষ্ঠীর একটি অংশ অভিভাবকদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যুব সমাজের র্কমসংস্থানের যথাযথ পদক্ষেপ যেমন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে তেমন এ ক্ষেত্রে র্ব্যথতা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশের সোনালি ভবিষ্যতের র্স্বাথেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গতি আনার উদ্যোগ নিতে হবে।নিজেদের সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশেই কর্মসংস্থানের পথ খুঁজতে হবে। সময়টা তথ্যপ্রযুক্তির। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রর্দশনের সুযোগ পাচ্ছে এ দেশের যুবকরা। অনেকেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্র গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছেন। ফলে সমাজে সম্ভাবনার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। আসলে যুব সমাজই হচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতামুক্ত আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়তে দেশের এই বিশাল শক্তির উপযুক্ত ব্যবহার হওয়া দরকার। এরাই নিজেদের মতো ও মনন শক্তি ব্যবহার করে নির্ধারণ করবে দেশের আগামী দিনের চলার পথ। তাই সমাজের এই সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী অংশকে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। এ জন্য যুব সমাজের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মের জোগান দিতে হবে। যুব সমাজের অমিত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তাই প্রবাসে নয়, স্বদেশেই কর্মসংস্থান নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে।লেখক: মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী , সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট , গবেষক ও সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম ।
বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে
০৬জুন২০১৯,বৃহস্পতিবার,অনলাইন ডেক্স,নিউজ একাত্তর ডট কম:দেশে ধর্ষণের ঘটনা একে পর এক ঘটছেই। খবরের কাগজ উল্টালেই ধর্ষণের খবর পাচ্ছি। শতবর্ষী বৃদ্ধার ধর্ষিত হওয়ার খবর আমাদের সত্যিই ব্যথিত করে। বাড়িতে, কর্মস্থলে ও পথে-ঘাটে ধর্ষিত হয় নারী। ধর্ষকদের কাছে শিশু, বৃদ্ধাও রেহাই পায় না। মসজিদের ইমাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ড্রাইভার, হেলপার, সাংবাদিক, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, রাজনৈতিক, পুলিশ, ব্যবসায়ী ঘরে বাইরে লাঞ্ছিত করে নারীদের। ওদের হাত থেকে আয়া, বুয়া,বুড়া কেউ বাদ যায় না। লাঞ্ছিত হয়, ধর্ষিত হয়।প্রশ্ন হলো ধর্ষণ রোধের উপায় কি? আলেম সমাজ বলবেন- 'পর্দা প্রথায় ফিরে আসলে ধর্ষণ আর হবে না।' আবার অনেকে বলবেন- 'কঠোর শাস্তি দিলে ধর্ষণ কমবে।' সবটাই মানি। ধর্ষকরা কুরুচিপূর্ণ হয় এ কথা কিন্তু সত্য। আমি বলব, আগে ধর্ষকদের মানুষিকতা বদলাতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের এ ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মূল্যবোধের অবনতি আর অপরাধীর শাস্তি না হওয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততাই এ জন্য দায়ী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়।আমরা জানি, বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ- কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। একই আইনের ৯(২) ধারায় আছে, 'ধর্ষণ বা ধর্ষণ-পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে।' একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, 'যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ওই ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে।' ভারতে এ ক্ষেত্রে শুধু যাবজ্জীবনের কথা বলা আছে।অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে অযোগ্য লোক থাকায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়া ও এর আরেক কারণ। এ ছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এরা শাস্তি পাবে। শুধু আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মহামারী ব্যাপক রূপ নিয়েছে। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান বেশ কঠিন। সব কিছুতেই আজ দলবাজি চলে। তাতে কিছু মানুষ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। যৌন নির্যাতনের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। নারীর ওপর বলপ্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটতে পারে। কখনও দেখা যায়, সামাজিকভাবে কোণঠাসা কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার আশায় অলীক কল্পনা করতে থাকে। কিন্তু কাঙ্খিত সমাধান না পেয়ে, বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। ঘরে-বাইরে নারীর ওপর আগ্রাসী যৌন আচরণ, যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ সবই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোতে নারীর অধস্তনতাই প্রকাশ করে নানারূপে। তাই ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন, নারীর সম্মতি ছাড়া তার ওপর যে কোনো ধরনের আগ্রাসী যৌন আচরণ ক্ষমতা প্রদর্শনের, দমন-পীড়নের, কর্তৃত্ব করার কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষতান্ত্রিক বলেই নারীকে তারা গণ্য করে অধস্তন লৈঙ্গিক পরিচয়ের বস্তু হিসেবে- যা পীড়নযোগ্য। এটা খুবই আশঙ্কার কথা যে, সমাজে বেশিরভাগ নারীই নিরাপদ নয়। যারা উচ্চবিত্ত, সমাজের ওপরতলার মানুষ, এ জাতীয় বিপদ তাদের ছুঁঁতে পারে কম।এ দেশে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরাই বেশি। যারা নিম্নবিত্ত বাসিন্দা, তারা সম্ভবত এখনও ধর্ষণকে স্বাভাবিক মনে করেন। ভয়ে চুপ থাকেন। ইজ্জত হারিয়েও মুখ খোলেন না। তারা জানেন, আইন-আদালত করলে তাদের ভাগ্যে উল্টো বিপত্তি ঘটবে। অন্যায় করে অপরাধীরা এভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই দেশে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে আমরা ইমানি শক্তি হারিয়েছি। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ, যৌন কামনা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রেরণা আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে। তাই সমাজ থেকে সুখ, শান্তি বা আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। নিঃশর্ত ভালোবাসা বা ভক্তি কমে যাওয়ার কারণে আমাদের গঠনমূলক মনোভাব বা সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে আমাদের ভোগের মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত যৌন কামনার প্রভাবে আমাদের মধ্যে ধর্ষণ, জেনা, পরকীয়া ইত্যাদির প্রবণতা বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী ভারতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে হৈচৈ পড়ে যায়। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের জনগণ একেবারেই নীরব। সচেতন কম। প্রতিবাদ হয় না, হলেও খুবই সামান্য।আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে একাধিকবার চলন্ত বাসের ভেতর নারীর ওপর গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ তার জোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমাদের দেশে এমন ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটছে কিন্তু প্রতিবাদ নেই। নেই প্রতিকারও। ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের হার ভারতের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে সারা বছর ধর্ষণের ঘটনা নারী নির্যাতনের শতকরা ১৮ ভাগ, যা ভারতে ৯.৫ ভাগ। এ ছাড়া শুধু ঢাকায় সারা বছরে ধর্ষণের ঘটনা মোট নারী নির্যাতনের শতকরা ২০.৪৬ ভাগ, যা নতুন দিল্লিতে ৯.১৭ ভাগ। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অধিকাংশই এখনও তাদের ওপর নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনার কথা প্রকাশ করতে চান না। আর ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা পুলিশের কাছে থানায় কিংবা আদালতে মামলা করেন না। তাই সরকারের খাতায় প্রতি বছর যতগুলো ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে মনে করেন সমাজবিদরা।ধর্ষণ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ, লোভ-লালসা- নেশা, উচ্চাভিলাষ, সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই-ম্যাগাজিন, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ইত্যাদি মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে, তা বর্জন করতে হবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যৌন শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। বাজে সঙ্গ ও নেশা বর্জন করতে হবে। ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগেও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নিজ নিজ পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, অশ্লীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধ তদন্তে ও অপরাধীদের বিচারাধীন রায় পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ধর্ষক যে-ই হোক তাদের দ্রুত আটক করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, সরকারকে নারীর মর্যাদার আসন নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বদলে যেতে হবে। আসুন আমরা নারীর ওপর লোলুপ দৃষ্টি নয়; মায়া-মমতার দৃষ্টিতে তাকাই। পরনারীকে কখনও মা, কখনও বোন, কখনো বা মেয়ে ভাবতে হবে। তবেই ধর্ষণ, নারী নির্যাতন কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।ঘরের বাইরে নারীর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইন রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর বাস্তবায়ন নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজটিই এখন বেশি জরুরি।ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শহরেই বহু কর্মজীবী নারীকে সন্ধ্যার পর কর্মস্থল থেকে একাকী ঘরে ফিরতে হয়। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার প্রশাসন তা সুনিশ্চিত করবে, এমনটাই মানুষের প্রত্যাশা। ধর্ষকদের ধরতে হবে প্রথমে, এরপর সুষ্ঠু তদন্তও বিচারের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষিতাদের সার্বিক সহায়তা দেয়াটাও সরকারে মানবিক কর্তব্য। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যাতে নারীরা ঘরের বাইরে নিজেদের নিরাপদ ভাবে। কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। লেখকঃ লেখক: মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী , সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট , গবেষক ও সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ
২০মে,সোমবার,অনলাইন ডেক্স,নিউজ একাত্তর ডট কম: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩৮ তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করেছে দেশবাসী। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায় রচনা করে কতিপয় জঘন্য এবং বিপদগামী সেনা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা ইতিহাসে আজীবন ঘৃনীত হয়ে থাকবে।সেই কালো রাতে বিদেশে অবস্থান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। পরে দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ভারত হয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। লাখো জনতা সেদিন অভ্যর্থনা জানায় গনতন্ত্রের মানস কন্যা শেখ হাসিনাকে। সেদিন শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানানোর জন্য শুধুমাত্র বিমানবন্দরেই উপস্থিত হয় ১৫ লক্ষ্য মানুষ। ১৯৮১ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দেশে ফিরেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন শুরু করেন শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় ৯০ এর গণ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন হয় এবং বিজয় হয় গণতন্ত্রের। ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে মোট চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয় শেখ হাসিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন। ছিলেন রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও। শিক্ষা জীবন থেকেই শেখ হাসিনা গণ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিরোধী শক্তি কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রত্যেকবারই প্রাণে বেঁচে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাব জেলে পাঠায়। প্রায় ১ বছর পর ২০০৭ সালের ১৯ জুন তিনি মুক্তি লাভ করেন। গণতন্ত্রের মানস কন্যা শেখ হাসিনা মিয়ানমার সামরিক সরকারের হাতে নির্যাতিন এবং বিতাড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করে সৃষ্টি করেছেন মানবতার এক অনন্য উদাহরণ। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে নিচ্ছে। সমুদ্র বিজয় শেখ হাসিনার অন্যতম সাফল্য। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ২১ টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার যে মহৎ উদ্দেশ্য তা সমৃদ্ধ করেছে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বকে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, বেড়েছে মাথাপিছু আয়। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জায়গায়। যা বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে কল্পনা করা যেত না। কিছু দিনের মধ্যেই পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এর মত বড় বড় প্রকল্প গুলো বাস্তবায়ন দেখবে এ দেশের জনগন। ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়ন কেবল মাত্র শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব বলে এদেশের জনগণ ইতিমধ্যে বিশ্বাস এবং আস্থা স্থাপন করে ফেলেছে। শিক্ষাখাতে যে পরিবর্তন বাংলাদেশে ঘটেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি। উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ন। অর্থাৎ সার্বিক উন্নয়ন বলতে যা বুঝায় শেখ হাসিনা তা করে দেখিয়েছেন। পরিশেষে বলা যায়, মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মানুষের হৃদয় মন্দিরে সহস্র শতাব্দি ধরে বেঁচে থাকবে নিজ কর্মগুণে। লেখক: মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী , সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট , গবেষক ও সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম ।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর